সর্বশেষ আপডেট : ১৫ মিনিট ৩১ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১৬ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ক্ষতিপূরণের ৭ হাজার কোটি টাকার খবর নেই : ক্ষতিগ্রস্থ ৬ শ’ পরিবার হতাশায়

652তাজুল ইসলাম, দোয়ারাবাজার:: সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ইউনিয়নস্থিত টেংরাটিলা গ্যাস ক্ষেত্র বিস্ফোরণের ১১ বছর পূর্তি। ১২ বছরে পা দিয়েছে আজ। প্রথম দফা ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাত ১০টায় এবং দ্বিতীয় দফা ওই বছরের ২৪ জুন রাত ২টায় দু’দফা বিস্ফোরণ ঘটে। ভয়াবহ ওই বিস্ফোরণে এলাকার ৬ শ’ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হলেও অন্যত্র স্থানান্তরিত হওয়ার কোনো উপায় খোঁজে না পেয়ে নিরুপায় হয়ে দু’শতাধিক পরিবার মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে এখানে বসবাস করছে। তথাপি কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো দেশের খনিজ সম্পদ ক্ষতিপূরণের প্রাপ্য ৭ হাজার কোটি টাকা আজও পরিশোধ করেনি। অপরদিকে, সরকারি ভাবেও ক্ষতিগ্রস্থদের পূর্ণবাসনের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্থ ৬ শ’ পরিবার চরম হতাশায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

শুক্রবার দিনভর টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডের বিস্ফোরিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, টেংরাটিলা ও আজবপুর গ্রাম সহ আশপাশের বিভিন্ন পুকুর, জমি, হাওর, রাস্তা ও বাড়িঘরের ফাঁটল দিয়ে বুদবুদ আকারে গ্যাস বেরুচ্ছে। এলাকাবাসী নিজেদের উদ্যোগে ঝুঁকি নিয়ে মাটির নিচ থেকে কৌশলে পাইপ লাইন বসিয়ে গ্যাসের চুলা তৈরি করে রান্নাবান্নার কাজ করছেন।

টেংরাটিলা গ্রামের বাসিন্দা মো. বাবর আলীর স্ত্রী সালমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আগুন লাগনের পর থাইক্কা কত টিভি আর পেপারে রিপোর্ট হইছে, আমরা যে কত কষ্টে বাইচ্ছা আছি, কই! সরকার তো আর আমরার খবর রাখে না। এসব রিপোট মিপোটে আমরার কুনু লাভ নাই।”
একই গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, এলাকার নব্বই ভাগ গাছ-পালা মরে যাওয়ার পর নতুন করে আর কোন বনজ-ফলজ গাছের জন্ম হচ্ছে না। আমরা গত ১০বছর ধরে মাটির নিচ থেকে পাইপ দিয়ে গ্যাস সরবরাহ করে রান্নার কাজে ঝুঁকি নিয়েই ব্যবহার করছি। আমাদের সবগুলো টিউবওয়েল ও কুয়ার পানিতে আর্সেনিক থাকার কারণে আর্সেনিক ও চর্মরোগে অনেক লোক আক্রান্ত হয়েছেন। তবে ধোয়া মুছার কাজ ছাড়াও স্বভাবত নিরুপায় হয়েই অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এসব দূষিত পানি ব্যবহার করে আসছে। এখন আমাদের প্রধান সমস্যা বিশুদ্ধ খাবার পানি। প্রায় আধা কিলোমিটার দূর থেকে আমাদের খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তাও আবার সাধ্যমতো নহে। টেংরাটিলা দাবি আদায় সংগ্রাম পরিষদের সদস্য বজলুল মামুন, সেলিম পাগলা সহ স্থানীয় অনেকেই একই সমস্যা তোলে ধরেন।

দু’দফা গ্যাস ফিল্ডে বিস্ফোরণে টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডের প্রোডাকশন কুপের রিগ ভেঙে প্রচন্ড গর্জনে কেপে উঠে দোয়ারাবাজার, ছাতক সহ সুনামগঞ্জ জেলা সদর এলাকা। এই ভয়াবহ কম্পনসহ ২শ’ থেকে ৩শ’ ফুট উপর পর্যন্ত আগুনের লেলিহান শিখা ওঠানামা করতে থাকে। এর স্থায়ীত্ব ছিল দীর্ঘদিন। দুই দফা বিস্ফোরণে গ্যাসফিল্ডের মাটির ওপরে ৩ বিসিক গ্যাস পুড়ে যাওয়া এবং ৫.৮৯ থেকে কমপক্ষে ৫২বিসিক গ্যাসের রিজার্ভ ধ্বংস হওয়া সহ আশপাশের টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, খৈয়াজুরি ও শান্তিপুরের ৬ শ’ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গাছ-পালা মরে গিয়ে বিরান ভূমিতে পরিণত হয়ে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়।

বিস্ফোরণের পর ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে প্রাথমিক পর্যায়ে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে থাকলেও কিছুদিন পর নাইকো তাদের সরঞ্জামাদি গুটিয়ে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করে। ক্ষতিগ্রস্থ প্রায় সব বাড়িরই বিভিন্ন ফাটল, ফসলি জমি ও রাস্তা দিয়ে গ্যাস উদগীরণের ফলে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। ওই এলাকার দশ সহ¯্রাধিক মানুষ টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড ট্র্যাজেডির বিভীষিকাময় স্মৃতির সাক্ষি হয়ে আজও বেঁচে আছেন। বর্তমান ওই এলাকায় নারী পুরুষ ও শিশুরা মারাতœক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে বসবাস করছেন।

সুরমা ইউনিয়নের ৪নং সদস্য শাহ আলম বলেন, প্রতিবছরই গ্যাস বিস্ফোরনের বিষয় নিয়ে টেলিভিশন ও পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রচার হচ্ছে। নেতারা আশার বাণী নিয়মিত শুনিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু আমাদের এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার তথা সরকারি সম্পদ রক্ষার্থে কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না দীর্ঘ এক যুগেও।

নবনির্বাচিত সুরমা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খন্দকার মো. মামুনুর রশীদ বলেন, গ্যাস ফিল্ডে বিস্ফোরনের পর আসেনিক দূষণ, শ্বাসকষ্ট, শ্রবণশক্তি হ্রাস, চোঁখে কম দেখা, চর্মরোগসহ নানা সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন এলাকাবাসী।
বাতাসে গ্যাস মিশে গিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় টেংরাটিলা ও আশপাশের এলাকা অনেকটা বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ায় স্থানীয়
লোকজন তাদের দৈনন্দিন কাজে ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস যত্রতত্র ব্যবহার করছেন। যেকোনো মূহুর্তে আবারও বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। প্লাস্টিক পাইপ লাইনের সাহায্যে রান্নার কাজে চূলোয় ব্যবহৃত এসব গ্যাস ঝুঁকিপূর্ণ না নিরাপদ এ প্রশ্নের উত্তরে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের স্থানীয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাজু চন্দ্র পাল বলেন, এ গুলো অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ, তবে সম্ভবত সেফটি বাল্বের মাধ্যমে চূলোয় জ্বালানি হিসাবে গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে যাথে গ্যাস পেছনে ব্যাক করতে না পারে। নতুবা যেকোনা সময় দূর্ঘটনা ঘটতো। তবুও এই সিস্টেম মোটেই নিরাপদ নয়। যে কোনো সময় এসব প্লাস্টিক পাইপ লিকেজ হয়ে সংঘটিত বড় ধরনের বিস্ফোরণে জানমালের ব্যাপক ক্ষতির আশংকা রয়েছে। এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য থাকবো।

গ্যাস ফিল্ডে দূর্ঘটনার ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও কথা রাখেনি নাইকো। ক্ষতিগ্রস্তরা এখনও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরন পায়নি। টেংরাটিলা দাবি আদায় সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মো. নুরুল আমীন যুগান্তরকে জানান, গত ৪ জানুয়ারি সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে দেশনেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপিতে টেংরাটিলা ট্রাজেডির ১১ বছর পূর্তি লগ্নে ৩টি দাবি পেশ করেছি। ১. নাইকোর কাছ থেকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ আদায় করা। ২. বাপেক্সের মাধ্যমে গ্যাস ক্ষেত্র সচল করা। ৩. স্বল্প সময়ের মধ্যে উদগীরিত গ্যাস বন্ধের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করে এলাকার পরিবেশ রক্ষা করা।

fakhrul_islam

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: