সর্বশেষ আপডেট : ৪ মিনিট ২২ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ২০ অগাস্ট, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৫ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বড়লেখা-জুড়ীতে ২৫ হাজার মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস

unnamed (15)জালাল আহমদ, মৌলভীবাজার:: মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পাহাড়ের চূড়ো আর টিলার পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। বেশিরভাগ সরকারি খাস জমিতে এসব বসতি গড়ে উঠলেও ভূমি প্রশাসন নির্বিকার। ফলে প্রতিবছর পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে টিলাধ্বসে দুর্ঘটনা ঘটছে। গত ৩ বছরে টিলা কাটতে গিয়ে মাটিচাপায় ও টিলাধ্বসে অন্তত ৩০ জন নারী-পুরুষের মৃত্যু ঘটেছে। হতাহতের ঘটনা ঘটলেই প্রশাসন ২-৪ দিন গণসচেতনতায় মাইকিং কিংবা লিফলেট বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ করে। পরিবেশ বিপর্যয়ের মূল কারণ, টিলাকাটা রোধে প্রশাসন কঠোরভাবে পরিবেশ আইনের প্রয়োগ না করায় অকাল বন্যা, ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। আর প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে কি করে, খোদ উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি উপজেলা নির্বাহী অফিসারই মদদ দিচ্ছেন টিলাকাটায়। মাঝে-মধ্যে অবশ্য লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করে থাকেন। কিন্তু উপজেলা কমপ্লেক্স আর থানা কমপ্লেক্সের ঠিক মধ্যখানে পাহাড়-টিলার মাটি ফেলা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। উপরন্তু ইউএনও অভিযোগকারীদের জানান, আপনারা লিখিত অভিযোগ দেন-আমরা তখনই ব্যবস্থা নেবো। unnamed (14)

পাহাড়ি এলাকা ঘুরে জানা গেছে, পাহাড়ের চূড়া ও টিলার পাদদেশে বসবাসকারীদের অধিকাংশই ভূমিহীন, হতদরিদ্র ও অসহায় প্রকৃতির। মাথা গোজার বিকল্প স্থান না থাকায় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এরা বৈধ ও অবৈধপথে সরকারি টিলা দখল করে বসবাস শুরু করে। জীবিকার তাগিদে এরা বৃক্ষ নিধন, টিলার মাটি ও পাথর বিক্রির মতো পরিবেশবিধ্বংসী কাজে জড়িয়ে পড়ে। বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার স্থানীয়দের দেয়া তথ্যানুযায়ী, পাহাড়ের চূড়া ও টিলার পাদদেশে বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। মদদদাতা প্রভাবশালীমহল বিগত ৩-৪ যুগ ধরে এসব বসবাসকারীদের সামান্য সুবিধা দিয়ে বছরের শুষ্ক মৌসুমে টিলা কেটে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় নির্বিচারে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটলেও রহস্যজনক কারণে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা থাকেন নীরব। বর্ষা মওসুমে টানা ভারী বর্ষণ হলেই আগের কাটা পাহাড়ের অবশিষ্ট অংশ ধ্বসে পড়ে। আর এ সময় পাহাড়ের চূড়া ও পাদদেশে বসবাসকারীরা দূর্ঘটনার শিকার হন। ভৌগলিক অবস্থানগত দিক দিয়ে পাথারিয়া পাহাড় ও হাকালুকি হাওরবেষ্টিত এ দুই উপজেলায় এ রকম দূর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসনের যে ভূমিকা থাকার কথা সে রকম ভূমিকা নেয়া হয় না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। কোনো অঘটন ঘটলেই দৌঁড়-ঝাঁপ শুরু হয় প্রশাসনের লোকজনের। দূর্ঘটনার আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয়দের সচেতন করতে কোনো ভূমিকা চোখে পড়েনি। unnamed (13)

ইতোপূর্বে বড়লেখার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউপি’র বোবারথল এলাকায় ঘটে যাওয়ায় এমন দু’টি ঘটনাই এর প্রমাণ। দূর্ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন দূর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয়দের সচেতন করতে কিছুটা তৎপর হতে দেখা গেলেও তা আশানুরূপ নয় বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর। এই ২টি উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, প্রতিবছরই পাহাড়ে বসবাসকারীরা আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে অবাধে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করে। তারা সরকারি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পাহাড়ি টিলা কেটে চূড়া ও পাদদেশে নির্মাণ করেন ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর। তাদের এমন আচরণে উজাড় হচ্ছে পাহাড়ি বনবৃক্ষ ও জঙ্গল। এমন নির্মমতায় বাসস্থান হারাচ্ছে বন্যপ্রাণি। পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে পাহাড়ি টিলাবেষ্টিত এ অঞ্চলের পরিবেশ। প্রকাশ্যে প্রশাসনিক কার্যালয়ের সামনে দিয়ে পাহাড়ি টিলার মাটি কেটে পরিবহন করে নেয়া হলেও রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্টরা থাকেন নির্বিকার।

সরেজমিনে বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার কয়েকটি এলাকায় পাহাড়ি টিলা কেটে মাটি বিক্রি করায় পাদদেশের বসতবাড়িগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিতে থাকতে দেখা গেছে। জুড়ীর ভজিটিলা নামক একটি বিশাল টিলা শুস্ক মওসুমে কেটে ফেলায় নিচের প্রায় ২০০ পরিবারের সহ¯্রাধিক নারী-পুরুষ মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। বসতবাড়িগুলোতে দুর্ঘটনার আশংকা রয়েছে। এলাকার বাসিন্দা সেলিম মিয়া, জুলেখা বেগম, রুবেল আহমদ, পারভীন বেগম, ডেইজি বেগম, আব্দুস সহিদ প্রমুখ জানান, শুষ্ক মওসুমে অবাধে এ সকল এলাকায় পাহাড় কাটা চলে। বর্ষায় কিছুটা কম হলেও থেমে থাকে না পাথরখেকো চক্র। প্রভাবশালী একটি চক্রের ছত্রছায়ায় স্থানীয় লোকজন প্রতিবছর টিলা কেটে মাটি ও পাথর বিক্রি করছে। পরে মাটি কাটা স্থানে নির্মাণ করছে বসতঘর। আইনি ঝামেলা এড়াতেই ওই স্থানে বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য কৌশলে ভূমিহীন অথবা হতদরিদ্র মানুষকে বসিয়ে দেয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন অথবা সরকারি পাহাড়ি টিলার পাদদেশে বসতবাড়ি নির্মাণ করে থাকা লোকজনকে ওই প্রভাবশালী চক্র নানাভাবে প্রলোভনে ফেলে ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অভাবী লোকদের পাহাড়ি টিলা কাটতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। স্থানীয়রা জানান, জুড়ী উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় পাহাড়-টিলায় মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে অন্তত ৫ হাজার মানুষ বসবাস করছে।

বড়লেখার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় অন্তত ২০ হাজার মানুষ চরম ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। বর্ষায় অতিবর্ষণে পাহাড় ধ্বসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেই কেবল প্রশাসন দৌঁড়-ঝাঁপ শুরু হয়। অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়াতে প্রচারণা আর নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীতে তা বাস্তবায়ন না করায় হতাহতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। গত কয়েকদিনের মুষলধারে বৃষ্টির কারণে বড়লেখার দুর্গম বোবারথল, ডিমাই, তেরাদরম, কাশেমনগর, বিওসি কেছরীগুল এলাকায় পাহাড়ি চূড়ায় ও টিলার পাদদেশে নির্মিত বসতঘরের আশপাশের মাটি ধ্বসে গেছে। যে কোনো সময় প্রাণহানিসহ বড়ো ধরণের দূর্ঘটনার আশংকা রয়েছে। ইতোপূর্বে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী আব্দুল হাসিবের বসতঘর মাটিচাপা পড়লেও অলৌকিভাবে পরিবারের ৬ সদস্য বেঁচে যায়। এর কয়েক দিন আগে ওই এলাকায় আরেক ব্যক্তি মাটিচাপায় প্রাণ হারান। এর আগের বছর শাহবাজপুর চা বাগানে পাহাড় ধ্বসে একই পরিবারের ৩জনের মৃত্যু ঘটে। স্থানীয় সূত্র জানায়, বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলায় ইতোপূর্বে অবৈধভাবে টিলার মাটি কাটতে ও পাহাড় ধ্বসে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধ্বসে হতাহতের ঘটনায় পাহাড়ের চূড়া ও পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহবান জানিয়ে বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলা প্রশাসন গত ১৪ জুন সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাইকিং করেছে। দুই উপজেলার উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, থানার ওসি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা ঝুঁকিপুর্ণ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এসএম আবদুল্লাহ আল মামুন; জুড়ীর ইউএনও মিন্টু চৌধুরী ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজাদের রহমান জানান, পাহাড়-টিলা ধ্বসেপড়ার আশংকা রয়েছে এমন-জনবসতি এলাকা তারা পরিদর্শন করেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া পাহাড়-টিলায় বসবাস না করতে এলাকায় গণসচেতনতামূলখ মাইকিং করতে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানদেরকে বলা হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: