সর্বশেষ আপডেট : ৩ মিনিট ৩৭ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ২৯ মার্চ, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১৫ চৈত্র ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

মুখোশ

542d146ca2d911fa4cf3e4317a8d1d99-1-copyদেলোয়ার হোসাইন::
খুব ঠান্ডা মাথার মানুষ তিনি। সহজে কাউকে মনে আঘাত দিয়ে কথা বলেন না। সবসময় আলাদা হয়ে থাকতে পছন্দ করেন। করো সাথে খুব একটা মিশেনও না। যদিও তিনি এখানকার স্থানীয় কেউ না, তবুও এখানকার অধিকাংশ মানুষ উনাকে চিনে। প্রথম দুই তিন বছর তিনি এখানে একাই থাকতেন। পরবর্তীতে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি এখানে বসবাস করে আসছেন।

মতিউর রহমান সাহেব, মনসাবাড়ি চা বাগানের ম্যানেজার। আগে অন্য আরেকটি চা বাগানে টিলা বাবু হিসাবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। নতুন মালিক মনসাবাড়ি চা বাগানটা কিনে নেওয়ার পর রহমান সাহেব ম্যানেজার হিসাবে এখানে যোগদান করেন। স্ত্রী, দুই মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে রহমান সাহেব চা বাগানের বাংলোতেই থাকেন। নতুন মালিক কিনে নেওয়ার আগে মনসাবাড়ি চা বাগানটা কেবল নামেই চা বাগান ছিল। গোটা কয়েক শ্রমিক ঘর আর অপরিকল্পিত ভাবে কয়েকটি টিলা আর কয়েক বিঘা সমতল ভূমি জুড়ে চা পাতার চাষ ছিল। উৎপাদনও তেমন ছিল না। নিয়মিত কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী কে চা বাগানে খুঁজে পাওয়া যেত না। অথচ আয়োতনের দিক দিয়ে চা বাগানটি কোন অংশে কম নয়। সন্দেহ নেই, মালিক পরিবর্তনের ফলে চা বাগানের ব্যপক উন্নতি ঘটেছে। নতুন চারা উৎপাদন, চারা রুপন থেকে শুরু করে রাস্তা সংস্কার, বাংলো নির্মান সবকিছুই চোখে পড়ার মতো। রহমান সাহেবেরও যে দিন দিন উন্নতি হয়নি তা কিন্তু বলা যাবে না!

রহমান সাহেব সারাদিন অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে কাজেরও তদারকি করেন। কোন রকম ক্লান্তি বা আলস্য তাঁকে কাবু করতে পারে না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে রহমান সাহেবও শার্ট ছেড়ে পাঞ্জাবী ধরেছেন। সবসময় মাথায় একটা টুপি পরে থাকেন। মুখটা জুড়ে সাদা-কালো দাড়ি। বাংলোতে বসে তিনি যখন উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করেন আশপাশের অনেক এলাকা জুড়ে সে সুর ছড়িয়ে পড়ে। তিলাওয়াতে আধ্যাত্বিকতা না-কি পর্দার ওপাশে চাটুকারিতা তা অবশ্য কেউই জানে না। রহমান সাহেব প্রতি শুক্রবারে ব্যক্তিগত সহকারিকে নিয়ে আয়োজন করে পাশের কোন একটি গ্রামের মসজিদে অথবা অন্য কোন এলাকার মসজিদে জুম্মার নামজ আদায় করতে যান।

একটা মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়ার চেষ্টা রহমান সাহেব কখনো করেনি, অথবা সেই অবস্থা তৈরী করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। অথচ মসজিদে নামাজ পড়তে রহমান সাহেবকে কেউ কোন দিন নিষেধ পর্যন্ত করেনি…

রহমান সাহেব যখন মনসাবাড়িতে নতুন আসেন তখন পাশের তিন গ্রামের অনেকের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্বভাবিক ভাবে সবার সাথে প্রতিবেশি একটা মনোভাবও তৈরী হয়। যার ফলে বিভিন্ন উৎসব কিংবা যে কোন ধরনের অনুষ্ঠানে অনেকের বাড়িতে তাঁর দাওয়াত থাকতো। সবার বাড়িতে যেতেন না, তবে একেবারে যে এড়িয়ে চলতেন তাও না। মাঝে মাঝে কারো কারো বাড়িতে রহমান সাহেব বেড়াতে যেতেন। গ্রামেরও অনেকেই তাদের নিজেদের বাগানে চাষ করা সবজি আর গাছের পাকা ফল বিভিন্ন সময় রহমান সাহেবের বাংলোতে পাঠাতো।

মধুপুর গ্রাম আর চা বাগানের মাঝখানে ছোট্ট একটা ছড়া নদী আছে। একদিকে নদীটা গ্রাম আর চা বাগান কে আলাদা করে ফেলেছে অন্যদিকে গ্রামের একটা বড় অংশ চা বাগানের শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। অপর দু’টি গ্রাম চা বাগানটির তিন দিক ঘিরে রেখেছে আর কিছু অংশ ভারতীয় সীমান্ত ছুঁয়ে ছড়িয়ে আছে।
গ্রামে বসবাসরত মানুষ গুলোর কেউ কেউ চা বাগানে কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। আর বাদ বাকি মানুষ গুলো তাদের নিজস্ব কর্মব্যস্ততা নিয়ে দিন যাপন করে…

মনসাবাড়ি চা বাগান কে ঘিরে থাকা যে তিনটি গ্রাম আছে, সে গুলোর মধ্যে যে সব বাড়ি গুলো একদম মনসাবাড়ির সীমান্ত ঘেষে অবস্থিত সেই সব বেশির ভাগ বাড়ির পরিবার প্রদানের কাছে একদিন হঠাৎ করেই- স্থানীয় জেলা আদালত থেকে নোটিশ আসতে শুরু করে। তাদের সবার বিরুদ্ধে জেলা আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের সবার বিরুদ্ধে একই ধারার মামলা। অভিযোগ হিসাবে বলা হয়- তারা যে বাড়ি গুলোতে বসবাস করে আসছেন সে গুলোর মধ্যে বেশ কয়েক টা বাড়ি এবং বাড়ির আশেপাশে যেসব আবাদি জমি আছে সে গুলোর অধিকাংশ জমির প্রকৃত মালিক হচ্ছে মনসাবাড়ি চা বাগান ! দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দরা এই সব জমি অবৈধ ভাবে ভোগ দখল করে করে আসছেন এবং বাড়ি-ঘর তৈরী করেছেন। মনসাবাড়ি চা বাগানের পক্ষে সকল মামলার বাদি- মতিউর রহমান সাহেব !

অথচ অনেক বছরের পুরনো এই মনসাবাড়ি চা বাগান। এই দীর্ঘ সময়ের ভিতর চা বাগানের মালিক পরিবর্তন হয়েছে অসংখ্য বার। এরই মাঝে অসংখ্য মানুষ চলে গেছে এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। তবু চা বাগানের পক্ষে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে কেউ কোনদিন কোন প্রকার অভিযোগ তুলেনি। বাপ-দাদার হাতে গড়া এই সম্পত্তি কিভাবে কেমন করে চা বাগানের হয়ে যায় তা গ্রামবাসি ভেবে পায় না। অথচ তাদের সবার কাছে এসব জায়গা-জমির বৈধ কাগজ পত্র আছে। তবু কোথায় যেন সর্বনাশের একটা গন্ধ পাওয়া যায়…

এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে আস্তে আস্তে রহমান সাহেবের মুখোশ খসে পড়তে থাকে। বাংলোতে বদ লোকের আসা-যাওয়া বাড়তে শুরু করে। চা বাগানের চা শ্রমিকরা মদ খেয়ে মাতাল অবস্থায় সারারাত বাংলোর আসে-পাশে পড়ে থাকে। রহমান সাহেব ও তার পরিবার কে পাহারা দেয় আর মাতলামি করে।

এলাকার অনেকেই রহমান সাহেবের কাছে এসবের কারণ জানতে তার বাংলোতে যান। তিনি কোন জবাব দেননি, শুধু বলেছেন যা করা হচ্ছে তার সবকিছু মালিক পক্ষের অনুমতিতেই করা হচ্ছে। যদিও স্থানীয় কিছু মানুষ এর প্রতিবাদ করে তবু তাতে কোন কাজ হয় না। উল্টো রহমান সাহেবে ভাড়া করা সন্ত্রাসী দিয়ে মাঠ গরম করে রাখেন। রহমান সাহেব আবারও মামলা করেন, এবার সন্ত্রাসী মামলা।

আস্তে আস্তে রহমান সাহেবের সাথে এলাকার মানুষের দুরত্ব বাড়তে থাকে। মামলার অভিযুক্তরা আইনের আশ্রয় গ্রহন করেন। আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তারা সবকিছু সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যান। নিজের অভ্যন্তরীন দূর্নীতি ঢাকতে নতুন নতুন ঘটনার সৃষ্টি করে মালিক পক্ষকে ব্যস্ত রাখার কৌশল রহমান সাহেবের চেয়ে ভাল আর কে জানে?

চা বাগানের পাশ দিয়ে যে ছড়া নদীটি বয়ে গেছে বর্ষা মৌসুম আসলেই পানিতে টইটুম্বুর হয়ে যায়। অন্যদিকে উজানের ঢলে মাঝে মাঝে প্রবল ¯্রােতের সৃষ্টি হয়। যার ফলে ছোট বড় অনেক ঢেউ তৈরী হয় আর এই ঢেউ গুলো আছড়ে পরে নদীর দু’কূল জুড়ে। সে কারনে ভাঙ্গনের কবলে পড়ে দু’কূল, ভাঙ্গন টা কখনো গ্রামের দিকে আবার কখনো চা বাগানের দিকে। প্রকৃতির এই খেলা কেউ থামাতে পারে না…

রহমান সাহেবও অনেক চেষ্টা করলেন এই ভাঙ্গন ঠেকাতে। যখন কিছুতেই কিছু হল না তখন তিনি অন্য পথের আশ্রয় নিলেন। তার পোষা গুন্ডা দিয়ে রাতের অন্ধকারে নদীর ঐ কূল (যে দিকটা গ্রামের দিকে পড়েছে) কোদাল দিয়ে কেঁটে নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। যাতে এবার ভাঙ্গনটা ঐ দিক থেকেই হয়।

পরদিন সকালে এলাকার সবার চোখে তা ধরা পড়ে। আঙুল টা রহমান সাহেবের দিকেই। স্থানীয় চেয়ারম্যান কে সরজমিনে এনে সবকিছু দেখানো হয়। রহমান সাহেব কে ডেকে পাঠানো হয়। রহমান সাহেব প্রাথমিক অবস্থায় চেয়ারম্যান সাহেবকে পাত্তাই দেননি। পরবর্তীতে কৌশলে ঐসব মানুষের গুলোর উপর বিভিন্ন রকম হয়রানি মূলক নতুন মামলা জুড়ে দেন।

বাংলোতে বসে রহমান সাহেব আজো উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করেন। আয়োজন করে দূরের কোন মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করতে যান। কেবল একা কোথাও বেরুতে আজ আর সাহস করেন না…

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: