সর্বশেষ আপডেট : ১৫ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১১ ফাল্গুন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আইসিটি শিক্ষার সাফল্য

dsnewspic_22jan17_33মিহির রঞ্জন তালুকদার ::

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির উন্নতির ফলে সারা বিশ্ব আজ গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। ফলে সারা পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। পুরো পৃথিবীটাই এখন আমাদের গ্রামের মতো যখন খুশি সবাই সবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। এটাকেই বলা হয় ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ (বৈশ্বিক গ্রাম)। আর এটা সম্ভব হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির ফলে। বিশ্বায়নের প্রশস্ত আঙিনায় তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় এবং আগামীদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা কতটা প্রস্তুত, সেই ব্যাপারে পর্যালোচনা করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বর্তমান মহাজোট সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির অংশের ১১.১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমের বর্তমান ফাইল ব্যবস্থাপনাকে ই-গভর্নমেন্ট বা ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর করা হবে এবং জনগণকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেবাদান নিশ্চিত করা হবে।’ শুরুতে ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তব রূপটি কেমন হবে, তা বোঝা অনেক কঠিন ছিল। প্রথমার্ধে সরকারের মন্ত্রিপরিষদ, সংসদ সদস্য, নীতিনির্ধারক এবং আইসিটি বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও এককভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের রূপরেখা স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু দেরিতে হলেও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা এবং অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাটি স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এখন এক কথায় বলা যায়, ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে সরকারের সব সেবা ডিজিটাল প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে জনগণের কাছে তুলে ধরা।

তথ্যপ্রযুক্তির সাফল্যের মধ্যে রয়েছেÑতথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সময় কমার সঙ্গে সঙ্গে কাজের খরচও কমেছে। কাজের ক্ষেত্র বৃদ্ধি পেয়েছে । ব্যবসা-বাণিজ্যে লাভজনক প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে ক্রম পরিবর্তনে আধুনিক ধারা বজায় থাকবে। কৃষি ও বিশ্বায়নে সামগ্রিক প্রক্রিয়া গতিশীল হবে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দেশের ৪৫০১টি ইউনিয়ন পরিষদে ‘ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র’ (ইউআইএসসি) স্থাপন। ফলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক বিবেচনায়ও একটি মাইলফলক হিসেবে থাকবে। এই ইউআইএসসিগুলো মূলত ইউনিয়নভিত্তিক জনগণের মিলনকেন্দ্র, যেখানে সরকার ইন্টারনেট সংযোগসহ কম্পিউটার দিয়েছে। ফলে সরকার যেসব নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রদান করবে, এলাকার লোকজন ইউআইএসসিতে এসে সেসব সেবা নিতে পারবে। তন্মধ্যে রয়েছে ৫০ রকমেরও বেশি সরকারি ফরম, সরকারি সার্কুলার, বিধি, বিজ্ঞপ্তি, বিভিন্ন ডকুমেন্ট, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ভিজিএফ-ভিজিডি কার্ডধারীদের তথ্য, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রাপ্ত সেবাসমূহ, জনগণের মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য ইত্যাদি।

এ ছাড়া রয়েছে, ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রায় ৭০ হাজার বর্গফুট আয়তনের ফ্লোরে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা সংবলিত একটি আইসিটি ইনকিউবেটর স্থাপন। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে ২৬৫ একর জমিতে হাইটেক পার্ক স্থাপন। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয় বাধ্যতামূলককরণ। বাংলাদেশের তৈরি কম্পিউটার (দোয়েল) স্বল্প মূল্যে বাজারজাতকরণ। সরকারি পর্যায়ে সব প্রতিষ্ঠানে আইসিটি পেশাজীবী দ্বারা আইসিটি সেল স্থাপন। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্য আইসিটি ইন্টার্নশিপ চালুকরণ এবং দক্ষ প্রোগ্রামার তৈরির জন্য পিজিডি কোর্স চালুকরণ। মানবসম্পদ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) শিল্পের উন্নয়ন, যোগাযোগ স্থাপন, ই-গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা।

সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ অনেক সাফল্য অর্জন করেছে। চালু করেছে জাতীয় হেল্পলাইন ডেস্ক, যার নম্বর-৯৯৯। জানা গেছে, এই হেল্পলাইনে ১০০ দিনে ৯ লাখ ফোনের মধ্যে ১৯ হাজার মানুষ সেবা পেয়েছে। ২৫ হাজার শিক্ষার্থী উদ্যোক্তা ফ্রিল্যান্সারের অংশগ্রহণে বিপিও সামিট বাংলাদেশ-২০১৬ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ২৩৫ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবনীমূলক উদ্যোগে ১৬৭টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এলআইসিটি প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালে ৫ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে ৫ হাজার ১২০ জনের প্রশিক্ষণও চলমান রয়েছে। সারাদেশে ৫ হাজারেরও বেশি কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। ৩৬টি জেলায় আইসিটি ক্যারিয়ার ক্যাম্প করা হয়েছে। গড়ে উঠেছে ২৮টি আইটি পার্ক।

আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনায় রয়েছে টেকনোলজি ল্যাব অ্যান্ড সফটওয়্যার ফিনিশিং স্কুল, ইনফো সরকার-৩ প্রকল্প, স্মার্ট সিটি প্রকল্প, ইন্টিগ্রেটেড ই-গভর্নমেন্ট প্রকল্প, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিএলএসআই ল্যাব, জাতীয় নিরাপত্তা কেন্দ্র ও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, আইটি পার্ক ফর এমপ্লয়মেন্ট প্রজেক্ট, ডিজিটাল কানেক্টিভিটি প্রকল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি একাডেমি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আইসিটি কেন্দ্র, জাতীয় সার্টিফিকেশন পরীক্ষা পদ্ধতি, জাতীয় সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সি এবং ভার্চুয়াল ইউনিভার্সিটি অব মাল্টিমিডিয়া অ্যান্ড ইনোভেশন।

ছোট দেশ হিসেবে জনসংখ্যার অত্যধিক চাপ। প্রযুক্তিগত শিক্ষার অভাবে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ প্রবণতা কম। অবকাঠামো ও ভৌত কাঠামো ব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বার্থসিদ্ধির প্রচলন। বিদ্যুতের ঘাটতি ও কাঁচামালের অভাব। বাংলাদেশে নতুন আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে মোবাইল নিয়ন্ত্রিত বোমা। অন্যান্য দেশে বোমা হামলার ঘটনা অনেক পুরনো। এর মধ্যে রয়েছে টাইম বোমা, যা কোনো নির্দিষ্ট সময় পর বিস্ফোরিত হয়। এরপর রয়েছে রিমোট কন্ট্রোল বোমা। এটার বিস্ফোরণ ঘটানোর সময় কাছাকাছি অবস্থানে থাকতে হয়। মোবাইল নিয়ন্ত্রিত এই বোমার বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য নির্দিষ্ট সময় কিংবা নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থান করার প্রয়োজন নেই; যেকোনো দূরত্বে যেকোনো জায়গা থেকে বিস্ফোরণ ঘটানো যায়। এটা আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ইন্টারনেট থেকে জানা যায়, উন্নত বিশ্বে এ ধরনের বোমাবাজির ঘটনা অনেক আগে থেকেই ঘটছে। তবে তারা এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতেও সক্ষম হয়েছে। তারা মোবাইল ফোনের সিম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নীতি প্রণয়ন করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই আতঙ্ক একেবারেই নতুন। আবার সিমকার্ডের অবাধ বিক্রির ফলে মোবাইল নিয়ন্ত্রিত বোমা আগামীদিনের জন্য অশুভ সংকেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। বাংলাদেশে এর কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এখনো নেওয়া হয়নি। এর প্রতিরোধে এখনই ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

আমাদের দেশের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। এজন্য আইসিটি শিক্ষার বিকল্প নেই।

শিক্ষার অভাব দূরীকরণে স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটির পাশাপাশি বয়স্কদের হাতে-কলমে শিক্ষা দিতে হবে। প্রযুক্তিকে তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হবে। যাবতীয় কুসংস্কার দূর করে প্রযুক্তি সংক্রান্ত ব্যাপারে পাঠ্য পুস্তক ও গণমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিই বর্তমান বিশ্বে সব ধরনের উন্নয়ন কর্মকান্ডের মূল হাতিয়ার। তাই একবিংশ শতাব্দীর কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রতিযোগিতামূলক এই বিশ্বে টিকে থাকতে হলে তথ্যপ্রযুক্তি বিকাশের কোনো বিকল্প নেই। কাজেই আমাদের দেশে এর বিপ্লব ঘটানোর জন্য সবাইকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তবেই বিশ্ব পরিমন্ডলে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় ও উজ্জ্বল হবে। এজন্য স্কুল-কলেজে আইসিটি শিক্ষকদের বেতনের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। সারা দেশে মাত্র ৫ হাজার ৭২ জন আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন।

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এই ৫ হাজার ৭২ শিক্ষক ২০১১ সাল থেকে বিনা বেতনে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে পাঠদান করে আসছেন, তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বর্তমান সময়ে বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ের শিক্ষকরা পরিণত হয়েছেন অবহেলার পাত্রে। বৃদ্ধ মা-বাবা জানে, তার ছেলে চাকরি করে। কিন্তু জানে না, তার ছেলে চার বছর যাবৎ বিনা বেতনে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। অনেক স্ত্রী জানে না, তার স্বামী বেতন পায় না। আজ বন্ধু-বান্ধবের কাছে বলতে লজ্জা লাগে, আমি আইসিটির শিক্ষক। অথচ এটি হচ্ছে বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ একটি সাবজেক্ট। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের বেতন-ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো প্রতিষ্ঠানই এতে আগ্রহী নয়। ফলে দীর্ঘ প্রায় চার বছর যাবৎ তারা রয়েছে অসহায় হয়ে। শিক্ষকরা তাকিয়ে রয়েছেন সরকারের সুদৃষ্টির আশায়।

লেখক : কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ও শিক্ষক

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: