সর্বশেষ আপডেট : ৩০ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

হারিয়ে যাচ্ছে মুর্তা : হারিয়ে যাচ্ছে শীতলপাটির কারিগর

শিপন আহমদ ::

মুর্তা উদ্ভিদ জাতীয়। মুর্তা গাছ সবুজাভ। প্রাকৃতিক সবুজ আবরণে আবৃত ছোট ছোট গাছ। তার গা আকারে বেশি বড় ও লম্বায় এতো দীর্ঘ হয় না। গায়ে ২ ইঞ্চি থেকে ৪/৫ ইঞ্চি ব্যসার্ধ গোলাকার ও লম্বায় হাত দু’হাত থেকে ৫/৬ হাত লম্বা হয়ে থাকে। জাম বা কাঁঠালের পাতার মত আকারও সবুজ। রজনীগন্ধার ফুলের মত সাদা ফুল ফুটে তবে ঘ্রাণ নেই। কখনো ঘিটু বাঁধা ডালপালা গজায়। মুর্তা গাছ নিত্য প্রয়োজনীয় কাজে লাগে। অজান্তে মুর্তা গাছ ঔষধীয় হতে পারে। বিজ্ঞ চিকিৎসকবিদরা তা হয়তো অবগত থাকবেন। আমরা জানি, বাংলাদেশের অতীত ঐতিহ্যে মুর্তা গাছ মানুষের দৈনন্দিন কর্মকান্ডে প্রয়োজনীয় থেকেছে। মুর্তা গাছের আবৃত সবুজ অংশ আবরণ বা চামড়া পাতলা করে চিলে উঠানো সম্ভব। মুর্তাকে চাকু দিয়ে চিলে করে যে সরু ও চিকন বেত বের করা হয় তাই মুর্তা বেত। বেতকে বের করার পর ভেতরে যে সাদা অংশ পড়ে থাকে তাকে মুর্তার বুক বলা হয়। মুর্তার বুক শুকিয়ে জ্বালানিতে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু শীতল পাটির জন্য উপযুক্ত বেত বের করতে মুর্তা বেত থেকে শুধু সবুজ আবরণটুকু চিলে নেয়ার ফলে আরেকটি সাদা আংশ বেত স্বরূপ পাওয়া যায়। তাকে আউতি বলে। এ আউতি দিয়ে চাটি, দাড়িয়া, দাড়া, ঝাড়ু ও আউতি আদি তৈরি করণে ব্যবহৃত হয়। পক্ত শক্ত মোটা মুর্তা কেটে যে বেত বের করা হয় তা দৈনন্দিন ব্যবহার ও কাজে লাগে। সাংসারিক ব্যবহৃত বাঁশ বেতের জিনিসপত্র, খলই, টুকলা, টুকরি, ডাম, জুঙ্গি, ধান বা ফসলের আটি, নেরার আটি ও ঘরের চালের ছন ইত্যাদি বাঁধতে এ বেত ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যুগের তালে তালে এসব প্রক্রিয়ার পরিবর্তন এসেছে। মুর্তা বেতের পরিবর্তে জালী বেত, সরু লোহার তার ও প্লাস্টিকের বেত দিয়ে উপরে উল্লেখিত কাজ করা হয়।

শীতলপাটির প্রধান উপকরণ মুর্তা। কিন্তু নিজেদের প্রয়োজনে মুর্তা উজাড় করে ফেলার কারণে বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলার গ্রামাঞ্চল থেকে ক্রমেই মুর্তা কিংবা মুর্তার বাগান হারিয়ে যেতে বসেছে। এমনও দিন ছিল বিভিন্ন খাল-বিল ও লোকালয়ের পাশে প্রচুর মুর্তা পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে মুর্তা দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠেছে। আশির দশকে সরকার মুর্তা উৎপাদনের জন্য কৃষকদের ঋণ দেওয়ার কথা বললেও পরবর্তীকালে আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এর ফলে এখন আর সচরাচর মুর্তা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে করে পাটিশিল্পীরা বেকার হয়ে পড়েছেন। হস্ত ও কুটির শিল্পকে উৎসাহিত করতে সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও শীতলপাটির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে তাদের কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।

মুর্তার সরু গাছ ৮-১০দিন পানিতে ডুবিয়ে রাখার পর তা শুকিয়ে মুর্তাগাছের ছাল থেকে হালকা বেত বা আঁশ তৈরি করা হত। পরে বেতগুলো বিভিন্ন প্রকার রঙে ডুবিয়ে শিল্পীরা দক্ষ হাতে বুনন করে একের পর এক শীতলপাটি তৈরি করতেন। ঢাকার বিখ্যাত মসলিনের মতো শীতলপাটিও এক সময় ছিল সৌন্দর্য ও শিল্পের প্রতিক। শীতলপাটি হরেক রকমের হয়ে থাকে। এর মধ্যে পয়সা, শাপলা, সোনামুড়ি, জয় পাটি, টিক্কা, সিকি, লাল গালিছা, আধুলি, মিহি প্রভৃতি পাটির কদর ছিল বেশি। কথিত আছে, মিহি পাটি এমনভাবে মিহি ও পিচ্ছিলভাবে তৈরি করা হতো যে, একটা পিঁপড়া পর্যন্ত এর উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারত না। শীতলপাটি শিল্পের সাথে জড়িতরা হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত। আর তাই পাটিতে তারা নানা ধরনের মন্দির, ত্রিশূল ও আলপনার আদল তৈরি করতেন। তাজ মহলও তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারেনি। ব্রিটিশ আমলে রানি ভিক্টোরিয়ার প্রাসাদের বালাগঞ্জের শীতলপাটি আভিজাত্য হিসাবে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল। বাড়িতে নতুন জামাই কিংবা পরম কাক্সিক্ষত অতিথি এলে শীতলপাটি বিছিয়ে বসতে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। কেউ অপারগ হলে লজ্জায় পড়তে হতো। শীতলপাটি একসময় হয়ে ওঠে এঅঞ্চলের মানুষের সভ্যতার মাপকাঠি।

ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলেও শীতলপাটির কদরের কমতি ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শীতলপাটি শিল্প বাজারে প্রচুর মার খেতে শুরু করে। বর্তমানে শীতলপাটি শিল্পীদের জীবন একেবারে নাজুক। বালাগঞ্জ উপজেলার তেঘরিয়া, চাঁনপুর, আতাসন, শ্রীনাথপুর, গৌরীপুর, মহিষাসি, লোহামোড়া, প্রভৃতি গ্রামের সহস্রাধিক লোক শীতলপাটি শিল্পের সাথে জড়িত ছিলেন। কিন্তু শ্রম ও বাজার মূল্যের প্রচন্ড ব্যবধান শিল্প তৈরিতে শিল্পীকে বিমুখ করে তুলেছে। ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তান আমলে বিভিন্ন দেশ থেকে বণিকরা বালাগঞ্জে জাহাজ ভেড়াতেন। সেখানে বিভিন্ন পণ্য বিক্রয় শেষে তারা নিয়ে যেতেন বাহারি শীতলপাটি। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়ায় শীতলপাটির কদর ছিল। ভারতবর্ষে আগমনের প্রমাণ হিসাবে ভিনদেশিরা ঢাকা মসলিনের পাশাপাশি বালাগঞ্জের শীতলপাটি নিয়ে যেতেন স্মৃতি হিসাবে। ১৯৯১ সালে বিশ্বের কারুশিল্পের এক প্রদর্শনী ইতালির রোমে অনুষ্ঠিত হয়। সেই প্রদর্শনীতে রাজনগরের বিলবাড়ি গ্রামের মনিন্দ্র নাথ এদেশীয় প্রতিনিধি হিসাবে শীতলপাটি নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। শীতলপাটির বুননশৈলী অন্যান্য দেশের শিল্পীদের প্রশংসা কুড়ায়।

১৯৮২ সালে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী হিসাবে স্বীকৃতি পান বালাগঞ্জের তেঘরিয়া গ্রামের পবন জয় দাস। শীতলপাটি শিল্পীদের বর্তমান অবস্থা জানতে পাটিশিল্পীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখন গ্রামাঞ্চলে মুর্তা পাওয়া যায় না। দূর থেকে মুর্তা কিনে আনতে যে টাকা খরচ হয়, সব কিছু বাদ দিয়ে নিট মুনাফা আসে এর চেয়ে কম। এতে উৎসাহ হারায় পাটিশিল্পীরা। একটা পাটি তৈরিতে কমপক্ষে মাস খানেক সময় লেগে যায়। কিন্তু বাজারে তা বিক্রি করলে ৩০০-৩৫০ টাকার বেশি মূল্য পাওয়া যায় না। শ্রম মূল্য না পাওয়ায় অনেকেই এখন আর শীতলপাটি তৈরিতে আগ্রহী নন। এজন্য দিন দিন মানুষের ঘর থেকে সরে গিয়ে শীতলপাটি শোভা পাচ্ছে ইতিহাসের পাতায়।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: