সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
মঙ্গলবার, ২২ মে, ২০১৮, খ্রীষ্টাব্দ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বিভীষিকার সেই রাত

1498883965নিউজ ডেস্ক:: গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় ৫ নম্বর হোল্ডিংসে হলি আর্টিজান বেকারি এবং ‘ও’ কিচেন রেস্তোরাঁ অবস্থিত। ঢাকায় বসবাসকারী অভিজাতদের কাছেই নয়; বিদেশিদেরও আড্ডার বিশেষ পছন্দের স্থান এটি। বিকেলের পর থেকেই এখানে বাড়ে লোকজনের আনাগোনা। গত বছরের ১ জুলাই ছিল শুক্রবার। রমজান মাস হওয়ায় ইফতারের পর থেকেই হলি আর্টিজানে অতিথিরা আসতে থাকেন। প্রকৌশলী হাসনাত করিম এসেছেন স্ত্রী শারমিনা করিম ও দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে। মেয়ের নাম সাফা করিম। ছেলের নাম রায়ান করিম। ১৩ বছর বয়সী মেয়ের জন্মদিন। এ উপলক্ষ্যে ডিনার পার্টির জন্যই তারা বেছে নিয়েছিলেন হলি আর্টিজান। নিচ তলার হল রুমের একটি টেবিলে বসেছেন তারা। অপর দিকে, বান্ধবী ফাইরুজ মালিহা ও তাহানা তাসমিয়াকে নিয়ে এসেছেন তাহমিদ হাসিব খান। সকালেই কানাডা থেকে ঢাকায় পৌঁছান তাহমিদ। ঢাকায় আসার পর কথা হয় ফাইরুজের সঙ্গে। ফাইরুজ থাকেন বাবা-মায়ের সঙ্গে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সড়কের একটি বাসায়। ফাইরুজ স্কলাস্টিকা স্কুলের ২০১৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী। গুলশানের ২ নম্বর এভিনিউয়ের ২ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা সৈয়দ আহামদ মুনীরের মেয়ে তাহানা তাসমিয়া তার বান্ধবী। তিনিও স্কলাস্টিকার একই ব্যাচের শিক্ষার্থী। ফাইরুজ তাহমিদকে বলেছিলেন, ইফতারের পর হলি আর্টিজানে তারা দেখা করবেন। সেজন্য তাহানার বাসায় ইফতার করতে চলে আসেন ফাইরুজ। ইফতারের পর তাহানাকে নিয়ে যান হলি আর্টিজানে। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন কানাডার টরন্টো ইউনিভার্সিটির ছাত্র তাহমিদ। তারা বসেছিলেন লেকঘেঁষা টালি ঘরের নিচে।

ভারতীয় নাগরিক সাত প্রকাশ গিয়েছিলেন ডিনার করতে। তন্ময় নামে তার এক বন্ধু আসার কথা। পাস্তা আর কমলার জুস অর্ডার দিয়ে তিনি অপেক্ষা করছিলেন বন্ধুর জন্য। সাত প্রকাশ ঢাকায় ‘প্রত্যয়’ নামে একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক হিসাবে কাজ করছেন।

আমেরিকা থেকে ছুটিতে দেশে আসা ফারাজ ফাইয়াজ হোসেন এসেছেন তার দুই বান্ধবীর সঙ্গে। তার বান্ধবীদের একজন ভারতীয় নাগরিক তারিশি জৈন। তারিশির বাবা সঞ্জিব জৈন ঢাকায় তৈরি পোশাক উত্পাদনের কাজে দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে অবস্থান করছেন। তারিশি ঢাকায় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়েছেন। তাই ছুটি পেয়ে আগে ছুটে এসেছেন ঢাকায়। বাড়ি ভারতের উত্তর প্রদেশের ফিরোজাবাদে। ফারাজের দুই বান্ধবীর আরেকজন অবিন্তা কবির। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনজনই এসেছেন হলি আর্টিজানে। বসেছেন হল রুমে। তাদের কাছেই একদল ইতালিয়ান নাগরিক বসেছিলেন ফেয়ারওয়েল ডিনারে। তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশে অবস্থান করছেন অন্তত ১৫-২০ বছর ধরে। তৈরি পোশাক উত্পাদন ব্যবসার সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত। ইশরাত আখন্দ নামে এক নারী রেস্তোরাঁয় ঢুকেছেন শ্রীলঙ্কান বন্ধু হরিকেশা উইজেসেকারার সঙ্গে। কিছু সময় পর তাদের সঙ্গে যোগ দেন হরিকেশার স্ত্রী ফেপতা সায়েমা উইজেকেরা। তারা তিনজনই বসেছেন বারান্দার টেবিলে।

রাত ৮টা ৪০ মিনিট থেকে ৫০ মিনিটের মধ্যে হলি আর্টিজান বেকারি এবং ‘ও’ কিচেনের শেফ, ওয়েটার সবাই ব্যস্ত। রেস্তোরাঁর দরজায় নিরাপত্তারক্ষী দায়িত্ব পালন করছিলেন নূর আলম। পাশেই গার্ড রুমের সামনে বসা আরেক নিরাপত্তারক্ষী জসিম।

এ সময় হেঁটে হলি আর্টিজানে প্রবেশ করে পাঁচ যুবক। এদের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। প্রত্যেকের কাঁধে ব্যাগ। পরনে টি-শার্ট আর ট্র্যাক স্যুট। পায়ে কেডস। অন্যদের মতো তাদেরও রেস্তোরাঁর রাতের অতিথিই মনে করেছিলেন সবাই। কিন্তু না, রেস্তোরাঁয় ঢুকতে ঢুকতেই এলোপাতাড়ি গুলি করতে শুরু করে এই পাঁচ যুবক। কারো হাতে একে-২২ রাইফেল, কারো হাতে পিস্তল। একজন ব্যাগ থেকে চাপাতি বের করে। হনহন করে তারা ঢুকে যায় হলি আর্টিজান বেকারিতে। মুহূর্তেই আতংক ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। চলতে থাকে চিত্কার, চেঁচামেচি। হতবিহ্বল হয়ে এদিক সেদিক ছুটতে থাকেন সবাই। অতিথি থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁর শেফ-ওয়েটার দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কেউ টেবিলের নিচে, কেউ গাছের আড়ালে লুকিয়ে প্রাণে বাঁচার চেষ্টা করেন।

প্রিয়জনদের সঙ্গে রাতের খাবার উপভোগের আনন্দ নিমেষেই বিষাদে রূপ নেয়। পাঁচ যুবকের কয়েকজন রেস্তোরাঁর হলরুমে বসা বিদেশিদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। বাকিরা বাইরের টেবিলগুলোতে বসা অতিথিদের জিম্মি করে অস্ত্রের মুখে। তাদের নিয়ে যায় ভেতরে। অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। তারপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাউকে কাউকে জবাই করে। ছুরিকাঘাত করতে থাকে এলোপাতাড়ি।

খবর পেয়ে গুলশান থানার এসআই ফারুকের নেতৃত্বে একটি টিম উপস্থিত হয়। তখন জঙ্গিদের সঙ্গে পুলিশের গোলাগুলি চলে। পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেডও ছুঁড়ে মারে তারা। পরে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা সেখানে ছুটে যায়। রাত সাড়ে ১০ টার দিকে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। জঙ্গিরা পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুঁড়ে মারে। এতে নিহত হন ডিবির সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন আহমেদ খান। আহত হন অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান, অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আব্দুল আহাদ, গুলশান থানার ওসি সিরাজুল ইসলামসহ অনেকে।

জঙ্গিরা একে একে ২০ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করে। এদের মধ্যে নয় জন ইতালিয়ান আর সাত জন জাপানি নাগরিক। বাকি চারজনের মধ্যে একজন ভারতীয়, একজন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিক, দুইজন বাংলাদেশি।

নিহতরা হলেন ইতালিয়ান নাগরিক নাদিয়া বেনেডেট্টি, ক্লদিও ক্যাপেলি, ভিনসেনজো ডি অ্যালেস্ট্রো, ক্লাদিয়া মারিয় ডি অ্যান্টোনা, সিমোনা মন্টি, অ্যাডেলে পুগলিসি, ক্রিসিটয়ান রসি, মারিয়া রিবোলি ও মার্কো টোনডাট।

৭ জাপানি নাগরিক হলেন মাকোতো ওকামুরা, হিরোশি তানাকা, কোয়ে ওগাসাওয়ারা, হিদেকি হাশিমাতো, নোবুহিরো কুরোসাকি, ইয়াকু সাকাই ও রুই শিমোদাইরা। তারা কাজ করতেন টোকিও বেইজড কনস্ট্রাকশন কনসাল্টিং কোম্পানি আলমেক কর্পোরেশনে। আর হিদেকি হাশিমাতো, নোবুহিরো কুরোসাকি এবং হিরোকি তানাকা কাজ করতেন টোকিং বেইজড কনসালটিং ফার্ম ওরিয়েন্টাল কনসালটেন্ট গ্লোবাল কোম্পানিতে। কোয়ো ওগাসাওয়ারা ছিলেন কাতাহিরা অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্টারন্যাশনালে। নিহতদের মধ্যে ২ জন ছিলেন নারী।

এ ঘটনার পর পরই পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও গোয়েন্দা সংস্থার শত শত সদস্য হলি আর্টিজানকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। রাত ১ টা ২৪ মিনিটে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) পক্ষ থেকে হলি আর্টিজানে হামলার দায় স্বীকার করে। রাত ৩ টার দিকে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ও র্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ গণভবনের গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। ভোর সাড়ে ৪ টার দিকে সিদ্ধান্ত হয় যে সেনাবাহিনী সেখানে অভিযান পরিচালনা করবে। সিলেট জালালাবাদ সেনানিবাস থেকে বিশেষ বিমানে করে ঢাকায় পৌঁছে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডোরা। এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন লে.কর্নেল ইমরুল হাসান। ঢাকা সেনানিবাসের ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুজিবুল হক পুরো অভিযান তদারকি করেন। প্যারা কমান্ডো বাহিনীর সদস্যরা আশেপাশের ভবনে স্নাইপার রাইফেল নিয়ে অবস্থান নেন। এর ব্যাকআপ ফোর্স হিসাবে র্যাবের টিমও সশস্ত্র অবস্থান নেয়। হলি আর্টিজানের পূর্ব দিকে লেকে অবস্থান নেয় নৌবাহিনীর সদস্যরা। পুরো অভিযানের ব্যাকআপ ফোর্স হিসাবে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার নেতৃত্বে পুলিশের প্রায় ৮শ’ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে কয়েকজন জিম্মি হলি আর্টিজান থেকে বের হয়ে আসেন। এরা হলেন তাহানা তাসমিয়া, ফাইরুজ মালিহা, তাহমিদ হাসিব খান, হাসনাত করিম, রায়ান করিম, সাত প্রকাশ, সাফা করিম, শারমিনা করিম, জাপানি নাগরিক ওয়াতানামি তামোকি, শ্রীলংকান দম্পতি হরিকেশা ও ফেফতা সায়মা। জিম্মিরা বেরিয়ে আসার ১০ মিনিট পর প্যারা কমান্ডোরা শুরু করেন ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ড’ নামে এই অভিযান। মুহুর্মুহু গুলির শব্দে এলাকা প্রকম্পিত হয়। মাঝে মধ্যেই গ্রেনেড ছুঁড়ে মারে প্যারা কমান্ডোরা। সকাল ৮ টা ২০ মিনিটে গুলি থেমে যায়। হলি আর্টিজানের ভিতরে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান প্রবেশ করে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দুই-একটি স্থানের আগুন নিভিয়ে ফেলে। প্যারা কমান্ডো ও সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেডের সদস্যরা হলি আর্টিজানে প্রবেশ করেন। হলি আর্টিজানের বাইরে থেকে ৬ জনের লাশ উদ্ধার করে। প্রথম দফায় এই ৬ জনকে জঙ্গি বলে মনে করা হলেও হলি আর্টিজানের শেফ (বাবুর্চি) সাইফুল ইসলাম চৌকিদারের বিষয়ে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কোনো তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।

নিহত ৫ জঙ্গি হলো রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামিহ মুবাশ্বির, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।

দুপুর ২ টার দিকে আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর থেকে এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের কাছে জানানো হয়। সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশন্সের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী এক প্রেসবিফ্রিংয়ে বলেন, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা সম্মিলিতভাবে অপারেশন থান্ডারবোল্ড পরিচালনা করেন। মাত্র ১২-১৩ মিনিটের মধ্যে সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। এতে তিন জন বিদেশিসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অভিযানের পর ২০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।




এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: