সর্বশেষ আপডেট : ১ মিনিট ১৬ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৫ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আতিয়া মহলে ভাড়াটেদের ফিরে যাওয়ার আনন্দ ও সব হারানোর আর্তনাদ

12 April 2017_pic 005নিজস্ব প্রতিবেদন ::
দক্ষিণ সুরমার জঙ্গি আস্তানা ‘আতিয়া মহল’ বিস্ফোরকমুক্ত ঘোষণার ১৮ ঘন্টা পর বাড়িটি ভনের মালিক ও ভাড়াটেদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে পুলিশ। ভবন বুঝে পাওয়ার পর জঙ্গিবিরোধী অভিযানের ১৮ দিনের মাথায় ভবন মালিক উস্তার মিয়া ভাড়াটেদের সাথে নিয়ে আতিয়া মহলের ভেতরে প্রবেশ করেন। ওই সময় পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ভাড়াটেদের কাছে মালামাল বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডোদের অভিযানে সে দিন এক কাপড়ে বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া ভাড়াটেদের অনেককে নিজেদের রেখে যাওয়া মূল্যবান জিনিসপত্র বোমা আর গুলির আঘাতে নষ্ট হয়ে গেছে দেখে চোখের পানি মুছতে দেখা গেছে। এর মধ্যে কেউ কেউ নগদ অর্থ ও সোনা খোয়া যাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০ টার সময় পুলিশ তালিকা অনুযায়ী আতিয়া মহলের ২৮ পরিবারের মধ্যে এ মালামাল হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করে। বেলা পৌনে ১২টার দিকে ওই মালামাল বুঝিয়ে দেওয়া শেষ হয়। তবে ভাড়াটেদের অধিকাংশ মালামালই বোমা আর গুলির আঘাতে নষ্ট হয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন মালামাল বুঝে পাওয়া বাসিন্দারা। মালামাল বুঝে পাওয়ার পর ভাড়াটেরা এগুলো অন্যত্র নিয়ে যেতে দেখা যায়।
12 April 2017_pic 013একদিকে স্বস্তি-আনন্দ, অন্যদিকে কান্না-আর্তনাদ। স্বস্তি, দীর্ঘ উৎকণ্ঠা শেষে নিজেদের ঘরের আসবাবসহ মূল্যবান জিনিস ফিরে পাওয়ার। আর্তনাদ, সবকিছু হারিয়ে ফেলার। নিচতলায় যারা বসবাস করতেন তাদের সব কিছুই আগুনে ও বোমায় পুড়ে গেছে।
গতকাল সকালে নগরীর শিববাড়ি এলাকার আতিয়া মহলে গিয়ে দেখা মিলে এমন বিপরীতমুখী দৃশ্যের। ফ্ল্যাটে ঢুকে অনেকে ফিরে পান নিজেদের সবকিছু, আবার অনেকে দেখেন কিছুই নেই। সব ছারখার হয়ে গেছে।
ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের কর্মকর্তা সাহানা বেগম আতিয়া মহলের ৩য় তলায় ১৩ নাম্বার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। স্বর্ণালংকার রাখা ছিল তাঁর ঘরের মধ্যে। ১৮ দিন পর গতকাল নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখেন স্বর্ণালংকার নেই। নেই মূল্যবান কোনো জিনিসপত্রই। নিজের ফ্ল্যাটের নিঃস্ব অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাহানা। বলেন, আমি একেবারে শেষ হয়ে গেলাম। আমাকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।
দ্বিতীয় তলায় গিয়েও শোনা যায় এমন আর্তনাদ। এই তলার ১১ নম্বর ফ্ল্যাটের বাসিন্দা গৃহিণী শিরীন আক্তার। কাঁদতে কাঁদতেই বলেন, আমার কোনো জিনিস পাইনি। ফ্রিজ-টিভি সব সব ধ্বংস হয়ে গেছে। বিছানার তোশকের তলা থেকে নগদ ৩৮ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। মাটির ব্যাংক ছিল, সেটা কেটেও টাকা নিয়ে গেছে। মানিব্যাগ ফ্লোরে পড়ে আছে, কিন্তু ভেতরে কোনো টাকা নেই। প্রায় তিন ভরি স্বর্ণালঙ্কার ছিল এগুলোও নেই। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি।
পুরো ভবনটি যেনো একটি পোড়াবাড়ি। পুড়ে কালচে হয়ে গেছে বেশিরভাগ দেওয়াল। অনেক দেওয়ালই ভাঙা। দেওয়ালজুড়ে গুলি-বিস্ফোরণের ক্ষত, পুড়ে গেছে বৈদ্যুতিক পাখা, ফ্রিজ, টিভির মতো বৈদ্যুতিক সামগ্রী। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ভবনটির নিচ তলার বাসিন্দারা। নিজ তলার একটি ফ্ল্যাটেই ছিল জঙ্গিরা। এই তলার অন্য পাঁচ ফ্ল্যাটের ভাড়াটেরা নিজেদের বাসায় ঢুকে প্রায় কিছুই পাননি। সবকিছু ঝাঁঝরা হয়ে গেছে।
নিচতলার ভাড়াটেরা পিয়ালী চৌধুরী বলেন, আমার বাসায় তো কিছুই অবশিষ্ট নেই। কেবল ছাই আর আসবাবপত্রের পুড়ে যাওয়া অংশ বিশেষ পড়ে রয়েছে।
নিচতলায়ই পরিবার নিয়ে থাকতেন পশুচিকিৎসক শ্যামসুন্দর ঘোষ। তিনি বলেন, সারা জীবন রোজগার করে যা কিছু গড়েছিলাম তার সব শেষ হয়ে গেছে। কিছুই পাইনি। বাকি জীবন রোজগার করেও আর এগুলো গড়া যাবে না।
তবে উপরের তলার ফ্ল্যাটগুলোতে থাকা বাসিন্দারা অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তাদের অনেকেই নিজের আসবাবপত্রসহ মূল্যবান জিনিস ফিরে পেয়েছেন। দীর্ঘদিন পর অনেক শঙ্কা শেষে এগুলো ফিরে পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন তাঁরা।
চতুর্থ তলার ভাড়াটে রবিউল ইসলাম বলেন, আমি আমার বাসায় সবকিছু পেয়েছি। তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। আমি খুবই খুশি, সকলকে কৃতজ্ঞতা জানাই।
সকালে নিজ ফ্ল্যাটে ঢুকে বৈদ্যুতিক সামগ্রী ছাড়া বাকি সব জিনিসপত্র ফিরে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন ৪র্থ তলার বাসিন্দা অঞ্জু দেব। তিনি বলেন, আমরা তো অনেকটা আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। এতো কাহিনির পর এগুলো ফিরে পাব বুঝিনি। এখন সব ফিরে পাওয়ায় খুব ভালো লাগছে।
গতকাল সকাল থেকেই ভাড়াটেরা নিজেদের আসবাবপত্র আতিয়া মহল থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া শুরু করেন। অনেকেই এর মধ্যে খুঁজে নিয়েছেন নতুন বাসা।
সিলেট মহানগর পুলিশের মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খায়রুল ফজল বলেন, গত সোমবার বিকেলে র‌্যাব অভিযান শেষে ভবনটিকে ঝুঁকিমুক্ত ঘোষণার পর আজ (গতকাল) আমরা তালিকা দেখে সকল ভাড়াটেকে ভেতরে পাঠিয়েছি। তাদের নিজেদের ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিয়েছি। তিনি বলেন, ভবনটি বিধ্বস্ত থাকায় এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এখনই কেউ এখানে থাকতে পারবেন না। তা নিজেদের মালপত্র নিয়ে যেতে পারবেন।
অনেকের টাকাপয়সা ও স্বর্ণালংকার খোয়া যাওয়া প্রসঙ্গে খায়রুল ফজল বলেন, নিচতলায় তো আর কিছু পাওয়ার কথা নয়। তবে উপরের তলাগুলো থেকে কিছু খোয়া যাওয়ার সুযোগ নেই। এমন প্রশ্ন উঠতে পারে ভেবে আমি এখন পর্যন্ত ভবনের ভেতরে কোনো পুলিশ ঢুকতে দিইনি। র‌্যাব ভবনটি বুঝিয়ে দেওয়ার পরই ভাড়াটেদের ডেকে এনেছি। তারা মালামাল সরিয়ে নেওয়ার পর আমরা ঢুকব। তিনি বলেন, তারপরও কারো কিছু হারিয়ে গেলে আমাদের জানাতে পারেন। আমরা খুঁজে দেখব।
ভবনের স্বত্বাধিকারী উস্তার মিয়া বলেন, অনেকে আমার কাছেও ঘরে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে আমার কী করার আছে? আমি নিজে তো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
গত ২৩ মার্চ দিনগত রাত আড়াইটায় এই আতিয়া মহলে জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে পুলিশ ভবনটি ২৪ মার্চ পর্যন্ত ঘিরে রাখে। এর পর ২৫ মার্চ সকাল থেকে ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ নাম দিয়ে অভিযানে নামেন সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডোরা। প্রথমে আতিয়া মহলে আটকে পড়া ২৮ টি পরিবারের ৭৮ জন সদস্যকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। পরে শুরু হয় জঙ্গিবিরোধী অভিযান।
২৮ মার্চ অভিযান শেষে চার জঙ্গি নিহতের খবর জানায় সেনাবাহিনী। অভিযানের মধ্যেই গত ২৫ মার্চ আতিয়া মহলের বাইরে বিস্ফোরণে র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রধান ও দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৭ জন নিহত হন। আহত হন আরও ৪৫জন।
সেনা অভিযানে নিহত চার জঙ্গির মধ্যে দুজনের লাশ অভিযানকালে উদ্ধার করা গেলে অবশিষ্ট দুই জঙ্গির লাশে আত্মঘাতী বোমা অপসারণ করে ‘অপারেশন টোয়াইলাইট’ শেষ হওয়ার ছয় দিনের মাথায় র‌্যাবের বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ‘অপরাশেন ক্লিয়ারিং আতিয়া মহল’ শুরু দিনই অপর দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে।
‘আতিয়া মহলে’ র‌্যাব সদর দপ্তরের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ও ডগ স্কোয়াড দলের সদস্যরা গত সোমবার (৩ এপ্রিল) থেকে ভবনটির ভেতরে আর কোনো বোমা পড়ে থাকলে সেগুলো খুঁজে বের করে নিষ্ক্রিয় করে ভবনটিকে ঝুঁকিমুক্ত করতে অভিযান চালায়। গত সোমবার সাতদিন ধরে চলা অপরেশন ক্লিয়ারিং আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করে র‌্যাব। এর পর আজ মঙ্গলবার ভাড়াটেদের কাছে বাসার মালামাল বুঝিয়ে দেওয়া হল।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: