সর্বশেষ আপডেট : ২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ডিজিটাল ফাঁদ বিদেশি প্রতারকদের

নিউজ ডেস্ক::

‘ডিয়ার কাস্টমার, কনগ্রাচুলেশনস। ইউর মোবাইল নাম্বার ওন ফাইভ লাখ পাউন্ড অ্যান্ড ৫১ ইঞ্চি এলইডি টিভি ফ্রম স্যামসং লটারি, টু ক্লেইম সেন্ট ইউর নেম, সেক্স, এজ, মোবাইল নাম্বার অ্যান্ড অ্যাড্রেস টু…।’ ফারজানা শরীফ নামে এক গৃহিণীর মুঠোফোনে এমন খুদেবার্তায় বলা হয়, কানাডা থেকে তার নামে পুরস্কারের একটি পার্সেল এসেছে শাহজালাল বিমানবন্দরে। বিকাশে ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে কাস্টমসের কাছ থেকে পার্সেলটি নিতে হবে। ফারজানা টাকা পাঠানোর কিছুক্ষণ পরই ফোন নম্বরটি বন্ধ পান।

পরে তিনি বিমানবন্দরে গিয়ে দেখেন তার নামে কোনো পার্সেলই আসেনি। ফারজানা বুঝতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। পরে এ ঘটনায় তিনি মামলা করেন। এরপর তার অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের ১৩ নভেম্বর উত্তরা থেকে কেলচি প্রিন্স জন, নিকেম স্যামুয়েল আজুইকি ও ডেনিস ওসিউডিরি চিফ নামে তিন বিদেশি প্রতারককে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, ওই চক্রটি গার্মেন্টস ব্যবসা ও ফুটবল খেলার কথা বলে এ দেশে এসে প্রতারণা শুরু করে। সম্প্রতি বিদেশি বিনিয়োগের ফাঁদে ফেলে এক ব্যাংকারের কাছ থেকে আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বিদেশি প্রতারকচক্র। এরপর ভুক্তভোগী ব্যাংকারের অভিযোগের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার উত্তরা থেকে ক্যামেরুনের নাগরিক কুয়াতে ফুতসু, আমেলিন মাওয়াবো ও এমবিদা একানিকে হারমানান গ্রেফতার করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে প্রায় ৬৫ লাখ টাকার সমপরিমাণ ইউরো এবং বিদেশি মদ জব্দ করা হয়।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে হঠাৎ করে প্রিসকো খলিফা নামে এক বিদেশি তরুণীর ফেসবুকে বন্ধুত্ব হয় ভোলার চরফ্যাশনের গ্রাম্য ওষুধ ব্যবসায়ী কামারুজ্জামানের। তাদের সে সম্পর্ক আস্থার স্থানে গড়ায়। এক পর্যায়ে ৪০ লাখ ডলারের লোভ দেখিয়ে ধাপে ধাপে কামারুজ্জামানের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় ওই বিদেশি তরুণী। শাহনূর হোসেন নামে আরেকজনের অভিযোগ, একইভাবে প্রলোভন দেখিয়ে তার ৪০ লাখ ৩৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বিদেশি একটি চক্রটি। দেশের মাটিতে বসে বিদেশি নাগরিকদের প্রতারণার এই ফাঁদ মূলত ইন্টারনেটকেন্দ্রিক। ফেসবুক, ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারের মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তুলে লটারিপ্রাপ্তি, বিদেশে পাঠানো, ব্যবসায় বিনিয়োগসহ মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া এমন বিভিন্ন লোভ দেখায়। আর লোভে পড়ে ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে লোকজন। অন্যদিকে এ দেশীয় আইনি দুর্বলতার সুযোগে একের পর এক অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে বিদেশিরা। বড় বিনিয়োগকারী, নামিদামি দাতা সংস্থার বড় কর্তাসহ বিভিন্ন পরিচয় দিয়ে লোকজনকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে বিদেশি অপরাধীদের সংঘবদ্ধ চক্র। আর তাদের মদদ দিচ্ছে দেশীয় চক্র।

ঢাকায় গত পাঁচ বছরে ২৬৩ বিদেশি অপরাধীকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হলেও তারা জামিনে বেরিয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না তাদের দৌরাত্ম্য। অথচ বিশ্বে কোথাও বিদেশি কোনো নাগরিকের একবার অপরাধ করে আটক হওয়ার পর শাস্তি ভোগ করে নিজ দেশে ফেরত যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। বাংলাদেশে আদালত থেকে মুক্তির পর কীভাবে ফেরত পাঠানো হবে তার নীতিমালা নেই। পাশাপাশি ফেরত পাঠানোর খরচের অর্থ কোন উৎস থেকে আসবে সে বিষয়েও নেই কোনো নির্দেশনা। ফলে আদালত কোনো বিদেশি অপরাধীকে মুক্তি দিলে সে আবার অপরাধে জড়াচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজধানীর অভিজাতপাড়ায় ও আগত বিদেশি নাগরিকদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি কম। সে কারণে তাদের দ্বারা অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এই অপরাধ প্রবণতারোধে বিদেশি নাগরিকদের ডাটাবেজ তৈরি করা, ইমিগ্রেশন সিস্টেমকে আরো আধুনিক করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হলে সমস্যার সমাধান সম্ভব বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিদেশিরা সাধারণত বিভিন্ন ক্লাবের খেলোয়াড়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, পর্যটক, ব্যবসায়ী বা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। অবৈধ এবং অপরাধে জড়িত এই বিদেশিদের বেশিরভাগই ঢাকার উত্তরা, মিরপুর, বিমানবন্দর, ভাটারা, গুলশান, শেরেবাংলা নগর ও বনশ্রী এলাকায় বাস করছে। তারা সবচেয়ে বেশি জাল টাকা, তৈরি ও বিপণন এবং ও চোরাকারবারে জড়িত। এদের কারণে দেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও প্রচুর সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। সামাজিকভাবে লিভ টুগেদারও বেড়েছে এসব অবৈধ বিদেশির কারণে। ছড়াচ্ছে এইডস ও অন্যান্য রোগব্যাধি। আশঙ্কা বেড়েছে জঙ্গিবাদের। সর্বোপরি বিঘœ ঘটছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার।

এদিকে বাংলাদেশে বিদেশিরা কোথায় অবস্থান করছে তার কোনো ডাটা নেই সরকারের কাছে। কেউ জানেন না এসব বিদেশির প্রকৃত সংখ্যা। যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমান বাংলাদেশে অবস্থান করা বিদেশিদের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। তবে এর বাইরে আরো প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এ ছাড়া বিনিয়োগ বোর্ড, বেপজা ও এনজিও ব্যুরোর হিসাবে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ বিদেশি বৈধভাবে কাজ করছে। বিভিন্ন সূত্রমতে, অনেক বিদেশি অনুমতি ছাড়াই বছরের পর বছর অবস্থান করছে। অপরাধে জড়ানোর পাশাপাশি তারা অবৈধভাবে আয় করে সে অর্থ পাঠাচ্ছে স্বদেশে। ফাঁকি দিচ্ছে কর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত অবৈধ নাগরিকদের বিরুদ্ধে খোঁজ-খবর নেওয়ার ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি রয়েছে। ঢাকায় বর্তমানে কতজন বিদেশি নাগরিক বসবাস করছে এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যও নেই তাদের হাতে। যদিও ইমিগ্রেশন পুলিশের দাবি, আগত বিদেশিদের তথ্যবহুল ডাটাবেজ রয়েছে তাদের কাছে। এদিকে ২০টি দেশের অন্তত ৭০০ নাগরিক অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত বলে গোয়েন্দা তথ্য আছে। খসড়া তালিকা থাকলেও তাদের ওপর যথাযথ নজরদারি নেই। অবৈধ বিদেশিরা কোথায়, কী ধরনের কাজ করছে, অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কি না, প্রত্যেকের ক্ষেত্রে পৃথক তথ্যও নেই কোনো সংস্থার কাছে। এসবের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় দুই লাখ বিদেশি অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৭ হাজার আফ্রিকানসহ ২০ দেশের নাগরিক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে বিদেশিদের তথ্য সব সময়ই হালনাগাদ করা হয়। অবৈধরা নিয়মিত শনাক্ত না হওয়ায় সঠিক তথ্য নেই কারো কাছেই।

গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি-উত্তর) শেখ নাজমুল আলম বলেন, বিদেশি নাগরিকরা কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে মিলে অপকর্ম করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অপরাধে জড়িত এমন ২০-২৫ জনকে আমরা শনাক্ত করেছি। এ ধরনের কয়েকটি সিন্ডিকেটের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে। কারা অধিদফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কারাগারে বন্দি আছে বিদেশিরা। এদের মধ্যে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে অতিরিক্ত দুই বছর জেল খাটছে ৮০ জন। সংশ্লিষ্ট দূতাবাস তাদের ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি। তবে কত বিদেশি জামিনে আছে তার হিসাব কারা কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। আদালত থেকে যেসব বিদেশি জামিন পায়, তাদের আইনজীবী বা দূতাবাসের যেকোনো কর্মকর্তার জিম্মায় দেওয়া হয়।

ডিএমপির পরিসংখ্যান অনুসারে গত পাঁচ বছরে ঢাকার বিভিন্ন থানায় মোট ২৮৭ বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে ৯৬টি মামলা হয়। এর মধ্যে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয় ২৬৩ বিদেশিকে। পলাতক থাকে ২৪। এর মধ্যে শুধু উত্তরায় গ্রেফতার হয় ১৯৩ জন। আবার গ্রেফতার ৬৩ বিদেশির নাগরিকত্ব শনাক্ত করা যায়নি। অপরাধী বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে জাল টাকা, চোরাকারবার, চোরাচালান, শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণ, প্রতারণা, জাল-জালিয়াতি, মাদক ব্যবসা, বৈধ কাগজপত্রবিহীন অবস্থান, চুরি, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, জঙ্গিবাদ, হ্যাকিং, হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা হয়।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: