সর্বশেষ আপডেট : ২৫ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

মরমি সাধক শাহ ফিরোজ মিয়া

জাকির শাহ ::
হযরত শাহজালাল শাহপরাণ ও তিনশত ষাট আউলিয়ার পদচারিত ধন্যভূমি সিলেটের মরমি ধারার গুপÍধন দীন ভবানন্দ সৈয়দ শাহনুর, শীতালং শাহ, শেখ ভানু, হাছন রাজা, রাধারমণ দত্ত, আছিম শাহ, আফজল শাহ, মাওলানা ইয়াছিন শাহ, মাওলানা তশনা, আরকুম শাহ, দূর্ব্বিণ শাহ, , শাহ আব্দুল করিম, প্রমুখ অসংখ্য মরমি, সূফি ও বাউলের জন্ম হয়েছে এই সিলেটের পূণ্যভুমিতে। তাই মরমি সাধনার ঊর্বরক্ষেত্র সিলেটে অদ্যাবদিও মরমি ধারার এই চর্চাটুকু চলছে এবং চলবেও। এটা যেন সিলেটের মানুষের ভ্রুণগত বৈশিষ্টের উল্লেখযোগ্য একটি।

উল্লেখিত মহাত্মাাজাতির এক সুযোগ্য উত্তরসূরির নাম মরমি সাধক শাহ ফিরোজ মিয়া। যার জন্ম ১৯৬৩ সালে সিলেট বিভাগের বিশ্বনাথ থানার দশঘর ইউনিয়নের চান্দভরাং গ্রামে । পিতার নাম আব্দুল হাসিম মাতার নাম নূরজাহান বেগম। পাঁচ ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। নানার বাড়ি নিজ গ্রামে থাকার সুবাদে নানা মুহাম্মদ খাতির হোসেনের ছত্রছায়ায় নানির কোলেপিঠে শৈশব থেকেই বেড়ে উঠা ফিরোজ মিয়ার।

লেখাপড়া করেন বল্লবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। শৈশব থেকেই নানির মাতৃছায়ায় আদৃত ফিরোজ মিয়া বিভিন্ন সময় নানির পৈতৃক নিবাস চন্দ্রচড়ি মুড়ারবন্দ দরবার শরীফে যেতেন। তারপর থেকে তাঁর মনের মধ্যে অজানা কোন এক অভাব দেখা দেয়। কৈশোরের ছেলেমাত্র ফিরোজ মিয়া মনের অজান্তে হাতে নেন বাঁশের বাঁশি। বাঁশিতে ফুক দিয়ে যেমন ইচ্ছা তেমন বাজাতেও ভালো লাগে। মনের ব্যারামের মহাদাওয়াই বাঁশের বাঁশিতে যে রয়েছে এটা তাঁর বোধের ভেতরে ধীরেধীরে এসেছিল। নির্জন স্থানে নিজেকে আড়াল করে বাঁশিতে ফুক দেওয়া অথবা একটুআধটু গলা ছেড়ে গান গাওয়া হয়ে ওঠে তাঁর প্রানের চাওয়া।

তারপর ছুটেচলা বিভিন্ন গানের আসরে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে সাহসের প্রসারতাও বাড়ে। নিজের গোপন খাক্তিটুকু সবার চোখে উন্মেষ হয়ে যায়। কি করা যায়। মা বাবর প্রথম সন্তান ফিরোজ মিয়াকে নিয়ে স্বপ্নের যে আল্পনা এঁেকছিলেন তা আর হয়ে উঠলো না। হয়ত কোন কোন সময় সে সন্তান স্বপ্নের উর্ধ্বেও চলে যায়। গান ভালো লাগে বাঁশি ভালো লাগে তাই তাঁর সন্ধানে ছুটে চলা ছাড়া আর উপায় নেই। তাই পাশের গ্রামের আম্বর আলী (জুয়েল মিয়া)র সঙ্গ নিলেন।

জুয়েল মিয়া তখন ক্বারী আমির উদ্দিন’র অন্যতম প্রথম শিষ্য হিসেবে ফিরোজ মিয়ার সুবিধা অনেকটা বেড়ে যায়। ফিরোজ মিয়া গৃহত্যাগি হয়েও গৃহপোষা গুরুর আস্তানায় পড়ে থাকেন। শুরু হয় তাঁর গানের ভুবনে পথচলা। গানের হাতেখড়ি অর্জন করে লেখালেখিতে মন দিলেন তিনি। রচনা করে গেলেন বেশ কিছু কালজয়ী গান। আর সে সময়ে মানুষের মুখেমুখে যে গানগুলো গীত হয়ে উঠেছিল সে গানগুলো এখনো বিভিন্ন স্টেজ প্রোগ্রামে, টিভি অনুষ্ঠানে আমরা শ্রবণ করে থাকি : না জেনে ভুল বুঝনা প্রাণে ব্যাথা দিও না (গেয়েছেন শিরিন), সাধ করিয়া কেন কুঞ্জ সাজাইলাম (গেয়েছেন আসিফ আকবর), মাগো তুই দোয়া কর তোর অভাগা জাদু রে ( গেয়েছেন সাজ্জাদ নূর), আমি হইলাম প্রেমো ভিখারি বন্ধুয়ায় বানাইল গো দেশান্তরী (গেয়েছেন সাজ্জাদ নূর) , তোরে লইয়া যাইমু আমি লন্ডনে (গেয়েছেন মমতাজ), সদায় আমি পত্র লেখি পন্থপানে চেয়ে থাকি উত্তর নিয়ে আসেনি পিয়ন, বন্ধুর লাগি কান্দে আমার মন (গেয়েছেন মমতাজ) এই সব গান এক সময় বাংলাদেশের প্রান্ত ডিঙ্গিয়ে সুদূর ইউরোপেও পৌছেছিল। তারপর লন্ডনে অবস্থানরত বাংলাভাষী গান পিপাসু লোকজনের আমন্ত্রণ আসে ফিরোজ মিয়ার। ১৯৮৫ সালের জুন মাসে ভক্তবৃন্দের আমন্ত্রণে পাড়ি দিয়েছিলেন সুদূর লন্ডনে। গান গেয়ে খুড়িয়েছিলেন অমূল্যখ্যাতি। তারপর দেশে ফিরে আসেন।

আবার শুরু হয় ফিরোজ মিয়ার হইচই। মালজুড়া আসরে ফিরোজ মিয়ার পারদর্শিতা ছিল খুব। তাই মালজুড়া গান-ই বেশি গেয়ে বেড়িয়েছিলেন সিলেটের বিভিন্ন প্রান্তে। যাদের সাথে তাঁর একাধিকবার মালজুড়া গানের আসর হয় তাঁরা হলেন- আব্দুল হামিদ, পাগলা বাচ্চু, বিরহী কালা মিয়া, গনি সরকার, আবেদ আলী, ক্বারী আমির উদ্দিন সহপ্রমুখের সাথে। আসর গান নিয়ে মূখরিত সময়ের মধ্যে আবার ফিরোজ মিয়ার লন্ডনে যাওয়ার আমন্ত্রণ আসে।

দ্বিতীয় বার যাওয়ার একদিন আগে ফিরোজ মিয়া দুর্বৃত্তকারীদের হাতে আহত হয়ে পড়েন স্থানীয় সিলেটে। আর যাওয়া হল না তাঁর বিলেতে। অসুস্থ্য অবস্থায় তিনি অনেক দিন কাটিয়েছিলেন। তারপর ১৯৯০ সালে সংসার জীবনে আপোশ করেন ফিরোজ মিয়া। বিয়ে করার এক বছর পর অর্থ্যাৎ ১৯৯১ সালে তাদের প্রথম সন্তান আজিজ মুহাম্মদ এ জন্ম হয় । তারপর ১৯৯২ সালে তাদের কোল জুড়ে আসে আরেক মেয়ে সন্তান জেনি। গান আর সংসার নিয়ে চলে তাঁর দিন যাপন। ধীরেধীরে আজিজ, জেনি বড় হতে থাকে। বাবা মা’র স্বপ্নের অন্ত: নেই। গানের পসরা সাজানো আবাসস্থলে দুই সন্তানের বেড়ে ওঠা আর বাবার গান শুনেশুনে ঘুমিয়ে পড়া এবং জেগে ওঠা আজিজ জেনিও ফিরোজ মিয়ার আদর্শে আদর্শিত হয়ে যায়।

আজিজ মুহাম্মদ গানের প্রতি শুরু থেকেই দুর্বল ছিলেন। তাই বাবার কাছ থেকে সঙ্গীতের শুরুটা নিয়েও অদ্যাবদি চলছেন। আর জেনি তো বিস্মিত ক্ষুদে গানরাজের একজন। জেনি তখন অনেক ছোট হলেও সে ভালো গান গাইতে পারতো। ফিরোজ মিয়া গানের আসরে যেতেন, গান করতেন কিন্তু মনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারছিলে না। তাঁর এতো স্বপ্ন সাধনা আজ কই গেলো। কি রকম এক দুঃখ শোকে মূক ও বধির হয়ে থাকতেন তিনি। কিন্তু গান রচনা থেকে বিরত ছিলেন না। ভবের মায়াজাল ছিন্ন করে উড়ে যাওয়া পাখির প্রতি মিনতি সুরে লিখেছিলেন- যে দিন পাখি লোকি দিবে/ আমায় সে দিন হারাইবে/ ফিরোজ মিয়া চলে যাবে/ যথায় আসল ঠিকানা/ আরে ও উড়াল পাখি রে উড়ে যাইওনা। আসলে ভাবুক আর সাধক যাই বলি তাঁরা সব সময় অধরা পাখির সন্ধানে অথবা দেহত্যাগি পাখির বিচ্ছেদের কথাকে স্মরণ করে গেয়েছিলেন জলপড়া গান।

এটা স্বাভাবিক মানুষের কাছে যদিও সাধারন বাক্য বা কথার মত কিন্তু তারাও একদিন অন্তীম সময়ে এই পাখির বিচ্ছেদে দিশাহারা হবেন। জগতের ক্ষণিক সুখের মোহঘোরে আমরা সবাই মজে থাকি কিন্তু ফিরার কথা জেনেও চির সত্যকে মানতে নারাজ আমরা। তারপর লিখেছেন চর্মচক্ষুর অন্তরালে লোকিয়ে থাকা আরাধ্য এক পিয়ারীর কথা-কল্পনাতে জাগে মনে/ সদায় আসিয়া মোর সনে/ স্মরণে করতেছে আলিঙ্গন/ তাই ভাবিয়া নিশি দিনে/ সদায় থাকি জাগরনে/ কবে আসে আমার গুণোধন/ উত্তর নিয়ে আসেনি পিয়ন। ফিরোজ মিয়া এমন এক পিয়ারির প্রেমে মজেছিলেন যে পিয়ারি কেবল অনুভূতির ভাবনায় হৃদয়ে আসা যাওয়া করতো। কিন্তু তাঁর অনুভব ঠাহর করার জন্য তিনি রাত দিন নিদ্রাহীন অবস্থায় থাকতেন। পরমের প্রেমে যে হৃদয় আসক্ত হয়ে পড়ে তাঁর ছটফটানিতেই জীবন চলে যায়। প্রেমাস্পদের টানে প্রেমিক প্রায় বাতুল হয়ে পড়েন।

জাগতিক চেতনা যদিও বোধের ভেতরে থাকে কিন্তু তা কখনো আকৃষ্ট করে রাখতে পারে না। এই ভাবে ক্ষণবয়ষ্ক পরম প্রেমি মানুষটি দিন দিন ক্ষীণ হয়ে পড়েছিলেন। ২০০৮ সালে তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। মৃত্যুর আগাম বার্তা ঠাহর করে পরকালে যাওয়ার আগ মুহূর্তে লিখেছিলেন দুটি গান: আমি বাঁচতাম নায়রে আইল মরণের খবর/ কে আছে এমন দরদি দেখত এক নজর/ আমি বাঁচতাম নায়রে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মানুষের মনের অবস্থা হতাশায় জর্জরিত থাকে। আপনজনকে কাছে পাওয়ার এক নিদারুন চাওয়াই রয়ে যায়। অন্তীম সময়ে যদিও কারও কিছু করার থাকে না কিন্তু শেষ দেখাটাই হয়ে ওঠে আফসোসের বিষয়। তারপর লিখেছিলেন: মরণ ব্যাথা সহিব কেমনে/ পুড়া পরাণে, মরণ ব্যাথা সহিব কেমনে/ জিন্দা থাকতে হইলাম দুর্বল/ হারাইলাম শক্তি সম্বল/ করল দখল ভবের নিদানে// দয়াল গুরুর সঙ্গ ধরো / মরার আগে একবার মর/ বাঁচতে পারো এই তিনের বন্ধনে/ জগতে রহিল সাধ/ কারে করি প্রতিবাদ/ ফিরোজ মিয়ার জায়গা নাই ভুবনে// আসলে এই অন্তীম সময়-ই ছিল ফিরোজ মিয়ার শেষ সময়। আর গান গাওয়া হল না, হল না আর গান লিখা। মাত্র ৪৫ বছর বয়স অতিক্রান্ত হয়ে ২০০৮ সালে এমন এক সময়ে অসীমের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন তিনি না ফেরার দেশে। সব কিছুতেই পরমের মঙ্গল নিহিত।

লেখক : গীতিকার

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: