সর্বশেষ আপডেট : ৪৬ মিনিট ৭ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১১ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ভ্রমণ কাহিনী : আদর করে অনেকে ডাকেন ‘মায়াবী ঝরনা’

01552601805_2017-03-29 03-15-56শিমুল খালেদ ::

জৈন্তিয়া বাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর ডানে পড়ল ডিবির হাওর। হাওরের ওপাশে মেঘালয় পাহাড়শ্রেণি। চোখ চলে যায় সেখানে। পাহাড়জুড়ে ঘন সবুজ অরণ্য। উড়ে যাচ্ছে মেঘদল। কোথাও আবার পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে আছে টুকরো সব মেঘ। সরে যাওয়ার নাম-গন্ধটি পর্যন্ত নেই!
সকালবেলা সিলেট থেকে রওনা হয়েছি আমি আর মিজান। রুহুলের বাড়ি লালাখালের ভাটিতে সারি নদীর পারে। আমাদের বাস সারিঘাটে থামলে তাকে তুলে নিলাম। পাথুরে পাহাড়ের গা ঘেঁষে পথ চলে গেছে জাফলংয়ের দিকে। একদৃষ্টে তাকিয়েছিলাম মেঘালয় পাহাড়শ্রেণির দিকে।

বর্ষাকাল আর বিশ্বের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের অঞ্চল—দুইয়ে মিলে প্রবল তেজে ফুঁসছে দুধের মতো সাদা স্রোতের ঝরনাগুলো। অনেক দূর থেকেও শোনা যাচ্ছিল পানির আছড়ে পড়ার শব্দ। বাস এসে থামে তামাবিলে। কয়লার চালান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি ট্রাক। তামাবিল ছাড়ার পর বাস যেন আকাশের দিকে উঠতে লাগল! নাক বরাবর খাড়া একটি আপহিল। চড়াই-উতরাই পথের শেষে পৌঁছে গেল জাফলংয়ে। দুপুর হয়ে গেছে। উদরপূর্তির কাজটি সেরে ফেললে ভালো হয়। দেখে-শুনে একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ি।
জাফলংয়ের বুক চিরে বয়ে গেছে পিয়াইন নদী। মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা সেই পিয়াইনে পাথর নিয়ে ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। নদীর পাড়জুড়ে সারি সারি ‘বারকি’ নাও বা নৌকা। তাতে পাথর উত্তোলন আর পরিবহনে ব্যস্ত পাথর শ্রমিকরা। পাড় ধরে এগিয়ে যাই নদীর উজানের দিকে। পিয়াইনের জল স্ফটিকের মতোই স্বচ্ছ। নদীর বেশ গভীরেও তলদেশের পাথরগুলো পরিষ্কার দেখা যায়। সেই দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম। হঠাত্ রুপালি ঝিলিক! চমকে উঠে ভালো করে তাকাই। মাছের একটি ঝাঁক পাথরের গায়ে লেগে থাকা শ্যাওলা খেতে এসেছে। তাদের শরীরে আলোর প্রতিফলন পড়ছে আর তাতেই রুপালি ঝিলিক।

নদীর উজানে সামনে ডাউকি ব্রিজ হয়ে চলে যাচ্ছে সুমো জিপ আর ট্রাক। এখান থেকে যাব সংগ্রামপুঞ্জি ঝরনায়। তার আগে নদী পার হতে হবে। একটি ইঞ্জিন লাগানো বারকি ভাড়া করলাম। পিয়াইনের জলে আলোড়ন তুলে ছুটে চলল আমাদের নৌযান। নদীর মাঝ বরাবর বেশ স্রোত। মাঝি এবার নদী ছেড়ে বাঁয়ে মোড় নিল। ডানপাশে পাথুরে মেঘালয় পাহাড়। মাঝি নাও ভিড়ালে নেমে পড়ি তার পাদদেশে। আকাশে মেঘ আর রোদের লুকোচুরি খেলা চলছে। পান্নার মতো সবুজ জলের দুনিয়া। তার কিনারা ছুঁয়ে পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে হাঁটছি। দূর থেকে ঝরনার জোরালো শব্দ কানে আসে। দৌড়ে এক ছুটে গিয়ে থামলাম ঝরনার নিচে। চোখে-মুখে আনন্দ আর পুলকের ঘোর। দুর্দান্ত প্রতাপে পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসছে ঝরনার প্রবল প্রবাহ। ঝরনার গায়ে বড় বড় প্রাচীন গাছ, বিশালাকার পাথর আর আছড়ে পড়া প্রবল জলস্রোতের অপূর্ব মেলবন্ধন। বেশ কয়েকটি ধারায় নেমে আসছে ঝরনার স্রোত। পাথরের ধাপগুলো বেয়ে একবারে নিচে এসে সৃষ্টি হয়েছে একটি প্রাকৃতিক ক্যাসকেড। কয়েকজন তরুণকে দেখলাম পাথরের গা বেয়ে ওপরে উঠতে। পাথরগুলো পিচ্ছিল। প্রথমে ইতস্তত করলেও শেষে তাদের সঙ্গেই যোগ দিলাম! ঝরনার পাশ দিয়ে উঠতে থাকি। বেশ সাবধানে। থামি দুই ধাপ ওঠার পর। পাথরের গায়ে পিঠ আর মাথা ঠেকিয়ে হেলান দিই। ঝরনার হিম ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা এসে লাগে আমাদের চোখে-মুখে। মাথার ওপর পাথরের গায়ে জন্মেছে পাহাড়ি কাশের ঝোপ। আধা ঘণ্টার মতো ঝরনায় ভিজে সাবধানে নিচে নেমে আসি। ঝরনার নিচের ডোবায় নামতেই তলিয়ে যাই বুক পর্যন্ত। ছোটখাটো ডোবাটির তিন দিকেই বড় বড় পাথরের দেয়াল। ডুব আর জলকেলি চলে কয়েক মুহূর্ত। এবার ফেরা দরকার। শেষবার চোখ জুড়িয়ে দেখি বিশালাকার ঝরনার মায়াবী রূপ। নদী আর বালুচর পেরিয়ে ওপাশে সংগ্রামপুঞ্জি। পুঞ্জির নামেই এই ঝরনার নামকরণ। অনেকে আবার আদর করে ডাকে ‘মায়াবী ঝরনা’ নামেও। খাসিয়াদের বসবাস এই পুঞ্জিতে। বালুর ঢিবি ডান পাশে রেখে হাঁটতে থাকি। গিয়ে থামি পুঞ্জির একদম শেষ মাথায়। এরপর আর সামনে যাওয়ার সুযোগ নেই। ঘন ঝোপঝাড় আর নেমে যাওয়া খাদ আটকে দিয়েছে পথ। এখান থেকে পুঞ্জির ভেতরে চলে গেছে সরু একটি রাস্তা। কয়েক পা ফেলতেই সামনে তকতকে কাদা দেখে থামতে হয়। কী করব, ভাবতে থাকি। দুটি পথের একটি বেছে নিতেই হবে। হাঁটু পর্যন্ত কাদা মাড়িয়ে যাওয়া অথবা পানবাগানের ভেতর দিয়ে যেতে হবে কাঁটাতার আর কাঁটাঝোপ মাড়িয়ে। দ্বিতীয় পথটি বেছে নিই। কাঁটাতারের ফাঁক গলে পানবাগান ধরে এগোই। পা টিপে টিপে সাবধানে। খাসিয়াদের কেউ দেখে ফেললে কী মনে করে কে জানে! কয়েক মিনিট হাঁটার পর দেখি রাস্তায় কাদাময় অংশ আর নেই। আবার কাঁটাতার মাড়িয়ে রাস্তায় নেমে আসি। মাত্র তিন-চার ফুট প্রস্থের চিকন রাস্তা। দুই পাশে পানবাগান। পানের ভারে ন্যুব্জ গাছগুলো হেলে এসেছে রাস্তার ওপর। অর্কিড লতার মতো ঝুলে আছে ঝুপি ঝুপি পানপাতা। পানবাগানের মাঝেমধ্যে কাঠ দিয়ে বানানো কুটির। মাচার ওপর খাসিয়াদের কুটিরগুলো বেশ মনোমুগ্ধকর। তবে কোথাও কারো দেখা নেই। ব্যাপার কী! উঁকিঝুঁকি মেরে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করি। অবশেষে প্রবীণ একজন মহিলাকে পেয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি। তাঁকে বললাম, পানের ছবি তুলতে চাইছি। তিনি সারল্য ভরা মুচকি হাসি দিয়ে মাথা নাড়েন। তাঁর সঙ্গে ঢুকে পড়ি একটি বাড়িতে। বাড়িটি যেন পান আর সুপারিগাছের এক দুনিয়া! পুঞ্জির পথের শেষে ছোটখাটো এক হাট বসেছে। কয়েকটি মাত্র দোকান। খাসিয়া মহিলারা তাঁদের চাষ করা তরিতরকারি আর ফলমূলের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। পুঞ্জির বৃষ্টিভেজা পরিচ্ছন্ন পথ ধরে হাঁটি আর দেখি খাসিয়াদের নীরব কর্মচাঞ্চল্য। তারপর ফিরে আসি পিয়াইনের তীরে। ফেরার জন্য সেখানে বারকি নায়ের জন্য অপেক্ষা।

কিভাবে যাবেন :
সিলেটের কদমতলী থেকে জাফলংয়ের উদ্দেশে বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া পড়বে ৭০ টাকা। ঝরনায় যেতে রিজার্ভে ইঞ্জিন নৌকা পাবেন। ভাড়া নির্ভর করবে কতক্ষণ থাকবেন, তার ওপর। দেখেশুনে দামদর করে ভাড়া ঠিক করে নেবেন। রাতে থাকার জন্য জাফলংয়ে কিছু হোটেল আছে। তবে দিনে দিনেই সিলেটে ফিরতে পারবেন।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: