সর্বশেষ আপডেট : ৮ মিনিট ২৫ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৯ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

মহীয়সী নারী নওয়াব ফয়জুন্নেসা

কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার অন্তর্গত পশ্চিমগাঁয়ে ১৮৩৪ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে ফয়জুন্নেসার জন্ম। তার বাবা আহাম্মদ আলী চৌধুরী এবং মা আরফানুন্নেসা চৌধুরানী। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তার অবস্থান ছিল তৃতীয়। বাল্যকাল থেকে লেখাপড়ার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। আর এই আগ্রহ দেখে জমিদার বাবা তার জন্য উপযুক্ত গৃহশিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। জীবনে তিনি কোনো দিন স্কুলে যাননি। কারণ সে সময়ে তিনি সমাজের রক্ষণশীলতা ভঙ্গ করতে চাননি। অত্যন্ত জ্ঞানস্পৃহায় তিনি বাংলা, আরবি, ফার্সি ও সংস্কৃত-এই চারটি ভাষায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

নওয়াব ফয়জুন্নেসা কেবল একটি নাম নয়, একটি জনকল্যাণকর প্রতিষ্ঠানও। ঊনবিংশ শতাব্দীর মানুষকে আলোকিত করার জন্য শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জনহিতকর কর্মযজ্ঞ আমৃত্যু অব্যাহত রেখেছিলেন তিনি। সামাজিক সংকট, অসত্য, নিমর্মতা তাকে নিদারুণ কষ্ট দিয়েছে ঠিক, তবে পরক্ষণে তিনি প্রতিরোধে উজ্জীবিত হয়েছেন এবং তার কাজের মধ্য দিয়ে প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা কাজে লাগিয়ে প্রজা ও সাধারণ মানুষকে সঠিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীই উপমহাদেশে সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেছিলেন, পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও শিক্ষার যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। আর এই প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই তিনি নারীশিক্ষার প্রতি বিশেষ মনোযোগী হয়ে পড়েন। তার চিন্তাধারায় অগ্রগণ্য হয়ে ওঠে যুগোপযোগী আধুনিক শিক্ষা ব্যতিরেকে সমগ্র নারীর উন্নয়ন সম্ভব নয়। লক্ষণীয়, যে যুগে মুসলিম ছেলেরাই ইংরেজি স্কুলে লেখাপড়া করত না, অথচ মেয়েদের ইংরেজি শিক্ষার জন্য তিনি ১৮৭৩ সালে কুমিল্লা জেলা শহরের উপকণ্ঠে বাদুরতলায় ফয়জুন্নেসা উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে অসীম সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বর্তমানে ফয়জুন্নেসা সরকারি পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় যুগের শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে চলমান।

উপমহাদেশের নারীজাগরণের অগ্রদূত হিসেবে ঐতিহাসিকরা বেগম রোকেয়াকে সবিশেষ স্থান প্রদান করলেও বেগম রোকেয়ার জন্মের পঁয়তাল্লিশ বছর পূর্বে নওয়াব ফয়জুন্নেসার জন্ম হয় এবং নারী জাগরণের উন্মেষ তার দ্বারা প্রথম ঘটেছিল। নিভৃত পল্লীতে বসবাস করে সমাজের অহমিকা ও দাম্ভিকতার বিপরীতে থেকে সম্পূর্ণ নিজস্ব মেধামননকে জাগ্রত করে সেই সময়কার সামাজিক প্রতিকূল অবস্থাকে উপেক্ষা করে নারীদের জ্ঞানকে আলোয় উদ্ভাসিত করার জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা করে গেছেন তিনি।

ইতিহাসে অমোচনীয় কালিতে লেখা হয়ে গেছে, ভারতবর্ষের নর-নারী জাগরণের অগ্রদূত হচ্ছেন নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী। উল্লেখ্য, ফয়জুন্নেসা উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দু’বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ১৮৭৫ সালে ভারতের মুসলিম জাগরণের অন্যতম অগ্রনায়ক স্যার সৈয়দ আহমদ মুসলিম তরুণদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য আলীগড়ে শামীউল্লাহ হাইস্কুলে ‘অ্যালো ওরিয়েন্টাল কলেজ’ গড়ে তুলেছিলেন। যা পরবর্তীকালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় নামে সুপরিচিতি লাভ করে। তাছাড়া নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলীর মতো মহৎ পুরুষরা শিক্ষার কথা ঢালাওভাবে বললেও অন্দরমহলের নেপথ্যচারিণী নারীদের শিক্ষার কথা বলেননি। তবে সৈয়দ আমীর আলী বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা-বিবৃতিতে ছেলেদের শিক্ষার ন্যায় সমভাবে নারীশিক্ষার কথা উল্লেখ করলেও কোনো সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। সেই শূন্য স্থানে একমাত্র নওয়াব ফয়জুন্নেসা দেশে তথা উপমহাদেশে সর্বপ্রথম পুরুষের পাশাপাশি নারীশিক্ষার তাগিদ অনুভব করেন এবং চেষ্টা চালিয়ে যান। ১৮৮৯ সালে ইংরেজ শাসনামলেই মহারানী ভিক্টোরিয়া কর্তৃক ভারতবাসীর কর্ম-কৃতিত্বের জন্য খেতাব প্রদানের তালিকায় প্রথম বাঙালি নারী হিসেবে স্থান পেয়েছিলেন বাংলাদেশের অখ্যাত পল্লী অঞ্চলের এক মুসলিম নারী জমিদার ‘নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী’।

সামাজিক প্রতিকূল অবস্থাকে উপেক্ষা করে নারীদের জ্ঞানকে আলোয় উদ্ভাসিত করার জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা করে গেছেন তিনি

নওয়াব ফয়জুন্নেসা ছিলেন জনকল্যাণের নিবেদিত প্রাণ। তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার ডগলাস একটি জনহিতকর কর্মে নিয়োজিত হয়ে বিশেষভাবে অর্থ সংকটে পতিত হন। সরকারি কোষাগারের অর্থ পেতে বিলম্ব হবে বিধায় তিনি স্থানীয় ধনাঢ্য ও জমিদারদের নিকট থেকে সাময়িকভাবে অর্থ-ঋণের প্রস্তাব করলে কেউ তার এই প্রস্তাবে সায় দেয়নি। কিন্তু নওয়াব ফয়জুন্নেসা প্রকল্পটি জনহিতকর জেনে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান করেন এবং ঘোষণা দেন ঋণ নয়, তিনি স্বেচ্ছায় দান করেছেন। মিস্টার ডগলাস নওয়াব ফয়জুন্নেসার এরূপ দানে বিস্ময় প্রকাশ করে মহারানী ভিক্টোরিয়াকে অবহিত করেন। রানী ফয়জুন্নেসার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাকে ‘বেগম’ উপাধি দেওয়ার ঘোষণা করেন। রানীর ঘোষিত এই উপাধি তিনি বিনয়াবনতভাবে প্রত্যাখ্যান করে জানান, জমিদার কন্যা ও জমিদার পতœী হিসেবে এমনিতে তিনি বেগম নামে সুপরিচিত। নতুন করে আবার পরিচিতির প্রয়োজন নেই। মহারানী ভিক্টোরিয়া জমিদার নন্দিনীর এমন সিদ্ধান্তে আশাহত না হয়ে এই গুরুত্ব উপলব্ধি করে অবশেষে ‘নওয়াব’ উপাধি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৮৮৯ সালে মহারানীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কুমিল্লার নওয়াব বাড়িতে তৎকালীন পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা ব্যয়ে ফয়জুন্নেসাকে ‘নওয়াব’ উপাধি প্রদান করা হয়। শুভেচ্ছার প্রতীক হিসেবে তাকে মনোহর তারকাকৃতির হীরকখচিত একটি পদকও উপহার প্রদান করা হয়, যা তিনি স্বহস্তে গ্রহণ করেন।

নওয়াব ফয়জুন্নেসার নাম ইতিহাসে উল্লেখ থাকলেও সে সময়ের ঐতিহাসিকরা বেগম রোকেয়াকে নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে অখ্যায়িত করে গেছেন। তবে নওয়াব ফয়জুন্নেসা বেগম রোকেয়ার জন্মের পঁয়তাল্লিশ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেন এবং ব্রিটিশ সরকারের মহারানী কর্তৃক নওয়াব উপাধিতে ভূষিত হয়েও যুগের পর যুগ উপেক্ষিত থেকে গেলেন শুধু ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিবিচারে। নারীশিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে কেউ তাকে স্মরণ করেন না বর্তমান নারীসমাজের প্রভূত অগ্রগতির মুহূর্তে। এমনকি স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে অনেক বরেণ্য ব্যক্তির জীবনী পাঠ্য হিসেবে থাকলেও এই মহীয়সী জনকল্যাণী ও নারীশিক্ষার উন্মেষকারিণী নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী অনুপস্থিত।

১৮৮৫ সালে নওয়াব ফয়জুন্নেসার মাতা বৃদ্ধা হওয়ার কারণে উপযুক্ত বড় দুই ভ্রাতা থাকা সত্ত্বেও তার বুদ্ধিমত্তা ও কর্মদক্ষতার জন্য বিশাল জমিদারি দেখাশোনা এবং তদারকির দায়িত্ব পড়ে ফয়জুন্নেসার ওপর। তিনি আমরণ সিংহচিহ্ন অঙ্কিত জমিদারির চেয়ার পরিত্যাগ করে সামান্য বেতের নির্মিত মোড়ায় উপবিষ্ট হয়ে একজন প্রজাদরদি সুযোগ্য শাসকরূপে ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। নওয়াব ফয়জুন্নেসা ছিলেন একাধারে শাসক, শিক্ষানুরাগী ও সুসাহিত্যিক। শাসকরূপে তিনি নিজেই ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে বিভিন্ন মৌজায় গিয়ে প্রজাদের সুখ-দুঃখের খবরাখবর নিতেন। প্রজাদের অভাব অভিযোগ লাঘবের চেষ্টা করতেন। প্রজাদের সুবিধার্থে নির্মাণ করেছেন বিভিন্ন মৌজায় খাল, পুকুর, রাস্তাঘাট, স্কুল, মুসাফিরখানা, দাতব্য চিকিৎসালয়, মাদ্রাসা-মক্তব ইত্যাদি। তাছাড়া তার জমিদারির আয়ত্তাধীন ১২টি মৌজায় সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়। তার দানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল লাকসাম দাতব্য চিকিৎসালয়। যা এখনো সগৌরবে মানুষের কাজে আসছে।

১৮৯৩ সালে কুমিল্লা শহরে প্রতিষ্ঠিত ফয়জুন্নেসা জানানা হাসপাতাল পরে ফিমেল ওয়ার্ড হিসেবে জেনারেল হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। মক্কায় হজ পালন করতে গিয়ে সুপেয় পানির অভাব মেটাতে সেখানে বহু অর্থ ব্যয় করে ‘নাহরে জুবাইদা’ পুনঃখনন করেন। পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে স্কুল স্থাপন এবং মক্কা শরীফে মাদ্রাসা-ই-সাওলাতিয়া ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে মাসিক ৩০০ টাকা হারে সাহায্যের ব্যবস্থা করেছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ফয়জুন্নেসার উত্তরাধিকারীরা এই অর্থ প্রেরণ করতেন নিয়মিত। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য নিজস্ব বাড়ি পশ্চিমগাঁয়ে ফয়েজিয়া মাদ্রাসা নির্মাণ করেছিলেন, কালক্রমে ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়ে তা নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজে রূপান্তর লাভ করে। নওয়াব ফয়জুন্নেসার সাহিত্যকীর্তি হলো রূপজালাল কাব্যগ্রন্থ। ১৮৭৬ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় রূপক কাহিনি আশ্রয়ে।

উনিশ শতকের শেষপ্রান্তে দেশ-উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনসুবিধাজনক কর্মকান্ডে নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর অবদান এবং ভূমিকা যুগের তুলনায় ছিল অনেক প্রাগ্রসর। তার এই অবদান দেশের সীমানা পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়িয়েছিল এ কথা আমাদের অনেকেরই আজো অজানা। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের মতো জাতীয় পর্যায়ে এই মহীয়সী নারীর অবদানের স্বীকৃতির বিষয়ে অনেক কিছু করার রয়েছে। নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী তার কাজের মাধ্যমে বেশকিছু সার্থক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, যা ইতিহাসে সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত, যা তাকে অমর করে রাখবে। এখানেই তিনি অনবদ্য সার্থক।

— সংগৃহীত

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: