সর্বশেষ আপডেট : ৫০ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২৪ জুন, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

দশম সংসদের চতুর্থ বছরে পা

1485659659নিউজ ডেস্ক:: দেশে প্রথমবারের মত প্রধান বিরোধী দলও সরকারের মন্ত্রিসভায়-এই অর্থে চলতি দশম জাতীয় সংসদ ‘ব্যতিক্রমী’। এই সংসদ আজ তিন বছর পূর্ণ করে চতুর্থ বছরে পা রাখছে। ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করা বিএনপিবিহীন বর্তমান সংসদ নিয়ে শুরু থেকেই দেশের ভেতর-বাইরে নানা আলোচনা-সমালোচনা ছিল। তবে সময়ের ব্যবধানে এবং উদ্ভূত রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা-সমালোচনাও এখন কমে এসেছে। গত তিন বছরে ৬৫টির বেশি আইন পাস হয়েছে নির্বিঘ্নে, যেখানে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো বাধা ছিল না। এমনকি তেমন কোনো মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন না করেও অন্যরকম ‘রেকর্ড’ সৃষ্টি করেছে জাপা।

দশম সংসদের তিন বছর পূর্তিতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গতকাল শনিবার আলাপকালে বলেন, সংসদ কার্যকর রয়েছে। সরকারি দল, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা সক্রিয়ভাবে সংসদ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছেন এবং করছেন। বিশেষ করে বর্তমান বিরোধী দল ভালো ভূমিকা পালন করছে। বিল পাসের প্রক্রিয়া ও সংসদীয় কমিটিসহ সকল কার্যক্রমে বিরোধী দল গঠনমূলক ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন বিল মন্ত্রিপরিষদ ও সংসদে উত্থাপন এবং এরপর সংসদীয় কমিটিতে পরীক্ষার পরে বিরোধী দলের সদস্যরা এগুলোর উপর সংশোধনী এনেছেন, যেগুলো বিল পাসের সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা গ্রহণও করেছেন। এটাই সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। বর্তমান সংসদে কোনো ধরনের বর্জন-বয়কট নেই, এটাও এই সংসদের একটি ইতিবাচক দিক।

জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ ও বিরোধী দলীয় নেতা এইচএম এরশাদ গত তিন বছরে বহুবার মন্ত্রিপরিষদ থেকে দলের সদস্যদের বের করে আনবেন বলেছেন। এনিয়ে জাপার সংসদীয় দল ও দলীয় ফোরামেও নানা তর্ক-বিতর্ক ও বাদানুবাদ হয়েছে। এরশাদ ও রওশন দু’জনই বারবার বলেছেন, সরকারে থাকায় জাপা সত্যিকারের বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারছে না। এমনকি জনগণ জাপাকে বিরোধী দল মনে করে না বলেও প্রকাশ্যে অসংখ্যবার মন্তব্য করেছেন এরশাদ এবং তার সহোদর ও দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তবে মন্ত্রিপরিষদ থেকে বের হওয়া না হওয়া নিয়ে এখন আর কোনো কথাবার্তা নেই জাপায়। এ ব্যাপারে এরশাদ, রওশন ও জিএম কাদেরসহ দলটির সবাই চুপ। বরং মন্ত্রিসভায় দলের প্রতিনিধিত্ব আরো বাড়ানোর জন্য ভেতরে-ভেতরে তত্পর ছিল জাপা, এজন্য দলটির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অন্তত দুই দফায় চিঠিও পাঠানো হয়েছিল।

এ বিষয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ও জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ গতকাল বলেন ‘সরকার থেকে বের হয়ে আসার জন্য অনেকভাবে চেষ্টা করেছি, তবে আমরা এখনো তা পেরে উঠিনি। গতবছরের শেষদিকে মন্ত্রিসভায় রদবদলের একটা সম্ভাবনা ছিল, ওই ফাঁকে সরকার থেকে আমাদের বের হয়ে আসার একটা চিন্তা-ভাবনা ছিল। যেহেতু তখন মন্ত্রিসভায় রদবদল আর হয়নি সে কারণে বিষয়টি পিছিয়ে গেছে। এখন সামনে যদি রদবদলের সম্ভাবনা থাকে তাহলে তখন প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো তিনি যেন মন্ত্রিসভা থেকে আমাদের দলের লোকদের বাদ দেন।’

উল্লেখ্য, জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এবং দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ মন্ত্রী, মশিউর রহমান রাঙ্গা ও মুজিবুল হক চুন্নু প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নির্বাচিত ও সংরক্ষিত মিলিয়ে চলতি সংসদে জাপার সদস্য সংখ্যা ৪০ জন। সরকারি জোট ও জাপার বাইরে ১৬ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যেরও একটি মোর্চা রয়েছে। দশম সংসদের প্রথম দুই বছরে স্বতন্ত্র সদস্য হাজী মো. সেলিম, ডা. রুস্তম আলী ফরাজী ও তাহ্জীব আলম সিদ্দিকী বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করে সংসদকে কিছুটা গরম রাখেন। তবে অসুস্থতার কারণে তৃতীয় বছরে হাজী সেলিম সংসদে বেশিরভাগ সময়েই অনুপস্থিত ছিলেন। অবশ্য রুস্তম আলী ফরাজী ও তাহ্জীব আলম সিদ্দিকী প্রথম দুই বছরের মত তৃতীয় বছর জুড়েও সরব ছিলেন। এর বাইরে জাপার কাজী ফিরোজ রশীদ, জিয়াউদ্দিন বাবুল, তাজুল ইসলাম চৌধুরী, ফখরুল ইমাম, নূরুল ইসলাম মিলন, নূরুল ইসলাম ওমর ও পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ সময়ে-সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদে সরকারের সমালোচনা করেছেন। আর আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাপার ফখরুল ইমামের বিভিন্ন সংশোধনী ও পর্যালোচনামূলক ভূমিকা গোটা সংসদের নজর কেড়েছে। অন্যদিকে, গত তিন বছরে বহুবার সরকারি দলের মুখে বিরোধী দলের প্রশংসা এবং বিরোধী দলের মুখে সরকারের প্রশংসার বিষয়টিও ছিল এই সংসদের ‘অন্যতম আকর্ষণ’।

বিরোধী দল হিসেবে জাপা বিদ্যুত্-গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর ওয়াকআউট করেছিল। এছাড়াও তারা বিভিন্ন কারণে হাতে গোনা কয়েকবার ওয়াকআউট করেছে। এর বাইরে গত তিন বছরে সরকারি ও বিরোধী দলকে কোনো ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য বিতর্কে জড়াতে দেখা যায়নি। বরং বেশিরভাগ সময়ে সরকারি ও বিরোধী দল সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির সমালোচনা করেছে। গতবছর ‘টিআর ও কাবিখার বরাদ্দের বেশিরভাগ এমপিদের পকেটে যায়’ মন্তব্য করে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বিত তোপের মুখে পড়েছিলেন তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত সংসদে দাঁড়িয়ে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ চেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া দেশ স্বাধীনের পর জাসদের ভূমিকা নিয়েও গতবছর অন্তত দু’বার সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা একযোগে সংসদে সমালোচনা করেছেন।

তিন বছরে সংসদে জাপার ভূমিকার বিষয়ে রওশন এরশাদ ইত্তেফাককে বলেন, ’৯১ এর পর থেকে শুরু করে নবম সংসদ পর্যন্ত প্রতিটিতেই বিরোধী দল বেশিরভাগ সময় সংসদে অনুপস্থিত ছিল। কথায় কথায় ওয়াকআউট, বর্জন আর বয়কটের মধ্য দিয়ে কেটেছে সেইসব সংসদ। সেই তুলনায় বর্তমান সংসদ অনেক বেশি কার্যকর, আমরা নিয়মিত সংসদে যাচ্ছি, বর্জন-বয়কট করছি না, বিনা কারণে ওয়াকআউট করছি না। মারামারি, দলাদলি ও ফাইল ছোড়াছুড়ি করছি না। বরং ছায়া সরকার হিসেবে বর্তমান বিরোধী দল জনগণের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সংসদে কথা বলছে, আমি নিজেও প্রতিটি বক্তব্যে সাধারণ মানুষের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেছি-সেটা সবাই দেখেছেন।

এদিকে, তিন বছরে ৫০টি সংসদীয় কমিটির আট শতাধিক বৈঠক হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৈঠক করেছে সরকারি হিসাব-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। সবচেয়ে কম বৈঠক করেছে পিটিশন কমিটি। প্রথম দুই বছর কার্যপ্রণালী বিধি-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কোনো বৈঠক না হলেও গত বছর কয়েকটি বৈঠক করেছে।

দশম সংসদের তিন বছরের সামগ্রিক পর্যালোচনায় স্পিকার শিরীন শারমিন ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমান সংসদে উল্লেখযোগ্য কতগুলো আইন প্রণয়ন হয়েছে। বিশেষ করে ধাত্রীদের বিষয়ে পাস হওয়া আইনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এমপিরা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন, বাল্যবিবাহ ও মাতৃ-শিশু মৃত্যু রোধ ও যুব উন্নয়ন বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন। সামাজিক নিরাপত্তা ও এই খাতে সরকারের বরাদ্দ ও ব্যয় নিয়ে এমপিরা অনেকগুলো মতবিনিময়ে অংশ নিয়েছেন। স্থায়ী কমিটিগুলো সক্রিয় রয়েছে। সংসদ সদস্যরা বিদেশেও এখন সিপিএ এবং আইপিইউ’সহ বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশ নিচ্ছেন। কিছুদিন আগেও সাইবার ’ল নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় একটি সেমিনারে অংশ নিয়েছেন আমাদের এমপিরা, সামনে লন্ডনেও একটি সেমিনার রয়েছে। আগামী এপ্রিলে ঢাকায় আইপিইউ সম্মেলন হতে যাচ্ছে। এছাড়া এবছর ঢাকায় সিপিএ সম্মেলন করারও সম্ভাবনা আছে।

দশম সংসদের তিন বছরের কার্যক্রম সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ-টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন ‘এই সংসদ নিয়ে কথা বলার তেমন কিছু নেই। যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবেই আছে, উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন নেই। তবে সংসদ আরো কার্যকর হতে পারত। সংসদীয় কমিটিগুলো বেশি সক্রিয় থাকলে সরকারের জবাবদিহিতা আরো বাড়ত। সংসদীয় কমিটিগুলো মন্ত্রণালয়গুলোকে চাপে রাখতে পারলে সুশাসনের পথেও অগ্রসর হওয়া সম্ভব হতো।’

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: