সর্বশেষ আপডেট : ৩৪ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৪ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

রোহিঙ্গা সমস্যার পরিণতি এবং আমাদের করণীয়

gggggggggggggggggggমৃণাল কান্তি দাস ::

নাফ নদী দিয়ে প্রতিদিন ভেসে আসছে মানুষের লাশ। প্রতিটি লাশ আমাদেরকে এক দুর্বিষহ স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। এভাবেই একদিন আমাদের স্বজনরা মারা যাচ্ছিলেন দলে দলে। তাঁদেরও কোন অপরাধ ছিলো না। সময়ে সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এরকম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আজ মায়ানমারের অসভ্য সরকার এবং বৌদ্ধ আরাকানরা সীমান্তের ওপারে দাঁড়িয়ে যখন নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে, এপারে বসে এই দৃশ্য হজম করা আমাদের জন্য অসম্ভব। মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে সেই সব নির্যাতিতদের আশ্রয় দেওয়া আমাদের উচিৎ ছিল। সে কারণে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু এই আশ্রয় দানই আমাদের একমাত্র দ্বায়িত্ব নয়। বরং এটি মায়ানমারের জন্য খুশির বিষয়। কেননা, ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, মায়ানমার সর্বদাই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে “পুশ ইন” করে আসছে। এবং তারা চাইছে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেই বসতি গড়ুক।

বিশ্বের মোড়ল সম্প্রদায় আজ মায়ানমারে সৃষ্ট এই মানবিক বিপর্যয়ের বিপক্ষে শক্ত কোন অবস্থান নিচ্ছে না। কেবল দায় সারা বাণী আউড়ে যাচ্ছে। সত্যিকার অর্থে কি তাদের কোন দায়ই নেই? দায় কি কেবল বাংলাদেশের? ২০১২ সাল পর্যন্ত এ দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ছিল ৮ লাখ। ২০১৬-১৭ সালে সে সংখ্যাটা ১১ লাখ অতিক্রম করেছে। আমরা একটা সমস্যা জর্জরিত জাতি, দেশে নিজেদের বিরাট জনসংখ্যা নিয়ে, বন্যা নিয়ে আমরা হিমসিম খাচ্ছি। তার উপরে এই ১১ লাখের উপরে মানুষের ভরণপোষণ করা আমাদের জন্য সম্পুর্ন অসম্ভব। তবুও আমরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিচ্ছি। সর্বাত্মক মানবতা নিশ্চিত করার প্রয়াস করে যাচ্ছি।কিন্তু এভাবেই আমাদের পার্বত্য অঞ্চল ভিন একটা নৃগোষ্ঠীর স্থায়ী আবাসে পরিনত হতে পারে না। এতে করে আমাদের নৃগোষ্ঠীর জন্যও চরম বিপন্নতা দেখা দেবে।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ইস্যুতে কিছু পদক্ষেপ নেবার সময় উপস্তিত হয়েছে।

পদক্ষেপ সমূহঃ

** বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংগঠনের কাছে বিশেষত বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র গুলোর কাছে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে জোরালো সহায়তা চাওয়া।

** আন্তর্জাতিক মহলকে দিয়ে এই ইস্যু নিয়ে মায়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করা যাতে রোহিঙ্গা নির্যাতন স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়, মায়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে নেয় এবং আরাকানের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের স্বায়ত্বশাসন দেয়।

** বাংলাদেশে আগত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে মায়ানমার যাতে ফেরৎ নিতে বাধ্য হয় সেটা নিশ্চিত করা। কিম্বা তৃতীয় কোন দেশে প্রেরনের প্রচেষ্টা করা।

** এ যাবৎ পর্যন্ত দেশে যত জন রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে তাদের একটা যথাযথ তালিকা প্রস্তুত করা।

** রোহিঙ্গাদের উপর কড়া নজরদারি রাখা, যাতে এরা কোনভাবেই দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে না যেতে পারে।

**রোহিঙ্গা নীতিমালা নামে একটা নীতিমালা প্রনয়ন করা। যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে শরনার্থী রোহিঙ্গাদের কি কি সুবিধা বাংলাদেশ প্রদান করবে, এবং বাংলাদেশে থাকতে হলে কি কি বিধিমালা তাদের মেনে চলতে হবে।

একথা একেবারেই পরিষ্কার যে রোহিঙ্গা নিয়ে মায়ানমারের গোঁয়ার্তুমি শুধু বাংলাদেশ নয় সমগ্র বিশ্বকে ভয়ংকর বিপদে ঠেলে দিতে পারে।আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি ভেবে থাকেন এই মানবিক সংকট কেবল বাংলাদেশের জন্য তৈরি হওয়া সংকট তবে তারা সেটা ভুল ভাবছেন। এটা মনে রাখা দরকার যে, একটা নিপীড়িত, নির্যাতিত জাতিগোষ্ঠীর মাঝেই সর্বদা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সুসংগঠিত অপরাধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। রোহিঙ্গাদের উপর চলমান এই অত্যাচার ক্রমশ তাদের চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। যার বিষবাষ্প সমগ্র পৃথিবীকে বিশাক্ত করে তোলবে। কেননা “জাতিগত ধোলাই” থেকেই জন্ম নেবে “নীতিগত সন্ত্রাসবাদ”।

সত্যিকারে রোহিঙ্গা আসলে কি? এটা অনেক বাঙ্গালি জানেনই না।

রোহিঙ্গা হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ও রাষ্ট্রবিহীন একটি জনগোষ্ঠী। প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গারা হল মায়ানমারের আরাকান বা রাখাইনের একমাত্র ভুমিপুত্র জাতি। এদের অধিকাংশই মুসলমান তবে রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক হিন্দুও আছেন। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহাঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। সেখানেই বাস করত রোহিঙ্গারা। এক সময় ইংরেজরা এ ভূখণ্ড দখল করে নেয়।
প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করে গেছে ব্রিটিশরাই। তারা যখন মিয়ানমারের ১৩৯ টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে তখন তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে নি। যার ফলে ১৯৬২ সালে মায়ানমারের সামরিক শাষক রোহিঙ্গাদের বিদেশি হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের সব নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়। তাদের ভোটাধিকার চলে যায়,সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। বিয়ে করা- সন্তান নেবার অনুমতি চলে যায়। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ। মায়ানমার এই রোহিঙ্গাদের সর্বদাই নিজের দেশের বোঝা মনে করে আসছে আর সে জন্য বারবার অমানবিক, বর্বর, নির্যাতন করে এদেরকে বাংলাদেশে “পুশ ইন” করছে কিম্বা পালিয়ে আসতে বাধ্য করছে।
২০১২ সাল পর্যন্ত মোট চার দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ অনুপ্রবেশ করেছে।

আমাদের দেশের কিছু সংখ্যক অতি উৎসাহী ব্যাক্তি ধর্মকে পরিচয় ভেবে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনকে মুসলমান নির্যাতন বলে বিষয়টাকে একপক্ষীয় করে তোলছেন । তাদের সে দরদ সাময়িক আবেগীয়। ধর্মান্ধদের দ্বারা কোনদিনই মানবতার কিম্বা ধর্মেরও কল্যান আসে নি আর আসবেও না। বরং মায়ানমারের মত অপবাদ আসবে। এর প্রমান দেখুন- বৌদ্ধরা সারা বিশ্বে অহিংস নীতি প্রচার করে আসলেও মায়ানমারের কতিপয় বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা সারা বিশ্বের বৌদ্ধদের উপর কালিমা লেপন করে দিয়েছে। তাই যারা মানবিক আবেদন বুঝেন, নিজেদের মানবতাবাদী দাবী করেন, তারাই এগিয়ে আসুন। বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি আপনারও অনেক দ্বায়িত্ব আছে। প্রতিবাদ করে, মানববন্ধন করে বিশ্ব মিডিয়ায় একটা উত্তাল সংবাদ সৃষ্টি করুন। আওয়াজ উঠুক…

মানুষ বাঁচুক।
রোহিঙ্গা বাঁচুক।
বাংলাদেশ বাঁচুক।
তবেই বিশ্বের শান্তি বাঁচবে।

লেখক : শিক্ষক, কবি।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: