সর্বশেষ আপডেট : ২৬ মিনিট ৫১ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৬ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বদরুলের সাজা ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

11march2017-pic-023তাওহীদুল ইসলাম ::
বহুল আলোচিত খাদিজা-বদরুল নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। পক্ষে-বিপক্ষে মতামত আসছে, আসবে। আমিও কিছু ব্যক্তিগত কথা বলে নিতে চাই। আপনি একটু পিছনে ফিরে তাকান। তাকান সেই ভিডিওটির প্রতি। যে ভিডিও ফুটেজে উঠে এসেছিল খাদিজাকে নির্মমভাবে কোপানোর দৃশ্য। সেই দৃশ্যে চোঁখ রেখে মনকে প্রশ্ন করুন, বিবেককে জিজ্ঞেস করুন, একজন মানুষ অন্যএকজন মানুষকে কোপাচ্ছে, আপনার হ্রদয় তখন কি করে? আরো কাছে গিয়ে প্রশ্ন করুন আমার বোনকে একটি ছেলে কোপাচ্ছে, আপনার মন তখন কি করে? চিন্তা করে দেখুন যখন ঘটনাটা ঘটেছিল, যখন খাদিজা শরীর ক্ষত বিক্ষত, তখন আপনার মনোভাব কি ছিল?

আর আজ যখন খাদিজা অনেকটা সুস্থ্য অবস্থায় তার উপর নৃশংস হামলার রায় হয়েছে তখন আপনার কি মনোভাব? নিশ্চয়ই মনোভাবে অনেক তফাৎ ধরেছে। তখন বলছিলেন ইয়া মাবুদ, আর এখন বলছেন হায় হায় এ কেমন রায় হলো?

আসলে আমরা অনেকটা আবেগী জাতি। যখন যা ঘটে তার উপরই আমরা আবেগপ্রবণ হয়ে কথা বলি, সিদ্বান্ত গ্রহণ করি। ঘটনার সময় যাদের খাদিজার জন্য কান্না দেখেছি, আহাজারি দেখেছি, তাদের কেউ কেউ আজ বদরুলের জন্যও মায়াকান্না দেখাচ্ছেন। অনেকেই বিভিন্ন যুক্তি দেখাচ্ছেন। অনেকে সেটাতে সমর্থন করছেন, আবার কেউ কেউ তর্কও করছেন।

কেউ কেউ বলছেন বদরুল একা দোষী নয়, খাদিজাও দোষী। হ্যা খাদিজা দোষী, খাদিজা দোষী, মানলাম। কিন্তু কি দোষ খাদিজার? খাদিজা বদরুলের সাথে প্রেম করেছে? খাদিজা বদরুলকে চা বানিয়ে খাইয়েছে? খাদিজা বদরুলের সাথে ছবি তুলেছে? খাদিজা বদরুলের সাথে ঘুরতে গিয়েছে? মানলাম এর সবই করেছে।
অত:পর বদরুলের সাথে খাদিজার মান অভিমান হয়েছে। খাদিজা বদরুলের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় না, খাদিজা বুঝতে পারলো বদরুলের সাথে সারা জীবনের সম্পর্ক মেনে নিতে পারছে না তাই সে দূরে সরে গিয়েছে। তাই বলে কি একটি মানুষকে এভাবে কোপাতে হবে?

এ কোপানোর অধিকার কে দিল? কোন প্রেম বিদ্যা সে অধিকার দিল? পৃথিবীর কোন প্রেম কাহিনীতে এমন ঘটনার স্বাক্ষী আছে? না এমন নেই। প্রচলিত ধারণায় প্রেম করার অধিকার যেমন আছে ঠিক তেমনি তা প্রত্যাখ্যান করার অধিকারও আছে। প্রেমে ব্রেক-আপ করার কাহিনী আমরা জানি কিন্তু ব্রেক আপ হলে কোপানোর কাহিনী আমরা জানি না। প্রেমের ক্ষেত্রে আমরা এটাও জানি, জোর করে কোন কিছু আদায় করা যায় না, সেটা ছেলে কিংবা মেয়ে উভয় ক্ষেত্রেই সমান। প্রচলিত ধারণায় প্রেম যেমন আনন্দ আছে – তেমনি বেদনাও আছে। মন ভাঙ্গলে যে মাথা ভাঙ্গতে হবে এমনতো কোথাও নেই।

আমি মনে করি প্রেম করার অধিকার সবারই আছে। আর তা মনে করে একে অন্যকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। সাধারণত বেশিরভাগ ছেলেদের পক্ষ থেকেই মেয়েদের কাছে প্রেমের প্রস্তাব যায়, মেয়েদের কাছ থেকে যে আসে না তা কিন্তু নয়, হয়তো সেটা সংখ্যায় কম হতে পারে।

আমি যদি প্রেমের বিষয়টি একটু গভীরে নিয়ে চিন্তে করি তখন দেখি আমরা অনেকেই প্রেম করতে চাই, কিন্তু আমার কেউ করুক তা আমরা চাই না। একবার আমার এক পরিচিত ভাই আমাকে বললেন, ভাই একটা প্রেম করবো। আমি বললাম, বাজারি প্রেম না করে কাউকে ভাল লাগলে তাকে চেষ্টা করে দেখো। কয়েকদিন পর বললো ভাই করে নিয়েছি একটা, আমি বললাম কেমনে? বললো, এইতো পরিচিত একজনকে বলেছিলাম সে নাম্বার দিয়েছে কথা বলে বলেই প্রেম! এখানে ভাল লাগা, মন্দ লাগার বিষয় নয় একটা মেয়ের সাথে কথা বলতে পারলেই হলো, প্রেম জমে গেল। যেই ছেলেটি কোন একটা মেয়ের সাথে কথা বলে দেখে না দেখে প্রেমের খেলায় মেতে ওঠে সেই ছেলেটি তার বোনের সাথে অন্য একটি ছেলের সম্পর্কের কথা শুনে সেই ছেলেটিকে মানুষ দিয়ে পিঠিয়েছিল। সে অন্য ছেলের বোনের সাথে প্রেম করতে পারবে তবে তার বোনের সাথে কেহ প্রেম করতে পারবে না, প্রেমের অধিকার ছেলে হিসেবে শুধু তাঁর কিন্তু প্রেমের অধিকার মেয়ে হিসেবে তার বোনের নয়। অর্থ্যাৎ আমার জন্য সাতাশ গুণ মাফ তুমার জন্য এক গুণও নয়, বড়ই স্যাকুলার সমাজ। নিজের প্রেমের অধিকার আছে কিন্তু বোনের নেই।

এবার আসি আবারে খাদিজা বদরুল প্রসঙ্গে। খাদিজার সাথে বদরুলের যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল তা কিন্তু প্রমাণিত নয়, বদরুল খাদিজার বাড়িতে থাকতো লজিং মাস্টার হিসাবে খাদিজা বদরুলের কাছে লেখাপড়া করতো, লেখাপড়া করতে গিয়ে একটু মন দেয়া-নেয়া হয়ে যেত পারে। সেই সুবাধে ধরে নিলাম তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এক পর্যায়ে মান-অভিমানের কারণে খাদিজা সে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছেন বা দিতে চাইছেন তাই বলে কি এটার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে একটা মানুষকে এভাবে হত্য করার উদ্দ্যেশ্য কোপাতে হবে? না তা হতে পারে না। এমন মেনে নেয়া যায় না। খাদিজার জায়গায় আয়নার সামনে নিজের বোনের ছবি বসিয়ে একটু কল্পনা করে দেখুন আর ভাবুন আপনার বোন একটি ছেলের সাথে সম্পর্ক করেছিল, পরিবারের চাপে অথবা যে কোন কারণে আপনার বোন সেই ছেলের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন।কিন্তু সেই ছেলেটি তা মেনে নিতে না পারে আপনার বোনের উপর হামলা করে তার সুন্দর জীবনটা নষ্ট করে পঙ্গু করে দিয়েছে। ভাই হিসেবে আপনার তখন কি করণীয়? বোনের বিচার চাইতে গিয়ে যাবজ্জীবন সাজা পেলে আপনি কি সন্তুষ্ট থাকতেন না কি ফাঁসির দাবি জানাতেন? প্রশ্ন আপনার কাছে রাখলাম উত্তরও আপনার। অনেকেই এখানে প্রশ্ন তুলেছেন, বদরুল সৃষ্টি করেছে খাদিজারা। সে কারণে খাদিজারও শাস্তি পাওয়া উচিত। ৩ অক্টোবর বদরুলের কাছ থেকে খাদিজা কী কম শাস্তি পেয়েছিল? বদরুলের মন ভাঙ্গার কারণে তার কী এমন শাস্তি প্রাপ্য ছিল?

বাংলা সাহিত্যর এক দিকপাল হুমায়ূন আহমেদ তো বলে গিয়েছেন, পৃথিবীতে সব ধরণের বিচার হয় কিন্তু মন ভাঙ্গার বিচার হয় না। এমন তো কোন আইন নেই! আইন হচ্ছে ভালবাসার মানুষকে না পেলে তার পথ চেয়ে সারা জীবন অপেক্ষা করে যাওয়া। বদরুল সেটা করতে পারতেন। হয়তোবা খাদিজাও বদরুলের কাছে ফিরে আসতো। আর এখানে বদরুলের যে রায় হয়েছে সেটা হয়েছে খাদিজার উপর নির্মম পৈশাচিক হত্যার উদ্দ্যোশ্যে হামলার বিচার। এখানে বদরুলের মন ভাঙ্গার বিচার হয়নি।

আদালতে বদরুলের যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ রায়কে সাধুবাদ জানাই। আশা করি এক বদরুলের শিক্ষা থেকে অনেক বদরুল শিক্ষা নিবে- অনেক খাদিজা শিক্ষা নিবে।

লেখক: সম্পাদক সাপ্তাহিক অপূর্ব সিলেট।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: