সর্বশেষ আপডেট : ২১ মিনিট ২১ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৬ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

হুমকিতে হাকালুকি হাওর এলাকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন

unnamed (15)জালাল আহমদ, মৌলভীবাজার :: মৌলভীবাজারের বড়লেখায় অবস্থিত এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হলেও মূলত মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণেই এবার বোরো ধান উৎপাদনে অনেকটা সমৃদ্ধ মৌলভীবাজার হুমকির মুখে পড়েছে। সেই সাথে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন নিয়ে হুমকির মুখে পড়েছে। বিষয়টি অভিভাবকদের জন্য উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে কৃষক ও জেলে পরিবারগুলো যেখানে দু’বেলা দু-মুঠো ভাত জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। সেই পরিবারগুলো একমাত্র সম্পদ এক ফসলি বোরো ধান হারিয়ে আর জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন মাছ না পেয়ে তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা জীবনের আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অসময়ে জীবন বাঁচার একমাত্র সম্পদ বোরো ধান, হাওরের মাছ ও গৃহপালিত পশু বিক্রি করে দেয়ায় কৃষক ও জেলে পরিবারগুলোতে হাহাকার বিরাজ করছে। সেই শোক কাটতে না কাটতেই এখন হাওরপারের অসহায় মানুষগুলো একের পর এক দুর্যোগপূর্ণ বাস্তবতার কারণে ছেলেমেয়েদের শিক্ষাজীবন নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ অবস্থায় সময় পার করছেন হাওরবাসী।
বংশপরম্পরায় বছরের পর বছর যে মাছ ধরে তারা জীবিকা নির্বাহ করতেন তাও শেষ। হাওরে এখন মাছ নেই। বৈশাখ মাসে বোরো ধান কাটার পর হাওরে মাছ ধরেই বাকি সময় সংসার পরিচালিত করছিলেন হাওরবাসী। কিন্তু এবার সব শেষ হয়ে গেছে বন্যার পানি ও বিষক্রিয়ার পানিতে বোরো ধান আর নানান কারণে মাছের মড়কে। সরকার ওই সব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়ালেও তা সংকুলান হচ্ছে না। ওএমএস চাল, ভিজিএফ কার্ডসহ সরকারি সহযোগিতা যা দেয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক স্থানেই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা পাচ্ছে না সরকারি সহযোগিতা। এমনকি চালও অনেকে না পেয়ে বিফল মনোরথে বাড়ি ফিরছে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই বিতরণ করলেও শিক্ষাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিসপত্রের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে অসহায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। যার জন্য হাওরপারের কৃষক পরিবারের ছেলেমেয়েদের শিক্ষাজীবন এখন হুমকির মুখে পড়েছে। আর পরিবারের বর্তমান অসহায়ত্বের চিত্র দেখে অনেক শিক্ষার্থী চোখে-মুখে যেনো অন্ধকার দেখছে। অনেকেই নিজের জীবনের কথা না ভেবে পরিবারের কথা মাথায় রেখে ছেড়ে দিচ্ছে শিক্ষাজীবন। যোগ দিচ্ছে বিভিন্ন কাজে না হয় চলে যাচ্ছে অন্যত্র জীবিকার তাগিদে।
সূত্র জানায়, মৌলভীবাজার জেলায় প্রাথমিক স্কুল ২৫৯৫টি, মাধ্যমিক স্কুল ১৭৩টি, মাদরাসা ৭১টি ও ২৪টি কলেজ রয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক। এর মধ্যে জেলার বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ এই ৫ উপজেলার নিয়ে বিস্তৃত হাওরপারে শিক্ষার্থী রয়েছে অর্ধলক্ষাধিক। জেলায় হাওরপারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে ১০ হাজার শিক্ষার্থী। তাদের খরচ ও পরিবারের চাহিদা কিভাবে মিটাবে-এ নিয়ে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে অভিভাবকেরা। এসব শিক্ষার্থীর পরিবার বোরো ধান আর মাছের ওপর নির্ভরশীল ছিলো।
সূত্র আরও জানায়, গত এপ্রিল মাসের অকাল বন্যায় হাকালুকি হাওরের তলানো ধান পচে বিষক্রিয়ায় পানিতে অক্সিজেন কমে যায়। এতে প্রচুর মাছ মারা যায়। মৎস্য বিভাগের হিসেব অনুযায়ী, হাকালুকি হাওরে আনুমানিক ২৫ মেট্রিক টন মাছ মারা গেছে এবারের প্রাকৃতিক দুর্যোগে।
কুলাউড়া উপজেলার হাকালুকি হাওরের ভুকশিমইল ইউনিয়নের বরদল এলাকার বাসিন্দা নিপুল দাস জানান, তার পরিবারের ৬জন সদস্য। মাছ ধরেই পরিবার চলে। এই বরদল গ্রামেই অন্তত ৩০০ কার্ডধারী মৎস্যজীবি আছেন। মাছের আকাল হওয়ায় অধিকাংশ মৎস্যজীবির ঘরেই চলছে অভাব-অনটন।
মৎস্যজীবি পরিবারের সন্তান বাবুল দাস এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। বাবুল জানায়, বাবা গেছইন মাছ ধরতে। কিন্তু মাছ ধরি পেটই দিতা পাররা না। পড়ার খুব ইচ্ছা। কেমনে পড়তাম। কই টাকা পাইতাম।
তালিমপুর ইউনিয়নের হাওর তীরবর্তী কানোনগো বাজার। জেলেরা এখানে এনে মাছ বিক্রি করেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, তেমন একটা মাছ বাজারে উঠেনি। হাওরে মাছ নেই, তাই এখানে ক্রেতাও তেমন নেই। এই কয়েক মাস আগে যেখানে দেখা গেছে, মাছ ক্রয় করতে যাওয়া মানুষদের ভীড়।
ভুকশিমইল ইউনিয়নের হাওরপাড়ে ইসলামপুর বাজার। জেলেরা মাছ ধরে এনে এখানে বিক্রি করেন। খুচরা মাছ ব্যবসায়ীরা মাছ কিনে আশপাশের বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন। সেখানে দেখা গেছে, কিছু মাছ ব্যবসায়ী বসে লুডু খেলছেন। ছোট দু-একটা নৌকা এসে ভিড়েছে। তাদের কাছে অল্প কিছু পুঁটি, ট্যাংরা, ছোট চাদাজাতীয় মাছ। এগুলো নিয়ে অনেকে দরদাম করছেন।
এ বিষয়ে বড়লেখা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবু ইউসুফ ও কুলাউড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ জানান, বড়লেখায় ২৪০০ জন ও কুলাউড়া উপজেলায় ১ হাজার ৭০০ জন নিবন্ধিত জেলে আছেন। জেলেরা মোটামুটি কষ্টের মধ্যে আছেন। মৎস্য অধিদপ্তর থেকে ত্রাণ দেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা ত্রাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি। এখনও কোনো ফিডব্যাক পাইনি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, হাকালুকি হাওর এলাকায় ৪ হাজার জেলে নিবন্ধিত আছেন। হাওরে মাছের ঘাটতি পোষাতে বিল নার্সারির (হাওর এলাকার বিল বা পুকুরে পোনা উৎপাদন) জন্য ২৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। অপরদিকে হাওরে রুই, কাতলা ও মৃগেল জাতীয় পোনা অবমুক্তের জন্য ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। আগামী ২০ জুনের মধ্যে পোনা হাওরে ছাড়া হবে।
তালিমপুর ইউপি চেয়ারম্যান বিদ্যুত কান্তি দাস ও কুলাউড়ার ভুকশিমইল ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত মৎস্যজীবি হিসেবে আলাদা কোনো ত্রাণ দেওয়া হয়নি। গরিব দেখে সাধারণ ত্রাণ থেকে কিছু কিছু লোককে সাহায্য দেওয়া হয়েছে। শুনছি ত্রাণ আসবে। এখনও আসেনি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুছ আকন্দ জানান, হাকালুকিতে মাছের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিল নার্সারি করা হবে ও পোনা ছাড়া হবে। মা মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মা ও পোনা মাছ যাতে কেউ না ধরে, সেজন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবে পুঁটি, ট্যাংরা, মলাসহ ছোট মাছের পোনা দেখা যাচ্ছে।
এদিকে হাকালুকি হাওরের উৎপাদিত বোরো ধান হারিয়ে সাড়ে লক্ষাধিক পরিবারের জীবন-জীবিকা থমকে গেছে। অনেকেই শহরে চলে গেছে জীবন বাঁচানোর তাগিদে। শিক্ষার আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে না পেরে ও পরিবারের কথা ভেবে অনেকেই বিভিন্ন কাজে যোগ দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাওরপারের লোকজন।
স্থানীয়রা মনে করেন, স্থানীয় কৃষক ও জেলে পরিবারগুলোকে এবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ওই সব পরিবারে এখন হাহাকার চলছে। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে হাওরপারের শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে ঝরে পড়বে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে সরকার গুরুত্ব সহকারে পাশে না দাঁড়ালে আগামীতে বোরো ধান চাষাবাদ করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। বোরো ধান উৎপাদনে অন্যতম সমৃদ্ধ হাকালুকি হাওরের কৃষকরা বোরো ধান উৎপাদন বন্ধ হলে ফলে শূন্য হয়ে যাবে হাওর। হাওরপারের অভিভাবকেরা জানান, সরকার যদি হাওরপারের আমাদের সন্তানদের এবার লেখাপড়া করার সুযোগ-সুবিধা না দেন তাহলে আমাদের সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ, এবার আমাদের একমাত্র সম্পদ বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। নিজেরা কি খেয়ে বাঁচবো তাই ভেবে পাচ্ছি না।
মৌলভীবাজার জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সৈয়দ মো: আব্দুল ওয়াদুদ জানান, আমি আমার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছি যে, এবার আগামী ফসল না ওঠা পর্যন্ত হাওরপারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওই সব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সব শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তির আওতায় আনার জন্য।
বড়লেখা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, এবার হাওর সম্পূর্ণ পানিতে ডুবে যাওয়া কৃষকেরা দিশেহারা। এখন হাওরপারের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। ত্রাণ চাহিদা অনুযায়ী আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তা না হলে সঠিকভাবে সঠিক সময় হাওর রক্ষা বাঁধে কাজ না করায় বানের পানির মতো হাওর যেভাবে ডুবে গেছে তেমনি টাকা ও প্রয়োজনীয় শিক্ষার আনুষঙ্গিক চাহিদা মেটাতে না পেরে শিক্ষার্থীরাও লেখাপড়া ছেড়ে বিভিন্ন কাজে যোগ দেবে, না হয় শহরে চলে যাবে জীবন বাঁচাতে।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: