সর্বশেষ আপডেট : ২ মিনিট ৪২ সেকেন্ড আগে
সোমবার, ২৭ মার্চ, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১৩ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

‘মাওলানা’ উপাধি ইসলামবিরোধী?

A.F.M.-Saidআ.ফ.ম. সাঈদ ::
সাম্প্রতিককালে ‘মাওলানা’ উপাধি এবং এই শব্দ সংবলিত দুরুদ শরিফ নিয়ে কেউ কেউ আপত্তি তোলেন। এ রকম দুরুদ পড়া মারাত্মক গুনাহ্ তথা শিরকির সমতুল্য বলে ফতোয়া দিচ্ছেন। তাদের মতে ‘মাওলা’ বা ‘মাওলানা’ শুধু আল্লাহকেই বলতে হয়। অন্য কাউকে বলা যায় না। এ বিষয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হলে বলা হচ্ছে, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের কোনো আলেমের কথা তাঁরা মানবেন না। কারণ এই উপমহাদেশের আলেমরা নিজেদের ‘মাওলানা’ পরিচয় দিয়ে মারাত্মক গুনাহ করছেন।

‘মাওলা’ বা ‘মাওলানা’ শব্দের অর্থ সম্পর্কে আলোচনার পূর্বে প্রাসঙ্গিক কিছু আলোচনা প্রয়োজন। সমৃদ্ধ সকল ভাষায়ই এমন কিছু শব্দ আছে, যার অর্থ একাধিক। একই শব্দের অর্ধ শতাধিক অর্থও রয়েছে। একটি অর্থের সাথে অপর অর্থগুলোর দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও একটি সমৃদ্ধ ভাষা। এ ভাষায়ও বহু অর্থবোধক অনেক শব্দ রয়েছে। যেমন ‘কর’। এর আভিধানিক একটি অর্থ হচ্ছে, কাউকে কোনো কাজ করার নির্দেশ। অপর অর্থগুলোর মধ্যে রয়েছে কিরণ, খাজনা, রাজস্ব বা ট্যাক্স, উৎপাদক, জনক (যথা চা-কর, চিত্রকর) এবং হিন্দুদের পদবিবিশেষ (যেমন অজয় কর)। অভিধানে ‘ধরা’ শব্দের ৫৩টি অর্থ রয়েছে। যথা-পৃথিবী, জরায়ু, ছোঁয়া, ধারণ করা, পরিধান করা, গ্রেফতার করা, অবলম্বন বা আশ্রয় করা, অনুসরণ করা, বন্ধ করা, অবলম্বন দেওয়া, আক্রমণ করা, শরণাপন্ন হওয়া, নাগাল পাওয়া ইত্যাদি। ‘জ্যোতি’ শব্দেরও ৬টি অর্থ রয়েছে।

এগুলো হচ্ছে-উজ্জ্বলতা বা দীপ্তি, গ্রহ-নক্ষত্র প্রভৃতি, দৃষ্টিশক্তি, চৈতন্য, অগ্নি ও সূর্য। (বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান) ইংরেজি ভাষায়ও বহু অর্থবোধক অনেক শব্দ রয়েছে। যেমন HARD (হার্ড) শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে-শক্ত বা কঠিন, অনমনীয়, ঘন, দৃঢ়, কষ্টসাধ্য, শ্রমসাধ্য, দুঃসহ, দুস্ত্যজ, নির্মম, উচ্চমূল্য ও অপরিমিত। অনুরূপ আরেকটি শব্দ FINE (ফাইন)। এর অর্থ আছে ১১টি। যথা-চমৎকার, সুন্দর, সূক্ষ্ম, ক্ষুদ্র কণিকাময়, অতি পাতলা বা মিহি, সুরুচিসম্পন্ন, তীক্ষ্ণ, নিখুঁত, জাঁকালো, লক্ষণীয়, বিশুদ্ধ বা খাঁটি। BAR (বার) শব্দটিরও ১৬টি অর্থ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে-কিছু লম্বা টুকরো, ডান্ডা, হুড়কা, রেলিং, গরাদে ঘেরা স্থান, দোকানের ভেতরে ঘেরাও করা স্থান, নদীর মোহনায় বা পোতাশ্রয়ে বালির চড়া, আলো বা রঙের সরু রেখা, শুঁড়িখানা, উকিলসভা, উকিলসমাজ, ওকালতি, প্রতিবন্ধক, প্রাপ্ত পদকাদি সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত সম্মান, ঐ সম্মান নির্দেশক ধাতুখণ্ড এবং ব্যায়াম চর্চায় ব্যবহৃত প্যারালেল বার। (Samsad English to bengali dictionary)

আরবি শুধু সমৃদ্ধ নয়, প্রাচীন এবং মর্যাদাসম্পন্ন ভাষাও। কুরআনের ভাষা আরবি, ঈমান এবং ইবাদতের ভাষাও আরবি। জান্নাতবাসীদের ভাষাও আরবি হবে। এই ভাষায়ও বহু অর্থবোধক অনেক শব্দ রয়েছে। যেমন ‘আশরাব’ শব্দের অর্থ-পানি পান করানো, পানি প্রদান করা, পানি পান করা, তৃষ্ণার্ত হওয়া, মনে ভালোবাসা দৃঢ় হওয়া এবং কাপড়ে ঘন রং দেওয়া। ‘আলাকা’ শব্দটিও বহু অর্থবোধক। অভিধানে এর ১১টি অর্থ রয়েছে। যথা-এমন পরিমাণ খাবার যাতে দিন কেটে যায়, রাস্তা, কুয়ার গভীরতা, বড় রশি, খায়েশ, ঝগড়া, বন্ধুত্ব, পেশা, মোহরানা, সম্পর্ক, রং লাগানো কাঠ এবং মৃত্যু। (আরবি-উর্দু অভিধান ‘মিফতাহুল্লুগাত’-আবুল ফতেহ আজিজি, প্রকাশকাল মুহররম ১৩৭৬ হিজরি, প্রকাশক মুহাম্মদ সাঈদ অ্যান্ড সন্স তাজিরানে কুতুব, কুরআন মহল, করাচি)।

উদাহরণস্বরূপ তিনটি ভাষার বহু অর্থবোধক কয়েকটি শব্দের উল্লেখ করা হলো। একটি শব্দের একাধিক অর্থ থাকলে বাক্যের বিষয় অনুসারে কোনো একটি অর্থটি বুঝে নিতে হয়। আলোচ্য ‘মাওলানা’ শব্দটি আরবি এবং ‘মাওলা’ শব্দ থেকে উদ্ভূত। ‘মওলবি’ (প্রচলিত মৌলভি) শব্দের উৎপত্তিও ‘মাওলা’ থেকে হয়েছে। ‘মাওলা’ শব্দের ১৯টি অর্থ রয়েছে। যথা-(১) মালিক (২) প্রভু (৩) ক্রীতদাস (৪) ক্রীতদাসকে মুক্তি দানকারী (৫) মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাস (৬) সঙ্গী (৭) নিকটাত্মীয় (৮) বন্ধু (৯) প্রতিবেশী (১০) অতিথি (১১) অংশীদার (১২) সাহায্যকারী (১৩) প্রতিপালক (১৪) নেয়ামত দানকারী (১৫) নেয়ামত প্রদত্ত (১৬) দয়াবান (১৭) জামাতা (১৮) ভগ্নীপতি (১৯) শ্বশুর। (প্রাগুক্ত, অন্যান্য অভিধানে এবং উইকিপিডিয়ায়ও অনুরূপ তথ্য রয়েছে)।

‘মাওলা’ থেকে উদ্ভূত ‘মওলবি’ হচ্ছে একবচন বা আমার জ্ঞাপক এবং ‘মাওলানা’ বহুবচন বা আমাদের জ্ঞাপক। যথা-‘মওলবি’ অর্থ-আমার মালিক, আমার প্রভু, আমার বন্ধু, আমার সাহায্যকারী, আমার সঙ্গী এবং ‘মাওলানা’ অর্থ-আমাদের মালিক, আমাদের প্রভু, আমাদের সাহায্যকারী, আমাদের বন্ধু, আমাদের সঙ্গী ইত্যাদি।
বহু অর্থবোধক ‘মাওলা’ ও ‘মাওলানা’ শব্দটি দুটি কুরআন শরিফে কয়েক স্থানে রয়েছে। প্রভু, বন্ধু, সঙ্গী ও সাহায্যকারী হিসেবে ‘মাওলা’ ও ‘মাওলানা’ ব্যবহার করা হয়েছে। সূরা আলবাকারায় রয়েছে-‘রাব্বানা ওয়ালা তুহাম্মিলনা মা লা তাকাতা লানা বিহি, ওয়ায়ফু আন্না অগফিরলানা ওয়ারহামনা আন্তা মাওলানা ফানসুরনা আলাল্ কাওমিল কাফিরিন।’ অর্থাৎ-হে আমাদের পালনকর্তা! এবং আমাদের এমন বোঝা বহন করতে দেবে না, যা বহন করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদের গুনাহ মোচন করো। আমাদের মাফ করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো। তুমিই আমাদের মাওলানা (প্রভু)। তাই কাফেরদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।

কুরআন শরিফের দ্বিতীয় পারায় সূরা বাকারার ২৮৬ নম্বর উক্ত আয়াতে আল্লাহপাককে ‘মাওলানা’ তথা আমাদের প্রভু বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতের ভিত্তিতে কতিপয় ব্যক্তি বলেন যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ‘মাওলানা’ বললে শিরক বা শিরকের সমতুল্য গুনাহ হবে। অথচ কুরআন মজিদে অপর একটি আয়াতে জিবরাইল আলাইহিস্ সালাম এবং নেক বা পুণ্যবান মুমিনদেরকে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও সালামের মাওলা বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই আয়াতটি হচ্ছে-‘ইন তাতুবা ইলাল্লাহি ফাকাদ সাগাত কুলুবুকুমা ও ইন তাজাহারা আলাইহি ফাইন্নাল্লাহা হুয়া মাওলাহু ওয়া জিবরিলু ওয়া সালিহুল মুমিনিন। ওয়াল মালাইকাতু বায়দা জালিকা জাহির।’ অর্থাৎ-তোমাদের অন্তর অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে যদি তোমরা উভয়ে তওবা করো, তাহলে ভালো কথা। আর যদি নবির বিরুদ্ধে তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো, তবে জেনে রেখো, আল্লাহ, জিবরাইল ও পুণ্যবান মুমিনগণ তাঁর (রাসূলের) মাওলা (সাহায্যকারী)। এছাড়া ফেরেশতারাও তাঁর (রাসূলের) সহায়। (পারা-২৮, সূরা আত্তাহরিম আয়াত-৪)

এই আয়াতে আল্লাহপাক নিজের পাশাপাশি জিবরাইল আলাইহিস্ সালাম এবং পুণ্যবান (সালেহ) মুমিনদেরকে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও সালামের ‘মাওলা’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই আয়াতে ‘মাওলা’ শব্দটি প্রভু অর্থে নয়; বরং সাহায্যকারী বা বন্ধু হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
কুরআন শরিফে অন্যত্র বন্ধু অর্থে ‘মওলা’ শব্দ এসেছে। হাশরের দিন প্রসঙ্গে আল্লাহপাক বলেন: ‘ইয়াওমান লা ইউগনি মাওলান আম্মাওলান শাইয়াওঁওয়ালাহুম ইউনসারুন।’ অর্থাৎ-যেদিন কোনো মাওলাই (বন্ধুই) কোনো মাওলার (বন্ধুর) উপকারে আসবে না এবং তাঁরা সাহায্য প্রাপ্তও হবে না। (পারা-২৫, সূরা আদ্ দুখান, আয়াত-৪১)
আল কুরআনে সঙ্গী অর্থেও ‘মাওলা’ শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। এক আয়াতে বলা হয়, জাহান্নাম হবে নাফরমানদের ‘মাওলা’ (সঙ্গী)। আল্লাহতায়ালা বলেছেন : ফাল ইয়াওমা লা ইউখাজু মিনকুম ফিদ্ইয়াতুওঁওয়ালা মিনাল্লাজিনা কাফারু, মা’ওয়াকুমুন্নার, হিয়া মাওলাকুম ও বিইসাল মাসির।’ অর্থাৎ-আজ তোমাদের কাছ থেকে কোনো মুক্তিপণ গ্রহণ করা হবে না এবং কাফেরদের কাছ থেকেও নয়। তোমাদের সকলের আবাসস্থল জাহান্নাম। সেটাই তোমাদের মাওলা (সঙ্গী)। এই প্রত্যাবর্তনস্থল কতইনা নিকৃষ্ট। (পারা-২৭, সুরা আলহাদিদ, আয়াত-১৫)।

বর্ণিত আয়াতসমূহ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয় যে, আল্লাতায়ালাই ‘মাওলা’ শব্দটি কুরআন শরিফে চারটি ভিন্নার্থে ব্যবহার করেছেন। তাই ‘মাওলা’ শব্দটি প্রভু ব্যতীত অন্যান্য অর্থে ব্যবহার করা কুরআনসম্মত। বিভিন্ন রকম দুরুদ শরিফ আছে অন্তত শ খানেক। অনেক দুরুদে ‘মাওলানা’ শব্দ রয়েছে। অর্থাৎ-মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও সাল্লামকে আমাদের ‘মাওলা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘মাওলানা’ শব্দ সংবলিত দুটি দুরুদ বহুলপঠিত। একটি হচ্ছে-‘সাল্লাল্লাহু আলা সাইয়িদিনা ও মাওলানা মুহাম্মাদ ও আলা আলিহি ও আসহাবিহি ও সাল্লাম।’ আরেকটি দুরুদ হলো-‘আল্লাহুম্মা সাল্লিা আলা সাইয়িদিনা মাওলানা মুহাম্মাদ ও আলা আলি সাইয়িদিনা মাওলানা মুহাম্মাদ।’ এ দুটি দুরুদে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও সাল্লামকে প্রভু হিসেবে ‘মাওলানা’ বলা হয়নি; বরং বন্ধু, সাহায্যকারী ও দয়াশীল অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে।

সহজ ও সাবলীল ভাষার কারণে ওই দুটি দুরুদ এ দেশের সাধারণ মুসলমানদের অনেকের মুখস্থ। তাই ভিত্তিহীন অজুহাতে দুরুদ দুটি পাঠে নিরুৎসাহিত করা বা বাধা দেওয়া মারাত্মক গুনাহের কাজ। কারণ কুরআন শরিফে দুরুদ পাঠের সরাসরি নির্দেশ রয়েছে। আল্লাহপাক বলেন: ‘ইন্নাল্লাহা ও মালাইকাতাহু ইউসাল্লুনা আলান্নাবিই, ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানু সাল্লু আলাইহি ও সাল্লিমু তাসলিমা।’ অর্থাৎ-নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও সাল্লামের উপর দুরুদ পাঠ করেন। হে ব্যক্তিরা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা নবির উপর দুরুদ ও সালাম পাঠ করো। (পারা-২২, সূরা আহ্জাব, আয়াত-৫৬) এই আয়াতের আলোকে বলা যায় যে, দুরুদ পাঠে বাধা দেওয়া বা নিরুৎসাহিত করা সুস্পষ্টভাবে আল্লাহর নির্দেশের বিরোধিতার নামান্তর।

বিশ্ববিখ্যাত অজিফা ‘দালাইলুল খাইরাত’-এ বর্ণিত অনেক দুরুদের মধ্যে ‘মাওলানা’ শব্দ সংযুক্ত দুরুদ আছে অন্তত ২৫টি। এই অজিফাটি সর্বশ্রেণির পির-মাশায়েখ পাঠ করে থাকেন। বিশ্বের নানা দেশে লাখ লাখ মুসলমান এই অজিফা পাঠ করেন। বর্তমান সৌদি আরবের কোনো এক এলাকা নিবাসী ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ বিন সুলাইমান আলজাজুলি রাহমতুল্লাহি আলাইহি এই অজিফা সংকলন করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উঁচুস্তরের ওলি এবং ৮৭০ হিজরিতে তার ওফাত হয়। এর ৭০ বছর পর তাঁর মৃতদেহ কবর থেকে তুলে বর্তমান মরক্কোর মারাকেশ শহরে পুনরায় দাফন করা হয়। ৭০ বছর পরও তাঁর মৃতদেহে সামান্য পচন বা বিকৃতি ছিল না; বরং মনে হচ্ছিল, কিছুক্ষণ পূর্বে তিনি ইন্তেকাল করেছেন।
অনুমিত হয় যে, আলোচ্য দু’টি দুরুদ শরিফ ৮৭০ হিজরির অনেক পূর্ব থেকে পঠিত হয়ে আসছে। বিগত অন্তত ৬শ বছরে কেউ এই দু’টি দুরুদ সম্পর্কে আপত্তি করেননি। আর বর্তমানে কতিপয় স্বঘোষিত পণ্ডিত এই দুরুদ দু’টি ভুল বলার ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছেন। এ যেন ‘কত গেলেন রথী মহারথী, আর শেওড়াতলায় চক্রবর্তী।’

এশিয়া ও আফ্রিকার নানা দেশের মুসলমানরা বিভিন্ন অর্থে ‘মাওলানা’ শব্দ ব্যবহার করেন। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে আলেম তথা ইসলাম ধর্মবেত্তাদের ‘মাওলানা’ ও ‘মৌলভি’ বলা হয়। এর প্রচলন হয় অনেক পূর্ব থেকে। দু’শতাধিক বছর পূর্বেও ভারতে আলেমদের ‘মাওলানা’ বলা হতো। ১৮৩১ সালে পাঞ্জাবের বালাকোট প্রান্তরে শিখদের সাথে মুজাহিদ বাহিনীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধের নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা সাইয়িদ আহমদ শহিদ বেরেলভি রহমতুল্লাহি আলাইহি (১৭৮৬-১৮৩১)। তাঁর সহ-নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা শাহ ইসমাইল শহিদ ও মাওলানা আবদুল হাই রাহমতুল্লাহি আলাইহি। যুদ্ধে তিনজনই শাহাদাত বরণ করেন। তাদের অন্যান্য সহযোদ্ধার অনেকে আলেম এবং ‘মাওলানা’ বলে পরিচিত ছিলেন। উল্লেখ্য, মাওলানা সাইয়িদ আহমদ শহিদ বেরেলভি রাহমতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন তদানীন্তন ভারতের যুগশ্রেষ্ঠ আলেম মাওলানা শাহ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভি রাহমতুল্লাহি আলাইহির শিষ্য। মাওলানা শাহ ইসমাইল শহিদ ও মাওলানা আবদুল হাই রহমতুল্লাহি আলাইহি যথাক্রমে শাহ আবদুল আজিজ রাহমতুল্লাহি আলাইহির ভ্রাতৃষ্পুত্র ও জামাতা ছিলেন। ‘মাওলানা’ ব্যবহার গুনাহের কাজ হলে তাঁরা নিশ্চয়ই তা করতেন না।

আফ্রিকার সোয়াহিলি (SWAHILI) জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ‘মাওলানা’ শব্দের প্রচলন রয়েছে। সমাজপতি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ‘মাওলানা বলা হয়। তাঞ্জানিয়া, কেনিয়া, মোজাম্বিক, সোমালিয়া ও কমরোতে সোয়াহিলিদের বসবাস এবং তারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী। (উইকিপিডিয়া) ইরান এবং তুরস্কেও ‘মাওলানা’ শব্দটি প্রচলিত। তবে এ দুটি দেশে শুধু প্রখ্যাত মরমি কবি জালাল উদ্দিন রুমিকেই মাওলানা বলা হয়। তুর্কিরা ‘মাওলানা’র উচ্চারণ করেন ‘মেভলানা।’ (উইকিপিডিয়া)

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আল্লাহর গুণবাচক ৯৯টি নাম রয়েছে। এগুলোকে বলা হয় ‘আসমাউল হুসনা।’ আল্লাহর এই ৯৯ নামের মধ্যে ‘মাওলা’ বা ‘মাওলানা’ নেই। এতেই প্রতীয়মান হয় যে, ‘মাওলা’ শব্দটি শুধু আল্লাহ পাকের জন্য নির্ধারিত নয়। অথচ ‘আসমাউল হুসনা’র প্রায় সকল নামই আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। যেমন-রাহমান, রাহিম, মুকিত, গাফ্ফার, গফুর, হাফিজ, মালিক, গনি প্রভৃতি। আসমাউল হুসনাভুক্ত আল্লাহর একটি নাম হচ্ছে ‘ওয়াকিল।’ এই শব্দটির একাধিক অর্থ রয়েছে। যথা-ভাঙা-গড়ার নিয়ামক, যিনি অন্যের হয়ে কাজ করেন, কৌঁসুলি। আল্লাহ যেহেতু ভাঙা-গড়ার নিয়ামক, তাই ‘ওয়াকিল’ তাঁর একটি গুণবাচক নাম।

এদিকে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও সাল্লামের গুণবাচক ২০১টি নামের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘ওয়াকিল।’ কারণ তিনি তাঁর উম্মতের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করেছেন এবং হাশরের দিনেও আল্লাহর কাছে উম্মতের জন্য সুপারিশ করবেন। বাংলায় প্রচলিত উকিল হচ্ছে ‘ওয়াকিল’ শব্দের অপভ্রংশ। আরবিতেও আইনজীবীদের ‘উকিল’ বলা হয়। ‘ওয়াকিল’ শব্দের একাধিক অর্থ থাকার কারণেই তা আল্লাহর গুণবাচক নাম হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য অর্থে অহরহ প্রয়োগ হচ্ছে।

আল্লাহতায়ালা কুরআন শরিফে নিজেকে ‘সুলতান’ বলেও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন : ‘ইয়া মায়শারাল জিন্নি ওয়াল্ ইনসি, ইননিস্তাতায়তুম আন তানফুজু মিন আকতারিস্ সামাওয়াতি ওয়াল্ আরজি, ফানফুজু লা তানফুজুনা ইল্লা বিসুলতান।’ অর্থাৎ-হে জিন ও মানবকুল! তোমরা আকাশমণ্ডল ও ভূমণ্ডল থেকে যদি চলে যেতে পারো তাহলে চলে যাও, কিন্তু সুলতানের অনুমতি ছাড়া যেতে পারবে না। (পারা-২৭, সূরা আররাহমান আয়াত ৩৩) আল্লাহপাক নিজেকে সুলতান বলে উল্লেখ করলেও আসমাউল হুসনায় তা’ নেই। ‘সুলতান’ শব্দের অর্থ হচ্ছে-বাদশাহ, শাসক, সাম্রাজ্য, দলিল, মহিমা, বিশেষ ক্ষমতা। আরবিতে রাজাবাদশাহদের ‘সুলতান’ বলা হয়। আরবের ওমানের শাসকের উপাধি ‘সুলতান।’ আমাদের দেশেও একসময় সুলতানি শাসন ছিল।

এই আলোচনায় নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, ‘মাওলা’ বা ‘মাওলানা’ শব্দদুটি শুধু আল্লাহর জন্য নির্ধারিত নয়। বিভিন্ন অর্থে শব্দ দু’টি প্রয়োগ করা হয়। কুরআন শরিফেও তা-ই করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘মাওলানা’ শব্দ সংবলিত দুরুদ পাঠ মোটেই গুনাহের কাজ নয়। বরং দুরুদ পাঠে বাধা দেওয়া বা বিরূপ মন্তব্য করা কূপমণ্ডূকতার পরিচায়ক। আলেম-ওলামাদের ‘মাওলানা বা মৌলভি’ আখ্যায়িত করাও গর্হিত নয়। এই উপমহাদেশ ছাড়াও এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ‘মাওলানা’ বলা হয়ে থাকে। তাই ‘মাওলানা’ নিয়ে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করা ফিৎনাবাজির নামান্তর। এমন ঘৃণিত ও গুনাহের কাজ থেকে আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে দূরে থাকার তওফিক দান করুন। আ-মিন

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: