সর্বশেষ আপডেট : ২১ মিনিট ৪১ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

‘ওরা আমাদের লজ্জিত করল’

নিউজ ডেস্ক::

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের শিক্ষকদের মধ্যে হাতাহাতি ও কিল-ঘুষির ঘটনায় সর্ব মহলে সমালোচনার ঝড় বইছে। গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে নীল দলের সভায় এ ঘটনা ঘটে। তার জের চলছে এখনো। দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বিচারের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি ছাড়িয়ে এ ঘটনা তোলপাড় তুলেছে গোটা শিক্ষক সমাজে। রাজনীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও ঘটনাটি বেশ আলোচিত ও সমালোচিত।

এ নিয়ে বেশ বিব্রত ঢাবি কর্তৃপক্ষ। তেমনি সরকারকেও বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে। এর আগে গত মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন নিয়ে নীল দলের শিক্ষকরা প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়লে সরকারের শীর্ষ মহলের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সুরাহা হয়েছিল। সেই শিক্ষকরাই এবার প্রকাশ্যে মারামারির মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়ায় জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হয়েছে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদেরও। দলীয় ফোরামে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। নিন্দার ঝড় বইছে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষকরা এ ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’, ‘অশোভন’ ও ‘অসুন্দর’ বলে মন্তব্য করেছেন। তারা এর মধ্য দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থায় ও শিক্ষকদের মধ্যে ‘নৈতিক অবক্ষয়’ দেখছেন। ঘটনায় জড়িত শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষকদের ‘লজ্জিত করল’ বলেও মন্তব্য করেছেন তারা। তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী কর্মকান্ড পরিচালিত হলে এমন ঘটনা ঘটত না। দীর্ঘদিন ধরেই সরকার সমর্থিত নীল দলের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চার অভাব রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চলেছে একক ক্ষমতাবলে। এ ঘটনা নানা অধিকার থেকে বঞ্চিত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

এসব শিক্ষক এ বলেও সতর্ক করেছেন যে, এগুলোর মীমাংসা দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে উচ্চতা ও মর্যাদা, সেটি অক্ষুণ্ণ রাখা না গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি সর্বনাশের দিকে যাবে।

এ ঘটনাকে ‘অসুন্দর’ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এ মারামারির মধ্য দিয়ে ওই শিক্ষকরা আমাদের লজ্জিত করল। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানের ও গবেষণার জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নীতি ও নৈতিকতা শেখানোর কথা। সেটাই হওয়া উচিত। তা না করে তারা হানাহানি, মারামারি করছেন। দলীয় রাজনীতি মুখ্য হয়ে উঠছে। এ ঘটনা অশোভন, অসুন্দর।’

এ প্রবীণ শিক্ষাবিদ আরো বলেন, ‘শিক্ষকরা কোনো দলকে সমর্থন করতে পারেন। তবে সেটি লেখা ও গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরবেন। তাদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়াটা অপ্রত্যাশিত। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষকই এটা করেন না। ক্ষমতা পেতে কিছু শিক্ষক এভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন, যা আগে ছিল না। শিক্ষকরা হবেন পথপ্রদর্শক।’

ঘটনাটিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কীভাবে দেখছে-জানতে চাইলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘ঘটনাটি কী পরিস্থিতিতে ঘটেছে, এর বিস্তারিত জানি না। তবে তা অপ্রীতিকর ও অপ্রত্যাশিত। উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ ও গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে এ ধরনের আচরণ জাতির কাছে কাম্য নয়। ঘটনাটি আওয়ামী লীগের সমর্থিত নীল দলের শিক্ষকদের মধ্যে ঘটলেও দলের পক্ষ থেকে তাদের বলার কিছু নেই। কারণ তারা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। তবে এটা বলব, নীল দলের শিক্ষকরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। একাত্তরের চেতনায় বিশ্বাসীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নিজেদের মধ্যে বিভেদ কাম্য নয়।’

অবশ্য নীল দলের শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বের রাজনীতির প্রকাশ ঘটে গত মে মাসে। ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে ৩৫ জন শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনের আগে নীল দলের প্রতিনিধি মনোনয়ন সভায় এক শিক্ষক আরেক শিক্ষকের দিকে তেড়ে যান। পরে নীল দল থেকে দুটি প্যানেল জমা হয়। যার একটি বাতিল করে দিলে দলাদলি প্রকাশ্য রূপ নেয়। গত ২৯ জুলাই সিনেটে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের দিন কিছু শিক্ষার্থী ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানাতে গেলে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের অনুসারী শিক্ষকদের বাধার মুখে পড়েন। কয়েকজন শিক্ষক ওইদিন শিক্ষার্থীদের কিল-ঘুষি মারেন এবং ধাক্কা দিয়ে ও কলার চেপে বের করে দেন। তবে সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারের ঘটনা আগের সব ঘটনাকে ছাপিয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা।

গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাবির টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সমর্থক ও তার বিরোধী পক্ষের শিক্ষকদের মধ্যে এ হাতাহাতি হয়। ঘটনার সময় হট্টগোল শুনে ক্যাফেটেরিয়ার বাইরে শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা ভিড় করেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তারা জানান, সেদিন শিক্ষকরা যেভাবে একজন আরেকজনকে মারতে গেছেন, চেয়ার নিয়ে তেড়ে গেছেন, সেটা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে হয়ে থাকে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় বিব্রত। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী বেশ ভালোভাবেই চলে আসছে। সেখানে প্যানেল করে নির্বাচন হয়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল দল ও শিক্ষকদের নিয়ে নীল দল ও বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সাদা দল। দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল। এই চর্চার প্রবর্তন করতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬০ সালের বিশ্ববিদ্যালয় কালো অধ্যাদেশ তুলে দিয়ে এই নতুন অধ্যাদেশ জারি করেন। সে অধ্যাদেশ অনুযায়ী তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই শিক্ষক সমিতি ও সিনেট নির্বাচন হয়ে থাকে।

‘কিন্তু কয়েক বছর ধরে নীল দলের মধ্যে শিক্ষক রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত হয়েছে বলেই এমন ঘটনা ঘটল। গণতন্ত্র না থাকার কারণে নেতা নির্বাচন ও নেতৃত্বে এক ধরনের ক্ষোভ ও বঞ্চনা ছিল। সঠিকভাবে সংগঠন চললে এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটত না’ বলেও মন্তব্য করেন এই উপাচার্য।

অধ্যাপক মিজানুর রহমান আরো বলেন, পাঁচ-সাত বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রাজনীতিতে গণতন্ত্র অনুপস্থিত ছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ গত বৃহস্পতিবারের ঘটনা। বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। যে শিক্ষক আহত হয়েছেন, তার বিরুদ্ধে এর আগেও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এসেছে। তবে এ ঘটনা অনকাক্সিক্ষত। এমন ঘটনা হওয়া উচিত নয়। এ ঘটনা প্রমাণ করে, যারা প্রশাসনে ছিল, তারা সবকিছু নিজেদের হাতে রেখেছে ও স্বেচ্ছাচারিতা করেছে। সবই হয়েছে একজনের নেতৃত্বে।

‘শিক্ষকরা রাজনীতি করবেন। তবে তা হতে হবে সুস্থধারার। বিভিন্ন ফোরামের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী গণতন্ত্রের চর্চা থাকতে হবে। সবকিছুই হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। যে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর মীমাংসা দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আলাদা মর্যাদা আছে। উচ্চতা আছে। এখানকার উপাচার্য, তার পদ, পদের মর্যাদা-সবকিছুরই উচ্চতা থাকতে হবে। তা না হলে এই বিশ্ববিদ্যালয় সর্বনাশের দিকে যাবে’-বলেও মন্তব্য করেন এই শিক্ষক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, এ ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। শিক্ষকদের এমন দলাদলি ও হাতাহাতির ঘটনা উদ্বেগজনক। এমন ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক অবক্ষয়ের নজির। যার দায় এড়াতে পারে না সরকার।

শিক্ষাঙ্গনের শৃঙ্খলা ফেরাতে দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, স্বার্থ-দ্বন্দ্ব থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শাসরুদ্ধকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সমস্যার উৎস মূলে রয়ে গেছে প্রশাসনের অতিমাত্রায় রাজনীতিকীকরণ। সরকারি দলের মধ্যেই বিভাজন। এগুলোর সমাধান দরকার।

এমন ঘটনা নেপথ্য কারণ হিসেবে নীল দলের কয়েক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার গণতান্ত্রিক চর্চা থেকে সরে গেছে। দীর্ঘদিন ছাত্র সংগঠন নির্বাচন নেই। ১০টি অনুষদের ডিন, ৬ সিন্ডিকেট সদস্য, সিনেটের ৩৫ শিক্ষক প্রতিনিধি, ২৫ রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি ও ৩ সদস্যের ভিসি প্যানেল এসব নিয়েই নীল দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে আছে। সবাই ক্ষমতায় যেতে চান।

এসব শিক্ষক এমনও বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন দলীয় রাজনীতি চর্চাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগেও রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। ক্ষমতার স্বাদ পেতে ক্ষমতাসীন সমর্থক শিক্ষকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ছে। প্রশাসনের অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণ আর শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজনের কারণে নষ্ট হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার মান।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: