সর্বশেষ আপডেট : ১৩ মিনিট ১০ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৮, খ্রীষ্টাব্দ | ৮ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

কিশোর গ্যাংওয়ারে আঁতকে উঠেছিল গোটা দেশ!

নিউজ ডেস্ক::

গেল বছরের শুরুতেই একদল কিশোরের গ্যাংওয়ারে প্রাণ হারায় উত্তরা ট্রাস্ট কলেজের ছাত্র আদনান কবির। একই রকম ঘটনায় বছরটিতে আরো কয়েকজন কিশোর নিহত হয়। এছাড়া সম্পদ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে কাকরাইলে মা-ছেলে এবং স্ত্রীর পরকীয়ায় বাড্ডায় বাবা-মেয়ে হত্যার ঘটনায় চমকে গিয়েছিল গোটা দেশ। বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফুন্নেসা আরিফা, এএসপি মিজানুর রহমান, হোটেল আল আরাফাতের ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন, উদীচী নেত্রী লিজা, মাদ্রাসাছাত্র জিদান, ব্যবসায়ী সিদ্দিক ও মনজিল হত্যাকাণ্ডের মতো চাঞ্চল্যকর সব ঘটনা। এসব আলোচিত হত্যাকাণ্ড ছাড়াও বছরজুড়েই গুম-খুন ও রহস্যজনক নিখোঁজ এবং ‘মুক্তিপণহীন’ অপহরণের ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। রাজপথে প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা যেমন ঘটেছে, তেমনই ঘরে ঢুকে কমান্ডো স্টাইলে হত্যার ঘটনাও আলোচিত ছিল। একটি খুনের রেশ না কাটতেই আরেকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। তবে গেল বছর নারী ও শিশুর ওপর সবচেয়ে বেশি নৃশংসতার ঘটনা ঘটেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গেল বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৩২১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছে ৪৯ জন। এদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দল নিজেদের মধ্যে ১৩৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় মারা গেছে ৪২ জন। আর আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে ১১টি সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছে মাত্র একজন। গেল বছরেও নারী ও শিশুদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চলেছে। এসিড নিক্ষেপে ঝলসে গেছে ২১ জনের মুখ ও শরীর। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৭৫১ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে শিশু আছে ১৭০ জন। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ৪৯ জন। আত্মহত্যার শিকার হয়েছে ১১ জন। ৯৭ জন নারী ও শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টাও হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সারা দেশে শিশু নির্যাতনের ৯৮৩টি ঘটনা ঘটেছে। ৫৭৪টি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ২৭টি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৬ বছরের নিচে শিশু হচ্ছে ১৩৯। আর ৭-১২ বছরের শিশু আছে ১৩৫। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ১৮৭টি।

জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সীমান্তে হত্যার শিকার ১৮ বাংলাদেশি। বিএসএফের গুলিতে আহত হয়েছে ৩২ জন। তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ৩৮ জনকে। এদের মধ্যে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ১৩ জনকে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১৫১ জন। এদের মধ্যে র‌্যাবের হাতে ৩৩ ও পুলিশের হাতে ১০০ জন নিহত হয়েছে। এসবের মধ্যে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ৯১ জন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসবের মধ্যে সংখ্যালঘুদের ৪৫ ঘর ধ্বংস কিংবা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মন্দির ও বিভিন্ন প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে ১৭৪টি। এতে ৫৭ জন আহত হয়েছে। এসব হামলায় মারা গেছে একজন।

মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলেছেন, অপরাধ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা। আবার সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের কারণেও অপরাধ বাড়ছে। তবে ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই ছিল। শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি বিবেচনা করা যাবে না। হত্যাকা-সহ বেশিরভাগ অপরাধের ঘটনায় মামলা হয়েছে। অনেক আসামি গ্রেফতার হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। যে হত্যা মামলাগুলো পেন্ডিং আছে, তা পরিপূর্ণভাবে ডিটেকশন করতে যে তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন, সেগুলো নানা কারণে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে, পুলিশ সদর দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে তিন হাজার ৫৪৯ জন খুনের শিকার হয়েছে। এর আগের বছর তিন হাজার ৫৯১ জন খুন হন। ২০১৫ সালে খুন হয়েছিল চার হাজার ৩৬টি। গেল বছর দেশজুড়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে তিন হাজার ৯৯৫ জন। আগের বছর ধর্ষণের শিকার হয়েছে তিন হাজার ৭২৮ জন নারী-শিশু। ২০১৫ সালে ধর্ষণ শিকার হয়েছে তিন হাজার ৯৩০ জন। গেল বছর বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে দুই লাখ ১৩ হাজার ৫২৯টি। আগের বছর মামলার সংখ্যা এক লাখ ৮১ হাজার ১৬৮টি। আর ২০১৫ সালে মামলা হয়েছে এক লাখ ৭৯ হাজার ৮৩৫টি। পরিসংখ্যান বিচারে অপরাধের হার কমলেও নৃশংসতা মাত্রা ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের খুন করা হয়েছে পৈশাচিক কায়দায়।

গেল বছর সারা দেশে সবচেয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল গুম-খুন ও রহস্যজনক নিখোঁজ এবং ‘মুক্তিপণহীন’ অপহরণের ঘটনা। একের পর এক জঙ্গি হামলা, গুম-নিখোঁজ আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যকর সব হত্যাকা-ে উদ্বেগ ছড়িয়েছে দেশে-বিদেশে। বছরের শুরুতেই কিশোর গ্যাংস্টারদের হাতে খুনোখুনিতে অভিভাবকদের মাঝে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এরপর মার্চে মাত্র তিন মিনিটে ব্যাংকার স্ত্রীকে খুন, নভেম্বরে কাকরাইল ও বাড্ডায় পরপর দুটি জোড়া খুনের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে দেশব্যাপী।

ভয়ানক গ্যাং কালচারের বলি স্কুলছাত্র আদনান : ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় উত্তরায় একদল কিশোর উত্তরার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবিরকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে। এসব কিশোর এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, আদনানকে হত্যার জন্য বের হওয়ার আগে তারা ফেসবুকে গ্রুপ ছবি পোস্ট করে জানান দেয়। ছবিতে তাদের সবাইকে নীল রঙের পোশাকে দেখা গেছে। কারো কারো হাতে ছিল হকিস্টিক।

ঘটনার সূত্রপাত ৩ জানুয়ারি। ওইদিন উত্তরায় কিশোরদের গ্যাং ডিসকো বয়েজ ও বিগ বস গ্রুপের সদস্যরা নাইন স্টার গ্রুপের গ্যাং লিডার রাজুকে ১৩নং সেক্টর ব্রিজের ওপর মারধর করে। প্রতিশোধ নিতে ৫ জানুয়ারি আজমপুর ফুটওভার ব্রিজের গোড়ায় নাইন স্টার গ্রুপের সদস্যরা বিগ বসের গ্যাং লিডার ছোটনকে আক্রমণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ডিসকো বয়েজ ও বিগ বস গ্রুপের সদস্যরা রাজুকে মারতে যায়। তাকে ধরতে না পেরে নাইন স্টার গ্রুপেরই অপর সদস্য আদনান কবিরকে ধারালো অস্ত্র ও হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে মারে। পরে চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা ধরা পড়ে।

মাত্র ৩ মিনিটে ব্যাংকার স্ত্রীকে খুন : গেল বছরের ১৬ মার্চ সেন্ট্রাল রোডে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে ইডেন কলেজের সাবেক ছাত্রী ও যমুনা ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফুন নেছা আরিফাকে কুপিয়ে হত্যা করে তার সাবেক স্বামী ফখরুল ইসলাম রবিন। হত্যাকাণ্ডের আগে-পরের দৃশ্য ধারণ করা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আরিফাকে খুন করতে মাত্র তিন মিনিট সময় নিয়েছিলেন রবিন। ঘটনার আট দিন পর ধরা পড়ে আসামি। পরে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়।

ছিনতাইকারীদের হাতে খুন এএসপি মিজান ও ছয় বছরের শিশু : হাইওয়ে পুলিশের সহকারী কমিশনার (এএসপি) মিজানুর রহমান তালুকদারকে খুনের ঘটনাটিও বিদায়ী বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল। ২১ জুন রাজধানীর মিরপুর বেড়িবাঁধের বিরুলিয়া ব্রিজ থেকে প্রায় ৫০০ গজ উত্তরে ঢাকা বোর্ড ক্লাবের সামনে থেকে এই পুলিশ কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে তদন্তে জানা যায়, সাধারণ মানুষ ভেবে মিজানকে প্রাইভেট কারে তুলে নেয় ছিনতাইকারীরা। পুলিশ জানার পর তাকে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে যায়।

অপর ঘটনাটি গত ১৮ ডিসেম্বরের। বড় ছেলে আলামিনের চিকিৎসার জন্য সপরিবারে শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় আসেন শাহ আলম গাজী ও আকলিমা বেগম। ভোরে তারা সদর ঘাটে নামেন। রিকশায় করে শনির আখড়ায় যাচ্ছিলেন। রিকশা দয়াগঞ্জ মোড়ে পৌঁছলে ছিনতাইকারীরা চলন্ত অবস্থায় আকলিমার কাছ থেকে ব্যাগে টান দেয়। এতে আকলিমা ও তার ছয় বছর বয়সি ছেলে আরাফাত পড়ে যায়। গুরুতর আহত শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। গত ২৩ ডিসেম্বর ঘটনায় জড়িত ছিনতাইকারী রাজীবকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পর দিন দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয় রাজীব।

অপরদিকে, ছিনতাইকারীদের আস্ফালন হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর কয়েক দিন পরই রাজধানীতে সাঁড়াশি অভিযান চালায় পুলিশ। ওই অভিযানে ৫৬ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়।

সম্পদের দ্বন্দ্বে মা-ছেলেকে গলাকেটে হত্যা : গেল বছরের অন্যতম আলোচিত হত্যাকা-গুলোর মধ্যে একটি ছিল কাকরাইলে নিজ বাসায় মা শামসুন্নাহার করিম ও ছেলে সাজ্জাদুল করিম শাওনকে গলাকেটে হত্যা। ২ নভেম্বর সন্ধ্যায় কাকরাইলের পাইওনিয়র গলির ৭৯/১ নম্বর বাসায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় শামসুন নাহারের স্বামী আবদুল করিম ও তার তৃতীয় স্ত্রী শারমিন আক্তার মুক্তা এবং মুক্তার ভাই আল আমিন জনিকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তারা তিনজনই জোড়া খুনের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে করিমের অধিকাংশ সম্পত্তির মালিক ছিলেন প্রথম স্ত্রী শামসুন্নাহার। এ নিয়ে মুক্তার মধ্যে অসন্তোষ ছিল। তাই বোনের স্বার্থ বিবেচনায় শামসুন্নাহারকে হত্যার পরিকল্পনা করে মুক্তার ভাই জনি।

বাড্ডায় পরকীয়ার বলি বাবা-মেয়ে : কাকরাইলে মা-ছেলে খুন হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই ৩ নভেম্বর রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় খুন হন বাবা জামিল শেখ ও তার নয় বছরের মেয়ে নুসরাত আক্তার জিদনী। পুলিশের তদন্তে জানা যায়, জামিলের স্ত্রী আরজিনা বেগম ও তার পরকীয়া প্রেমিক শাহীন মল্লিক পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে দুজনকে খুন করে। গ্রেফতারের পর দুই আসামিই হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: