সর্বশেষ আপডেট : ১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ২৪ জুন, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

বাংলাদেশী টিভি চ্যানেলে বিদেশী সিরিয়াল নতুন নয়, আগেও ছিলো

drama-inner-homeমুনশী ইকবাল ::
ডাবিং করা সিরিয়াল বাংলাদেশে নতুন নয়। এটা অনেক আগে থেকে চলে এসেছে। বাংলাদেশে টিভি নাটকের স্বর্ণযুগ যদি বলা হয় তবে তা হলো নব্বইয়ের দশক। এই সময়ে আমরা পেয়েছি সংসপ্তক, অয়ময়, তথাপি, কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত, রূপনগর, আজ রবিবার-এর মতো বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় সব ধারাবহিক নাটক। ঠিক সেই সময় পাশাপশি চলেছে, টিপু সুলতান, ম্যাক গাইভার, হারকিউলিস এবং আলিফ লায়লার মতো বিখ্যাতসব বিদেশী সিরিয়াল। আর এই সবগুলোর অর্থাৎ নাটক এবং সিরিয়াল বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন বিটিভিতে।

জনপ্রিয়তার মাপে নাটক বা বিদেশী সিরিয়াল বলতে গেলে কেউ কারো থেকে কম ছিলো না। সবগুলোর প্রচারের সময় দর্শক টিভির সামনে জড়ো থাকতেন আয়োজন করে। প্রতি সপ্তায় এগুলো প্রচারের দিন এবং সময়ে ছিলো অভিন্ন চিত্র। কিন্তু সিরিয়াল বা নাটক প্রচারে কেউ কারো প্রতিদ্ধন্ধি ছিলো না। কেননা স্বাদ বা ধরণের বেলায় এগুলো ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা। আর তাই সেই সময় কাউকে কোনো সম্প্রচার বন্ধের জন্য আজগের দিনের মতো এতো উথলা হতে দেখা যায় নি। যেমনটা ইদানিং দেখো গেছে অনেক নাটকজীবী বা অনুষ্ঠানজীবীদের মাঝে।

এ নিয়ে একটা সমাবেশ বা অবস্থান কর্মসূচীও তারা পালন করে ফেলেছেন কিছুদিন আগে। নির্দিষ্ট সিরিয়াল বন্ধের জন্য সময়ও বেঁধে দিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন ‘সময়ের চাহিদায় বাংলাদেশের নাটকের বাজেট কম আর বিদেশী সিরিয়ালগুলো যা বাংলাদেশের চ্যানেলে প্রচার করা হয় বেশ বড়ো বাজেটে তৈরী। ওগুলোর চিত্রায়ণে যে চমকপ্রদ ব্যাপার দেখা যায় তা বাংলাদেশের নাটকে বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভব নয়। আর তাই বাংলাদেশের দর্শক এখন ঐসব সিরিয়ালের কারণে বাংলা নাটক থেকে সরে যাচ্ছে’। যে যুক্তি দেখিয়ে তারা এই কথা বলছেন তাদের এই বক্তব্য যে একেবারে মানবার মতো নয় তা বুঝতে বেশি দূর যেতে হবে না।

বাংলাদেশের দর্শকমাত্র এটি স্বীকার করতেই হবে এখনকার যেকোনো সময়ের চেয়ে নব্বইয়ের দশকের দর্শকরা ছিলেন অনেক সচেতন। কেননা সে সময় টেলিভিশনের সংখ্যা ছিলো খুবই কম। আর তাই সেসময় যারা টেলিভিশন রাখতেন তারা নাটক বা অনুষ্ঠানের অনেক খোঁজ খবর রাখতেন। সে সময় প্রচারিত বিদেশী সিরিয়াল এক টিপু সুলতানের একপর্বের যে বাজেট ছিলো সেই সময়ের অনেক ধারাবাহিক নাটকের পুরো শুটিং সেই বাজেটে হয়ে যেতো। পাহাড় টিলা আর সুরম্য সব অট্টালিকার আবহে চিত্রায়ণ হতে দেখা গেছে টিপু সুলতানের পর্বের পর পর্ব। অন্যসব সিরিয়ালের বেলায়ও ছিলো চমপ্রদ সব চিত্রায়ণ।

সেই তুলনায় বাংলাদেশের নাটকগুলো হতো সেটের মধ্যে আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে বিটিভির স্টুডিওতে। হঠাৎ দু একটা চিত্রয়ন কেবল পার্কে বা কোনো আঙিনায় দেখা যেতো। যদি বাজেট আর চিত্রায়ণের তুলনা করা হয় তবে সেই সময়ের বিদেশী সিরিয়ালের কাছে তুলনা করবার মতোই কিছু ছিলোনা আমাদের নাটকের। এর বাইরে ছিলো নানান সীমাবদ্ধতা। কিন্তু তারপরও কেউ কি বলতে পারবেন যে সেই সময় বাংলা নাটক ওই সব বিদেশি সিরিয়াল থেকে কম জনপ্রিয় ছিলো। মোটেই না। বরং সেই সময় নাটকের কথাগুলো ছিলো মানুষের মুখে মুখে। কর্তাব্যক্তিরা আপিসে অবসরে আগের দিনের নাটকের কথা নিয়ে গপসপ করতেন। সামনের পর্বে কি হবে তা নিয়ে থাকতো আগ্রহ।

বাংলা নাটক কতোটা জনপ্রিয় ছিলো তা বুঝতে একটা উদাহরণই যতেষ্ট। হুমায়ূন আহমেদের কোথাও কেউ নেই নাটকে বাকের ভাই নামে একটি জনপ্রিয় চরিত্র ছিলো। আসাদুজ্জামান নূর বাকেরভাই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। নাটকের শেষ পর্বে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয়। বাকের ভাইকে ফাঁসি না দেবার জন্য রাস্তায় আন্দোলন হয়। নাটকের যে মহিলা চরিত্রের কারণে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয় সেই অভিনেত্রীর গাড়িতে উত্তেজিত জনতা হামলা করে বলে খবর শোনা যায়। বাংলা নাটক কতোটুকু জনপ্রিয় হলে পরে এবং নাটকের প্রতি বাংলাদেশি দর্শকের কতোটুকু প্রীতি আর টান থাকলে পরে এই ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে তা বুঝিয়ে বলতে হবে না। অতচ সেই সময় বিদেশী সিরিয়ালও জনপ্রিয়তার সাথে প্রচার হতো। কিন্তু নাটকের জনপ্রিয়তা কোনো অংশেই কমেনি কিংবা নাটক থেকে দর্শক সরে থাকেনি। এর মূল কারণ হলো সেই সকল নাটকে ছিলো মানুষের কথা, সমাজের কথা।

বাজেট আর দৃশ্যায়ন যতোই সিরিয়ালের তুলনায় কম চমকপ্রদ হোক নাটকগুলো মানের দিক থেকে কোনো অংশেই কম ছিলো না। আর তাই দর্শকরা ঝুঁকেছেন মানসম্পন্ন নাটকের দিকে। আর সবচেয়ে বড়ো কথা হলো সেই নাটকগুলো ছিলো আমাদের মৌলিক নাটক। আজগের দিনে যারা সিরিয়াল বন্ধ সিরিয়াল বন্ধ বলে গলাবাজি করছেন এরা দর্শককে মানসম্পন্ন নাটক দিতে পারছে কিনা সেটাই হলো একটা প্রশ্ন। মানসম্পন্ন নাটক পেলে দর্শক কেনো দেখবে না। ভালো মানের নাটক তৈরী হলে অবশ্যই দর্শক দেখবে। আর যে সিরিয়াল বন্ধের কথা বলা হচ্ছে সেই সিরিয়াল বাংলাদেশের চ্যানেলে দেখানো হচ্ছে অন্য কোনো চ্যানেলে নয়। যা আগেও হতো। বিদেশি সিরিয়াল বাংলাদেশি চ্যানেলে দেখালে দর্শক তা বাংলাদেশি চ্যানেলেই দেখবে বাইরে যেতে হবে না। কিন্তু যে বিদেশি চ্যানেলগুলোর আগ্রাসনের কারণে দর্শক বাংলাদেশী টিভি চ্যানেল থেকে দর্শক সরে যাচ্ছে সেই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের কোনো কথা নেই। তাদের এই আচরণই সবচেয়ে রহস্যজনক। বরং বিগত কিছুদিনে দেখা গেছে ওইসব আন্দোলনকারীরা বিদেশী চ্যানেলের সিরিয়ালের অনুকরণ করে বাংলাদেশে ধারাবহিক নাটকের নামে উদ্ভট ধরণের সিরিয়াল নিমার্ণ করতে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দর্শক ওই সব নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কারণ বাংলাদেশের দর্শক মৌলিক নাটক দেখতে চায় অনুকরণের নাটক নয়। যে ধরণের বিষয় তারা বিদেশী চ্যানেলে দেখতে পারবে সেই বিষয় তাদের মতো করে নিজের দেশের চ্যানেলে তারা কেনো দেখবে।

কাজেই বাজেটের দোহাই দিয়ে কিংবা কারো অনুষ্ঠান সম্প্রচার নিয়ন্ত্রিত করে আটকে রেখে খুব একটা লাভ হবে না। মানসম্পন্ন মৌলিক নাটক করতে পারলে দর্শক বাংলা নাটকের দিকে ঝুঁকবে এটা বলে বুঝাতে হবে না। আর তাই সবার আগে দরকার শষ্যের ভেতর থেকে ভূত তাড়ানো। আমাদের এখনকার তথাকথিত নির্মাতাদের মাথা থেকে নকলে ভূত তাড়িয়ে সেখানে মৌলিকত্বকে লালন করতে হবে। তবে দেখা যাবে এমনিতেই নাটক দর্শক দেখছে। আন্দোলন করে দর্শক টানতে হবে না। মনে রাখতে হবে সিরিয়াল বন্ধ করা হলো কিন্তু দর্শকে যদি মৌলিক কিছু না দেয়া যেতে পারে তবে সেই দর্শক টিভি দেখা থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেবে। তখন কি আন্দোলনকারীদের আম ও গেলো ছালাও গেলো অবস্থা হবে না।

টিপু সুলতান, ম্যাক গাইভার কিংবা আলিফ লায়লার মতো জনপ্রিয় বিদেশী সিরিয়াল যদি সেই সময় বাংলা নাটকে ভাটা ধরাতে না তবে ভালো নাটক হলে এখনো কোনো বিদেশী সিরিয়ার ভাটা ধরাতে পারবে না। বর্তমান সময়ে যে সিরিয়াল নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করা হচ্ছে সেই সুলতান সুলেমান কি আলিফ লায়লা, ম্যাক গাইভার কিংবা টিপু সুলতানের জনপ্রিয়তার ধারেকাছে যেতে পারবে। যারা টিপু সুলতান দেখে থাকবার পর ইদানিং সুলতান সোলেমান দেখেছেন তারা বলবেন অবশ্যই না। কাজেই সবকথার শেষ কথা আমাদের মৌলিক অনুষ্ঠান করতে হবে, মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান বা নাটক বানাতে হবে। যদি তা করা যায় তবে তা দর্শকে কিভাবে দেখাতে হবে তা নিয়ে ভাবতে হবে না। দর্শককে জোড় করে অনুষ্ঠান দেখাতে রাস্তায় ও নাটকজীবী বা অনুষ্ঠানজীবীদের নামতে হবে না।

munshi-iqbalলেখক: মুনশী ইকবাল, সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মি, সহ সাধারণ সম্পাদক ওজাস।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: