সর্বশেষ আপডেট : ১০ মিনিট ২ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১০ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বাংলাদেশীরাই অর্জন করল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

dsnewspic20feb17_013ধীরাজ কুমার নাথ ::
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির চরম আত্মোৎসর্গের চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশের মানুষ অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছে বাংলাভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার এক মহান ব্রতে। ভাষার এ দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল আমাদের স্বাধিকারের আন্দোলন, তারই প্রেক্ষাপটে পরিচালিত হল সশস্ত্র সংগ্রাম, অর্জিত হল আমাদের স্বাধীনতা। অবশেষে বাংলাদেশীরাই সফল হল একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।

এ হচ্ছে এক বিশাল ঐতিহাসিক অর্জন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করে, তখন এ দিবসের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট আলোচনা করতে গিয়ে উঠে আসে সালাম, রফিক, সফিউল, বরকতের নাম। আলোচিত হয় সেসব ভাষা সৈনিকের নাম, যারা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’-এর আন্দোলন শুরু করে পাকিস্তানিদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।

প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে, যখন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত ২৯নং সাব রুলসে উল্লেখিত উর্দু ভাষার পাশাপাশি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শাসনতন্ত্রে সংযোজনের জন্য দাবি করেন।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সভায় সভাপতিত্ব করছিলেন। কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন এভাবে ,I knwo Sir, that Bengali is a provincial language, but so far our state is concerned, it (Bengali) is the language of the majority of the people of the state (State of Pakistan). So although, it is a provincial language, as it is a language of the majority of the people of the state and it stands as a different footing therefore. Out of six crores and ninety lakhs of people inhabiting in this state, 4 crores and 40 lakhs of people speak the Bengali language, which is used by the majority of the people of the state and for this Sir, I consider that Bengali language is the Lingua Franca of our state.’

প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, যোগাযোগমন্ত্রী সরদার আবদুর রব খান, শরণার্থীবিষয়ক এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী গজনফর আলী খান, পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন, পূর্ব বাংলার সদস্য তমিজউদ্দীন খান অত্যন্ত জোরালো ভাষায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। লিয়াকত আলী খান তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ‘I wish the Hon’ble member had not moved this amendment and tried to create misunderstanding between the different parts of Pakistan. He should realize that Pakistan has been created because of the demand of a hundred millions Muslims in this sub-continent and the language of Muslims is Urdu. Pakistan is a Muslim State and it must have his lingua franca, the language of the Muslim millions.’

মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন বলেছিলেন, ‘I am sure that overwhelming majority of the people of East Pakistan are in favour of having Urdu as the State Language of Pakistan.’ এই খাজা নাজিউদ্দীনের মাজার স্থান পেয়েছে দোয়েল চত্বরের পাশে কোন্ বিবেচনায়? আজ দেশবাসীর প্রশ্ন, তিনি কী করে অন্যান্য দেশবরেণ্য নেতার সঙ্গে এমন জায়গায় স্থান পেয়েছেন, যে ব্যক্তি বাংলা ও বাঙালি জাতির সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে বিরোধিতা করেছেন। নুরুল আমিনের কবর হয়েছে করাচিতে।

সেদিন এই ১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষা প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তান থেকে তিনজন সদস্য বক্তব্য রাখেন, তারা হলেন প্রেম হরি বার্মা, ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত, শীরিষ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পূর্ব পাকিস্তানের অন্য কোনো সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে সমর্থন করেননি। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৫১ সালে বলেছিলেন, আমার বক্তব্য একজন হিন্দু হিসেবে কোনোদিনই ছিল না, এ বক্তব্য ছিল বাংলার গরিব হিন্দু-মুসলিমদের বক্তব্য, যারা আরবি বা উর্দু পড়তে জানে না।

পাকিস্তানিরা কোনোদিনই ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে ক্ষমা করেনি। তাকে ২৮ মার্চ, ১৯৭১ কুমিল্লায় তার নিজ বাড়িতে গিয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তুলে নিয়ে যায় এবং নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করে। উল্লেখ্য, খাজা নাজিমউদ্দীন এবং নুরুল আমিন প্রচার করেছিল ২১ ফেব্রুয়ারিতে কলকাতা থেকে হিন্দুরা এসে এ আন্দোলনকে পরিচালনা করছে। তাদের উত্তরসূরিদের আমরা দেখতে পাই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে।

একুশের চেতনা এবং বাংলাভাষাকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম কখনই থেমে ছিল না। ১৯৯৮ সালে কানাডা প্রবাসী বাঙালি তরুণ রফিকুল ইসলাস (প্রয়াত) এবং আবদুস সালাম জাতিসংঘের তদানীন্তন মহাসচিব কফি আনান সমীপে আবেদন করেন একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার জন্য।

অবশেষে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থার (ইউনেস্কো) প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় এবং একুশের চেতনাকে ধারণ করে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। তারপর ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো যথাযথ মর্যাদায় পালন করছে।

তবে ২০১০ সালে ২১ অক্টোবর জাতিসংঘের ৬৫তম অধিবেশনে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। উল্লেখ করা হয়, বিশ্বব্যাপী সব মানুষের ভাষাকে সুরক্ষা এবং উপস্থাপনার সুযোগ সৃষ্টি করাই হচ্ছে এর লক্ষ্য। এ হচ্ছে ভাষাপ্রেমিক বাঙালি জাতির অহংকারের বিশাল অর্জন।

ইউনেস্কো ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে ‘Towards Sustainable Futures through Multilingual Education.’ এ উপলক্ষে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা তার বাণীতে বলেন, ‘On this occasion of this Day, I launch an appeal for the potential of multilingual education to be acknowledged everywhere, in education and administrative systems, in cultural expressions and the media, cyberspace and trade.’

বহুমাত্রিক ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা ও সংস্কৃতির চর্চা এবং প্রশাসনিক পদ্ধতির প্রচলন করার এ আবেদন কতটা প্রয়োগ হবে এ নিয়ে চলছে সর্বত্র। তবে বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হওয়া ভাষাগুলোকে সুরক্ষা করতেই হবে।

বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার ভাষা আছে। অনেক ভাষার কোনো লিপিমালা নেই। তারা হারিয়ে যাচ্ছে কালের স্রোতে। কারণ তাদের বংশধররা বৃহৎ ভাষাভাষী এবং উন্নত লিপিমালায় সমৃদ্ধ ভাষাকে তাদের আপন করে নিয়েছে। হারিয়ে যাওয়ার পথে চলমান ভাষাকে সুরক্ষা করতে প্রতিটি দেশ ও জাতিকে আবেদন করছে ইউনেস্কো; কিন্তু এ হচ্ছে এক গতিশীল ও প্রবহমান ভাবধারা, যেখানে দেশ, জাতি, সমাজ ও সমষ্টির প্রভাব বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

তাই দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৪৭টি ভাষা বিরাজমান থাকলেও কালের প্রভাবে আদিবাসীদের ভাষাকে বাংলাভাষা প্রভাবিত করে চলেছে। বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের ভাষার সুরক্ষার জন্য পৃথক ‘ভাষা একাডেমি’ প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে; কিন্তু বাংলা ভাষার প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা কম। কারণ বিশ্বব্যাপী বাংলার প্রভাব বাড়ছে, প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ এক ভাষা যার প্রভাব সর্বত্র।

মাতৃভাষাকে সুরক্ষা এবং আরও উন্নত করে জীবনের সবস্তরে প্রয়োগ করার একটি উদ্যোগ হচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। এ গ্রন্থমেলার সঙ্গে মিশে আছে আমাদের প্রাণের স্পন্দন, মনের আকুতি এবং হৃদয়ের অভিব্যক্তি। এ মেলার মাঝে উদ্ভাসিত হয়ে থাকে আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য। সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের উন্মেষ হচ্ছে আমাদের প্রত্যাশা। তাই প্রতি বছর একুশের বইমেলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের আত্মত্যাগের ইতিহাস, কণ্ঠে ভেসে আসে ‘আ মরি বাংলা ভাষা, তোমার বোলে, তোমার কোলে, কত শান্তি ভালোবাসা।’

কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী রচিত মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি কবিতার পঙক্তি হচ্ছে-
‘আজ আমি এখানে কাঁদতে আসিনি,
ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি
ওরা চল্লিশ জন কিংবা আরো বেশি,
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
রমনার রৌদ্র দগ্ধ কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়,
ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য- বাংলার জন্য। ’

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: