সর্বশেষ আপডেট : ৭ ঘন্টা আগে
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুন, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

কোকাকোলার এই ইতিহাসটা অনেকেরই অজানা

amazing-history-of-cocacola-pic4-copyডেইলি সিলেট ডেস্ক ::

নায়াগ্রা জলপ্রপাত সম্পর্কে আমাদের সকলেরই কম বেশি জানাশোনা আছে। প্রতি সেকেন্ডে কি পরিমাণ পানি উপর থেকে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে তা ধারণাই করা যায় না। এই নায়াগ্রা জলপ্রপাত দিয়ে যে পরিমাণ পানি ২০ ঘন্টায় নিচের দিকে গড়িয়ে পরে সেই পরিমাণ কোকাকোলা এ পর্যন্ত বিশ্ববাসী পান করেছেন। অতএব বুঝতেই পারছেন এই পানীয়টির জনপ্রিয়তা কতখানি। অথচ এই পানীয়টির আবিষ্কারের দিকে চোখ ফেরালে দেখা যায় অনেকটা অজান্তেই আবিষ্কৃত হয় সারা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা এই পানীয়টি।

আবিষ্কারকের কিছু কথা : শুরুতেই আসা যাক জনপ্রিয় এই পানীয়টির আবিষ্কারকের দিকে। জন স্মিথ পেমবার্টন কোকাকোলা নামক এই পানীয়টির আবিষ্কারক। তিনি ছিলেন একজন হাতুড়ে ডাক্তার বা ছোটখাটো রসায়নবিদ। তিনি তার তৈরি করা ওষুধ ফেরি করে বিক্রি করতেন। এছাড়া তার এক ধরনের আবিষ্কারের নেশাও ছিল। তিনি বাস করতেন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায়। পেমবার্টনের একজন ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলেন। তিনি হলেন ফ্র‌্যাংক রবিনসন।

কোকাকোলা আবিষ্কারের গল্প : কাজের ফাঁকে ফাঁকে পেমবার্টন সুস্বাদু একটি সফট ড্রিংকস তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন। দিনটি ছিল ১৮৮৬ সালের ৮ মে। প্রথম প্রচেষ্টাতে তিনি এক ধরনের সিরাপ তৈরি করেন, যেটি কিনা প্রতি গ্লাস ৫ সেন্ট করে বিক্রি করা হতো। মাথাব্যাথা ও ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ এই সিরাপ খেত৷ অনেকে বলেন এই সিরাপই হলো বর্তমান সময়ের কোকাকোলা। কিন্তু বাস্তবে বর্তমান কোকাকোলা সেই সিরাপ বা শরবত নয়। এটি মূলত কোকাকোলার আদি সংস্করণ। পরে নতুন আরও অনেক কিছু যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে বর্তমান কোকাকোলা। এরপর পেমবার্টন আদর্শ একটি সফট ড্রিংকস আবিষ্কারে মনোনিবেশ করেন। ২য় ধাপে এসে পেমবার্টন সেই সিরাপ এর সাথে কোকা গাছের পাতার নির্যাস মিশিয়ে নতুন এক ধরনের পানীয় তৈরি করেন। যার নাম দেন ‘ভিন মারিয়ানি’। এটি ওষুধের দোকানে নার্ভ সতেজ রাখার টনিক হিসেবে বিক্রি করা হতো। কিন্তু পেমবার্টন চেয়েছিলেন এমন কোনো পানীয় তৈরি করতে যেটি পান করলে একই সাথে তৃষ্ণা নিবারণ ও শরীর মনে চনমনে ভাব চলে আসবে। পেমবার্টন আগে থেকেই জানতেন যে, আফ্রিকার অরণ্যবাসীরা তৃষ্ণা নিবারণ ও শরীর চনমনে রাখতে কোলাগাছের বাদাম চিবিয়ে খায়। তাই তিনি এবার তার সেই যুগান্তকারী পানীয় আবিষ্কারের জন্য সেই কোলাগাছের বাদামের প্রতি মনোযোগ দেন। পেমবার্টন তার ল্যাবরেটরিতে কোলা গাছের বাদাম পরীক্ষা করে দেখেন তাতে রয়েছে ক্যাফেইন ও থিওব্রোমিন। এই দুটির মিশ্রণে তৈরি পানীয়টি স্টিমুল্যান্ট বা উত্তেজক ওষুধের কাজ করে। পেমবার্টন তার আগের সেই সিরাপের সাথে কোলা গাছের বাদামের গুড়া, চিনি এবং কিছু সুগন্ধি দ্রব্য মেশান। তারপর সেই মিশ্রণ থেকে বুদবুদ উঠতে থাকে এবং এক ধরনের গাঢ় পানীয় তৈরি হয়। উচ্ছ্বসিত পেমবার্টন একদিন তার আবিষ্কৃত নতুন পানীয়টি একটি তিন চাকাযুক্ত একটি বড় পিতলের পাত্রে করে ঠেলে নিয়ে যান তার পার্টনার ফ্র্যাংক রবিনসনের কাছে। পেমবার্টন এর আবিষ্কৃত নতুন পানীয় পান করেই রবিনসন উল্লসিত হয়ে সাথে সাথে পানীয়টির নাম দেন ‘কোকাকোলা’। কিন্তু এটিও কিন্তু বর্তমান সময়ের কোকাকোলা নয়। এরপরও এর সাথে আরও অনেক কিছু যোগ করা হয়েছে। উল্লেখ্য প্রথমদিকে কোকাকোলার সাথে কোকেন মেশানোর বিষয় খুব ভালোভাবে প্রচলিত ছিল।

এরপরের গল্প : প্রথম দিকে প্রতিদিন ৯ গ্লাস কোকাকোলা বিক্রি হত। প্রথম বছরে তিনি ৫০ ডলার আয় করেন কিন্তু ব্যয় হয় ৭০ ডলার। ব্যবসা সম্পর্কে পেমবার্টন খুব বেশি কৌশলী ছিলেন না। তাই তিনি তার ব্যবসায়ের সমস্ত শেয়ার একে একে বিভিন্ন জনের কাছে বিক্রি করে দিতে থাকেন। ১৮৮৯ সালে এ.জি ক্যান্ডলার নামে এক ব্যবসায়ীর কাছে তার আবিষ্কৃত পানীয়টির তৈরির ফর্মূলা সহ সমস্ত শেয়ার বিক্রি করে দেন।

পেমবার্টন এর গল্পের ইতি : ক্যান্ডলারের কাছে ফর্মূলা ও শেয়ার বিক্রি করার পর ‘কোকাকোলা’র সাথে পেমবার্টন এর আর কোনো সম্পর্ক নেই। পেমবার্টন এর কাছ থেকে শেয়ার কেনার তিন বছর পর ক্যান্ডেলার পেমবার্টন এর অভিজ্ঞ পার্টনার রবিনসন ও আরও দুজন ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে ‘কোকাকোলা কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় তাদের মূলধন ছিল ১ লাখ ডলার। ক্যান্ডেলার পেমবার্টন এর আবিষ্কৃত পানীয়তে কিছুটা পরিবর্তন আনেন। তিনি এর সাথে কার্বনেটেড ওয়াটার বা কার্বন ডাই অক্সাইড মিশ্রিত পানি মিশিয়ে এক রসনামুগ্ধ পানীয় উপহার দিলেন। ক্যাণ্ডলারই প্রথম ব্যক্তি যিনি কোকাকোলাকে এতটা জনপ্রিয় করে তোলেন। ফলে নতুন স্বাদের এই ‘কোক’ বাজারে হু হু করে বিকোতে লাগল। প্রথমে গ্লাসে গ্লাসে শরবত হিসাবে বিক্রি হলেও বোতলভর্তি কোকাকোলা বিক্রি শুরু হয় ১৮৯৪ সালে। কিন্তু তার আগে তাদেরকে নতুন এই পানীয়টিতে মানুষকে অভ্যস্ত করতে বহু চড়াই-উৎরাই ও কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে।

প্রথম দিকে ফ্রি খাওয়ানো হতো : যারা নতুন এই পানীয়টি সম্পর্কে জানতো তারা এমনিতেই এটি কিনে পান করতো। কিন্তু এভাবে তো আর ব্যবসা বাড়বে না। তাই যারা এই পানীয়টি সম্পর্কে জানে না, তাদেরকে জানানোর জন্য ক্যান্ডেলার ১৮৯১ সালে ক্যালেন্ডারে, পেপারে এবং নোটবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে ভোক্তাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন। এতেও যখন খুব বেশি লাভ না হয় তখন ক্যান্ডেলার বিপণন কর্মী নিয়োগ দেন। যাদের কাজ ছিল সাধারণ মানুষের কাছে ফ্রি কুপন বিলি করা। এই ফ্রি কুপন দিয়ে দোকান থেকে বিনামূল্যে কোক পাওয়া যেত। এটি ছিল ক্যান্ডেলারের ব্যবসায়িক কৌশল। যারা প্রথমবার ফ্রি-তে এই কোকাকোলা পান করেন, তারা পরবর্তীতে টাকা দিয়ে কিনে কোকাকোলা পান করতে বাধ্য হয়েছেন। এভাবেই আস্তে আস্তে আমেরিকাবাসীদের কাছে কোকাকোলা জনপ্রিয় একটি পানীয়তে পরিণত হয়। একসময় আমেরিকার সীমানা পেরিয়ে সারা বিশ্বজুড়েই জনপ্রিয় হয়ে উঠে এই পানীয়টি। ২০০ টির বেশি দেশে কোকাকোলার পণ্য এখন বাজারজাত করা হচ্ছে। হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি আছে যাদের পণ্য কিনা ২০০ টির ও বেশি দেশে বাজারজাত করা হচ্ছে।

গরমের তুলনায় শীতে ব্যবসা ভালো ছিল না : শুরুর দিকে গরমের সময়ে এই কোমল পানীয়টির ভালো বিক্রি থাকলেও শীতের সময়ে তা একেবারেই কমে যায়। বেশ কয়েকবছর এভাবেই চলতে থাকে। ক্যান্ডেলারের মাথায় তখন ভর করে নতুন এক কৌশল। ১৯২২-এর ডিসেম্বরে পুরো পাতা জুড়ে কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন: ‘থার্স্ট নোওজ নো সিজন’! চারটি শব্দের ওই বিজ্ঞাপন কয়েকবার ছাপাবার পর ম্যাজিকের মতো কাজ হল। শীতেও বিক্রি এত বাড়তে শুরু করল যে, প্রস্তুতকারকরা হিমসিম খেয়ে গেলেন।

নামকরণ ও লোগো : ‘কোকাকোলা’ নামকরণটি করেন পেমবার্টন এর ব্যবসায়িক পার্টনার ফ্র‌্যাংক রবিনসন। cocain এবং cola nut থেকে কোকাকোলার মূল উপাদান সংগ্রহ করা হয় তাই এর নাম হয় কোকাকোলা। সে সময় তিনি বাকা অক্ষরে একটি লোগোও তৈরি করে দেন। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কোকাকোলার অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও নাম ও লোগোর কোনো পরিবর্তন করা হয় নি। কিন্তু প্রচলিত রয়েছে যে, সারাবিশ্বের মার্কেট ধরার জন্য তারা তাদের লোগোতে পরিবর্তন আনে। একারণে লাল সাদা রং ও প্যাঁচানো ইংরেজি অক্ষরে কোকাকোলা লোগোটি ব্যাবহার শুরু করে।

সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা : সারা আমেরিকায় জনপ্রিয় হবার পর কোকাকোলা কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করে তাদের এখন ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করা উচিৎ। এ উদ্দেশ্যে তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে কাজে লাগায়। আমেরিকান সৈন্যদের হাত ধরে কোকাকোলা পৌঁছে যায় ইউরোপ এবং এশিয়ায়। তারা বিভিন্ন দেশের স্থানীয় বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে ব্যাবহার শুরু করে। যার ফলে বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে একেবারে লোকাল ব্র্যান্ড রূপে নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়। বিশ্বে সম্ভবত মায়ানমার ও সিরিয়া বাদে বাকি সব দেশেই কোকাকোলা পাওয়া যায়। বিভিন্ন সংকটপূর্ণ বাজারেও (যেমনঃ পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, জিম্বাবুয়ে ইত্যাদি) তারা সফল ভাবে তাদের ব্যাবসা পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। তাদের রয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল। যার ফলে যেখানে আপনি থাকুন না কেন হাটা দূরত্বের মধ্যই কোকাকোলা পেয়ে যাবেন। তাদের ব্র্যান্ডভ্যালু এত শক্ত যে ইংরেজি শব্দ ‘Kola’ পরিবর্তন হয়ে ‘Cola’ হয়ে গিয়েছে। এমনকি ৯/১১ এর পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী মনোভাব কোকাকোলার প্রবৃদ্ধি ঠেকাতে পারে নিঃ।

পৃথিবীর সবচেয়ে গোপন রেসিপি : পৃথিবীতে গোপন যত বিষয় আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো কোকাকোলার রেসিপি। কোকাকোলার রেসিপিটি তৈরি করেন পেমবার্টন। ক্যান্ডেলার, পেমবার্টন এর কাছ থেকে রেসিপি সহ সম্পূর্ণ স্বত্ব কিনে নেন। যুগ যুগ ধরে অতি বিশ্বস্ত কোনো লোক ছাড়া কোকাকোলার এই রেসিপিটি সম্পর্কে কেউ জানতো না। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ৬.৬ ফুট মোটা ধাতব একটি ভল্ট বানানো হয় যেখানে কোকাকোলার রেসিপি নিয়ে কাজ করা হয়। এখানে রেসিপি সংশ্লিষ্ট বিশ্বস্ত লোক ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারে না। শত চেষ্টা করলেও বাইরের কেউ এই ভোল্টের ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে না।

যারা তৈরি করেন তারাও ঠিকভাবে জানেন না রেসিপি : ঠিকভাবে জানেন না এই কারণে বলছি যে, কোকাকোলা তৈরিতে যে উপাদানগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলো তারা চিনেন কিন্তু কোনটির কি নাম তারা তা জানেন না। কেননা যেসব বোতলে সেই উপাদানগুলো থাকে তার গায়ে কোনো লেবেল লাগানো থাকে না। তারা মূলত গন্ধ ও রং দেখে উপাদানগুলো ব্যবহার করে। আমেরিকার ট্রাস্ট কোম্পানি অব জর্জিয়া নামের ব্যাঙ্কের সেফ্ ডিপোজিট ভল্টে ‘7x’ চিহ্নিত কোকের ‘রিয়েল থিং’টি সযত্নে রাখা হয়েছে। যে দশ জন অফিসারের হাতে ফর্মুলার চাবিকাঠি রয়েছে, তাঁদের একসঙ্গে বসবাস এবং চলাফেরা নিষিদ্ধ। কারণ যদি তাঁরা অপহৃত হন বা দুর্ঘটনার কবলে পড়েন।

যুগ যুগ ধরেই গবেষকরা চেষ্টা করছেন কোকাকোলার রেসিপি নিয়ে : একদিকে কোকাকোলা কর্তৃপক্ষ তাদের রেসিপিটি গোপন রাখার জন্য সর্বোচ্চ গোপনীয়তা অবলম্বন করছেন। অপরদিকে সারা বিশ্বের গবেষকরা বছরের পর বছর গবেষণা করে চলেছেন কোকাকোলার রেসিপির রহস্য উদঘাটনে। বেশিরভাগই ব্যর্থ হলেও অনেকে কোকাকোলার গোপন রেসিপির সন্ধান পেয়েছেন বলে দাবি করেন। আমেরিকার উইলিয়াম পাউণ্ড স্টোনও কোক-রহস্যের হদিশ দিয়েছেন তাঁর ‘বিগ সিক্রেটস’ গ্রন্থে। কোক-পানীয়তে যে সব সম্ভাব্য উপাদানের কথা বলেছেন সে সব হল—চিনি, ক্যাফেইন, ক্যারামেল, ফসফরিক অ্যাসিড, কোক-পাতার নির্যাস, কোলা-নাট, সাইট্রিক অ্যাসিড, কমলালেবু, লাইম-জুস, দারুচিনি, জায়ফলের তেল, গ্লিসারিন, ভ্যানিলা এবং ‘সেভেন এক্স’ নামের এক ‘রিয়েল থিং’। কিন্তু ‘সেভেন এক্স’টা যে কি সেটা তিনিও জানাতে পারেননি।

আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে কোকাকোলার গোপন রেসিপি : সারা বিশ্ব জুড়ে হইচই ফেলে দেওয়া একটি পানীয়র গোপন রেসিপি সম্পর্কে টনক নড়ে আমেরিকার ফেডারেল সরকারের। ১৯০৯ সালে আমেরিকার ফেডারেল সরকার কোকাকোলার গোপন রেসিপি জানার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হন। এই মামলাটি ৯ বছর ধরে চলে। অবশেষে আদালতের রায় কোকাকোলা কোম্পানির পক্ষেই যায়।

প্রতিযোগী কোম্পানির আবির্ভাব : কোকাকোলার গোপন রেসিপি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়ার পর কিছু প্রতিযোগী পানীয় কোম্পানি কোকাকোলার উপাদান অনুসরণে নতুন পানীয় প্রস্তুত করে বাজারে ছাড়েন। কিন্তু কোকাকোলার সেই স্বাদ কেউই তৈরি করতে পারেন নি। কারণ সেই কোম্পানিগুলোর অ্যানালিস্টদের উপাদানগুলোর অনুপাত সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ছিল না। তারা তাদের পানীয়তে অতিরিক্ত পরিমাণে কোকা ও কোলা ব্যবহার করেন। যার কারণে স্বাদের তারতম্য ঘটে।

গুজব : প্রতিযোগী কোম্পানিগুলো কিছুতেই কোকাকোলার গোপন রেসিপি সম্পর্কে জানতে না পেরে অবশেষে বাজারে এক ধরনের গুজব ছড়িয়ে দেয়। ১৯৫৪ সালে মরক্কোর লোকেরা প্রচার করে যে, কোকাকোলাতে শুয়োরের রক্ত মেশনো হয়। আফ্রিকানরা বলেন, কোকাকোলাতে কড়া ডোজের কোকেন মেশনো হয়। ভারতীয়রা বলেন, কোকাকোলাতে মানুষের দেহের বর্জ্য পদার্থ মেশানো হয়। এছাড়া আরও বলা হয় যে, কোকাকোলায় কফির উপক্ষার, ফসফরিক অ্যাসিড ও চিনির ব্যবহারের ফলে দাঁতে ক্ষয় হয়। কিন্তু কোকাকোলার জনপ্রিয়তার কাছে কোনোকিছুই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে নি।

মানবদেহের ক্ষতিকর উপাদান: বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এই পানীয় কোম্পানিটিকে আদালতের কাঠগড়ায়ও দাঁড়াতে হয়েছিল। ভারতের ‘সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যাণ্ড এনভায়রনমেন্ট’ (CSE) কোকাকোলার ১২টি পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে মানবদেহ ও উদ্ভিদ দেহের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশক, পোকামাকড় ধ্বংসকারী রসায়নিক দ্রব্যাদির মিশ্রণ এমন মাত্রায় রয়েছে যার কারণে পাকস্থলির বিভিন্ন অসুখ, দেহে খনিজ পদার্থের ঘনত্ব কমানো, স্নায়ুতন্ত্রে সমস্যা, জন্মকালীন বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। কোক-বটলিং প্ল্যান্টের বর্জ্যেও পাওয়া পাওয়া গেছে বিষাক্ত ক্যাডমিয়াম ও সিসা। ক্যাডমিয়াম বিকল করতে পারে কিডনি। সিসার প্রভাবে শিশুদের মধ্যে দেখা দিতে পারে মানসিক জড়তা ও ভয়াবহ রক্তাল্পতা! এই কারণে ২য় বারের মতো ভারতে কোকাকোলা নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এতোকিছুর পরও সারা বিশ্বে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই কোকাকোলার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এখনও সারা বিশ্ব জুড়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে কোকাকোলা।

নতুন লেবেলে বাজারে এসেছে কোকাকোলা : কোকাকোলা মানেই লাল রংয়ের লেবেল ও লাল ঢাকনাওয়ালা বোতল। কোকাকোলা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর থেকে কোনোদিন এর লেবেলে পরিবর্তন করা হয় নি। সবসময় লাল লেবেলেই বাজারজাত করা হতো। ২০০১৩ সালের নভেম্বরে এসে চিরায়ত লাল লেবেল এবার হয়েছে সবুজ, পানীয়তে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক উপাদান এবং এর নাম দেয়া হয়েছে কোকাকোলা লাইফ। আর্জিন্টিনায় উৎপাদিত হয়েছে নতুন এই কোক। আর্জেন্টিয়ায় উৎপাদিত হলো সবুজ লেবেলের কোকাকোলা লাইফ, যাতে মেশানো হয়েছে স্টেভিয়া নামের একটি গাছের এক্সট্রাক্ট। স্টেভিয়া নামের লাতিন আমেরিকান গাছটির পাতা কিছুটা মিষ্টি স্বাদের। এটি ব্যবহারে পানীয়টির সাধারন ক্যালরি লেভেল দ্বিগুন পরিমানে কমে গেছে। এই উপাদান অন্যান্য অনেক ব্র্যান্ডের পানীয়তে হরহামেশাই ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে কোকাকোলার দাবি, তাদের মিশ্রনটিই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর। শুধু লেবেলিং বা পানীয়তে নয়, কোকাকোলা লাইফের বোতলটিতেও পরিবর্তন এসেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর প্লাস্টিকে মেলানো হয়েছে ৩০ শতাংশ ভেজিটেবল ফাইবার।একদিকে যখন সাম্প্রতিক সময়ে এই বিখ্যাত ব্র্যান্ডটির বাজার কিছুটা পড়তে শুরু করেছে, তখনই এই নতুন সংস্করণ নিয়ে এসেছে আর্জেন্টিনার কোকাকোলা। তারা আশা করছে, নতুন লেবেল ও পানীয় সমৃদ্ধ কোকাকোলা লাইফ খুব সহজেই স্বাস্থ্য-সচেতন ক্রেতাদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

কোকাকোলার মজার ও অজানা কিছু তথ্য : এখন পর্যন্ত উৎপাদিত কোকাকোলার ৮ আউন্সের বোতল সবগুলোকে যদি পাশাপাশি এক প্রান্তের সাথে আরেক প্রান্ত লাগিয়ে শেকলের মত করে রাখা হয় তাহলে অন্তত ১০০০ বার চাঁদে আসা যাওয়ার সমান লম্বা হবে। একই ভাবে এ যাবত কালে উৎপাদিত হওয়া সব কোকাকোলার চেইন বানালে পুরো পৃথিবী ৪০০০ বারের বেশি ঘুরে আসা যাবে।
এখন পর্যন্ত উৎপাদিত কোকাকোলার সব বোতল যদি মানুষের মাঝে বিলি করা হয় তাহলে প্রত্যেকে ১০০০ টির বেশি বোতল পাবে।
পুরো বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮০০০ গ্লাসেরও বেশি কোকাকোলা খাওয়া হয়ে থাকে।
এ যাবত কালে উৎপাদিত সব কোকাকোলা ঢেলে যদি একটি সুইমিং পুল বানানো হতো তাহলে সেই সুইমিংপুলের দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩০ মিলোমিটার ও প্রস্থে ১৫ কিলোমিটার হতো। এর গভীরতা হতো ২০০ মিটার। এই সুইমিং পুলে প্রায় হাফ বিলিয়ন মানুষ গোসল করতে পারবে।
কোকাকোলা ব্র‌্যান্ড কোক ছাড়াও আরো প্রায় ৩৫০০ রকমের বেভারেজ তৈরি করে। প্রতিদিন অন্তত ৩টা করে বেভারেজ খেলেও সবগুলোর স্বাদ নিতে আপনার ৩ বছরেরও বেশি সময় লাগবে।
পৃথিবীর ৯০% মানুষই কোকাকোলার লাল লোগোটি চেনে।
কোকাকোলার একটি সার্ভিং এ ৩৯ গ্রাম চিনি থাকে। তার মানে বেশির ভাগ আমেরিকানই বছরে প্রায় ৫ কেজি চিনি খায় শুধু মাত্র কোকাকোলা পান করার মাধ্যমেই।
কোকাকোলা বিজ্ঞাপনের পেছনে প্রচুর অর্থ খরচ করে। ২০১১ সালে এই খরচ ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিলো।
কোকাকোলার ফেসবুক পেজে ৭০ মিলিয়নের বেশি ফ্যান আছে এবং প্রতিনিয়ত এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

কোকাকোলা ও পেপসির মধ্যে কিছু পার্থক্য

বর্তমান সময়ে কোকাকোলার অন্যতম কোমল পানীয় কোম্পানি হচ্ছে পেপসি। আসুন জেনে নিই কোকাকোলা ও পেপসির মধ্যে কিছু পার্থক্য।
পেপসি নীল রংয়ের বোতলে এবং কোকাকোলা লাল রংয়ের বোতলে পাওয়া যায়৷ যদিও তরলের রং একই৷
পেপসি কোকাকোলা অপেক্ষা বেশি মিষ্টি৷
কার্বোনেশন লেভেল কোকে বেশি৷
Fizzy এফেক্টটা কোকের মধ্যে বেশি৷ এটা কোক আর পেপসির বোতল ঝাকাঁলেই বুঝা যায়৷
ক্যাফেইনের পরিমাণ কোকে বেশি, এছাড়া অন্যান্য উপাদান গুলা দুইটাতেই একই৷ প্রথম দিকে কোকে ‘কোকেইন’ মিশানো হতো৷
পেপসির এডভারটাইজমেন্ট কোকের তুলনায় বেশি৷ পেপসির লোগো, স্লোগান অনেকবার পরিবর্তন করা হয়েছে কিন্তু কোকের টা পরিবর্তন করা হয় নি৷

শেষ কথা:
শুরুর দিকে কোকাকোলা বিপজ্জনক ছিল। কারণ তখন কোকাকোলায় মাত্রাতিরিক্ত সুগার ব্যবহার করা হতো। কিন্তু গত ২০-৩০বছরে তারা ডায়েট কোক ও জিরো কোকের মতো স্বল্প বা জিরো ক্যালরির পানীয় ছেড়েছে বাজারে। এখন বাজারে নানান কোম্পানীর কোমল পানীয় পাওয়া গেলেও কোকাকোলার জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। তারপরও কোমল পানীয়র ক্ষতিকর দিক বর্তমান সময়ে সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি বিষয়। তাই এই বিষয়টি সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখতে হবে।

সংগৃহীত

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: