সর্বশেষ আপডেট : ৫ মিনিট ২২ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৮ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ওসমানীনগরের সম্মানপুরবাসী আট মাস ধরে পানিবন্দি

Pic-6ওসমানীনগর সংবাদদাতা ::
বছরে সাত থেকে আট মাস যাবৎ পানিবন্দি অবস্থায় কর্মহীন জীবন। আর বছরের বাকি চার-পাঁচ মাস ফসল উৎপাদন ও মৎস্য আহোরনের সংগ্রাম। এ যেন সম্মানপুরবাসীর নিয়তির লিখন। বছরের একটি মাত্র বোরো ফসল ঘিরেই গ্রামের কৃষকদের স্বপ্ন-সম্ভাবনা। ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে সোনার ফসল ঘরে উঠলে সারা বছরের খোরাকি হবে। ধারদেনার টাকা শোধ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে ডালভাত খেয়ে বছরটা ভালো যাবে। উদ্বৃত্ত কিছু ধান বিক্রি করে ছেলে-মেয়ের বিয়ে কিংবা সংসারের খরচ জোগানো যাবে। এটুকু আশা নিয়ে দিনাতিপাত করেন ওসমানীনগরের সাদীপুর ও উমরপুর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সম্মানপুর (ভরাউট) গ্রামবাসী। বর্ষায় অথৈ জলরাশি আর গর্জে ওঠা ফেনিল ঢেউয়ের মধ্যেই তাদের বসবাস।
গ্রামের দুই শাতাধিক পরিবারের মধ্যে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার মৎসজীবী। এ বছর অসময়ে পানি এসে হাওরাঞ্চলের বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় হাওর পাড়ের মানুষের দিন কাটছে এখন অভাব-অনটন আর নানা বঞ্চনার মধ্যে দিয়ে। একদিকে অসময়ে হাওরের বোরো ধান বিপর্যয় অন্যদিকে গ্রামের মানুষের দুর্বিষহ কষ্টের কান্না শোনার কেউ নেই। জীবিকার তাগিদে গ্রামের মৎসজীবীরা মাছ ধরতে গিয়েও হাওরে বিভিন্ন ইজারাদারদের কারণে মাছ ধরতে পারছেন না। এর ফলে গ্রাম এলাকার মানুষ কাজকর্মহীন হয়ে পড়েছে।
কুড়ি বিল ও বানাইয়া হাওরের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠেছে সম্মানপুর গ্রাম। এই গ্রামের মানুষের বর্ষাকালীন জীবনচিত্র বড়ই করুণ। গ্রামের পানিবন্দি লোকজনের প্রতিটি বাড়ির আঙিনা ও বসতঘরে পানি রয়েছে। গ্রাম এলাকায় নেই কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক, সাবসেন্টার কিংবা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ও ধর্মীয় উপাসনালয়। আর বিদ্যুৎ পাওয়াতো গ্রামের মানুষের স্বপ্ন। গ্রাম এলাকায় চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকায় সঠিক চিকিৎসাসেবার অভাবে পানিবাহিত রোগসহ নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, সদির্, জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষসহ সব বয়সি মানুষকে বসবাস করতে হচ্ছে। গ্রামবাসীর যাতায়াতের জন্য কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। এক্ষেত্রে নৌকাই তাদের একমাত্র ভরসা। গ্রামের রাস্তার জন্য একাধিক বার সরকারি বরাদ্দ আসলেও তা যথাযথ স্থানে কাজে লাগানো হয়নি বলে গ্রামবাসীর অভিযোগ।
বিশুদ্ধ পানির সংকট ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা খুবই নাজুক অবস্থার মাঝে চলছে সম্মানপুর গ্রামবাসীর দৈনন্দিন জীবন। প্রতিনিয়তই চোর-ডাকাত আতঙ্কে থাকেন গ্রামবাসী। কয়েক মাস পূর্বে গ্রামের বনমালী বিশ্বাসের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। গ্রামের মানুষের জীবিকার প্রধান অবলম্বন হল শুষ্ক মৌসুমে ধান চাষ করা ও বর্ষা মৌসুমে হাওরে মাছ ধরে বিক্রি করে জীবিকানির্বাহ করা। হাওরপারের কৃষকদের প্রতি বছরই বন্যা, শিলাবৃষ্টি ও খড়ার করাল গ্রাসে কৃষকের কষ্টের ফলানো সোনালি ফসল নষ্ট হয়ে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হওয়ার পরও যে ধান তারা গোলায় তুলতেন, তা দিয়ে কৃষকদের কোনো রকম জীবন চলত। কিন্তু এবছর অসময়ে পানি এসে হাওরের বোর ধান তলিয়ে যাওয়ায় তারা এখন খুব দুঃখকষ্টের মধ্যে দিন পার করছেন। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সমাজের উঁচু শেণির মানুষ অবহেলিত সম্মানপুরের অসহায় লোকজন বর্তমানে কেমন আছে তার খোঁজখবর নেয়ার প্রয়োজন মনে করছেন না। অথচ ভোটের সময়ে হাওরবাসীর দ্বারে-দ্বারে ঘুরেন তারা। কিন্তু কষ্টের সময়ে তাদের পাওয়া যায় না এমন মন্তব্য গ্রামবাসীর।
এলাকার যুবলীগ নেতা নুর হোসেনসহ গ্রামবাসীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চৈত্রের অকাল বন্যায় বোরো ফসল বিপর্যয়ের পর থেকে গ্রামবাসী পানিবন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে কয়েক দফায় বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাড়ির আঙিনা ও বসতঘর আক্রান্ত হয়েছে। পানির কারণে অনেকেই গৃহস্থালি জিনিসপত্র ও গবাদি পশু নিয়ে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যায় সরকারি-বেসকারিভাবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী ও আর্থিক সহায়তা দেয়া হলেও এসব সহায়তা থেকে তারা বঞ্চিত রয়েছেন।
গ্রামের বনমালী বিশ্বাষ, বারিক মিয়া, সুজন মিয়াসহ অনেকে জানান, আমরা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছি। আমাদের পার্শ¦বর্তী গ্রামগুলোতে সরকারিভাবে টিউবওয়েল দেয়া হলেও আমাদের গ্রামে কোনো টিউবওয়েল দেয়া হয়নি। খোলা পায়খানা ব্যবহার করার কারণে লোকজনের রোগবালাই লেগেই আছে। আমরা স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখা পাই না, তারা ভুল করেই আমাদের গ্রামে আসেন না।
সম্মানপুর গ্রামের দূরবর্তী এলাকায় অবস্থিত একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্টান ভরাউট হাজি সুলেমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ফাতেহা খানম বলেন, হাওর এলাকায় অবস্থিত সম্মানপুর গ্রামে যোগাযোগ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিকিৎসা, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। এই মানুষ সবাই হতদরিদ্র। গ্রামবাসীর উন্নয়নে সরকারিভাবে একটি পাইলট প্রকল্প চালু করা হলে গ্রামের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী উপকৃত হবেন।
সম্মানপুর গ্রামের ষষ্ট শ্রেণির স্কুল ছাত্রী জেবা রাণী ও কল্পনা রাণী জানায়, বছরের অধিকাংশ সময় পানি থাকায় আমরা নিয়মিত স্কুলে গিয়ে ক্লাশ করতে পারি না। আমরা দরিদ্র পরিবারের সন্তান। আমাদের অভিভাবকরা সব সময় কামকাজে ব্যস্থ থাকায় নৌকা দিয়ে নিয়মিত আমাদেরকে স্কুলে পাঠাতে পারেন না। আর নৌকা দিয়ে যখন আমরা স্কুলে যাই, তখন আমাদের মনের ভয় থাকে হাওরের ঢেউয়ে কখন জানি নৌকা ডুবে যায়। তাই গ্রামের অনেকেই প্রাথমিক শেষ করে মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করা হয়ে ওঠে না। গ্রামের ষাটোর্ধ্ব মহিলা চন্দ্রা রায় বলেন, অভাব-অনটনে থাকলেও আমাদের খোঁজখবর কেউ নেন না। শরীরে বিভিন্ন রোগে বাসা বেঁধেছে। এই বয়সে আমি বয়স্ক ভাতাও পাচ্ছি না।
স্থানীয় ইউপি সদস্যা আলেয়া বেগম বলেন, অবহেলিত ও যোগাযোগ বঞ্চিত সম্মানপুর গ্রামটি সাদীপুর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত, গ্রামের অংশিক অংশ আবার উমর ইউনিয়নের অধীনেও রয়েছে। গ্রামে ৬ শতাধিক লোকের বসবাস। যাদের মধ্যে শতভাগ লোকই হতদরিদ্র। বছরের অধিকাংশ সময় এই গ্রাম পানিতে নিমজ্জিত থাকে। নেই রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবসহ স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নেই। গ্রামবাসীর সমস্যা ও দুর্ভোগের বিষয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন মহলে ধর্না দিয়েও গ্রামবাসীর জন্য কিছুই করতে পারছি না।
উমরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া বলেন, আমার ইউনিয়নের অধীনে থাকা সম্মানপুরের লোকজন সব সময় ত্রাণ সহায়তাসহ সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন। ঐ এলাকায় আমি একটি মাটির রাস্তাও করে দিয়েছি।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন বলেন, সম্মানপুরের বিষয়টা আমাদের নজরে আছে, বর্তমানে টিউবওয়েল ও স্যানিটেশনের কোনো বরাদ্দ নেই। তবে এ বছর বন্যা হওয়ার কারণে আশা করছি, বেশি পরিমাণ বরাদ্দ আসবে। বরাদ্দ পেলে সম্মানপুরকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হবে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: