সর্বশেষ আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে
বুধবার, ২৮ জুন, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

দুই ভায়রার দায়মুক্তির গল্প

mushfik-120170526153253স্পোর্টস ডেস্ক:: একটি জয়। একটি সাফল্য। দুটি অন্য ধরনের অর্জন ও প্রাপ্তি। প্রথম কৃতিত্ব; দেশের বাইরে নিউজিল্যান্ডকে প্রথমবার হারানো। দেশের মাটিতে কিউইদের টানা সাত ম্যাচে হারানোর দুর্দান্ত কৃতিত্ব থাকলেও ২৪ মে ডাবলিনের ক্লনটার্ফে পাওয়া ৫ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়ের আগে দেশের বাইরে আর কখনই কিউইদের হারাতে পারেনি টাইগাররা।

তবে দেশের বাইরে কিউইদের বিপক্ষে যে জয় নেই কথাটি সর্বাংশে সত্য নয়। ইতিহাস জানাচ্ছে এর আগে আরও একবার দেশের বাইরে ব্ল্যাক ক্যাপ্সদের হারিয়েছে বাংলাদেশ। তবে সেটা একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে নয়। ২০০৭ সালে কিউইদের বিরুদ্ধে একটি অবিস্মরণীয় জয় আছে। ওয়েষ্ট ইন্ডজের মাটিতে বসা বিশ্বকাপের মূল লড়াইয়ের আগে প্রস্তুতি বা গা গরমের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিল হাবিবুল বাশারের বাংলাদেশ।

তবে সেটা একদিনের স্বীকৃত ম্যাচ ছিল না। মানে ঐ ম্যাচটির ওয়ানডে স্ট্যাটাস ছিল না। তাই এবারের জয়টিই দেশের বাইরে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে প্রথম ওয়ানডে জয় বাংলাদেশের। যদিও ঘরের মাঠে কিউইদের টানা সাত ম্যাচ হারানোর রেকর্ড এখনো অটুট আছে বাংলাদেশের। কাজেই ২৪ মে`র জয়ের একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে।

এর বাইরে ওই দিন আরও একটি অধরা কৃতিত্বও ধরা দিয়েছে। ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ে প্রথমবার ছয় নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মত দলকে পেছনে ফেলে এত ওপরে ওঠা যে এক বছর আগেও ছিল শুধুই স্বপ্ন আর কল্পনা। কিন্তু এখন এটাই বাস্তব। বাংলাদেশ ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ে ছয় নম্বর। আর শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ টাইগারদের পেছনে।

এমন এক জোড়া কৃতিত্বই কি ওই ম্যাচের সব? আর কি কিছুই নেই? খালি চোখে হয়তো তাই মনে হবে। তবে ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। গত পরশু (বুধবার) দিনের খেলাটি মাশরাফি বাহিনীর সম্মিলিত পারফরমেন্সের বড় দলিল। বোলিং, ব্যাটিং ও ফিল্ডিংয়ের তিন শাখায় এক সঙ্গে জ্বলে ওঠা এবং বোলারদের পাশাপাাশি ব্যাটসম্যানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভাগাভাগি করে দল জেতানো টিম পারফরমেন্সেরও ম্যাচ।

প্রথমে বোলারদের চেষ্টায় কিউইদের শেষ দিকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়া। এক সময় মনে হচ্ছিল নিউজিল্যান্ডের রান ৩০০ ছাড়িয়ে যাবে। ৪০ ওভার শেষে ব্লাক ক্যাপ্সদের রান ছিল ৪ উইকেটে ২১৭। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো। শেষ ১০ ওভারে মাত্র ৫৩ রান দিয়ে নিউজিল্যান্ডকে ২৭০ এ বেঁধে রাখা। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা আর অনেক দিন পর সুযোগ পাওয়া নাসির হোসেন, তারপর ব্যাটিংয়ে তামিম ইকবাল ও সাব্বির রহমান জুটির অসাধারণ ব্যাটিংয়ে জয়ের পথ খুঁজে পাওয়া ও ঐ পথে হেঁটে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া।

mushfik

কিন্তু আবার এক সময় ক্ষানিক ছন্দ পতন। সাফল্যের আকাশ হঠাৎই কালো মেঘে ছেয়ে যাওয়া। সেখান থেকে মুশফিকুর রহীম আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের হাত ধরে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যাওয়া। ষষ্ঠ উইকেটে দুই ভায়রার অসামান্য দৃঢ়তা ও দায়িত্ব সচেতনতায় টিম বাংলাদেশ পায় স্মরণীয় এক জয়। ৬০ বলে ৭১ রানের পার্টনারশিপটা সোনালি হরফে লেখা হয়ে থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে। এমন এক জয় উপহার দিয়ে দুই ভায়রা এখন জাতীয় বীর।

কিন্তু জানেন, এ ম্যাচটি শুধুই তাদের সাফল্য গাঁথা নয়। এক অতি বড় দায়মুক্তির সনদও। খুব বেশি দিন নয়, ১৪ মাস আগের কথা। ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচে ধোনি-কোহলিদের বিরুদ্ধে জয়ের সুবর্ণ সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। সমালোচকদের ভাষায় বলতে গেলে, এই দুই ভায়রা মানে মুশফিকুর রহীম আর মাহমুদউল্লাহর ব্যর্থতা আর অদূরদর্শি ব্যাট চালনায় নিশ্চিত জয়ের সুযোগ হয়েছিল হতছাড়া।

আসুন স্মৃতির আয়নার দাঁড়িয়ে ঐ ম্যাচটি দেখি। দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ। ভেন্যু বেঙ্গালোরের চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম। স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভর্তি ভারত সমর্থকের গগনবিদারী চিৎকার অকুণ্ঠ সমর্থনের পরও জয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। লক্ষ্য বড় ছিল না তেমন। জিততে দরকার ছিল ১৪৭ রানের। জয় নিশ্চিত করতে শেষ ওভারে টাইগারদের দরকার ছিল মোটে ১১ রানের। হাতে উইকেট ছিল ৫ টি। উইকেটে ছিলেন মুশফিকুর রহীম আর মাহমুদউল্লাহ। ভারতের পেসার হার্দিক পান্ডিয়ার করা ওই শেষ ওভারের প্রথম তিন বলে চলে এসেছিল ৯ রান। মানে শেষ তিন বলে ৫ উইকেট হাতে থাকা অবস্থায় মাত্র ২ রান প্রয়োজন ছিল। চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের কোলাহল, হৈ চৈ, ভারত সমর্থকদের করতালি আর চিৎকার সব থেমে গেল। পুরো স্টেডিয়াম যেন ভুতুরে নগরী। সাড়া শব্দ নেই, সবাই চুপ।

হিসেব ও সমীকরণ যখন একদম হাতের মুঠোয় ঠিক তখনই ধৈর্য হারিয়ে ফেললেন মুশফিকুর রহীম ও মাহমুদউল্লাহ। মাথা ঠাণ্ডা রেখে, বুদ্ধি খাটিয়ে ক্রিকেটীয় শাস্ত্র ও ব্যাকরণ মেনে ব্যাট না করে অতি উৎসাহী ও বেশি আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে নিশ্চিত জয় হাতছাড়া করলেন দুজন। প্রথম ভুল পথে পা বাড়ালেন মুশফিক। স্লো শর্ট বল পেয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। পুল করে বসলেন। তার ভাবনা ও প্রত্যাশার চেয়ে দেরিতে আসা ডেলিভারি ব্যাটের জায়গামত না লেগে চলে গেল ডিপ মিড উইকেটে ওত পেতে থাকা রবীন্দ্র জাদেজার হাতে। ৬ বলে ১১ রান করে সাজঘরে মুশফিক।

তখনো খেলা হাতে। দুই বলে দুই রান, ঠিক এমন অবস্থায় ফুলটচ ডেভিভারি পান্ডিয়ার। লং অফ-লং অন সীমানার ধারে। অনায়াসে ক্রস বা আড়াআড়ি ব্যাটে না খেলে সোজা অফ বা অন সাইডে পুশ করলেও সিঙ্গেলস নেয়া যেত অনায়াসে, অবলীলায়। মাহমুদউল্লাহ সেই সোজা পথে হাঁটলেই কিন্তু ম্যচ টাই হয়ে যায়। কিন্তু তা না করে তার খায়েস হলো ফুলটচ ডেলিভারিকে স্লগ করার। বল গিয়ে জমা পড়লো ডিপ মিড উইকেটে থাকা সেই রবীন্দ্র জাদেজার হাতে। শেষ বলে দুই রান দরকার থাকা অবস্থায় মোস্তাফিজ রান আউট হলে ১ রানের পরাজয় এসে গ্রাস করে।

mahmudullah

২০১২ সালে এশিয়া কাপের ফাইনালে প্রায় একই অবস্থা থেকে হারের পর আরও একটি বিগ ম্যাচ জেতার সুবর্ণ সুযোগ হলো হাতছাড়া। যেখানে দলকে জয়ের বন্দরে ভিড়িয়ে নায়ক হবার কথা, সেখানে তীরে এসে তরী ডুবিয়ে উল্টো খলনায়ক বনে যান দুই ভায়রা মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ। সৌরভ গাঙ্গুলিসহ ভারতের অনেক সাবেক তারকাই ঐ ম্যাচে বাংলাদেশের হারকে বিস্ময়কর বলে মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ ভক্ত ও সমর্থকদের মনে ঐ ম্যাচ হারার স্মৃতি ঠিক কাটা হয়ে বিধে আছে। এখনো সবচেয়ে দুঃখজনক হারের প্রসঙ্গ আসলেই ঐ ম্যাচের কথা ওঠে। ‘হোয়াংহো নদী যদি হয় চীনের দুঃখ, তাহলে ২৩ মার্চ বেঙ্গালোরে ভারতের কাছে জয়ের দোরগোড়ায় হারা ম্যাচটিও বাংলাদেশের ভক্ত-সমর্থকদের দুঃখ হয়ে আছে।

সেই সঙ্গে অনেক ব্যক্তিগত ও দলগত সাফল্যর রূপকার দুই ভায়রা মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ এতকাল ‘ভিলেন’ হয়েই ছিলেন। অবশেষে সেই দায়মুক্তি ঘটলো পরশু বুধবার। যেখানে দুই ভায়রার হাত ধরেই ধরা দিল দারুণ এক জয়। জিততে দরকার ছিল ২৭১ রানের। ৭ রানে উদ্বোধনী জুটি ভাঙার পর তামিম ইকবাল (৬৫) ও সাব্বির রহমান রুম্মনের (৬৫) ১৩৬ রানের পার্টনারশিপেই জয়ের পথ খুঁজে পাওয়া।

তবে ২৭ ওভারে ১৪৩ রানে যখন এই জুটি ভাঙলো তখন মনে হলো বাংলাদেশ বেশ সহজেই লক্ষ্যে পৌঁছাবে। কিন্তু তারপর আবার ছন্দপতন। ১৪৮ রানে তৃতীয়, ১৬০ এ চতুর্থ আর ১৯৯ রানে পঞ্চম উইকেটের পতন। তামিম, সাব্বির, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত আর সাকিব আল হাসানের ফিরে যাওয়া।

শেষ ৭০ বলে দরকার পড়লো ৭১ রানের। কি হয়, তা দেখার জন্য সমর্থকদের উন্মুখ অপেক্ষা। এরকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় হাল ধরলেন সেই দুই ভায়রা। যেন পণ করেই নামা, ১৪ মাস আগের সেই না পারার দায়মুক্তি ঘটাতেই হবে আজ। মুশফিক ৪৫ বলে ৪৫ (তিন বাউন্ডারি ও এক ছক্কা) অসীম সাহস, প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস আর অবিচল আস্থার মিশেলে লড়াই শুরু। এবার আর ধৈর্য হারিয়ে, অহেতুক চার ও ছক্কা হাকাতে গেলেন না। দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের সর্বোচ্চ তাগিদ থেকে ব্যাট করলেন। দুজন দুরকম অ্যাপ্রোচে ব্যাট করলেন। মুশফিক বল পিছু রান তুলে একদিক আগলে রাখার কাজটি করলেন বিশ্বস্ততার সঙ্গে। আর ভায়রা মাহমুদউল্লাহ অন্য প্রান্তে কিছু সাহসী শট খেলে ৩৬ বলে অপরাজিত ৪৫ রানে। ৭১ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটির ওপর ভর করে শেষ পর্যন্ত ১০ বল আগে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে গেল বাংলাদেশ।

দায়িত্ব ও সচেতনতার অনুপম প্রদর্শনীতে ম্যাচ জেতানো ভূমিকার পুরস্কার হিসেবে ম্যাচ সেরা হলেন মুশফিক। জয়ের মাহেন্দ্রক্ষণে দুই ভায়রার সে কি আনন্দ! উচ্ছ্বাস আর বাঁধভাঙ্গা বিজয় উল্লাস। এ উৎসব ও আনন্দ শুধুই দল জেতোনোর আনন্দে নয়। এ উল্লাস নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ রাখতে পারার। `আমরা দল জেতাতেও পারি। ক্ষণিকের ভুলে এর আগে ভারতের মাটিতে ধোনি, কোহলি, রবীন্দ্র জাদেজা আর অশ্বিনদের হারাতে পারিনি। দুটি সিঙ্গেলস যেখানে দলকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মত বৃহৎ আসরে অবিস্মরণীয় জয় এনে দিতে পারতাম, সেখানে অযথা-অপ্রয়োজনে বিগ শট হাঁকাতে গিয়ে নিশ্চিত জয় হাতছাড়া করেছিলাম। সেই না পারা ও ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার কিউইদের বিরুদ্ধে দৃঢ় সংকল্প আর বুদ্ধি খাটিয়ে ব্যাট চালিয়ে জয়ের বন্দরে।’

এটা শুধু যে মুশফিক আর মাহমুদউল্লাহ দুই ভায়রার দায়মুক্তির দলিল, তা নয়। টাইগাররা যে দিনকে দিন উন্নতি করছে, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচ জেতানো শিখছে, তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: