সর্বশেষ আপডেট : ৫০ মিনিট ৫ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১১ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আমার ছেলেবেলার ঈদ

491vocd0আহমদ আবদুল্লাহ ::
ছেলেবেলার কথা মনে হতেই সেকালের জাদুর বাক্স খুলে যায়। একে একে সিনেমার মতো ভেসে ওঠে শীতলক্ষ্যার টলটলে সুনীল শীতল পানি। ভেসে ওঠে পাঁচ-ছয় একর জমি জুড়ে নানা ফলফলারিসমৃদ্ধ গাছগাছালি ও বিরাট বরাক বাঁশের ঝাড়। সে বনজঙ্গল, সে ছায়াঘেরা সরু পথ, সেই নদীর কিনার, সেই বাঁশঝাড়, সে লাউয়ের জংলাসহ হাজারও ছবি মনের কোণে ভেসে ওঠে। এ স্মৃতি বড় করুণ, বড় দুঃখময়। সেসব স্মৃতির মধ্যেই যে এই পোড় খাওয়া জীবনটা আধুনিকতায় জড়িয়ে ধরা অজগরের কবল থেকে মুক্তি পেতে চায়। হায়রে অতীত যদি ফেরানো যেত। কিন্তু সে অতীত আর ফিরে আসবে না। ‘ফিরিবে না কপোত নীড়ে, ছায়াঘেরা তরু শাখাতে; শুকিয়েছে অশ্রুধারা চখা-চখির মিলন রাতে।’

ঈদের আগের দিন মাগরিবের আজান দেওয়া মাত্র চাঁদ দেখার ধুম পড়ে যেত। যারা সালাত আদায় করেন, তারা মসজিদে গিয়ে দ্রুত সালাত শেষ করে নদীর পাড়ে সমবেত হতেন। আমরা অনেক আগেই নদীর তীরে ভিড় করেছি। সূর্য ডুবেছে খানিকটা সময় হলো। পশ্চিমাকাশ লাল। কিন্তু মেঘের পাহাড়গুলো সেদিন বেশি ওড়াওড়ি করতে থাকে। মেঘগুলো কখনো হাতির আকারে, কখনো ঘোড়ার রূপ ধারণ করে। সূর্য অস্তমিত হওয়ার পরপরই এরা মহানন্দে আকাশ পানে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। আর চাঁদ নতুন বৌয়ের মতোন ঘোমটা এঁকে চুপটি মেরে লুকিয়ে থাকে। যেন আমরা দেখে ফেললে ওর শরম হবে। কোনো কোনো ঈদে চাঁদ দেখা যেত না। সেবার চাঁদ দেখার নামে কামান দাগায়। সে আওয়াজ শুনে সবাই বুঝতে পারেন কাল ঈদ মোবারক। আবার কখনো কখনো ঢাকা থেকে খবর শুনে পথিকরা পথে

পথে বলতে থাকেন, ‘আজ চান উঠেছে। কাল ঈদ।’

ভোর না হতেই শীত কুয়াশায় পুকুরে ডুব দিয়ে গোসল সেরে নিতাম। নতুন জামা-কাপড় পরে ঈদের জামাতে যাওয়ার জন্য কত যে ছটপট করতাম। সকল মুরুব্বির কাছ থেকে সালামি নিয়ে সামান্য সেমাই ও ফিরনি খেয়ে দৌড়। ঈদগাহে চলতি পথে মুরুব্বি সবাই উচ্চ আওয়াজে তাসবিহ পড়তেন, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার।’ তাদের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও আওড়িয়ে যেতাম।

ঈদগাহে আমাদের পেছনের সারিতে নিরাপদ জায়গায় বসিয়ে মুরুব্বিরা সামনে চলে যেতেন। ইমাম সাহেব লম্বা কালো জরির পাড়ওয়ালা জুব্বা পরিধান করে বড় লাঠি হাতে নিয়ে ওয়াজ করেন। তিনি কত কত কথা বলেছেন, ফিতরার কথা, গরিব-মিসকিনদের দান-খয়রাত করার কথা। পাড়া-প্রতিবেশীর কথা, আত্মীয়স্বজনদের কথা। সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতেন অসহায় দুস্থদের প্রতি ধনীদের কর্তব্য। তিনি বলেন, ‘যাদের নেই তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়াই হলো ঈদের মূল উদ্দেশ্য।’ ইমাম সাহেব দেড়-দু’ঘণ্টা ওয়াজ করে নামাজে দাঁড়াতেন। সালাতের পর খুৎবা। খুৎবা হতো আরবিতে। আমরা কিছুই বুঝতাম না, কিন্তু গুনাহ হবার ভয়ে কোনো কথা বলতাম না। নীরব হয়ে শুনতাম। এরপর শুরু হয় কোলাকুলি। একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে সবাই আনন্দ প্রকাশ করত। খোঁজখবর নেওয়া হতো সবার। বাড়িতে ফেরার পথ ছিল ভিন্ন। যে পথে গিয়েছি, সে পথে নয় অন্য পথে। পুবপাড়া দিয়ে আসতে হতো। বাড়িতে মেহমান এলে তাদের খাওয়াদাওয়া আর তাজিম তোয়াজ ইত্যাদি করে পাড়ার লোকদের বাড়িতে যেতাম। মহিলাদের অনেকেই ভাই, দাদু ভাই, বাবা-সোনা বলে আদর করে কিছু কিছু না মিষ্টি খেতে দিতেন।

সেই দিনগুলো ছিল শান্তি ও সুখের দিন। সেকালের মানুষ গরিব হলেও পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য ছিল। মানবতাবোধ

ছিল সবার মাঝে জাগ্রত। মনে পড়ে, ‘পাশের বাড়ির রাশিদার বাবা এসেছে, রাশিদারা ছিলো গরিব। আমার

মা আমাকে দিয়ে আধা কেজি দুধ পাঠিয়েছিলেন রাশিদার বাবার জন্য।’ সমাজে এই আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব,

প্রীতি স্নেহ মায়ামমতা-এসবের আজ বড্ড অভাব। মানুষ হয়ে পড়েছে আত্মকেন্দ্রিক, মানবতা দিয়েছে বিসর্জন। তাই কেবল আফসোস হয়, কিন্তু আবার কি আসবে সেই দিন!!

-সংগ্রহীত

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: