সর্বশেষ আপডেট : ৩০ মিনিট ২০ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮, খ্রীষ্টাব্দ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

নলকূপ পানিতে তলিয়ে গেছে, কুলাউড়া খাবার পানির সংকট

unnamedমৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি:: বানভাসী আরও দশটা মানুষের চেয়ে গৌরাঙ্গ দাসের অবস্থা কিছুটা ভিন্ন। অন্যদের কাজকর্ম লাটে উঠলেও তার হাতে আছে নৌকা। নৌকা চালিয়ে কমবেশি উপার্জন করছেন। তবু পেট পুরে খাবার মিলছে না হাকালুকি হাওরপারের এই বাসিন্দার। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউপি’র বরদলের বাসিন্দা গৌরাঙ্গ দাস জানান, তিন সপ্তাহ ধরি বউত (প্রচুর) পানি। ভাঙা ঘর ভাঙা দরজা। কেউ কিচ্ছু দিচ্ছে না। ডিলার (ওএমএস) থাকি ৫ কেজি চাউল আনতাম। এটাও নাই। পরিবারে ৬ জন মানুষ। ভাড়া নাও নিয়া খেয়া দেই। কোনো দিন ১০০-১৫০ টাকা পাই। হকলে মিলি তুরা তুরা (অল্প অল্প) খাই।

সরেজমিনে বরদলসহ হাকালুকি হাওরপারের বিভিন্ন গ্রামের অন্তত অর্ধশত নারী ও পুরুষের সঙ্গে কথা বলে একই চিত্র পাওয়া গেছে। ঘরবাড়ি-রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় দুর্ভোগের পাশাপাশি ঘরে ঘরে এখন ভাতের কষ্ট। পাকার আগেই বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শূন্য গোলা। প্রচুর পানি থাকায় ধরা পড়ছে না মাছও। নেই কাজের সুযোগ। সরকারি ও বেসরকারি কোনো ত্রাণই পাচ্ছেন না অনেকে।

বরদলের একটি চা দোকানে কথা হয় সুভাষ দাসের (৫৫) সঙ্গে। তিনি জানান, আমরা তিন বেলা খাইয়া অভ্যস্ত। একটু আগে এক কাপ চা ও একটা বিস্কুট খাইছি। ঘরে অখনো রান্না-বান্না অইছে না। ছেলেরা হাওরে মাছ ধরতে গেছে। মাছ পাইলে বেচমু। নাইলে নাই। কোনো সাহায্যও পাইছি না।
বরদল সেতুর কাছে দাঁড়াতেই অনেক মানুষ এসে ভীড় জমায়। সবার কণ্ঠে অভাব-অনটনের হাহাকার। আবদুর রহিম (৬০) জানালেন, বাড়িত পানি। ঘর একখান তুফানে ফালাই দিছে। ঈদের সময় ১০ কেজি চাউল পাইছলাম। অনেক কষ্ট করি চলরাম।

যোগেশ দাসের ঘরে পানি উঠে গেছে। পরিবার নিয়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। মাছ ধরে সংসার চলে। কিন্তু দিনে ৩০-৪০ টাকার মাছও পাচ্ছেন না। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি কেউই তাকে ত্রাণ দেয়নি। ত্রাণ না পাওয়ার কথা বললেন গীতেশ দাস, ছেকই বেগম, কবির মিয়া, সন্টু দাস, কটু দাস, কুটি মিয়াসহ অনেকে। তারা যে মিথ্যা বলছেন না, তার জন্য একে অপরকে সাক্ষী করলেন।
এদিকে এই এলাকার বেশিরভাগ মানুষেরই এখন নৌকা ছাড়া ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। অনেক বাড়ির নলকূপ পানিতে ডুবে আছে। কোনো নলকূপের মুখ সামান্য ভাসছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য সেখানে কলসি নিয়ে ছুটছেন নারী ও পুরুষ। অনেক বাড়িতে জ্বর, সর্দি-কাশিসহ নানা রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে। বরদলের সুহেল আহমদ জানান, দুই দিন জ্বর আছিল। একটু কমছে। বাইর অইছি। মানুষের মাঝে খুব বেশি খাদ্য সংকট। এক বেলা খাইলে দুই বেলা নাই।
হাঁটুপানি ভেঙে সুহেল আহমদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, এখনও তার ঘরে প্রায় হাঁটুপানি। বাড়ির নলকূপটি ডুবে যায়। এখন কিছুটা ভেসেছে। পাশের ফারুক মিয়ার বাড়ির নলকূপটি এখনও পানিতে ডুবে আছে। কদিন বৃষ্টির পানি জমিয়ে খেয়েছেন তারা। এখন সুহেলের নলকূপ থেকে আশপাশের লোকজন পানি নিচ্ছে। তবে নলকূপে প্রথমে ঘোলা পানি ওঠে। কয়েকবার চাপ দেওয়ার পর পরিষ্কার পানি পাওয়া যায়।
পাশের কারেরা গ্রামে গিয়েও বানভাসী মানুষজনের দুর্দশা চোখে পড়ে। গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, আমরা কোনো দিন কিনিয়া খাইছি না। এখন ধনি-গরিব সমান। কিনিয়া খার না, এমন কেউ নাই। ছাত্রলীগের উপজেলা শাখার সহ-সভাপতি আবু সালেহ আম্বিয়ার বাড়ি এই গ্রামেই। তিনি জানান, ‘এটা বাস্তব। লুকানোর কিছু নাই। মানুষ খুব কষ্টে আছে।

বরদল ও কারেরা গ্রামটি পড়েছে ভুকশিমইল ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডে। এই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল মালিক জানান, আমি তালিকা দিই দু-তিন’শ জনের। ত্রাণ পাই ৫০-৬০ জনের। ফলে একসঙ্গে সবাইকে দিতে পারি না। যারা ত্রাণ পায়নি, পরেরবার তাদের দেওয়া হবে।
এদিকে উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের ফরিদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে তিলকপুর গ্রামের ৩টি পরিবার এক সপ্তাহ ধরে আশ্রয় নিয়েছে। জয়ন্তী মালাকার নামের একজন জানালেন, তারাা একদিন নগদ ৫০০ টাকা, একদিন ২০০ টাকা পেয়েছেন। একদিন শুকনা খাবারও পেয়েছেন। জয়ন্তীর মা রাণী বালা মালাকারের (৬৫) ডায়রিয়া হয়েছে। গত বুধবার চিকিৎসক দলের সদস্যরা তাকে ওষুধ ও স্যালাইন দিয়ে গেছেন। কাদিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয় নেওয়া আরও ১৩টি পরিবার চিড়া, মুড়ি, গম ও নগদ টাকা পেয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নুরুল হক জানান, ভুকশিমইল বাজারে চিকিৎসক দল কাজ করছে। এছাড়া নৌকায় ভ্রাম্যমাণ একটি দল কাজ করছে। এরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখছে। তবে নৌকায় করে বেশি দূর যাওয়া যায় না। ধীরে ধীরে সব এলাকায় গিয়ে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধুরী মো: গোলাম রাব্বী জানান, যারা পায়নি বলেছে, তারা বোধ হয় সঠিক বলেনি। কোনো না কোনোভাবে সবাই পেয়েছে। এরপরও যারা পায়নি, তালিকা দেখে তাদের আগে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: