সর্বশেষ আপডেট : ৮ ঘন্টা আগে
শুক্রবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৮, খ্রীষ্টাব্দ | ৭ বৈশাখ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সিলেট অঞ্চলে হারিয়ে গেছে গ্রামবাংলার ‘গরুবারি’

শিপন আহমদ ::
“রাখাল ছেলে! রাখাল ছেলে! বারেক ফিরে চাও/, বাঁকা গাঁয়ের পথটি বেয়ে কোথায় চলে যাও?”/ রাখাল গরু চরায় কেটে যায় বেলা/, চাষি ভাই করে চাষ কাজে নাহি হেলা”। আ ন ম বজলুর রশীদ রচিত ‘আমাদের দেশ’ ও পল্লিকবি জসীমউদদীন রচিত ‘রাখাল ছেলে’ কবিতায় গ্রামীণ জনপদের রাখাল ছেলের অপরিসীম গুরুত্ব ও তাৎপর্য ফুটে উঠলে কালের বিবর্তনে আজ সিলেট অঞ্চলে গ্রাম বাংলা সেই রাখালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে আছে। তারই সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য ‘গরুবারি’ প্রথা।

এক সময় সিলেটের প্রতিটি এলাকায় গরুবারি প্রথা চালু ছিল। নিয়মনুযায়ী প্রতিদিন গ্রামের একেকজন ওই গ্রামের সবার গরু একত্রিত করে মাঠে নিয়ে গিয়ে রাখালের দায়িত্ব পালন করতেন। আবার বিকাল হলে নিজ দায়িত্বে গরুগুলোকে তাদের মালিকদের কাছে সমঝে দিতেন। একযুগ আগেও সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের থেকে আসা রাখালেরা ছিল পেটের দায়ে গৃহস্থ বাড়ির অলিখিত চুক্তিভিত্তিক দাস। রাখালের সাথে গৃহস্থ বাড়ির সস্পর্কের ভিন্নমাত্রা অন্য কিছুর সাথে তুলনা হতো না। অনেক পরিবারেই রাখালের উপর থাকত সংসারের গোটা দায়িত্ব। রাখালের বীরত্বের কাহিনি গ্রাম ছাপিয়ে ছড়িয়ে যেত গ্রাম-গ্রামান্তরে। গৃহস্থ পরিবারের ছোট ছেলে-মেয়েদের প্রথম বন্ধু ছিল রাখাল। কালের বিবর্তনে গরুবারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় রাখালদের কদরও পুরিয়ে গেছে। এর ফলে রাখালের দায়িত্বে গ্রামের সবার গরুগুলোকে একত্রিত করে ঘাস খাওয়ার সেই চিরচেনা চিত্র হয়তো আর কোনো দিনই আমাদের চোখে পড়বে না।

আগেকার দিনে শুষ্ক মৌসুমে প্রতিদিন একজন রাখালের দায়িত্বে ছোট বড় হালের বলদ দুধের গাভী ও বাচ্চাসহ কয়েকশ গরু একত্রিত করে একসাথে খোলা আকাশের নিচে কোনো না কোনো মাঠে ঘাস খাওয়াতেন। একজন রাখালের দায়িত্বে গরুগুলোকে একত্রিত করে ঘাস খাওয়াকে বলা হতো ‘গরুবারি’। গ্রামের সকল গরুকে একত্রিত করে যিনি রাখালের দায়িত্ব পালন করতেন তাকে বলা হত ‘গরুবারিদার’। তখনকার দিনে গ্রামে গরুবারি নিয়ম ছিল এরকমÑবড় গ্রাম হলে গ্রামে গৃহস্থদের বেশি সংখ্যক গরু থাকলে সে ক্ষেত্রে দু’ ঘরের দুজন একসাথে রাখালের দায়িত্ব পালন করতেন। এভাবে সিলেটের প্রতিটি গ্রামে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে গরুবারি দেয়া হতো। ছোট গ্রাম হলে তাতে গরুর সংখ্যা কম হতো, সে ক্ষেত্রে ঐ গ্রামের একজনই বারিদারের দায়িত্ব পালন করতেন। সে নিয়ম অনুযায়ী ধারাবাহিক ভাবে প্রতিটি গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সবাইকে পর্যায়ক্রমে (যাদের গরু আছে) গরুবারিদারের দায়িত্ব পালন করতে হতো। সকালবেলা গ্রামের গৃহস্থ গোয়ালঘরের দরজা খুলে গরুগুলো ঘর থেকে বের করে নিজ দায়িত্বে বারিদারের কাছে সমজিয়ে দিয়ে আসতেন। আবার ঠিক সন্ধ্যা হবার পূর্বমুহূর্তে গরুগুলো নিজ দায়িত্বে বারিদারের কাছ থেকে বুঝে আনতেন। কৃষি জমিতে দালানকোঠা নির্মাণের ফলে হাওরগুলোতে এখন আর খালি মাঠ না থাকায় গবাদি পশুগুলো উন্মুক্ত স্থানে চরিয়ে ঘাস খাওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। সেই সাথে হারিয়ে গেছে গরুবারি প্রথা।

অন্যদিকে গরু দিয়ে হাল চাষ বা ধান মাড়াই দেয়ার বিকল্প পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ায় কৃষকরা আগের মতো গরু পালনের প্রয়োজন হচ্ছে না। বর্তমান সময়ে কৃষকরা জমির উর্বরাশক্তি বাড়ানোর জন্য জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। কিন্তু এক সময় গরুর গোবরই একমাত্র সার হিসেবে জমিতে ব্যবহার হতো। আবার গ্রামের হতদরিদ্র লোকজন গরুর গোবর দিয়ে গুঁই বানিয়ে (সিলেটি ভাষায় এটিকে মুটিয়া বলা হতো) বানিয়ে উনুনে জ্বালিয়ে রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহার করতেন। এলাকার মুরুব্বি আপ্তাবুর রহমান, করিম মিয়াসহ একাধিক বয়স্ক লোকজন বলেন, ছোটবেলায় তারাও প্রায় সময় গরুবারি দিয়েছেন। এমনকী আমরা লেখা পড়ার ফাঁকে সকাল বিকাল আমাদের গরুগুলো হাওরে নিয়ে যেত হতো বারিদারের কাছে। সে সময়ে গরুবারি দেওয়ায় একজনের বিশেষ অসুবিধা হলে তার পরিবর্তে অন্য আরেকজন ওই দায়িত্ব পালন করতেন।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: