সর্বশেষ আপডেট : ৪ মিনিট ৯ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ২১ অগাস্ট, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৬ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ভালো নেই হাওরপারের মৎস্যজীবি সম্প্রদায় : জাল আছে মাছ নেই

newspic0011জালাল আহমদ ::
ঘরে চাল নেই। তেল, নুন মরিচও নেই। অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে হাওরপারের জেলে পরিবারের। এখন আয়-রোজগার না থাকায় অভাব-অনটনেরও শেষ নেই। চলছে চরম দুর্দিন। এ বছর ধান নেই। মাছও কম। সবই হারিয়ে নি:স্ব হাওরতীরের কৃষি ও মৎস্যজীবি মানুষ। এখন মাছের ভর মৌসুম। কিন্তু জেলেরা হাওরে জাল ফেলে হতাশই হচ্ছেন। কারণ, মিলছে না আশানুরূপ মাছ। তাছাড়া ভাসমান পানিতে মাছ ধরা নিয়েও রয়েছে নানা বাঁধা-বিপত্তি। যে এলাকাতে জালে কম-বেশি মাছ ধরা পড়ছে সেখানে মাছ ধরতে দিচ্ছেন না বিল ইজারাদার। বিলের আশপাশ ভিড়লেই নানা বিড়ম্বনা। দুর্ভোগগ্রস্তরা জানালেন, এ বছর হঠাৎ উত্তাল হাওর রাক্ষুসে হয়ে সবই গ্রাস করেছে হাওর। তাই বোরো চাষীদের মতো দুর্দিনে হাওরতীরের মৎস্যজীবিরাও। এ সংকট কাটাতে নেই তাদের সহায়-সম্বল। প্রতিদিনই নানাজনের আশার বাণী আর প্রতিশুকির ফুলঝুরিই যেনো তাদের শান্ত¡না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও মিলে না সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। তাই তাদের এখনকার বাস্তবিক দৃশ্য অনেকটাই এখন করুণ। আশানুরূপ কোনো সহায়তা এখনও জুটেনি তাদের। দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তাও নেই। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের। বেঁচে থাকার সংগ্রামে প্রতিদিনই আগের মতো ছুটে চললেও তা হচ্ছে অসার। কেননা, এ বছর হাওর হারিয়েছে তার জৌলুস। আয়-রোজগার নেই। তাই পরিবারের খাওয়া-বাঁচা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা-এমন দুশ্চিন্তায় এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন।
স্থানীয় মৎস্যজীবিরা জানান, মড়কের পর জালে মাছ ধরা পড়ছে কম। অকাল বন্যা আর চলমান বর্ষণে এখন পানিতে টইটম্বুর হাকালুকি। অনান্য বছর এ সময় নানা জাতের দেশীয় প্রজাতির মাছ জালে ধরা পড়লেও এ বছর ভিন্নচিত্র। সারা দিন জাল ফেলেও মিলছে না পর্যাপ্ত মাছ। তারপরও পরিবারের জীবিকার প্রয়োজন, অলস সময় আর নেশার টানে ভাসমান নতুন পানিতে জাল ফেলছেন মৎস্যজীবিরা। কিন্তু অনেকটা হতাশ হয়ে ফিরছেন বাড়িতে। যে হাওরকে উপলক্ষ করে চলে তাদের জীবন-জীবিকা। সে হাওর এখন জীবিত থেকেও মৃত। তাই হাওরতীরের মানুষগুলো এখন চরম অসহায়। এ বছর চৈত্রের অকাল বন্যায় তাদের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে। টানা ভারী বর্ষণ আর উজানের পাহাড়ি ঢল কেড়ে নিয়েছে তাদের সোনালী ফসল। বোরো ধানের পর মরছে মাছ। গবাদি পশু আর জলজ প্রাণি ও উদ্ভিদ। উত্তাল হাওর একে একে গিলে খেয়েছে সব সম্পদ। বসতভিটা ছাড়া এখন হাতে আর অবশিষ্ট নেই বেঁচে থাকার অবলম্বনের মতো কোনো সম্পদ। এমন দুঃসময়ে বেকারত্ব গোছাতে মিলছে না অন্য পেশাও। তাই ঘুরেফিরে মাছ ধরা আর বিক্রি করাই তাদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পেশা।
সরেজমিনে হাওরপারের জেলেপল্লী হিসেবে পরিচিত কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের তেঘরিঘাট, সাদীপুর, কুরবানপুর, মিরশংকর, বরমচাল ইউনিয়নের আলীনগর; জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের শাহপুর, ফতুনগর ও বেলাগাঁও এবং বড়লেখা উপজেলার হাল্লা, মুর্শিবাদকুরা এলাকায় গেলে কথা হয় স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সাথে। তারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে তুলে ধরেন তাদের অসহায়ত্বের কথা। তারা জানান, জন্মের পর এতো বড়ো দুর্যোগ আর দেখেননি তারা। অনান্য বছর বন্যা হলেও কিছু ধানও ঘরে তুলতে পেরেছেন। বানের পানিতে ধান গেলেও প্রচুর মাছ পেয়েছেন। কিন্তু এ বছর ভিন্ন। বোরো ধানের সাথে মরেছে মাছও। জেলেপল্লীর বাসিন্দারা ক্ষোভের সাথে জানালেন এখন পর্যন্ত তারা সরকারি তরফে কোনো সহায়তা পাননি। তারা বলেন, আমাদের এমন চরম দুর্দিনে আশা ছিলো সরকার আমাদের পাশে দাঁড়াবেন। সংকটময় এ দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবেন। সরকারের তরফে এমন প্রতিশ্রুতি ফুলঝুরি শোনালেও এখন ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যজীবি হিসেবে আমরা কিছুই পাইনি। অকাল বন্যার পর হাওরপারের মানুষের জন্য ওএমএস বা ভিজিএফ’র যে ত্রাণ সহায়তা এসেছিলো তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল থাকায় ওই সহায়তাও আমাদের কপালে জুটেনি। এখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে গেলে তারা বলেন, মৎস্যজীবিদের জন্য এখনও বরাদ্দ আসেনি আসলে পাবেন। তারা ক্ষোভের সাথে জানালেন, আমাদের এমন দুর্যোগ চলে গেলেও মনে হয় সরকারের ওই ত্রাণ সহায়তা আমাদের কাছে পোঁছাবে না।
হাকালুকি হাওরের তেঘরিঘাট এলাকার সেতুর পাশেই জাল, ডরি ও ফড়িয়া (মাছ ধরার বিশেষ ফাঁদ) পেতে মাছ ধরছিলেন সলিম মিয়া, হরমুজ আলী, আছই মিয়া। কেমন মাছ ধরা পড়ছে জানতে চাইলে তারা বলেন, ভাই আগের মাছ নাই। এ বছর মড়কের পর মাছ ধরা পড়ছে খুবই কম। সারা দিন মাছ ধরে ১০০ টাকারও মাছ পাই না। এ দিয়ে নিজে খাবো কি আর পরিবারের সদস্যরা খাবে কি। তারা জানালেন, মাছ যে একেবারেই নেই এমন নয়। সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিতে নদী ভাঙ্গনে সৃষ্ট বন্যায় হাওরতীরবর্তী এলাকার বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। এতে পুকুর ও মৎস্য খামারের মাছ প্লাবনের পানিতে ভেসে হাওরে আসে। এ বছর ধান পচে প্রচুর খাবার থাকায় ওই মাছগুলো হাওরের বিল এলাকায় চলে যাওয়াতে হাওরের তীরবর্তী ভাসমান পানিতে জালে মাছ ধরা পড়ছে কম। আর বিল এলাকায় মাছ ধরা পড়লেও ইজারাদারদের কারণে মাছ ধরা তো দূরের কথা নৌকা নিয়ে বিলের পাশ দিয়েও যাতায়াত করা কষ্টকর। হাওরপারের ইসলামগঞ্জ বাজারের পশ্চিম পাশে মাছ ধরছিলেন কয়েকজন জেলে।
তারা জানালেন, জমি বর্গা নিয়ে তারা চাষ করেছিলেন বোরো ধান। কিন্তু অকাল বন্যায় একটি ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। এখন জালে মাছও ধরা পড়ছে কম। অনান্য বছর ধান না থাকলেও মাছ ছিলো কিন্তু এ বছর কিছুই নেই। তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা দিশেহারা। হাওরপারের স্থানীয় ইসলামগঞ্জ বাজার ঘাটে ও ঘাটের বাজারে প্রতিদিনই পর্যাপ্ত মাছ উঠলেও এ বছর উল্টোচিত্র। আগের মতো নেই পাইকারি কিংবা খুচরা মাছ ক্রেতা-বিক্রেতার হাকডাক। মড়কের পর পুঁটি, টেংরা, মলা, ঢেলা আর ছোটো চাঁদাজাতীয় মাছ ছাড়া জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না বড়ো মাছ। তাই স্থানীয় মাছের বাজারগুলোরও ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে।
স্থানীয় মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর হাকালুকি হাওরে মাছ মারা গেছে আনুমানিক ২৫ মেট্রিক টন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, হাওরতীরবর্তী এলাকায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন অন্তত ৪ হাজার। এ বছর দুর্যোগের পর হাওরে মাছের ঘাটতি পোষাতে বিল নার্সারির (হাওর এলাকার বিল বা পুকুরে পোনা উৎপাদন) জন্য ২৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। অপরদিকে হাওরে রুই, কাতলা ও মৃগেল জাতীয় পোনা অবমুক্তের জন্য ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। চলতি মাসের মধ্যেই এ সকল পোনা মাছ হাওরে অবমুক্ত করা হবে।
কুলাউড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ ও বড়লেখা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জয় ব্যানার্জী জানান, এটা সত্য হাওরের এই দুর্যোগের পর জেলেদের দুর্দিন যাচ্ছে। তিনি আশ^স্ত করে বলেন, হাওরে পুঁটি, টেংরা, মলাসহ ছোটো মাছের পোনা দেখা যাচ্ছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে হাওর থেকে মাছ বিলুপ্ত হয়নি। এ বছর যে পরিমাণ খাদ্য সৃষ্টি হয়েছে তাতে দ্রুত মাছ বৃদ্ধি পাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যে হাওরে জেলেদের জালে পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়বে। বড়লেখার তালিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান বিদ্যুত কান্তি দাস ও কুলাউড়ার ভুকশিমইল ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, এখন পর্যন্ত মৎস্যজীবি হিসেবে আলাদা কোনো ত্রাণ দেওয়া হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জেনেছি ত্রাণ আসবে।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: