সর্বশেষ আপডেট : ৮ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড আগে
শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৫ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

হতাশ করলেন সু চি

1505107045নিউজ ডেস্ক:: ২০১২ সালের জুনে নরওয়ের রাজধানী অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার গ্রহণের পর অং সান সুচি বলেছিলেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার শান্তির লক্ষ্যে কাজ করতে আমার সংকল্প আরও দৃঢ় করেছে। এই সম্মান যেন আমার হূদয়ে একটা দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ওই ভাষণে রাখাইন রাজ্যে মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর বৌদ্ধ ও সেনাবাহিনীর নির্যাতনের বিষয়েও কথা বলেছিলেন সুচি।

১৯৯১ সালে যখন অং সান সুচিকে নরওয়ের নোবেল কমিটি শান্তি পুরস্কার দেওয়ার কথা ঘোষণা করে, তিনি তখন মিয়ানমারে গৃহবন্দি ছিলেন। একুশ বছর পর গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী আং সান সুচি-র হাতে সেই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী ভাষণে নরওয়ের নোবেল শান্তি কমিটির প্রধান থরবিয়র্ন জাগল্যান্ড অং সান সুচিকে বিশ্ব বিবেকের কণ্ঠস্বর বলে বর্ণনা করেন। বিশ্ব মানবতা যে এক, তারা সেটারই স্বীকৃতি দিয়েছেন বলে জানান।

সুচিও বলেন, নোবেল কমিটি আমাকে শান্তি পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে এটারই স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, মিয়ানমারের নির্যাতিত জনগণ, যাদের বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল, তারাও বিশ্বেরই অংশ। বিশ্ব মানবতা যে এক, তারা সেটারই স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু সেই বিশ্ব মানবতা রক্ষার দাবি কি সমুন্নত রাখতে পেরেছেন অং সান সুচি? বিশেষ করে বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের রক্ষার ক্ষেত্রে। যাদের অস্তিত্ব এখন বিলীন হওয়ার মুখে। সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ ও তার দেশের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে যারা আজ দেশহীন এক জাতিগোষ্ঠী!

রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত, নিপীড়িত জনগোষ্ঠী। মিয়ানমারে অব্যাহতভাবে জাতিগত নিপীড়নের শিকার তারা। বিনা কারণে হত্যা করা হচ্ছে রোহিঙ্গা নর-নারীকে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী। কিন্তু এর কোনো বিচারই হচ্ছে না। জাতিগত নিপীড়নের কারণে রোহিঙ্গারা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। বর্তমানে মিয়ানমারে যত রোহিঙ্গা আছে তার চেয়ে বেশি সংখ্যক রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতনের মুখে বিভিন্ন সময় দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। গত ২৫ আগস্ট থেকে আবারো রাখাইনে সেনা অভিযান শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের হিসেবে এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা। সাগর ও নদীপথে আসতে গিয়ে ইতিমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে আরো প্রায় একশ’ রোহিঙ্গা। যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।

প্রতিদিনই মানুষ মরছে মিয়ানমারে। রোহিঙ্গারা অকাতরে প্রাণ দিচ্ছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের আহবান সত্ত্বেও হত্যা, নৃশংসতা বন্ধ হচ্ছে না। বিশেষ করে মিয়ানমার সরকার কোনো কিছুতেই গ্রাহ্য করছে না। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো শান্তিতে অবদানের জন্য যিনি বিশ্বে আলোচিত সেই সুচিও কোনো কথা বলছেন না রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিরুদ্ধে। বরং রাষ্ট্রীয় মদদে দেশটির সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল মিয়ানমারের সরকারকে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানালেও সরকার তা করছে না। বলা চলে এর মাধ্যমে অং সান সুচির এনএলডি সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের জন্য সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে সবুজ সংকেত দিয়ে রেখেছে।

সুচিকে বলা হয়, মিয়ানমারের ‘ডি-ফ্যাক্টো’ নেতা। অর্থাত্ সরকার প্রধানের দায়িত্বে না থেকে সরকারের ক্ষমতার কেন্দ্র। এই সুচি যিনি সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন তিনি আজ সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে আটকে গেছেন। তিনি সেনাবাহিনীকে সংযম প্রদর্শন করতে না বলে সহিংসতার জন্য নিরীহ রোহিঙ্গাদের দোষারোপ করছেন। বিশ্বের প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তিই সুচির এই মনোভাব ও রোহিঙ্গা নির্যাতন ইস্যুতে নীরব ভূমিকায় অবাক হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন শান্তিতে নোবেল জয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ-বিরোধী নেতা ও ধর্মযাজক ডেসমন্ড টুটু।

বুধবার এক খোলা চিঠিতে তিনি সুচিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন: রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও হত্যা বন্ধে সোচ্চার হন। চিঠিতে টুটু বলেন, তিনি তাকে অত্যন্ত প্রিয় এক বোনের মতো দেখেন, তার প্রশংসা করে থাকেন। কিন্তু রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা ও নিধনযজ্ঞ তাকে এই প্রিয় মানুষটির বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য করেছে। তিনি চিঠিতে লিখেছেন, বেশ কয়েক বছর আমার ডেস্কের ওপর আপনার একটি ছবি ছিল। ওই ছবি আমাকে মনে করিয়ে দিতো, মিয়ানমারের জনগণের প্রতি অঙ্গীকার ও ভালোবাসা থাকার কারণে আপনাকে কতটা অবিচার সহ্য করতে হয়েছে এবং ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। আপনি ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

কিন্তু এখনো রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ বজায় রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন কেউ কেউ, আবার অনেকের কাছে তা ‘ধীরগতির গণহত্যা’। ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক হিসেবে কোনো ব্যক্তি দেশ পরিচালনা করতে গেলে এ বিষয়গুলো তার কাছে অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হওয়ার কথা। এমন যদি হয় যে আপনার নীরবতা হলো মিয়ানমারের উচ্চপদে আসীন হওয়ার রাজনৈতিক মূল্য চুকানো, তবে নিশ্চিতভাবে বলবো এ মূল্যটা খুব চড়া।

আরেক নোবেল জয়ী মালালা ইউসুফজাই রোহিঙ্গাদের হয়ে বলার জন্য মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। আমরা এখন চুপ থাকতে পারি না। নোবেল জয়ী বেশ কয়েকজন নারী এক চিঠিতে বলেছেন, সুচি নোবেল শান্তি পুরস্কারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এই চিঠিটি লিখেছেন শান্তিতে পুরস্কার জয়ী মার্কিন নাগরিক জোডি উইলিয়ামস, ইরানের শিরিন এবাদি এবং লাইবেরিয়ার লেইমাহ বোয়ি এবং আরও চার নোবেল জয়ী নারী।

নিরীহ রোহিঙ্গাদের বাঁচাতে, তাদের মৌলিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষায় সুচি কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ইতিমধ্যে তার নোবেল পুরস্কার কেড়ে নেওয়ার দাবি উঠেছে। লাখ লাখ মানুষ একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করে নোবেল কমিটির কাছে তা পাঠিয়েছে। নোবেল কমিটি বলেছে, একবার কাউকে এই পুরস্কার দিলে তা ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ তাদের নেই।

একসময় সুচি ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতীক। তখন দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার পর স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় প্রতীক বিবেচনা করা হতো সুচিকে। নব্বই’র দশকে তার দেওয়া সাক্ষাত্কারগুলোয় বার বার বলতেন অহিংসার কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সুচির আচরণ ঠিক তার বিপরীত। নোবেল কমিটি হয়তো উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে যে সুচিকে নোবেল দেওয়া যথাযথ ছিল না! হয়তো তারা সুচিকে ভুল বুঝেছিল।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: