সর্বশেষ আপডেট : ৮ মিনিট ১৮ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ২০ অগাস্ট, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৫ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

জাকির শাহ’র গানের ভুবন

`Zeসাইফুর রহমান::
সজনী যাইও না গো জলে/ বইসা আছে হাসন রাজা কদম গাছের তলে। আধ্যাত্মিক শাস্ত্রের পুঁরোধা হাসন রাজার তীর্থভূমি সুনামগঞ্জ মরমি সাধকদের মিলনমেলায় হয়ে আছে ভরপুর। দুর্ব্বিণ শাহ, রাধারমণ দত্ত, কালা শাহ, শাহ আব্দুল করিম, গিয়াসউদ্দিন আহমদ প্রমুখ কবি ও সাধকগণ নিভৃত আলোর লেলিহান শিখাতে হয়েছিলেন ছাই। তাঁদের পদচিহ্ন ধরে বর্তমানে যারা এগিয়ে চলছেন অমৃতের সুধাতুল্য প্রেমের শরাব পানে জাকির শাহ তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। আসলে জাকির শাহকে নিয়ে কিছু লিখতে আমি সম্পূর্ণ অক্ষম। তবুও সৌভাগ্য হয়েছে বলে দু-চার লাইন লিখব ভাই-বন্ধু-গুরু কবি জাকির শাহকে নিয়ে।

মনমোহিনীকে ধরার জন্য হাসন রাজা বংশী হাতে কদম তলায় বসে থাকতেন। তখন গ্রামের মেয়েরা গান ধরতেন। সজনী যাইও না গো জলে/ বইসা আছে হাসন রাজা কদম গাছের তলে। স্নান করিতে আসিলে আড়াল থেকে হাসন বঁধূর রূপ লাবন্য দেখবেন বলে বসে থাকতেন কদমতলায়। আসলে হাসন জানতেন যে তিনি এমন এক বঁধূর সঙ্গে নিয়েছেন যে কিনা জীবনে কখনো গোসল করে না। তবুও তাঁকে বঁধূর অপেক্ষায় যেতে হত কদম তলায়। সেই বঁধূর রূপের ছটায় জাকির শাহ হয়েছেন মাতাল। তাঁর সেই মাতলামী সাধারনের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাইতো জাকির শাহ অনায়াসে বলেনÑ তোমরা নাচো গো নাচো গো সখি সকলে মিলিয়া/ আজ নিশিতে চান্দের সাথে হইব আমার বিয়া/ বিয়া এ যে নয় গো সখি তবে এ কোন বিয়া/ চান্দের সাথে আন্ধের মিলন হিয়ার মাঝে হিয়া। হিয়ার মাঝে হিয়ার মিলন ঘটানো তখন সম্ভব যখন প্রেম সাগরে ডুবে হাত-পা মারতে থাকে মাতাল প্রেমিক: ভাইরে ভাই বিশ্বাস করে ঘরের বউরে দিছিলাম চুরানি/ এখন সারা বছর যাইব আমার কইরা পেরেশানী/ ভাইরে ভাই, হতাশায় কাতর হইয়া গলায় যায় না পানি/ এত সাধের বউর কারনে আইল ঘোর নিদানি/ ভাইরে ভাই, নুনা জলের পিপাসায় বউ করইন ছটপটানি/ জাকির শাহরে ফতুর কইরা এখন দেয় চুরানি/ আমার কি হইব না জানি/ পৌষ মাসে ধরাইল আকাল গোলায় নাই মোর খানি। এমন বউয়ের হাতে যার সংসার না জানি কি কষ্টে তাঁর দিন যায়। চাপা কান্নায় জর্জরিত হয়ে তাকে তালাক দিতে চাইলে সে তালাক লয় না। একি কর্ম! দেখি জাকির শাহের পরিণতি: আমি খরি আল্লাহ’র ভরসা/ তাইর বিতরে দান্ধাবাজি তাখে হরহামেশা/ আমারে দেখায় লোব-লালছা উলাটা পথে যাইতে/ ফুইন্না বউয়ের যুক্তির বাহানা/ পাগল জাকির ঈমান তইবার জাগা তো ফায় না/ বউরে তালাক দিলে তালাক লয় না/ উল্টা মারে গাইতে/ অত মায়ার বউটা আমর আইল না আদতে/ বউটারে ফারলাম না বুজাইতে । শেষ পর্যন্ত জাকির শাহ ব্যর্থ হলেন।

কিন্তু তাদের এই ব্যর্থতার পথ ধরেই আমরা পাই আলোর পথ। মরমি সঙ্গীত এমন একটা বিষয় যা যুক্তি তর্কে আবদ্ধ কোনো নৈয়ায়িকের পক্ষে বুঝে ওঠে সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে খাজা হযরত উসমান হারুনী (রহ) বলেন: সঙ্গীত এমন এক অপার্থিব রহস্য যা সকলের জানা নেই এবং যা সকলের কাছে ব্যক্ত করার মতোও নয়। সূত্র: সিলেটের মরমি সাহিত্যÑ সৈয়দ মোস্তফা কামাল। রহস্য নিয়ে যারা আগমন করেন ধূলিতে তাঁরা কখনো বলেন নি তাঁদের মর্মকথা। যারা প্রেমিক তাঁরা আপনি থেকে এমন উদঘাটন করতে সক্ষম। তাই হাসন রাজা বলেছেন, প্রেমের প্রেমিক যেই জনা এ সংসাওে হবে না/ অপ্রেমিকে গান আমার শুনবে না। তাই আজকের দিনে সঙ্গীত হয়ে গেছে এক রমরমা ব্যবসা। কয়জন লোক খুঁজিতেছে শেকড়ের সন্ধান। অতি অল্প! তবুও যারা কালোর্ত্তীন। তাঁরা আমাদের মত সাধারনের ধরাÑছোঁয়ার বাহিরে। কেবল সেই পরম সত্তার জন্য তাঁরা নিবেদিত: স্মরণ হইলে মরণ হয় প্রয়োজন সজনী গো/ শ্যাম বিনে কি সুখি থাকে মন/ সজনী গো সদায় থাকি পাগলল বেশে/ কলঙ্কী বলে এই দেশে গো/ পাগল জাকির যাবে তাঁর তাল্লাশে/ ছাড়িয়া মায়ার জীবন/ শ্যাম বিনে কি সুখি থাকে মন। খোদা প্রেমিকদের বিচ্ছেদ যে কি কঠিন, তা উপব্ধি করা যায় ফকির দুব্বির্ণ শাহ ( র:) ’র বিখ্যাত গানেÑ বিষ মাখাইয়া তীরের মুখে/ মারিলে তীর আমার মুখে/ দেহ থইয়া প্রাণটি লইয়া যায়/ আমার অন্তরায়, আমার কলিজায়।

সেই বিরহে কাতর কবি জাকির শাহ বলেছেন: দূরে যদি যাবিরে তুই ভালো থাকিস যা/ তোকে বুকে ধারন করে বাঁচবে জাকির শাহ। জীবন মরণ সকল-ই যেন পিয়ারীর চরণ তলে। অধরার হাসি না জানি কত সুন্দর। তাঁর হাসি-কান্না-মান-অভিমান দেখতে প্রেমের হাটে ঘটে প্রেমিকদের আনাগোনা: নয়ন বাঁকা ভঙ্গি বাঁকা কপালে চন্দ্রিমা আঁকা/ সোনার বদন লাজে ঢাকা ঐ রুপসি কে যায়/ রক্ত গোলাপ খোঁপায় গাঁথা আলতা রাঙ্গ নূপুর পায়/ কথা বলে মান দেখিয়ে ভরা ফাগুন অঙ্গে নিয়ে টেনে নেয় তাঁর মায়া দিয়ে খুশবুতে অঙ্গ ছড়ায়/ দেখিয়া রূপের রুপসি জাকির শাহ’র মন হয় উদাসী/ হইতাম চির বনবাসি যদি মোরে দিস সহায়। এই রূপের নেশায় কত জন জঙ্গলায় বাসা করিল। কিন্তু কি রূপ হেরিল কেউ বলে নাই। ঐ রূপ দেখিতে প্রয়োজন অন্তর চক্ষুর। ¯ূ’’লজ্ঞানে আটকে থেকে চর্মচক্ষু দ্বারা কখনো দেখতে পাবে না ঐ রূপ।
একই প্রসঙ্গ ধরে জাকির শাহ গেয়েছেনÑ যারে খুঁজি নয়ন ধারে সে থাকে নয়নের আড়ে/ জাকির শাহ পায় না তাঁরে/ অন্তর চুক্ষে গ-গোল। পৃথিবীতে চর্মচোখে পিয়ারীকে দেখা সম্ভব না। মহামিলনের দিন প্রেমিকগণ বিমোহিত হয়ে পড়বেন পিয়ারী দেখে। আর সেই বাসনা বুকে ধরে বনে বনে ঘুরায় তাঁরা। সেই বাসনার প্রার্থীত জাকির শাহ’র ব্যথিত পয়ারÑ জাকির শাহ মইরা গেলে বাইন্ধাা রাখিস তমাল ডালে/ সনের শেষে সে আসিলে/ দেখাইয়া দিস অই/ আমার হয়ে বলিস তাঁরে সে যেন না ছোঁয় আমারে/ দেখা হবে শেষ বিচারে/ পাগল জাকির কই। অথবা Ñ আমার ভাল্লাগেনা সই/ বন্ধু আমার দূর বিদেশে কেমনে একা রই। ভাটিয়ালি, মুর্শিদী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, পারঘাটা সবখানে রয়েছে জাকির শাহ’র হাত। তাঁর এই অনবদ্য অবিনাশি সৃষ্টিতে অচিন পাখিরও কথা পাইÑ বানাইয়া সাধের পিঞ্জিরা/ করল একটা পাখি ভাড়া/ পাখিটা নামে অধরা/ রয় না বসে পিঞ্জরে/ সর্বদায় সে উড়–উড়– করে/ কবে যে কার মন্ত্র পাইয়া যাইবে খাচা ছেড়ে/ মাটির খাচা রইবে পড়ে কান্দে জাকিরে। “চব্বিশ হাজার ছয়শত বার উড়াউড়ি করে”। এটা দয়েমী নামাজ। এ নামাজে অন্তর চক্ষু নূরী হয়ে যায়। আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় রয়েছে। যা পঞ্চ ইন্দ্রিয় নামেও পরিচিত। এ পাঁচটি ইন্দ্রিয় ছাড়াও আরো পাঁচটি ইন্দ্রিয় রয়েছে। এগুলো বাতুনি। এদরে আকাঙ্খা হল পিয়ারীর রূপ লাবন্য দর্শন করা। যার যত বেশি ইন্দ্রিয়গুলো শক্তিশালি সে ততো বেশি কামেল। আর সেই ইন্দ্রিয়গুলো শক্তিশালী হয় তখন, যখন প্রেমিকাকে হারিয়ে প্রেমিক পাগলের মতো তাকে খুঁজে: ডাইকো নারে মরার কোকিল যাওরে বন্ধুর দেশে/ কইও তাহার জাকির পাগল অজও নিরুদ্দেশে/ তাহার শুলে নয়ন জলে হইল দুচোখ অন্ধরে/ তুমি সুরেই পাও আনন্দ ॥ কবি জাকির শাহ আমার শিক্ষাগুরু, আমাদের পথ চলার পাথেয়। তাঁ অনুসরন ও অনুকরণ আমাদের জন্য একান্ত জরুরী। তাঁর ভালোবাসার সিক্ত জলে লাই খেলিতে খেলিতে ক্লান্ত এই ছোট মানুষটি: জাকির শাহের গান ভিক্ষলব্ধি ধন/ তুমি দাদা দুর্ব্বিণ শাহ, কয় সাইফুর অভাজন ॥

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: