সর্বশেষ আপডেট : ৮ মিনিট ৩৩ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১৭ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

রফতানি বন্ধ রেখে দেশের মানুষকে সাশ্রয়ী মূল্যে ইলিশ খাওয়ার সুযোগ করে দিন

12 April 2017_pic 014এস এম মুকুল ::

বাংলা নববর্ষ বরণের সঙ্গে পান্তা-ইলিশের একটা সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছে আমাদের সংস্কৃতিতে। মার্চ মাস থেকেই পান্তা-ইলিশ সংস্কৃতির বাঙালিরা বর্ষবরণের উদ্দেশ্যে ইলিশ কিনে ফ্রিজে ভরে রাখতে শুরু করেন। এই সুযোগে মুনাফালোভীরা ইলিশের বাজারে চড়াদামে তা বিক্রি শুরু করে। খবরে প্রকাশ, পাইকাররাও ইলিশ পাচ্ছেন না-কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। চার হাজার টাকা কেজি দরে ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে! বৈশাখে ইলিশ খাওয়া না খাওয়া নিয়ে বিতর্ক আছে। কারো মতে, বৈশাখে ইলিশ লাগবেই। কেউ বলছেন, ইলিশ বৈশাখী সংস্কৃতির অংশ নয়। ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং জাতীয় সম্পদ। বিশেষ উৎসবে সাধ্য অনুযায়ী যে কেউ ইলিশ খেতেই পারেন।

ইলিশ বাংলা নববর্ষ সংস্কৃতির ঐতিহ্য না হলেও বর্তমানে বাংলা বর্ষবরণে ইলিশ নব ঐতিহ্য হিসেবে একটি জায়গা করে নিয়েছে-এ কথা অস্বীকার করারও উপায় নেই। তবে বৈশাখী উৎসবে পান্তা-ইলিশ খেতেই হবে, তা অনেকেই মানতে নারাজ। প্রথমত, বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সঙ্গে ইলিশ খাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয়ত, ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময়ে আমাদের ইলিশপ্রীতি জাতীয় ক্ষতির কারণ যেন হয়ে না দাঁড়ায়। ইলিশ প্রজনন, আহরণ, জাটকা নিধন বন্ধ করা, ইলিশ বড় হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের নাগরিক দায়িত্ব অবশ্যই পালনীয়। তা না হলে মৌসুমে আমরা পর্যাপ্ত ইলিশ নাও পেতে পারি। নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত ইলিশ ছোট থাকে। এই সময়ে জাটকা ধরা আইনত দ-নীয় অপরাধ। অথচ বৈশাখ সামনে রেখে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ জাটকা মাছ ধরা হয়। অসময়ে এভাবে ইলিশ মাছ খাওয়ার উৎসব চলতে থাকলে ইলিশের সার্বিক মজুদে প্রভাব পড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রীতি জনপ্রিয় হলেও বাঙালির বর্ষবরণের সংস্কৃতির সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র নেই। বলতে দ্বিধা নেই, নববর্ষে পান্তা-ইলিশ বাণিজ্যিক এবং হুজুগে বাঙালি সাজার প্রবণতা ছাড়া কিছুই নয়। শহুরে ভোজনবিলাসীরা ইতোমধ্যে ইলিশ দিয়ে ফ্রিজ ভর্তি করেছেন। এই সুযোগে আকাশচুম্বী হয়েছে ইলিশের দাম। দশ হাজার, বিশ হাজার টাকায় বাড়তি মূল্যে যারা ইলিশ কিনছেন, তারা কি জানেন এই টাকায় পাঁচ সদস্যের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাস চলে যায়। হয়তো তারা এভাবে কখনো ভেবে দেখেননি। তারা এও ভেবে দেখেন না- এক মণ ধান উৎপাদন করতে একজন কৃষকের কতটা ঘাম ঝরে। এক কেজি সবজি উৎপাদন করতে কৃষকের কত টাকা খরচ পড়ে। অথচ এই বৈশাখ উদ্যাপন করার কথা ছিল বাংলার কৃষকের। যারা আয়েশ করে ইলিশ-পান্তা, ইলিশ পোলাও, শর্ষে ইলিশ ইত্যাদি পেটপুরে খাবেন তারা হয়তো জানেন না, এ সময় বাংলার কোনো কোনো কৃষক পরিবারের পান্তার সঙ্গে একটুখানি শুঁটকি ভর্তা অথবা পেঁয়াজ আর মরিচ পোড়া জোটাতেও কষ্ট হবে। মূলত পান্তা-ইলিশ একটি আরোপিত সংস্কৃতি। এই বিলাসিতার সঙ্গে বাঙালির নববর্ষ উদ্যাপনের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা যখন পান্তা-ইলিশ নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছি, তখন সুযোগ বুঝে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ইলিশের গলাকাটা দাম নিচ্ছে। মৌসুমের বড় বড় ইলিশগুলো জাটকা অবস্থাতেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এর খেসারত আমাদেরই দিতে হবে। মৌসুমে আমরা পর্যাপ্ত ইলিশ থেকে বঞ্চিত হব। ইলিশ রফতানি থেকে আয় কমে আসবে। তারপরও কি এই দিনে ইলিশ খেতেই হবে?

চৈত্র-বৈশাখ ছিল বাংলা চিরায়ত খরার মাস। এ সময় তেমন কোনো ফসল হতো না। কৃষকের অর্থকষ্ট বেড়ে যেত। বাংলা নববর্ষ হালখাতা, অষ্টমী, চৈত্রসংক্রান্তি ইত্যাদির কেন্দ্রবিন্দু বাংলার কৃষক ও গ্রামীণ বাংলার আবহমান সংস্কৃতির আভিজাত্য। তাদের পক্ষে এই সময়ে ইলিশ কিনে খাওয়ার প্রশ্নই ছিল না। নববর্ষে গ্রামে কৃষাণিরা আগের রাতে নতুন পাত্রে কাঁচা আমের ডাল ও চাল ভিজিয়ে রাখতেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে কৃষক সেই চাল-পানি খেয়ে কাজে নেমে পড়তেন। পান্তাও খেতেন বটে। তবে তা ইলিশ ভাজা দিয়ে নয়। কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে। কখনো কখনো শুঁটকি, বেগুন ভর্তা, আলু ভর্তাও থাকত পান্তার সঙ্গে। কাজেই আজকের ইলিশ সংস্কৃতি আমাদের আদি বাঙালি গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ নয়। তারপরও সত্যি হলো- বাঙালির দেশপ্রেম যতখানি, ইলিশপ্রেম তার চেয়ে ঢের বেশি! আজকাল বাঙালির বর্ষবরণ যেন ইলিশ ছাড়া হয় না। ওপার বাংলায় জামাইষষ্ঠীতে ইলিশ লাগবেই। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় এক কোটি বাঙালিও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ইলিশ খেতে ভোলেন না। আহারে বৈশাখে ইলিশের বাহারে!!

গবেষণা থেকে জানা যায়, ইলিশে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড-যা মানুষের দেহের রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা ও ইনসুলিনের লেভেল কমায়, হৃদরোগ উপশম করে। ইলিশে আছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহসহ বিভিন্ন খনিজ পদার্থ। যার তেলে আছে ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ডি’। দেশের প্রায় ১০০টি নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যায়। একদা বিখ্যাত পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, গড়াই, চিত্রা ও মধুমতী নদীতে বিপুল পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যেত। এখন শুষ্ক মৌসুমে ইলিশ মাছ পাওয়া যায় না। তবে অভয়াগ্রম করায় বর্তমানে পদ্মা নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতা বেড়েছে। পান্তা-ইলিশ এখন শহুরে বাঙালি সংস্কৃতির একটি অংশ। আর হিন্দুদের পুজোয় চলে শর্ষে ইলিশ। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ ভারত আর পাকিস্তানেও জনপ্রিয়। ইলিশের জীবনের অধিকাংশ সময় কাটে সাগরে। কিন্তু ডিম পাড়ার আগে ইলিশ মাছ ১২শ’ কিলোমিটার সাঁতরে নদীর মিঠা পানিতে আসে। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটসহ উপকূলের ১৬ জেলায় সমুদ্রগামী প্রায় সাত লাখ জেলেদের জীবন ইলিশনির্ভর। ২০-২৫ লাখ লোক পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, রফতানি ইত্যাদি কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। ইলিশ সুস্বাদু, সুঘ্রাণ ও কাঁটাযুক্ত মাছ। অক্টোবর ও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসকে ইলিশের প্রজনন মৌসুম ধরা হয়। পদ্মার ইলিশ স্বাদে সেরা হিসেবে সুখ্যাত। চাঁদপুরের ইলিশের জুড়ি নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চাঁদপুরের ইলিশের চাহিদা আকাশচুম্বী। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ইলিশ মাছ ভারত থেকে ভারতীয় ইলিশের স্টিকার লাগিয়ে বিদেশে রফতানি করা হয় বলেও জানা গেছে! সম্প্রতি চাঁদপুর জেলাকে ইলিশের বাড়ি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ।

বিদেশি রাষ্ট্রীয় অতিথিরা বাংলাদেশের ইলিশের প্রশংসা করেন। ভালো খবরটি হচ্ছে, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ১২ শতাংশ আসে জাতীয় মাছ ইলিশ থেকে, যার অর্থমূল্য আনুমানিক সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। উৎপাদিত ইলিশের সামান্যই রফতানি করে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। সরকারের নানামুখী উদ্যোগের কারণে ১০ বছরে ইলিশের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর প্রজননকালীন নিষেধাজ্ঞা থাকায় কমপক্ষে দেড় কোটি মা ইলিশ আহরণ থেকে রক্ষা পায়। এর থেকে প্রায় ৪৭ হাজার কেজি ডিম প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন হয়, যা থেকে শতকরা ৫০ ভাগ হিসাবে প্রায় ৩০ হাজার কোটি রেণু উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে শতকরা মাত্র ১০ ভাগ রেণু আহরণ থেকে রক্ষা পলেও তিন হাজার কোটি ইলিশের উৎপাদন বাড়ে। আশার খবরটি হচ্ছে, ইলিশের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইলিশের উৎপাদন, আকার ও বিচরণ ক্ষেত্রে পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। এক কেজি গড় ওজনের ইলিশ মাছ বাংলাদেশে ফিরতে শুরু করেছে। মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশ বাংলাদেশে ধরা পড়া ১৭ হাজার ইলিশের ওপর গবেষণা চালিয়ে এ তথ্য দিয়েছে।

গত কয়েক বছরে পদ্মা ছাড়াও সারা দেশেই সুরমা-কুশিয়ারার আশপাশের বড় বড় বিল ও হাওর এলাকা থেকেও ইলিশ ধরা পড়ার খবর পাওয়া যায়। এটা নিঃসন্দেহে সুখবর। মাছবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইলিশ পাওয়া যায় বিশ্বের এমন ১১টি দেশের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই ইলিশের উৎপাদন ক্রমাগত বাড়ছে বাকি ১০টিতেই ইলিশের উৎপাদন কমছে। বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে।

পরিশেষে বলতে হয়, ইলিশ বাংলা নববর্ষে খাওয়া না খাওয়া যার যার নিজস্ব বিষয়। জাতীয় মাছ ও জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষার এবং অর্থনৈতিক বিকাশে ভূমিকা রাখার দায়িত্ব সবার। বাংলাদেশ সরকার আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ইলিশ রফতানি বন্ধ রেখে দেশের জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে ইলিশ খাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার কথা ভাবতে পারে। ইলিশে সমৃদ্ধ হোক বাংলাদেশ-এটা আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম গবেষক

writetomukul36@gmail.com

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: