সর্বশেষ আপডেট : ৪ ঘন্টা আগে
মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১৬ ফাল্গুন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সর্বাগ্রে দেশপ্রেম অতঃপর দেশপ্রেম

dsnewspic_26jan17_003কামার ফরিদ ::

বাংলাদেশকে যারা প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এখানে ব্যক্তিপ্রেমের কোনো স্থান নেই; দেশপ্রেমই একমাত্র ঠিকানা। তাদেরকে মনে রাখতে হবে, ‘দেশপ্রেম এবং দেশপ্রেম; এর কোনো বিকল্প নেই’। দেশ ও জাতির মান-ইজ্জত এবং মর্যাদাকে সমুন্নত রাখাই হবে প্রতিটি নাগরিকের, বিশেষ করে যারা প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাদের প্রধান কাজ।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল নিউজিল্যান্ড সফরে যা দেখিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখা তো দূরের কথা, ইজ্জতটাও সামলানো যায়নি। দেশের ১৬ কোটি মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছে। এ দেশের মানুষ ভাবতেও পারেনি, এ রকম লজ্জাজনক ফল নিয়ে তাদের প্রাণপ্রিয় ক্রিকেট দলকে দেশে ফিরতে হবে। নিউজিল্যান্ডে গিয়ে এভাবে ‘অল হোয়াইট’ হওয়া বিপর্যয়ের সিরিজ যে এতটা লজ্জায় ডুবিয়ে শেষ হবে, তা কারো কল্পনায়ও ছিল না। ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বজ্ঞানহীন পারফরম্যান্স দেশকে এতটাই অসম্মানজনক স্থানে নামিয়ে এনেছে।

ওয়ানডে, টি২০-র পর টেস্টেও তথৈবচ। এক মাসের দীর্ঘ এই সফরে প্রাপ্তি বলতে যা পেয়েছি, তাকে একটি বিগ জিরো বললেও কম বলা হবে। নামতে নামতে মাইনাস ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সব ফরম্যাট মিলিয়ে ৮-০-তে হেরেছে ব্যাঘ্রসন্তানরা। শেষমেশ আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তার অন্যতম উপমা হলো সর্বশেষ টেস্ট। বৃষ্টিতে পুরো একদিন পন্ড হওয়ার পরও খেলা ৪ দিনে এসে দাঁড়ায়। ড্র করার সমূহ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও হারতে হলো আরো এক দিন বাকি থাকতে। বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের চূড়ান্ত হেঁয়ালিপনায় হতভম্ব হতে হয়েছে স্থানীয় সাংবাদিকদেরও।

ম্যাচ শেষে দলের ক্যাপ্টেন তামিম ইকবাল বলেছেন, সাফল্যের জন্য শর্টকাট পথের সন্ধান করেছে বাংলাদেশ। তামিমের এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, শর্টকাট পথের সন্ধান বাংলাদেশ করেনি; করেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম। তার এই বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হ্যাগাল ওভালের টেস্টে যে ১১ জন বাংলাদেশের পতাকা হাতে মাঠে নেমেছিলেন, এই দায় তাদের। দেশের ১৬ কোটি মানুষ এই দায় নিতে পারে না। কেননা, ১৬ কোটি মানুষ খেলার দর্শক হয়ে দেশপ্রেমের যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, তার কানাকড়িও খেলোয়াড়দের মাঝে দেখা যায়নি। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ড সফরের ৮টি ম্যাচেই তার নমুনা খুঁজে পাওয়া যায়। এখানে বিশেষভাবে বলে রাখা ভালো, দেশপ্রেম নেই এমন খেলোয়াড়দের বাংলাদেশ দলে থাকার কোনো অধিকার নেই। দেশপ্রেম বিবর্জিত দলের কাছে এর চেয়ে বেশি আশা করাটা হবে বোকার স্বর্গে বাস করার মতো।

শেষ টেস্টের পোস্টমর্টেমে যা পাওয়া গেছে, তা হলো, প্রথম ইনিংসে লিড না হোক, স্বাগতিকদের ৩০০ রানের মধ্যে আটকে রাখা খুব একটা কঠিন ছিল না। সাতসকালে মাত্র ১৫ রানের ব্যবধানে দুটি ক্যাচ মিসকে ক্রিকেট বিশ্লেষকরা কিভাবে দেখবেন, জানা নেই। তবে এ দেশের মানুষ বলছে, ওরা যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে কলঙ্কিত করার জন্যই মাঠে নেমেছিল। টিভি সেটের সামনে বসা দর্শকদের আপ্তবাক্য যেন ম্যাচ শেষে সত্যে পরিণত হলো।

ক্রাইস্টচার্চ টেস্টের প্রথম ইনিংসে ক্যাচ পড়েছে ৬টি। সব মিলিয়ে নিউজিল্যান্ড সফরে বাংলাদেশ দল ক্যাচ ফেলেছে ২০টি। ক্রিকেট অঙ্গনে অত্যন্ত প্রচলিত একটি বাক্য হচ্ছে, ‘ক্যাচ মিস, তো ম্যাচ মিস।’ এই বাক্যটি দেশের প্রায় সব ক্রিকেটপ্রেমীর জানা থাকলেও বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা তা মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি। তা না হলে খেলার চিত্র কিছুটা হলেও ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু তা হয়নি বলেই বিধ্বস্ত হয়েছে বাংলাদেশ।

এবার ব্যাটিংয়ের গল্প শোনা যাক। ৬৫ রানে পিছিয়ে থাকা ইনিংসের শুরুটাই ছিল অনেকটা ডাঙ্গুলি খেলার মতো। কখনোই একে টেস্ট খেলার সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। অধিনায়ক বাউন্ডারি মেরে ইনিংস শুরু করলেন, কিন্তু অধিনায়কোচিত দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হলেন। এতদিনের খেলোয়াড়ি জীবনেও তিনি জানতে বা বুঝতে পারেননি, ক্রিকেট আমাদের গ্রামীণ জীবনের ডাঙ্গুলি খেলা নয়। এর সঙ্গে অঙ্কের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এখানে গায়ের জোরের চেয়ে বুদ্ধির জোরের চাহিদাই বেশি। হাত-পায়ের ব্যবহারের চেয়ে মস্তিষ্কের ব্যবহারই মুখ্য। শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পরিচালনা করে মস্তিষ্ক। তাই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ধীরস্থিরভাবে মস্তিষ্ক দিয়ে পরিচালনা না করে ক্রমাগত অযাচিতভাবে পুল শট করলে যা হওয়ার তা-ই হবে। অধিনায়ক তামিমের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। পিচে কয়েক মিনিটও থাকতে হয়নি তাকে। হুক করতে গিয়ে ৮ রানের মাথায় প্যাভিলিয়নে ফিরতে হয়েছে তাকে। ৮৩ মিনিট টিকে থাকার পর আউট হয়েছেন সৌম্য। তার সংগ্রহে ছিল ৩৬ রান। সাকিবও সেই বাউন্ডারি দিয়ে শুরু করলেন। ডাঙ্গুলি খেলতে তিনিও ভুল করলেন না। তার মতো বড় মাপের খেলোয়াড়ের কাছে কখনো এ রকম আশা করে না এ দেশের মানুষ। তিনিও তা-ই করে বসলেন। ফল যা হওয়ার তা-ই হলো। পয়েন্টে ক্যাচ তুলে তিনি ফিরলেন প্যাভিলিয়নে। এরপর মাহমুউদল্লাহ ও সাব্বির। তারাও অগ্রজদের অনুসরণ করতে ভুল করেননি। ফলে বাংলাদেশের স্কোর তখন ৫ উইকেটে ১০০ রান। কিন্তু কেন? যখন টিকে থাকতে পারলেই ড্র হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, তখন কেন এই ডাঙ্গুলি খেলার প্রবণতা!

আমরা তাদের ভালো খেলাও দেখেছি। তারা যে ভালো খেলতে পারেন, তাও আমাদের জানা। তারা যা জানেন না, তা হলো অঙ্কের হিসাব। তাদের ভেতরে যা নেই, তা হলো দেশপ্রেম। অঙ্কের হিসাব জানা থাকলে তারা কখনো পুল বা হুক শটের দিকে যেতেন না; গ্রাউন্ড শটকেই প্রাধান্য দিয়ে মাঠের কোন অংশে গ্যাপ আছে, তা সন্ধান করতেন। বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানকে ধারাবাহিকভাবে গ্রাউন্ড শট খেলতে দেখা যায়নি। তারা যখন গ্রাউন্ড শটের কথা মাথায় রেখে খেলেছেন, তখন বাংলাদেশকে এভাবে বিধ্বস্ত হতে দেখা যায়নি কখনো। তবে মাথা দিয়ে না খেলে অপরিকল্পিতভাবে যখন ডাঙ্গুলির দিকে তারা মনোযোগী হয়েছেন, তখনই নেমে এসেছে বিপর্যয়।

পরিশেষে বলতে হয়, দেশের হয়ে খেলতে হলে সবচেয়ে আগে যা প্রয়োজন, তা হলো দেশপ্রেম। দেশপ্রেম থাকলে মাঠে নামার আগে কে কিভাবে খেলবেন, তার জন্য কোচের পরামর্শের বাইরে নিজের মাথাটাকেও একটু ব্যবহার করা জরুরি। নিজ পরিকল্পনার অংশে থাকতে হবে দেশপ্রেম। তবে যেকোনো অবস্থায় ক্রমাগত ডাঙ্গুলি খেলাকে খেলোয়াড়ের অযোগ্যতা বলে বিবেচনায় আনতে হবে। বিশেষ করে যখন তারা টেস্ট ক্রিকেট খেলবেন। আশা করি, আগামীতে তারা নিউজিল্যান্ড সফর থেকে শিক্ষা নিয়ে মাথা দিয়ে খেলার চেষ্টা করবেন আর ১৬ কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে দেশকে ভালোবাসা দিতে কার্পণ্য করবেন না।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: