সর্বশেষ আপডেট : ২১ মিনিট ১৮ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২২ জুলাই, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৭ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

‘ইলা দুরভোগে আর খতোদিন থাখতাম’

unnamedজালাল আহমদ, মৌলভীবাজার:: অকাল পানিয়ে নিছে বরুয়া (বোরো) খেত। সাড়ে তিন মাস থাকি পানিবন্দী আছি। কছম (শপথ) করি কইয়ার কেউ এক মুট চাউল দিছে না। এখন ঢেউয়ে ঘরবাড়ি ভাঙিয়া নেরগি। ইলা (এভাবে) দুরভোগে আর খতোদিন থখতাম। আঞ্চলিক ভাষায় এভাবেই হতাশা ব্যক্ত করছিলেন হাকালুকি হাওরতীরের কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের বড়দল গ্রামের জামাল মিয়া (৭০)। তিনি একা বাড়ি পাহারার জন্য থেকে গেছেন। স্ত্রীসহ ৬ সন্তানকে পাঠিয়ে দিয়েছেন আত্মীয়ের বাড়িতে।

সরেজমিন গিয়ে এভাবে গত সাড়ে মাসে ত্রাণ না পাওয়া অসংখ্য মানুষের দেখা পাওয়া যায়। এর মধ্যে ভুকশিমইল ইউনিয়নের কাড়েরা গ্রামের যগেশ দাশ, আব্দুল মালিক, তজমুল আলী, প্রণতি দাসসহ অর্ধশতাধিক নারী ও পুরুষ জানান, ত্রাণ চাইতে গেলে মেম্বার ও চেয়ারম্যানরা উল্টো আমাদের ধমক দেন। ঘরে চাল নেই, চুলাও জ¦লে না। চারদিকে অথৈ পানি। কিন্তু পান করার পানির জন্য চলছে হাহাকার। নলকূপগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির জন্য ছুটতে হয় পাশর্^বর্তী উঁচু বাড়িতে।

একই গ্রামের সাধন দাস, সজল দাস, শ্যামল দাস প্রমুখ জানান, এলাকার বেশিরভাগ মানুষের উঠানে পানি। কারও ঘরে ২-৩ ফুট পানি। পেশায় তারা মৎস্যজীবি হলেও তারা মাছ ধরতে পারছেন না। কারণ, বন্যার পানি এতোই বেশি যে, জাল দিয়ে মাছ ধরাও সম্ভব হচ্ছে না। গত সাড়ে ৩ মাস থেকে তারা খেয়ে না খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন। হাওরতীরে এখনও ৫০ ভাগ মানুষের কাছে সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি। শুধু তাই নয়, গৃহপালিত পশু গরু ও ছাগল নিয়েও বিপাকে রয়েছে দুর্গত মানুষজন। সাড়ে ৩ মাস থেকে বন্যা থাকায় হাওরে কোনো প্রকার জলজ ঘাসশূণ্য হওয়ায় গো-খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর প্রভাব কোরবানির পশুর বাজারেও পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

হাকালুকি হাওরপারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা-এই ৩ উপজেলায় অকাল বন্যায় বোরো ফসল হারানো ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ১৩টি ইউনিয়নে মে মাস থেকে ওএমএস কার্যক্রম চালু হয়। গত ০১ জুলাই থেকে হঠাৎ করে চাল বিক্রি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বানভাসী মানুষ।
ওএমএস ডিলার আজমল আলী জানান, গত ০১ জুলাই থেকে চাল বিক্রি বন্ধ হওয়ায় প্রতিদিন অন্তত ৪০০ লোক ফেরত যাচ্ছেন। কুলাউড়া উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে ওএমএস কার্যক্রম চালু ছিলো। এতে মাসে বন্যাদুর্গত ৪২ হাজার পরিবার ওএমএস’র চাল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হাওরতীরের ভুকশিমইল, জয়চ-ী, কাদিপুর, ভাটেরা, বরমচাল, ব্রাহ্মণবাজার ও কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের দুর্গত মানুষের কথা বিবেচনা করে ফের ওএমএস কার্যক্রম চালুর দাবি বন্যাদুর্গত লোকজনের।

শুধু কুলাউড়ায় নয়, সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে হাওরতীরের জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায়ও। হাওরতীরের বন্যাকবলিত এলাকার শতভাগ মানুষকে প্রকৃতিকার্য (প্রশাব-পায়খানা) সম্পন্ন করতে হয় বানের জলে। ফলে হাওর এলাকার বন্যার পানি ভয়াবহ দূষণের আশংকা রয়েছে।
বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের বড়থল গ্রামের ইনাম উদ্দিন ইনই (৬৭) নামের এক বৃদ্ধ গত ০২ জুলাই সকালে মারা যান। এলাকায় জানাযার মাঠ পানিতে নিমজ্জিত থাকায় হাটুপানিতে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এলাকার কবরস্থান বন্যাকবলিত হওয়ায় তাকে পাশর্^বর্তী চিন্তাপুর গ্রামে বন্যার পানিতে অর্ধ-নিমজ্জিত কবরস্থানে দাফন করা হয়।

এদিকে জুড়ী উপজেলার ২টি আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছে ২৫টি পরিবার। এর মধ্যে শাহাপুর সপ্রাবি আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছে ১০টি পরিবার। আশ্রয় কেন্দ্রের ২য় তলায় অবস্থান করছেন আশ্রিত মানুষ। নিচতলায় অন্তত ৩ ফুট পানি। বিদ্যালয়ের টয়লেট বন্যাকবলিত হওয়ায় আশ্রিত মানুষকেও বন্যার পানিতে মলমূত্র ত্যাগ করতে হচ্ছে। শুধু আশ্রয় কেন্দ্র নয়, বন্যাকবলিত জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ও পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের শতভাগ মানুষ বন্যার পানিতে নিজেদের প্রকৃতিকর্ম সম্পাদন করেন।

ভুকশিমইল ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, ওএমএস চালু থাকলে মানুষের মাঝে এতো হাহাকার থাকতো না। তাছাড়া ত্রাণ হিসেবে চালের পরিবর্তে গম দেয়ায় মানুষ একটা ঝামেলায় পড়েছে। ভয়াবহ বন্যায় মানুষের উঠানে পানি। গম শুকিয়ে সেগুলো আবার ভাঙানোর একটা বাড়তি ভোগান্তিতে পড়েছে বানভাসী লোকজন।
সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার চৌধুরী মো: গোলাম রাব্বি জানান, কুলাউড়ায় ৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে বর্তমানে ১৭৩টি পরিবার রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে সার্বক্ষণিক ত্রাণ সরবরাহ করা হচ্ছে। ওএমএস প্রসঙ্গে তিনি জানান, গত ৩০ জুন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই ওএমএস চালু ছিলো। এরপর আর কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা করা হয়নি। আবারও ওএমএস চালু করার জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে চিঠি পাঠিয়েছি।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: