সর্বশেষ আপডেট : ৫৯ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১১ ফাল্গুন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ভুট্টোর কারাবৃত্তান্তের নেপথ্যের গল্প

news_1-600x338ডেস্ক রিপোর্ট:: সিলেট নগরীর খাসদবীর সৈয়দমুগনী এলাকার সোলেমান আহমদ ওরফে সলু ড্রাইভারের ছেলে রিপন আহমদ ভুট্টো অন্যের পরিবর্তে জেল খাটছিলেন সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে। তার বন্দিজীবনের এ গল্পটি সংবাদ-মাধ্যমে উঠে এলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তদন্ত হয়, তদন্তে দোষী হন কারাভোগকারী ভুট্টোই। লোভে পড়েই তিনি প্রতারণার গল্পে নায়ক হন, তদন্তে প্রমাণ মিলেছে এমনই।

ভুট্টোর প্রাথমিক বক্তব্য ছিল, ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে খাসদবীর এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে কারাগারে আসার পর জানতে পারেন যাবজ্জীবন সাজায় তাকে জেলে আনা হয়েছে। মামলার বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি। সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রচার হলে সত্যতা যাচাইয়ে ঘটিত হয় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি। সিলেটের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাজী আবদুল হান্নানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত ৩ সদস্যের কমিটিতে সদস্য সচিব করা হয় যুগ্ম জেলা জজকে (২য় আদালত) এবং কমিটির অন্য সদস্য হিসেবে রাখা হয় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে (১ম আদালত)।

তদন্ত কমিটি মুখোমুখি হয় রিপন আহমদ ভুট্টোর। তিনি তাদের সাক্ষ্য দেন, ২০১৫ সালের ১৪ই অক্টোবর পুলিশ পরিচয়ে একদল লোক তাকে একটি গাড়িতে তোলে। গাড়িতে তুলে তাকে তারা জানায় যে, তিনি ইকবাল হোসেন বকুল এবং তিনি একটি মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি। তিনি তাদের নিজের প্রকৃত পরিচয় জানালেও তারা তাতে কান না দিয়ে তাকে আদালতে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে বলা হয় তিনি যেনো নিজেকে ইকবাল হোসেন বকুল পরিচয় দেন এবং কথামতো চললে তাকে জামিনে বের করে নিয়ে এসে বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। ভুট্টো রাজি হন সে শর্তে। ইকবাল হোসেন বকুল হিসেবে বরণ করেন কারাজীবন। কিন্তু কারাগারে গিয়ে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে না পেয়ে ভুট্টো নিজের প্রকৃত পরিচয় সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপারের কাছে উপস্থাপন করেন।

সিলেট সদর উপজেলার মোগলগাঁও ইউনিয়নের চানপুর গ্রামের পশ্চিমপাড়ার চেরাগ আলীর ছেলে আলী আকবর সুমন হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ইকবাল হোসেন বকুলের বদলি হিসেবেই জেল খাটছিলেন রিপন আহমদ ভুট্টো। নিজের পরিচয়ে অন্যকে কারাগারে পাঠিয়ে বকুল পালিয়ে আছেন সৌদি আরবে।
ঘটনার আরো গভীরে যেতে তদন্ত কমিটি সব মিলিয়ে ১৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করে। যার মধ্যে ৪ জন কয়েদিও ছিলেন। কয়েদিদের সাক্ষ্যে প্রতীয়মান হয় যে, ভুট্টো প্রথমে কাউকেই নিজের আসল পরিচয় দেননি। ঘনিষ্ঠতা হওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি তাদের কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরেন। রিপন আহমদ ভুট্টো যে আসলেই ইকবাল হোসেন বকুল নন তা নিশ্চিত হতে তদন্ত কমিটি ভুট্টোর পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় সিটি কাউন্সিলর ফরহাদ চৌধুরী শামীমের সাক্ষ্যও গ্রহণ করে। তদন্ত কমিটি নিশ্চিত হয় ইকবাল হোসেন বকুলের পরিবর্তেই জেল খাটছেন রিপন আহমদ ভুট্টো।

মামলার নথি পর্যালোচনা করে তদন্ত কমিটি দেখতে পান অ্যাডভোকেট ওয়ারিস আলী মামুনের সম্পাদিত ওকালতনামায় এবং তার দাখিল করা দরখাস্তের মাধ্যমেই রিপন আহমদ ভুট্টোকে ইকবাল হোসেন বকুল হিসেবে আত্মসমর্পণ করানো হয়। তদন্ত কমিটি সাক্ষ্য নেয় অ্যাডভোকেট ওয়ারিস আলী মামুনের। তদন্ত কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয় অন্য আরেক অ্যাডভোকেট শাহ আলমের মাধ্যমে আসায় ওয়ারিছ আলী না জেনেই রিপন আহমদ ভুট্টোকে আদালতে উপস্থাপন করেন।
তদন্ত কমিটির সামনে ডাক পড়ে অ্যাডভোকেট শাহ আলমের। তিনি জানান, বাদামবাগিচার বাসিন্দা মৃত তোজাম্মেল হোসেনের ছেলে লিয়াকত হোসেনের মাধ্যমে তিনি এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। লিয়াকতই তাকে শিক্ষানবিশ আইনজীবী শামীম আহমদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই শামীম আহমদই হচ্ছেন অন্যকে কারাগারে পাঠিয়ে সৌদি আরবে পালিয়ে থাকা ইকবাল হোসেন বকুলের ছোট ভাই।
তদন্ত কমিটির কাছে দেয়া সাক্ষ্যে লিয়াকত হোসেন জানান, আদালত প্রাঙ্গণে ফাইলপত্রের ব্যবসার সুবাদে তার পরিচয় হয় শিক্ষানবিশ আইনজীবী শামীম আহমদের সঙ্গে। আর পূর্ব থেকেই লিয়াকত হোসেনের সঙ্গে পরিচয় ছিল অ্যাডভোকেট শাহ আলমের। লিয়াকত হোসেনের মাধ্যমেই শামীম আহমদের সঙ্গে অ্যাডভোকেট শাহ আলমের পরিচয় হয়।
মামলার রায় সংক্রান্ত কাগজপত্রের নকল তোলা হয়েছিলো আরো এক অ্যাডভোকেট মো. মহিউদ্দিনের দরখাস্তের ভিত্তিতে। সাক্ষী হিসেবে তাকেও উপস্থিত হতে হয় তদন্ত কমিটির সামনে। তিনি জানান, অ্যাডভোকেট শাহ আলমের অনুরোধেই তিনি নকল তোলার দরখাস্তে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন। তদন্ত কমিটি সাক্ষ্যগ্রহণ করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অফিস সহকারী মো. মহিউদ্দিনের কাছ থেকেও। তিনি নিশ্চিত করেন, নকল তোলার জন্য অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিনের স্বাক্ষরে দরখাস্ত করা হলেও শিক্ষানবিশ আইনজীবী শামীম আহমদই নকলটি সংগ্রহ করেন অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন পরিচয়ে।

৫ই জানুয়ারি তদন্ত কমিটি গঠন হওয়ার পর থেকে ১৬ই জানুয়ারি পর্যন্ত তদন্ত করে কমিটি। এ সময়ের মধ্যে ১০ বার বৈঠক করে তদন্ত কমিটি। ১৬ তারিখ কমিটি ১০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। সে প্রতিবেদনের আলোকে ২২শে জানুয়ারি রায় দেন জেলা জজ মনির আহমদ পাটোয়ারী। লোভে পড়ে স্বেচ্ছায় ইকবাল হোসেন বকুল সেজে আত্মসমর্পণ করে কারাবরণ করায় এবং এ পরিকল্পনার নেপথ্যে থাকায় অ্যাডভোকেট শাহ আলম, শিক্ষানবিশ আইনজীবী শামীম আহমদ, ডিসি অফিসের দালাল লিয়াকত হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন তিনি। এ নির্দেশের আলোকে পরদিন সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ছগির মিয়া বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় এ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা (নং:১৫) দায়ের করেন।

২০০৯ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর সিলেট নগরী থেকে বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ হন সিলেট সদর উপজেলার মোগলগাঁও ইউনিয়নের চানপুর গ্রামের পশ্চিমপাড়ার চেরাগ আলীর ছেলে আলী আকবর সুমন। পরে পার্শ্ববর্তী হাওর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তিন জনের যাবজ্জীবন সাজা হয়। যাদের একজন হচ্ছেন সদর উপজেলার হাউসা গ্রামের আবদুল মতিনের ছেলে ইকবাল হোসেন বকুল (২৬)। এই বকুলের পরিবর্তে আত্মসমর্পণ করে ২০১৫ সালের ১৪ই অক্টোবর থেকে কারান্তরীণ থাকেন খাসদবীর সৈয়দমুগনী এলাকার ট্রাকচালক রিপন আহমদ ভুট্টো। (সংকলিত)

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: