সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
রবিবার, ২৮ মে, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বাবুল পরিবার চেয়েছিল মিতুর সংসার ভাঙতে!

1485457846নিউজ ডেস্ক:: চট্টগ্রামে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংস হত্যাকা্লের শিকার মাহমুদা খানম মিতুর সংসার ভাঙতে চেয়েছিল তার স্বামীর পরিবার। মিতু হত্যার তদন্তে নিয়োজিত পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যই পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে বাবুল ও মিতুর দাম্পত্য জীবনের নানা টানাপড়েনের কথা। জানা গেছে, অনেক কষ্টের মধ্যেও সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে বাবুলের সংসারেই থাকতে চেয়েছিলেন মিতু। কিন্তু বাদ সেধেছিলেন শ্বশুর বাড়ির অন্য সদস্যরা। তারা চাননি মিতু বাবুলের বউ হয়ে থাকুক। তাদের কাছে মিতুর একটাই অপরাধ—বাড়ির অন্য বউদের তুলনায় সে কম শিক্ষিত। অন্য বউরা উচ্চ শিক্ষিত। কেউ অনার্স পাস, কেউ মাস্টার্স পাস। কিন্তু মিতু এতোদূর লেখাপড়া করেনি। তাই মিতুকে তালাক দিয়ে ছেলের জন্য ‘শিক্ষিত’ বউ আনার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন বাবুলের মা। সহযোগিতায় ছিলেন ভাই-বোনেরাও। ছেলের জন্য বউ দেখার কাজও সেরে ফেলেছিলেন তারা। বাকি ছিল বাবুলকে ঘটা করে বিয়ে করানো। সেই দিনেরই অপেক্ষায় ছিলেন তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাথে দেখা করে মিতু ও বাবুলের জীবনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন মিতুর মা শাহেদা মোশাররফ নীলা ও পিতা মোশাররফ হোসেন। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদে মিতু ও বাবুলের দাম্পত্য সম্পর্ক, শ্বশুর বাড়ির সাথে সম্পর্ক, পরকীয়াসহ নানা দিকও উঠে আসে। মিতুর পিতা-মাতা বাবুলের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে তদন্ত কর্মকর্তাকে অনুরোধ করে বলেছেন, তাদের মধ্যেও যদি কেউ বাবুলকে ব্যবহার করে মিতুকে হত্যার কলকাঠি নাড়িয়ে থাকে তাহলে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হোক। এসব তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের মামলা তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন, মিতু হত্যার ঘটনাটি সুপরিকল্পিত এবং এর সঙ্গে মিতুর স্বামী বাবুল আক্তারের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।

ডিবি কার্যালয় থেকে বের হয়ে মিতুর পিতা মোশাররফ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ নানা কারণেই বাবুল আক্তারের পরিবারের সাথে মিতুর দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। এই টানাপড়েন চলছিল দীর্ঘদিন ধরেই। তারা বাবুলের জন্য বউ দেখার কাজও করেছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি। হয়তো বাবুল এটা চাইতো না। সে মিতুকে নিয়েই থাকতে চেয়েছিল। বাবুলকে রাজি করাতে না পেরে হয়তো তারা মিতুকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। এ কারণে বাবুলের পরিবারের কেউ মিতু হত্যায় সম্পৃক্ত থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। পুলিশকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে অনুরোধ করেছি।

এদিকে তদন্ত সূত্র আরো জানায়, ‘পথের কাঁটা’ মিতুকে সরিয়ে অন্য কাউকে বউ করে আনার পরিকল্পনা নেয় মিতুর পরিবার। এই কাজে বাবুলের মা ও বোনের উত্সাহই সবচেয়ে বেশি ছিল বলে জানা গেছে। এর আগে বাবুলের ছোট ভাইও ‘পরিবারের চাপে’ দ্বিতীয় বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পেশায় আইনজীবী ওই ভাইয়ের প্রথম সংসার খুব বেশিদিন টেকেনি। মাত্র ছয় মাসের মাথায় চুরির অপবাদ দিয়ে প্রথম স্ত্রীকে সংসার থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপর বোনের এক স্বামী পরিত্যক্তা বান্ধবীকে বিয়ে করেন বাবুলের ছোট ভাই।

জানা গেছে, বড় ভাইয়ের বউকেও কোনো এক অজুহাতে সংসার থেকে সরিয়ে দেয়ার দুরভিসন্ধি আঁঁটেন বাবুলের বোন। বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন মিতু। এ কারণে সবসময় তার মন খারাপ থাকতো। স্বামী ও স্বামীর পরিবারের সাথে তিক্ততা ক্রমশ বেড়েই চলছিল। মিতুর পিতা মাতা তদন্ত কর্মকর্তাকে বাবুলের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, পরিবারের কোনো সদস্য অথবা বাইরের কেউ বাবুলকে ব্যবহার করে মিতুকে হত্যা করেছে কীনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। হয়তো কেউ বাবুলের জীবনে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু বাবুল তাকে চাইতো না। সে মিতুকে নিয়েই থাকতে চেয়েছিল। বাবুলের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর সে হয়তো ক্ষুব্ধ হয়ে থাকতে পারে। হয়তো সেই বিশেষ কারো জন্য মিতু ছিল পথের কাঁটা। তাই পথের কাঁটা সরিয়ে দিতেই তারা টাকা পয়সা দিয়ে লোক ভাড়া করে মিতুকে হত্যা করিয়েছিল।

গতকাল সিএমপি সদর দফতরে মিতুর পিতা-মাতার সাথে প্রায় চার ঘন্টা কথা বলেন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর) মো. কামরুজ্জামান। ডিবি কার্যালয় থেকে বের হয়ে তারা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। মিতুর মা শাহেদা মোশাররফ নীলা সাংবাদিকদের বলেন, আমি আমার মেয়ের হত্যাকা্লের মোটিভ জানতে চাই। কী কারণে তাকে খুন করা হলো। সে চাকরি, করতো না, ব্যবসা করতো না। তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকাও ছিল না। তাহলে কিসের লোভে আমার মেয়েকে খুন করা হলো।

মেয়ের হত্যাকারী হিসেবে কাউকে সন্দেহ করেন কীনা এমন প্রশ্নের উত্তরে মিতুর বাবা বলেন, হত্যাকারী যেই হোক, সেটা বাবুল আক্তারই হোক বা আর কেউ হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশকে অনুরোধ করেছি। এমনকি যদি কোনো পরকীয়ার ব্যাপারও থাকে সেটাও সামনে আনা হোক। পরকীয়া নিয়ে সন্দেহের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটাতো হতেই পারে। এখনকার সমাজে খুন-খারাপিসহ নানা অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে পরকীয়ার কারণে। তাই এ হত্যাকা্লের পেছনে বাবুল ও মিতুর দু’জনেরই কোনো পরকীয়ার ঘটনা ছিল কি না তা যাচাই করা হোক। আর খুনি যেই হোক না কেন, বাবুল হোক, তার পরিবারের কোন সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব হোক, যেই হোক না কেন তা বের করা হোক। তিনি বলেন, পুলিশ শুধু আমাদেরকেই (মিতুর পরিবার) জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কিন্তু বাবুলের পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না। আজকেও আমাদের সাথে বাবুলকে ডাকা উচিত্ ছিল। কিন্তু তাকে ডাকা হয়নি। বাবুলের পিতা-মাতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা বললে পুলিশ বলে সেটা করা হয়েছে। কিন্তু কখন তা করেছে, জিজ্ঞাসাবাদ করে কী পাওয়া গেছে সেটা বলে না।

মিতুর হত্যাকারী হিসেবে বাবুল আক্তারকে সন্দেহ করেন কীনা জানতে চাইলে মিতুর মা ‘না’ সূচক উত্তর দেন। এ বিষয়ে বাবুলকে কখনো জিজ্ঞাসা করেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাবুল এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। এই প্রসঙ্গে কোনো কথা হলেই সে চুপ করে থাকে। প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়। দেখেন না বাবুলতো এমনিতেই চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। কথা বলে না।

মিতুর মা জানান, মিতুর ব্যবহূত মোবাইল ফোনটির সন্ধান পাওয়া গেছে। সেটি ঢাকায় এক সিএনজি অটোরিকশা চালকের কাছে আছে। এক সপ্তাহ আগে সেই মোবাইল থেকে আমার কাছে ফোন আসে। নিজেকে অটোরিকশা চালক পরিচয় দিয়ে ওই ব্যক্তি বলেন, ঢাকার হাতিরঝিল এলাকায় তিনি মোবাইল ফোনটি কুড়িয়ে পেয়েছেন। জবাবে মিতুর মা ওই চালকের সাথে দেখা করে মোবাইল ফোনটি ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করলে তিনি জবাব না দিয়ে ফোনটি কেটে দেন।

তদন্ত কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে মিতুর মা শাহেদা মোশাররফ বলেন, আমার মেয়ের স্বভাব-চরিত্র কেমন ছিল তা তদন্তকারী কর্মকর্তা জানতে চেয়েছেন। আমি বলেছি, মেয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো, পর্দা করতো, হিজাব পড়তো। তদন্ত কর্মকর্তা বাবুলের সাথে আমাদের যোগাযোগ আছে কিনা, নাতি-নাতনীদের সাথে যোগাযোগ হয় কিনা তা জানতে চেয়েছেন।

এদিকে, মামলায় পরকীয়ার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, এটা নতুন কোনো বিষয় না। আমরা প্রথম থেকেই সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করছি। বাবুল আক্তার বা মিতুর কোনো পরকীয়ার জেরে এই হত্যাকা্ল হয়েছে কীনা তা দেখছি। মিতুর মোবাইলটি উদ্ধার করা হচ্ছে না কেনো জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। এটা টেকনিক্যাল কাজ। এজন্য আইটি বিশেষজ্ঞ কাজ করছে। সবাই যত সহজ মনে করছে আসলে কাজটা তত সহজ নয়।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২২ ডিসেম্বর বাবুল আক্তারের শ্বশুর মোশাররফ হোসেনকে মিতু হত্যা মামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এর আগে ১৫ ডিসেম্বর বাবুল আক্তারও সিএমপিতে এসে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন। গত ৫ জুন সকালে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় নগরীর জিইসি মোড় এলাকায় দুর্বৃত্তদের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত ও গুলিতে নিহত হন তত্কালীন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: