সর্বশেষ আপডেট : ১৯ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

প্রকৃতি প্রেমী সাংবাদিক কাজল

মো: কায়ছার আলী:: “দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।” মানবজীবন ও অরণ্যজীবন-প্রাণের এ দুই মহান প্রকাশের মধ্যে বাজে একটি মাত্র ছন্দ। ঋতুচক্রের আবর্তনের পথে উভয়ের একই স্পর্শকাতরতা। বসন্তের দক্ষিণ বাতাসে মানুষ তার হৃদয়ের আনন্দভূতিকে চিত্রে, সংগীতে কিংবা কবিতায় প্রকাশ করে। আর অরণ্য তার বাসন্তী বেদনাকে প্রকাশ করে অশোক, পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম প্রগলভতায়। উভয়ের আদান প্রদানের সম্পর্কও অতি নিবিড়। এক বিপুল ভ্রান্তিবিলাসের জন্য মানুষ এতদিন তার পরম বন্ধুকে চরম শত্রু মনে করে নির্বোধ ঘাতকের মতো ধ্বংসের পৈশাচিক নীলায় মেতে ও উঠেছিল। কাজেই আজ আর বনভূমি ধ্বংস নয়, বনভূমি সৃজনই প্রয়োজন। বন-প্রকৃতি মানুষের নিকটতম প্রতিবেশী। বনভূমি পৃথিবীর আগন্তুক। অরণ্য তার অবারিত শ্যামল ছায়া বিস্তার করে তাকে সূর্যের প্রখর দহনজ্বালা থেকে রক্ষা করেছিল। তার ক্ষুধার্ত মুখে অরণ্যই দিয়েছিল খাদ্য, প্রকৃতির নানা বিরুদ্ধ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য দিয়েছিল নিরাপদ আশ্রয়। গভীর অরণ্যের বুকে মানুষ গড়ে তুলেছে চঞ্চল জনপদ।

জীবন স্পন্দনে অপূর্ব কোলাহলমুখর সে জনপদ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে বিস্তৃত হয়েছে। মাঠে মাঠে ফসলের দোলা, কর্মের সমারোহ, আনন্দের জয়ধ্বনি জেগেছে। কৃষি সভ্যতার বুনিয়াদ মজবুত হয়েছে। প্রয়োজন বেড়েছে মানুষের। বনের গাছ কেটে মানুষ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র তৈরি করেছে, ঘরের খুঁটি দিয়েছে। জীবিতকালে গাছ ফুলের সুবাস দেয়, ফল দেয়, অক্সিজেন দেয়, মরণের পরেও সে নানানভাবে মানুষের উপকার করে যায়। পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়নের মতো এমন উপকারী আর কিছু নাই। মানুষ আজ অরণ্য বিনাশের মাধ্যমে পৃথিবীতে ডেকে আনছে মরুভূমি। বিশ্বব্যাপী নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। শিল্পোন্নত দেশগুলো কর্তৃক অনিয়ন্ত্রিত বা অবাধে কার্বন নি:সরণের ফলে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনই হয়নি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বন ও বন্যপ্রাণী হুমকির মুুখে পড়েছে। হাতি, বাঘসহ অনেক প্রজাতির প্রাণী আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে মানুষের জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে রয়েছে ১৩.৪৬ শতাংশ।

পরিবেশ হচ্ছে পৃথিবীর অস্তিত্ব, স্বাভাবিকতা ও জীবনের অনুকূল অবদান বজায় রাখার অনিবার্য নিয়ামক। ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জীব ও পৃথিবীর স্বাভাবিকতার সাথে পরিবেশের সম্পর্ক নিবিড়ভাবে জড়িত। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৫জুন সুইডেনের স্টকহোমে মানব পরিবেশের উপর জাতিসংঘের উদ্যেগে অনুষ্ঠিত ১ম সম্মেলনে মানবজীবন, প্রাণিজগৎ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। সম্মেলনে বলা হয়-পরিবেশ দূষণের কারণে বিশ্ব ক্রমশ বিপর্যয়ের দিকে এগুচ্ছে। মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ডের জন্য যেভাবে পরিবেশ বিপর্যয়ের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে পৃথিবী অচিরেই বাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। সম্মেলনে বক্তাগন পরিবেশ রক্ষায় অবিলম্বে পর্যাপ্ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে মানবজাতির বাসস্থান পর্যাপ্ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে মানবজাতির বাসস্থান পৃথিবী বাস অযোগ্য হয়ে পড়ার শঙ্কা ব্যক্ত করেন। এ অবস্থায় বিশ্বকে মানবজাতির বাসোপযোগী রাখার লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৭তম অধিবেশনে প্রতি বছর জুন মাসের ৫ তারিখ বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসেবে পালন করার জন্য সদস্য রাষ্ট্রসমূহের প্রতি আহবান জানানো হয়।

এ বছর জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে যথাযোগ্য মর্যাদায় এদেশেও দিবসটি পালিত হয়। গত ৪ঠা জুন ২০১৭ সাংবাদিক আতাউর রহমান কাজল “বঙ্গবন্ধু এ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন ২০১৭” পদক পান। ঢাকার বঙ্গবন্ধু আনর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে স্বর্ণপদক, ৫০ হাজার টাকার চেক ও সনদপত্র গ্রহণ করেন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও গণসচেতনতা সৃষ্টির কাজে বিশেষ অবদান রাখায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয় তাকে এ পদকের জন্য মনোনিত করেন। এর পূর্বেও তিনি শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন, বেসরকারি সংস্থা, পাতাকুঁড়ি সোসাইটি, বাংলাদেশ বণ্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশসসহ বিভিন্ন সংগঠন কর্তৃক সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্র পান। সাংবাদিক কাজল ১৯৬১ সালের ১লা জুন ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার চপই গ্রামে ডাঃ শামসুল আরেফীন আখন্দ ও রওশন আক্তার বেগম দম্পতি ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। সুখী নীলগঞ্জ এর সুধাসম বুকভরা বাতাসে তথা সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠেন। স্থানীয় স্কুল থেকে মাধ্যমিক, কিশোরগঞ্জ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং গঙ্গা তিস্তার পূণ্য প্রবাহ বিধৌত বরেন্দ্রভূমির পুরাকীর্তির অনন্য নিদর্শন দিনাজপুর পলিটেকনিক থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ প্রথম বিভাগে ডিপ্লোমা ডিগ্রী অর্জন করেন। দুরন্ত যৌবনের দিনাজপুরে রয়েছে তার অসংখ্য স্মৃতি। বঙ্গবন্ধুর চেতনা ও আদর্শে লালিত, প্রগতিশীল ও সংস্কৃতিমনা সাংবাদিক কাজল শৈশব থেকে শিশুশিল্পী হিসেবে মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন। সমাজের দর্পণ বলা হত নাটককে। অন্য ভাষায় নাটককে দৃশ্যকাব্য বলে। আজ আকাশ সংস্কৃতির যুগে মঞ্চ নাটক বা যাত্রা হারিয়ে গেলেও সে সময় ছিল একমাত্র বিনোদন। দিনাজপুরের স্বনামধন্য নাট্যসংগঠন ও নাট্য পরিচালকের ছোঁয়ায় তিনি হয়ে উঠেন নাটকের নায়ক। কেন্দ্রীয় চরিত্রে সব সময় অভিনয় করতেন তিনি। স্মার্ট ও সুদর্শন সাংবাদিক কাজল ১৯৮৫ সালে রংপুর বেতার কেন্দ্রেও সরাসরি সম্প্রচারিত নাটকেও অংশ্র নেন। নাটকের নায়ক সাংবাদিক কাজল দিনাজপুর শহরের স্বর্ণব্যবসায়ীর পরিবারে আঞ্জুমান আরা আক্তারির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দিনাজপুর এবং ঢাকায় প্রকৌশলী পদে চাকরি করলেও কেন জানি শ্রীমঙ্গলে বড় বোনের বাসায় বারবার ছুটে যেতেন। হয়তো নিয়তি তাকে সেখানে নিয়ে গেছে এই জন্য যে, তার দ্বারা প্রকৃতি, পরিবেশ বন্যপ্রাণী, জীব বৈচিত্র্য ও ইকো-ট্যুরিজম বিষয়ক প্রতিবেদনসহ সৃষ্টিশীল কাজ করাবেন। লাউয়াছড়া উদ্যান ও শ্রীমঙ্গলের আলো বাতাস ছাড়া অন্যত্র তিনি শান্তি পান না। মানুষ ও গাছপালা যেমন অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে ও ত্যাগ করে।

তেমনিভাবে সাংবাদিক প্রকৃতিপ্রেমী কাজল শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে সাংবাদিক পেশাকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে দীর্ঘ ১৯ বছর যাবৎ ধারাবাহিক ভাবে লিখে চলেছেন। তার প্রকাশিত সংবাদ, ফিচার ও প্রতিবেদনের সংখ্যা চার হাজারেরও বেশি। আগামী প্রজন্মের জন্য তিনি ২৩টি ফিচারভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন যা শুধুদেশেই নয় বিদেশেও সমাদৃত হয়েছেন। তার কয়েকটি বই আমেরিকার লাইব্রেরি অব কংগ্রেস (খঙঈ) এ সংরক্ষিত রয়েছে। একজন সত্যানুসন্ধানী সাংবাদিক পথ অনেক পঙ্কিল ও দুর্গম। অনেক বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় একজন সাংবাদিককে। জীবনে ঘাত-প্রতিঘাত আছে এসব মেনে নিয়েই তিনি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সকলে যেন আরও সোচ্চার হয় এজন্য আগামী প্রজন্মের স্বার্থে এই গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যাচ্ছেন। শ্রীমঙ্গলের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সকল সাংবাদিক এর সাথে তার সুসম্পর্ক বিদ্যমান। তারা সর্বদা একের অপরের সাথে সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে কাজ করেন। সাংবাদিকতা জীবনে কয়েকটি পত্রিকায় কাজ করলেও সর্বদা সততা, বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে তিনি কাজ করতেন। মোহনা টেলিভিশনের শ্রীমঙ্গলের প্রতিনিধি সাংবাদিক কাজলের ‘বঙ্গবন্ধ ু এ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন ২০১৭’ পুরস্কার প্রাপ্তির খবর প্রচারিত হওয়া মাত্রই সমাজের সকল স্তরের মানুষেরা তাকে অভিনন্দন জানায়। তার সহধর্মিনী এ পুরস্কার প্রাপ্তিতে যেমন খুশি তার চেয়েও বেশি খুশি তার একমাত্র কন্যা কাকলী।  উনা জামাতা মোহাম্মদ উল্লাহ নান্টুও গর্বিত। সেই সাথে তৃতীয় প্রজন্মের উত্তরাধীকারী তার একমাত্র নাতনি নাজিফা মোহাম্মদ মুখের প্রথম বুলিতেই হয়তোবা তার প্রকৃতি প্রেমী নানুভাইয়ের পুরষ্কার প্রাপ্তিতে গর্ব করতে পারবে।

লেখক:: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

 

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: