সর্বশেষ আপডেট : ৮ মিনিট ১৩ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

স্পিডবোট বরাদ্দের জন্য জেলা প্রশাসকের চিঠি

MB Rajnagor flood 14 julyজালাল আহমদ:: কাউয়াদীঘি হাওর ও কুশিয়ারা নদীর পানিতে সৃষ্ট বন্যায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের হাওরপারের মানুষ। উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী। বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঘরে ঘরে খাবার সংকট। গ্রামীণ পথঘাট বানের পানিতে নিমজ্জিত। ঘর থেকে বের হলেই পানি। এতে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ। যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত। বানভাসী মানুষের নৌকার অভাব। পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়া, বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব, বন্যায় শ্রমজীবি মানুষের কাজ বন্ধ ও মজুরি না থাকায় সীমাহীন দুর্ভোগে মানবেতর জীবন-যাপন করছে বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন।

এদিকে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্যান্য ত্রাণসামগ্রির পাশাপাশি ৩টি স্পিডবোট বরাদ্দ দেয়ার জন্য ঢাকায় চিঠি পাঠিয়েছেন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক। এই স্পিডবোট দিয়ে দুর্গতদের কাছে দ্রুত সাহায্য পাঠানো যাবে বলে মনে করছে জেলা প্রশাসন।

সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, গত ২৮ দিন ধরে রাজনগরে বন্যা চলছে। ফলে এ অঞ্চলের স্বাভাবিক কর্মকা- ও জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধ্বস নেমেছে। উপজেলা প্রশাসনের কাজও বিঘিœত হচ্ছে। বন্ধ রয়েছে রাজনগর-বালাগঞ্জ সড়ক। এসবের কারণে বিশাল ক্ষতির মুখে পড়ছে রাজনগর উপজেলা। বন্যায় মানুষের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রাণ পৌঁছেনি-দুর্গতদের এমন অভিযোগ রয়েছে। বন্যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার কারণেই মূলত ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না। ত্রাণ যেটুকু দেয়া হচ্ছে তা নিয়েও দলীয়করণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পর্যাপ্ত সরকারি সাহায্য না পাওয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসিন বন্যার্তদের সহায়তা করতে পারছেন না। বন্যার কারণে কঠিন এক সময় পার করছে রাজনগরের বন্যার্তরা। গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে গিয়ে সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসিন বলেন, সরকার ত্রাণ দিচ্ছে, কিন্তু যে পরিমাণ মানুষ এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাতে বিতরণে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। আগাম বন্যায় বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের দুর্গতির মধ্যে চলমান বন্যা আরও দুর্গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। সকলের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় আমরা এই দুর্ভোগ মোকাবিলার চেষ্টা করছি। তিনি সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনকে বন্যার্তদের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

সরেজমিনে গেলে হাওরপারের গ্রাম ইসলামপুরের কৃষক শফিক মিয়া জানান, গত একমাস ধরে বন্যা চলছে। বোরোর মৌসুমে বোরো ধান বন্যায় নেওয়ার পর থেকে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে সংসার চলতো। এখন বেকার, কাজ নেই। একই গ্রামের আব্দুল আহাদ জানালেন, ঘরের ভিতর পানি। নৌকা ছাড়া যোগাযোগের কোনো মাধ্যম নেই। এ সময় দেখা গেছে, ঢেউয়ের আঘাত থেকে ঘর রক্ষার জন্য চারিদিকে কচুরিপানা দিয়ে ভাসমান বাঁধ দিয়েছেন বাসিন্দারা।
ধুলিজুড়া গ্রামের জহির চৌধুরী জানান, কাউয়াদীঘি আওর (হাওর) আর আওর রইছে না। ইগু (এটা) সাগর অই (হয়ে) গেছে। সাগরের পানির কারণে আমরা নিচে নেমে গেছি। পেটুগাঁও গ্রামের হাসিম মিয়া জানান, বন্যায় মানুষের বোরো ফসল নেওয়ার পর এখন আউশ ধানও তলিয়েছে। কৃষিঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। পানি না নামলে আমন ধানও হবে না বলে জানিয়েছেন। আর আমন ধান না হলে এখানে মারাত্মকভাবে অভাব দেখা দেবে। আমিরপুর গ্রামের সোবহান মিয়া জানান, ঘরবাড়ি পানির নিচে। ক্ষতির দিক দিয়ে খুবই কম সহায়তা পাচ্ছে মানুষজন।

রাজনগর উপজেলাটি কাউয়াদীঘির পাড় এবং কুশিয়ারা নদীর তীরে অবস্থিত। এই হাওড়ের পানি কুশিয়ারা নদীতে গিয়ে নামে। কিন্তু কাউয়াদীঘি হাওড়ের চারদিকে রাস্তা করা হয়েছে। এতে হাওড়ের পানি স্বাভাবিক গতিতে কুশিয়ারা নদীতে নামতে পারে না। পাশাপাশি হাওরের কাশিমপুর নামক স্থানে রয়েছে পাম্প হাউস। হাওরের পানি বৃদ্ধি পেলে এটির দ্বারা নির্ধারিত সময়ে হাওর থেকে পানি নিষ্কাশন করার কথা। কিন্তু নানা টালবাহানায় পানি নিষ্কাশন করা হয় না। এছাড়া হাওরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ৩১টি নালা বা ছড়ার অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে। পাশাপাশি হাওড়ের বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। মূলত এসব কারণে কাউয়াদীঘির পানি কুশিয়ারাতে নামতে না পেরে হাওরটি এখন সাগরে রূপ নিয়েছে। পানিতে সাগর হয়ে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে রাজনগরের একটি অংশ রয়েছে কুশিয়ারা নদীর তীরে। কুশিয়ারার পানি যাতে প্লাবিত করতে না পারে সেজন্য স্থানীয় উত্তরভাগ ইউনিয়নের একটি অংশে বাঁধ দেয়া হয়েছে। এই বাঁধের কারণে উপজেলার উঁচু এলাকাগুলোতে পানি না ঢুকলেও ভাটি এলাকার গ্রামগুলো তলিয়ে গেছে।

শারমপুর গ্রামের লেচু মিয়া জানালেন, নির্ধারিত সময়ে স্লুইচ গেট দিয়ে পানি নিষ্কাশন করলে কাউয়াদীঘি হাওর আজ সাগর হয়ে মানুষের দুঃখের কারণ হতো না। তিনি বলেন, স্লুইচ গেট দিয়ে পানি নিষ্কাশনের কথা বললে, ওরা জানায় মেশিন নষ্ট, কারেন্ট নাই ইত্যাদি। এছাড়া কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সেদিক দিয়েও পানি নামতে পারছে না।
রাজনগরে রাস্তার পাশে থাকা বন্যার্তদের ত্রাণ দেওয়া হলেও হাওরের প্রত্যন্ত এলাকায় তেমন কিছু দেয়া হচ্ছে না। ফলে খাবার না পেয়ে মানুষের কষ্টের সীমা থাকছে না।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের তৈরি করা এক হিসেবে দেখা গেছে, রাজনগরের ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টি ইউনিয়নই বন্যাকবলিত। এই ৫টি ইউনিয়নের ৭৭টি গ্রাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২টি আশ্রয় কেন্দ্রে ২৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বন্যায় রাজনগরে ৮ হাজার ৫৯০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ১১০টি বাড়ি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৪৩ হাজার ১৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ১৬০ হেক্টর কৃষিজমি নষ্ট হয়েছে। এর বিপরীতে ত্রাণ পর্যাপ্ত নয় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পেটুগাঁও গ্রামের রুহুল আমীন বন্যার পানির কারণে অনেকটা নিঃস্ব হয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি ১৪০ টাকা রোজে অন্যের ঘরে কাজ করছেন। ধুলিঝুড়া গ্রামের কিশোর রফিক মাসে ১ হাজার টাকা বেতনে পাঁচগাঁও গ্রামের আজাদের বাজারে একটি চায়ের দোকানে কাজ নিয়েছে। কেওলা গ্রামের শামসুল আলম খান জানান, হাওরে পানির কারণে নৌকায় চলাফেরা করতে হচ্ছে। এজন্য তিনি ২৫ হাজার টাকা দিয়ে নৌকা তৈরি করিয়েছেন। পূর্ব নোয়াগাঁও গ্রামের নৌকা মিস্ত্রি সুন্দর আলী জানালেন, পানিবন্দী হলেও অবস্থা সম্পন্ন লোকজন টাকা খরচ করে নৌকা তৈরি করেছেন। গত একমাসে তিনি শুধু নৌকা তৈরি করে আয় করেছেন প্রায় ১ লাখ টাকা।
ইউপি চেয়ারম্যান শামছুন নূর আজাদ জানান, বেশি পানি হওয়ায় এই ইউনিয়নে এখনও ৪০০ ঘর পানিবন্দী রয়েছে। একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তুলনায় ত্রাণ সরবরাহ কম। বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় মানুষের কষ্ট এবং ক্ষতির পরিমাণ বেশি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরিফুল ইসলাম জানান, বন্যায় এ পর্যন্ত ১১৫ মেট্টিক টন চাল, ২০০ প্যাকেট বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রি এবং নগদ ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ত্রাণ পেয়েছি। মেম্বার এবং চেয়ারম্যানের মাধ্যমে এগুলো বন্যার্তদের মাঝে বিতরণও করা হয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আশরাফ আলী জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় ত্রাণসামগ্রি ী চাওয়ার পাশাপাশি ৩টি স্পিডবোট চাওয়া হয়েছে। এই স্পিডবোট দিয়ে দ্রুত দুর্গত এলাকায় ত্রাণসহ বিভিন্ন সামগ্রি পৌঁছিয়ে দেয়া হবে। কয়েকদিনের উন্নতির পর গত রোববার থেকে ফের অবনতি হচ্ছে মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতির। আগের ৩ দিন বিভিন্ন নদ-নদীর পানি কমলেও গত সোমবার থেকে আবার সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বাড়তে শুরু করে। এতে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কবলে পড়েছে জেলার ৩ লক্ষাধিক মানুষ। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
মৌলভীবাজার পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী বিজয় ইন্দ্র শংকর চক্রবর্ত্তী জানান, কুশিয়ারা নদীর পানি আমলসিদ ও শেওলা পয়েন্টে ১৪.১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বাড়ায় দুর্ভোগও বাড়ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: