সর্বশেষ আপডেট : ১৪ মিনিট ১৯ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৬ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

মৌলভীবাজার পাসপোর্ট অফিস যেনো ওপেন দালালের হাট!

passport-office-daily-sylhet-copyনিজস্ব প্রতিবেদক ::
দালালদের ওপেন হাট। বিনা পুঁজিতে গ্রাহক হয়রানির মাধ্যমে প্রতিদিনই জমজমাট আয়- রোজগার। টাকা দিয়েও গ্রাহকরা ওদের বিড়ম্বনা আর হয়রানি থেকে রেহাই পান না। দালাল আর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কবলে জিম্মি মৌলভীবাজার পাসপোর্ট অফিস। এমন গুরুতর অভিযোগ ভুক্তভোগী গ্রাহকদের। ভুক্তভোগীরা জানান, প্রতিদিনই ওই অফিসের সামনে দালালদের জটলা থাকে।এটি এখানকার চিরচেনা দৃশ্য। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি মাসেই ওই দালাল সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। গ্রাহকদের অভিযোগ, ওই অফিস, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী ও কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি নিয়েই এখানে দালাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তাই জিম্মি দশায় এ জেলার পাসপোর্ট গ্রাহকরা। এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দুর্ভোগগ্রস্তদের নানা অভিযোগ। এসব অভিযোগের কারণে কিছুদিন থামলেও তারপর যেই-সেই অবস্থা। গ্রাহকদের এমন দুর্দশা লাঘবে সংশ্লিষ্টদের নেই কোনো উদ্যোগ। কারণ একটাই- সরষেই যে ভূত!

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা। পাসপোর্ট অফিসের সামনে গ্রাহকদের বিশাল লাইন। লাইনের ভেতর ও বাইরে কিছু লোকের ঘোরাঘুরি সতর্ক দৃষ্টিতে। জানলাম ওরাই দালাল। গ্রাহক ধরার ধান্ধায় পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে ওঁৎপেতে থাকে তারা। তাদের টার্গেট নতুন মক্কেল। নানা কৌশলে ইশারা-ইঙ্গিতে দালালদের পাসপোর্ট তৈরির জন্য গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে হাঁকডাক আর দর কষাকষি। অনেক সময় গ্রাহক টার্গেট ও লেনদেন নিয়ে দালাল বনাম দালাল কিংবা দালাল বনাম গ্রাহক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। কখনও তা ঝগড়া-ঝাটি, হাতাহাতি থেকে মারামারিতেও গড়ায়। গ্রাম থেকে আসা সাধারণ লোকজনই এদের খপ্পরে পড়েন বেশি। আর প্রতিনিয়ত তাদের সঙ্গে ঘটে এমন প্রতারণা। পাসপোর্ট অফিসকে কেন্দ্র করেই এখন দালালচক্রের জমজমাট আয়-রোজগার সেখানে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দালাল জানায়, এ ব্যবসায় তারা কেউ কেউ নেমেছে একেবারেই খালি হাতে। আবার কেউ কেউ অল্প পুঁজিতে পাসপোর্ট অফিসের সামনে খুলেছে ফটোস্ট্যাটের দোকান। মূলত এর অন্তরালে চলে পাসপোর্টের দালালি ব্যবসা। অফিসের দুর্নীতিপরায়ণ কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে আঁতাতে তারা চালায় পাসপোর্ট দালালির এই লাভজনক ব্যবসা। প্রতিদিনই শতাধিক দালাল অফিস চলাকালীন প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা ঘিরে রাখে। যে কেউ এই অফিসে এলে তাদের পাতা ফাঁদে ধরা পড়তেই হয়। দালালচক্র এবং অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে এই অফিস থেকে বিধি মোতাবেক পাসপোর্ট আদায় প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিধি মোতাবেক ফরম পূরণ এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ও ফিস প্রদানের পর অর্ডিনারি পাসপোর্ট পেতে ১৫ কর্মদিবস এবং আর্জেন্ট পাসপোর্টের ক্ষেত্রে ৭ কর্মদিবস সময় নির্ধারণ করা রয়েছে। অর্ডিনারি পাসপোর্টের ক্ষেত্রে ৩ হাজার ৪৫০ টাকা এবং আর্জেন্ট পাসপোর্টের ক্ষেত্রে ৬ হাজার ৯০০ টাকা ফিস প্রদানের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু কোনো নিয়ম-ই ওখানে কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকরা জানান, আর্জেন্ট ১০-১২ হাজার ও অর্ডিনারির ক্ষেত্রে সাড়ে ৫ হাজার টাকা নেয় দালাল চক্র। তবে কয়েকজন দালাল জানায়, এ টাকা তারা একা ভোগ করে না। ফিঙ্গার প্রিন্টের নাম করে নেয়া ১ হাজার ৫০ ও পুলিশ ভ্যারিফিকেশনের জন্য ৪০০ টাকা থেকে একটি অংশ সংশ্লিষ্টদের দিতে হয়।

পাসপোর্ট গ্রহীতারা জানান, দালাল ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা হলে অফিস থেকে নানান ত্রুটি -বিচ্যূতি চিহ্নিত করে ফের আবেদন করতে বলা হয়। তাদের নির্দেশনা অনুসারে পুনরায় আবেদন করা হলে সপ্তাহ দিন শেষে ফিংগার প্রিন্ট দিতে বলা হয়। সপ্তাহ দিন পর আসলে আবারও নানান অজুহাতে পরবর্তী সপ্তাহে আসার জন্য বলা হয়। এভাবে শুরু হয় সময় ক্ষেপণ। এ কারণে বিধি মোতাবেক পাসপোর্ট আদায়ের ক্ষেত্রে ১৫ দিনের স্থলে ১-২ মাস এবং আর্জেন্ট পাসপোর্টের ক্ষেত্রে সপ্তাহের বদলে ১৫-২০ দিন গড়ায়। কিন্তু দালালদের মাধ্যমে পাসপোর্ট তৈরিতে বাড়তি দু’তিন হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাদের সাহায্য নিলে সব সমস্যার দ্রুত সমাধান।

সূত্র জানায়, পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে এবং বাইরে লম্বা লাইনের ঝক্কি-ঝামেলা আর পুলিশ ভ্যারিফিকেশনের নামে প্রসাশনের দীর্ঘসূত্রতা এই সবগুলোর অন্তরালেই কিন্তু গ্রাহকদের বিড়ম্বনায় ফেলে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিনব কৌশল। কারণ এতোসব ঝুট-ঝামেলা এড়াতে সাধারণ মানুষ দালালদের ফাঁদে পা দিয়ে থাকেন।

পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট করতে আসা সাইদুল ইসলাম, মারুফ হাসান, জায়েদ আহমদ, বেলাল হোসাইন, আব্দুল বাছিত প্রমুখসহ সাধারণ মানুষ তাদের নানা দুর্ভোগ ও হয়রানির কথা তুলে ধরে জানান, গেটে থাকা আনসার সদস্যসহ অফিসের অনেক অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি এই বাণিজ্যে জড়িত। তারা জানান, আমরা বৈধভাবে কাগজপত্র জমা দিয়ে পার্সপোট পাই না। পুলিশ ভ্যারিফিকেশনের জন্য মাসদিন পর্যন্ত থানায় ধর্ণা দিয়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিয়েও সময় মতো কাগজ পাই না। ব্যাংকে টাকা জমা দিতে গেলেও ঝামেলায় পড়তে হয়। অথচ দালাল কিংবা কোনো ট্রাভেলস ব্যবসায়ী একদিনেই অনেকগুলো ভ্যারিফিকেশন করতে পারেন সময় মতো পাসপোর্টও পান।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মৌলভীবাজার পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে প্রায় অর্ধশত দালালের একটি চক্র, শতাধিক ট্রাভেলস ব্যবসায়ী ও পাসপোর্ট অফিসের সামনের শাকুরা মার্কেটের কয়েকটি ফটোস্ট্যাটের দোকান নিয়মিত এমন দালালি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার নামেও প্রতিদিনই বরাদ্দ থাকে কয়েকটি পাসপোর্ট ফাইল। অনুসন্ধানে নিয়মিত পাসপোর্ট অফিসের দালালি পেশায় সক্রিয়ভাবে জড়িত বলে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে তারা হচ্ছে-শিমুল আহমদ, মহসিন, মুহিত, মানিক, নজরুল, তালেব, আবুল হোসেন, সুনু মিয়া, লুলু মিয়া, কামাল পাশা, বাদশা, রিপন, আব্দুল মতিন, বাবলু, পাপ্পু, রিপন, ধীরেন্দ্র, মনসুর, সেলিম, জসিমসহ অনেকেরই নাম। শাকুরা মার্কেটের কয়েকটি দোকানেও চলে দালাদের নিরাপদ ব্যবসা। তাছাড়া ওই অফিসের এমএলএসএস জাবেদের নেতৃত্বে অন্যরাও পাসপোর্ট দালালির সঙ্গে জড়িত। অফিস চলাকালীন জাবেদকে ফাইলপত্র নিয়ে ছোটাছুটি ও নানাজনের সাথে লেনদেন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) অফিসের অফিস সহায়ক জাহাঙ্গীর ও হাসানের নামেও প্রতিদিনই বরাদ্দ থাকে ৪টি ফাইল। অভিযোগ উঠেছে জেলা প্রশাসকের নাম ভাঙিয়েই তারা নেন এই ফাইলের আর্থিক সুবিধা।

মৌলভীবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক আফজাল হোসেন জানান, এ বিষয়ে কেউ আমাকেঅভিযোগ করেনি। এখানে তিনি নতুন এসেছেন এ রকম কোনো অভিযোগ এখনও পাননি দাবি করে তিনি বলেন, গ্রাহক তরফে হয়রানির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে তিনি এ বিষয়ে গ্রাহকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান এবং যার-তার সঙ্গে লেনদেন না করার পরামর্শ ও অনুরোধ করেন।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: