সর্বশেষ আপডেট : ১৬ মিনিট ৪৯ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৬ আশ্বিন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

শিশু নির্যাতন ও আমাদের সামাজিক অবক্ষয়

মো. সাইদুর রহমান::
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের জাতির ভবিষ্যৎ। তারা শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়, চিন্তায়-চেতনায় ও মননে যত সমৃদ্ধ হবে জাতির ভবিষ্যৎ তত শক্তিশালী হবে। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশুদের সার্বিক পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। গত সাড়ে তিন বছরে দেশে ৯৬৮টি শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। যেখানে ২০১২ সালে ২০৯, ২০১৩ সালে ২১৮, ২০১৪ সালে ৩৫০ এবং ২০১৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৯১ জন। ২০১৪ সালে শিশুহত্যার হার আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৬১ শতাংশ বেশি ছিল। এ বছর হত্যার পাশাপাশি বেড়েছে নৃশংসতাও । বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিসংখ্যানে এ তথ্য প্রকাশ করে । বর্তমানে শিশুহত্যার প্রক্রিয়া বীভৎস থেকে বীভৎসতর হচ্ছে । এ ধরনের নৃশংস ঘটনার শিকার হচ্ছে মূলত দরিদ্র পরিবারের শিশুরা। নির্যাতনকারীরা হচ্ছে প্রভাবশালী।আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশু নির্যাতন একটি চলমান সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আর সব নির্যাতনে বীভৎসতার মাত্রা ছিলো অবিশ্বাস্য ।

২৬ জুলাই, ২০১৫ দুপুরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে একা পেয়ে জুয়েল ও মিন্টু একটি ঘরে নিয়ে শিশু রুবিনাকে (৭) ধর্ষণ করে। এতে শিশুটির অনেক রক্তক্ষরণ হলে তাঁরা গলাটিপে হত্যা করে শিশুটির লাশ বস্তায় ঢুকিয়ে পার্শ্ববর্তী বিলের একটি ঝোঁপে ফেলে দেয় ।এ রকম শত শত লোমহর্ষক ধর্ষণের ঘটনা আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারি।

গত ৪ আগষ্ট মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে সুটকেসের ভেতর থাকা একটি ছেলেশিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার পিঠে ছিল পাঁচ ইঞ্চির মতো গভীর জখম। বুকে ও কপালে ছ্যাঁকার দাগ ছিল। থুতনিতেও জখমের চিহ্ন ছিল। শিশুটির বয়স আনুমানিক নয় বছর।

’অ ভাই আমারে এক গললাস (গ্লাস) পানি দেওরেবা, আমার গলা হুকাইগেছে (শুকিয়ে গেছে), আর আমারে মারিও না, আমার আত-পাও ভাংগি গেছে (হাত-পা)” এত সব কথা বলার পরও মন গলেনি পাষণ্ড খুনীদের। গত ৮ জুলাই সিলেট-সুনামঞ্জ রোডের কুমারগাঁও বাসস্টেশন এলাকার বড়গাঁওস্থ সুন্দর আলী মার্কেটের একটি ওয়ার্কশপের সামনে বারান্দার খুঁটিতে বেঁধে রেখে নির্যাতন করে হত্যা করা হয় রাজনকে। ঐ দিন সকাল সাতটার দিকে শিশুটিকে এমন নির্যাতন করে লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়। ওইদিন পর্যন্ত সেটি গুমই ছিল। রাত ১১টার দিকে একটি মাইক্রোবাস থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে ১০ জুলাই বুধবার রাত ১১টায় থানায় গিয়ে পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত করেন।

বরগুনায় রবিউল আউয়াল নামে ১১ বছরের এক শিশুকে চোখে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। মাছ চুরির ‘অপবাদে’ স্থানীয় এক ব্যক্তি এই বীভৎস কায়দায় তাকে হত্যা করেছে বলে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে।

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর পল্লবীতে ডাস্টবিনের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয় নির্যাতনের বীভৎস শিকার গৃহকর্মী আদুরিকে। খুলনায় ১৩ বছরের সীমাকে গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী শুধু হত্যাই করেনি, দীর্ঘ ৯ মাস ডিপ ফ্রিজে রেখে দিয়েছিল।

খুলনায় নির্যাতনের শিকার হওয়া ১২ বছর বয়সী রাকিব গ্যারেজ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এ কারণে আগের গ্যারেজ মালিক ও তার সহযোগী রাকিবকে ধরে মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেওয়ার কমপ্রেসর মেশিনের নল ঢুকিয়ে দেয় তার মলদ্বার দিয়ে। এরপর চালু করে দেওয়া হয় কমপ্রেসর। নল দিয়ে পেটে বাতাস ঢুকে শিশুটির দেহ ফুলে প্রায় বড়দের মতো হয়ে যায়। ছিঁড়ে যায় নাড়িভুঁড়ি, ফেটে যায় ফুসফুসও। মৃত্যু হয় রাকিবের।

এতো নির্যাতনের পরে মায়ের পেঠেও শিশু নিরাপদ থাকেনি। আর তাই মাগুরায় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় মা ও তাঁর পেটের শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা তো দেশজুড়েই আলোচিত।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ৬৩ জন শিশু যৌন হয়রানি এবং ৩২২ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়।
আড়াইশোর বেশি মানবাধিকার সংগঠনের জোট শিশু অধিকার ফোরামে বলছ, গত ৭ মাসে বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ২৮০ টি।
শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আব্দুছ সহীদ মাহমুদ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, গতবছর এই সংখ্যা ছিল ১৯৯টি। আর ২০১৩ সালে ১৭০টি এবং ২০১২ সালে ছিল ৮৬টি। এই সংখ্যা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এর বাইরেও থাকতে পারে।

বিএসএএফ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে অপহৃত হয় ১১৮ জন শিশু। এদের মধ্যে ৫০ জনকে হত্যা করা হয়। ৬৬ জন অপহৃত শিশুকে উদ্ধার করা হয়। ২০১৩ সালে ৪২ জন শিশু অপহরণের শিকার হয়। তাদের মধ্যে হত্যা করা হয় ১৩ জনকে। ২০১২ সালে ৬৭ জন শিশু অপহৃত হয়।

শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে যৌন হয়রানি, ধর্ষণসহ অপহরণের ঘটনা।যে সব মানবিক গুণাবলীর অভাবে একটি সমাজ নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম শিশু নির্যাতন।আমাদের দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন, ১৯৯৫ প্রচলিত আছে। এই আইন অনুযায়ী কোন ব্যক্তি যদি বিষাক্ত, দাহ্য বা দেহের ক্ষয় সাধনকারী কোন বস্তু দ্বারা কোন নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটায় তবে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। অন্যথায়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ন্যূনতম ৭ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এতোসব আইন থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে অহরহ নানাভাবে শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এসব শিশু নির্যাতনের যে ভয়াবহতা তা যে কোন সভ্য-শিক্ষিত সমাজের জন্য কলঙ্ক।আর তাই আমাদের সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে শিশু নির্যাতনের প্রতিবাদে এগিয়ে আসতে হবে, তৈরি করতে হবে গণ সচেতনতা । আমাদের মনে রাখতে হবে শিক্ষা-সংস্কৃতির দিক থেকে আমরা যতদূরই অগ্রসর হই না কেন, শিশু নির্যাতন বন্ধ না হলে আমাদের সব অর্জন স্লান হয়ে যাবে।

লেখক: সংবাদকর্মী

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: