সর্বশেষ আপডেট : ১ মিনিট ১৭ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৮ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে দুর্বিষহ শরণার্থী জীবন

1505703958নিউজ ডেস্ক:: শনিবার মধ্যরাত। আকাশ ভেঙে নামলো ঝুম বৃষ্টি। বিজলীর মুহুর্মুহু চমকানিতে গা ছমছম করছিল। প্রচণ্ড শব্দের বজ্রপাতে কেঁপে উঠছিল ভূমি থেকে পাহাড়। এর মাঝেই ১০ ফুট বাই ৬ ফুটের ত্রিপলে মোড়ানো ঘরে জবুথবু হয়ে কাঁপছিল ১১ জন আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ, যাদের তিনজন শিশু। বাঁশের কঞ্চির উপর দাঁড়িয়ে থাকা সে ঘরের ভেতরটা ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। বিজলী আর বজ পাতে ভীত শিশুরা ঠাঁই নিয়েছিল মায়ের বুকে। বয়স্করাও যেন চাপা আতঙ্কে কেঁপে কেঁপে উঠছিল। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা আবদুল মজিদের থাকার ঘরের চিত্র এটি।

দুই দিন আগে যেই মজিদ প্রাণে বাঁচার তাগিদে মাইলের পর মাইল পাহাড়, জঙ্গল ডিঙিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে সেই মজিদ এখনো বাঁচার লড়াই করছে। গতকাল রবিবার সকালে কথা হচ্ছিল মজিদের সাথে। ত্রিপল দিয়ে কোনোভাবে আকাশটা ঢেকে দিয়ে তার নাম দিয়েছে ‘ঘর’; কিন্তু সে ঘর কতোটা স্বস্তির তা উপরের চিত্রেই দৃশ্যমান। যখন তার সাথে কথা হচ্ছিল তখনো ঝুম বৃষ্টি। ত্রিপলের ফাঁক গলে বৃষ্টির ফোঁটায় ভিজে যাচ্ছিল ঘরের ভেতরটা। আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বস্তাবোঝাই কিছু মালামাল। এর মাঝেই কেউ শুয়ে আছে, কেউ বসে আছে।

উখিয়া-টেকনাফের রাস্তার দুই পাশের পাহাড়, ঝোপ কিংবা সমতলে আবদুল মজিদের ঘরের মতো এমন হাজারো ঘরের দেখা মিলবে। ছোট্ট ঘরে গাদাগাদি করে ৫ থেকে ৩০ জন পর্যন্ত রোহিঙ্গা দিন যাপন করছে। ৫-১০টি পরিবার একটি চুলায় রান্না করছেন। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, ধোয়ামোছার জন্য পানি নেই, শৌচাগার নেই। বৃষ্টি হলে ভিজতে হয়, আবার রোদ উঠলে পুড়তে হয়।

বালুখালী এলাকায় রাথেডং এলাকা থেকে আসা এনায়েত উল্ল্যাহ বলছিলেন, তারা ১০ ফুট বাই ১২ ফুটের একটি ঘরে ১৭ জন থাকছেন। সময় ভাগ করে ঘুমাচ্ছেন। কেউ সকাল থেকে দুপুর, কেউ বিকাল থেকে রাতের প্রথমভাগ, কেউ আবার রাতের বেলায় ঘুমাচ্ছেন। নিজেদের আলাদা কোনো স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। এ জন্য অনেক দূরে যেতে হয়। নারীদের শৌচকাজ করতে রাতের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। শিশুরা পাতায় মল ত্যাগ করছে, সেটি আবার ঝোপঝাড়ে ফেলতে হচ্ছে। পানির অভাবে তাদের ঠিকমতো পরিষ্কার করা যাচ্ছে না। এদিকে নারী ও শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে। প্রতিটি ঘরে দুই-একজন শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত বলে জানা গেছে।

কুতুপালং এলাকায় পরিবার নিয়ে একটি ঘরে থাকেন অলি আহমদ। তিনি বলছিলেন, রাতের বেলা তারা অন্ধকারেই থাকেন। তবে যাদের কিছুটা সামর্থ্য আছে তাদের কেউ কেউ মোমবাতি, কুপিবাতি জ্বালান। অনেকে আবার আসার সময় সোলার প্যানেল নিয়ে এসেছেন। কেউ কেউ সেগুলো সচল করে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালাচ্ছেন।

গত শনিবার রাত থেকেই কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। গতকাল সারাদিন রোদের দেখা মেলেনি। ফলে বৃষ্টিতে জবুথবু হয়েই দিন কাটিয়েছেন লাখো রোহিঙ্গা শরণার্থী।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এমন বেশকিছু ঘর পরিদর্শনে দেখা গেছে, খুবই মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন শরণার্থীরা। থাকার জন্য এক টুকরো জায়গা মিললেও সেখানে বসবাস করা কঠিন। স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকেই। আবার অসুস্থ হওয়ার পর ওষুধের অভাবে পরিস্থিতির আরো অবনতি হচ্ছে। পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকেই এইডস, যক্ষ্মা, হাম, পোলিওসহ বেশকিছু রোগ বহন করে আনারও খবর মিলেছে। ইতোমধ্যে কুতুপালং, বালুখালী ক্যাম্পে একজন এইডস, চারজন হাম, ১৬ জন পোলিও রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।

কক্সবাজার সিভিল সার্জন ডা. আবদুস ছালাম স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘদিন হেঁটে আসায় রোহিঙ্গারা ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাছাড়া বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে শিশুরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে শিশুদের টিকাদান ও ভিটামিন ক্যাপসুল খাওয়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান তিনি।

যদিও শরণার্থী শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা যেসব ওষুধ সরবরাহ করছে তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। প্রায় পাঁচ লাখ শরণার্থীকে থাকার জন্য ভালো ঘর দেওয়াও সম্ভব নয়। এরপরও দ্রুত সময়ে তাদের অন্তত বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগগুলো নিশ্চিত না করলে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

ত্রাণ বিতরণে শৃঙ্খলা: রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। গতকাল দুপুরে সরেজমিনে টেকনাফ উখিয়ার সড়কে দেখা গেছে, ত্রাণবাহী গাড়ির যানজট নেই। নির্বিঘ্নে চলাফেরা করছে অন্যান্য যানবাহন। এসময় বিজিবি সদস্যদের ত্রাণবাহী যানবাহনকে নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল আহমদ জানিয়েছেন, ত্রাণ বিতরণে শৃঙ্খলা আনতে তারা কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত ৯০৭টি গাড়িতে ৯ লক্ষাধিক প্যাকেট ত্রাণ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছে বলে জানান তিনি।

রাখাইনে আগুন জ্বলছেই, অনুপ্রবেশ অব্যাহত: সারা বিশ্বের সমালোচনার মুখেও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর নিপীড়ন অব্যাহত আছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে মংডু, রাথেডং, বুথিডং এর যেসব এলাকার রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসছেন, তাদের জনশূন্য বাড়িঘরগুলো পুড়িয়ে দেওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এখনো পর্যন্ত রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত আছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে এই পর্যন্ত অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

নিবন্ধন চলছে: রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিবন্ধন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। গত শনিবার পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গাকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: