সর্বশেষ আপডেট : ২ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৭ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

আলী আমজদ নির্মাণ করেননি সুরমা পাড়ের ঘড়ি!

ali-amjoder-ghori-daily-sylhet-copyহাসান মো.শামীম::

সিলেট শহরের প্রবেশধার ক্বিন ব্রিজ পাড়ি দিলেই হাতের বাম দিকে দেখা মেলে অদ্ভূত সুন্দর একটি ঘড়ির । ১৪২ বছর আগে ১৮৭৪ সালে ঘড়ি টি নির্মান করা হয়। এ অঞ্চলে তখন ঘড়ির অবাধ প্রচলন ছিল না, মানুষ সূর্যের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করতেন সময়। আলী আমজদের ঘড়ি নামে পরিচিত লোহার খুঁটির ওপর ঢেউটিন দিয়ে সুউচ্চ গম্বুজ আকৃতির এ মনোরম স্থাপত্য শৈলীর ঘড়ি ঘরটি তখন ছিল বিশাল জনপ্রিয় । আকর্ষণীয় ঘড়িটি দেখার জন্য প্রতিদিন সিলেটের দূর-দূরান্তের গ্রামাঞ্চল থেকে লোকজনের শহরে আগমন ঘটত। মানুষ সে আমলে শহরের প্রবেশপথে স্থাপিত ঘড়িঘরের সময় দেখে শহরে আসা-যাওয়া ও কাজকর্ম সম্পাদন করতেন। তবে আলী আমজদের নামে হলেও আসলে এই ঘড়িটি আদতে তিনি নির্মাণ করেননি ! কারন ঘড়ির নির্মাণ কাল অনুসারে তখন তার বয়স ছিল ৩ থেকে ৫ বছর । শিশু বয়সে এই রকম একটি স্থাপনা নির্মাণ নিতান্তই অসম্ভব । অথচ সিলেটসহ সারাদেশের অনেক মানুষ ঘড়িটি আলী আমজদের নামে হওয়ায় মনে করেন এর নির্মাতাও তিনি । এমনকি উইকিপিডিয়াতে ও লেখা আছে এই ঘড়ির নির্মাতা কুলাউড়ার পৃথ্বিম পাশার জমিদার নবাব আলি আমজদ খান । কিন্তু মুল গল্প ভিন্ন !

এ ব্যাপারে গবেষক সাংবাদিক আ ফ ম সাঈদ ডেইলি সিলেটকে বলেন ‘ আলি আমজদের ঘড়ি নির্মাণ করেন তার বাবা কুলাউড়ার পৃথ্বিম পাশার জমিদার আলী আহমদ খান !’ তিনি বলেন ‘১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ করে সিলেট জেলা কে আসামের সাথে জুড়ে দেয় । সিলেটবাসী এর প্রতিবাদ করেন । সিলেটবাসীকে সান্ত্বনা দিতে ভারতে ব্রিটিশ সরকারের সর্বোচ্চ কর্তা গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থবুক সিলেটে আসেন । তার আগমন উপলক্ষে সিলেট সুরমা নদীর উত্তর পাড়ে নির্মাণ করা হয় বিরাট পাকা সিঁড়ি । যা এখন চাঁদনী ঘাট নামে পরিচিত । একই সময়ে লন্ডনের বিগবেন ঘড়ির আদলে নবাব আলী আহমদ খান নির্মান করেন একটি সুদৃশ্য ঘড়িঘর । কলকাতার নামকরা কারিগর দ্বারা নির্মিত এই ঘড়ি ঘরটি তার পুত্র আলী আমজদ খানের নামে নামকরণ করেন নবাব আলী আহমদ খান । সেই থেকে ঘড়িটির নাম হয় আলী আমজদের ঘড়ি । ঘড়ি নির্মাণের সময় আলী আমজদের বয়স ছিল তিন বছর ।

আলী আমজদ খান ১৮৭১ সালে জন্ম গ্রহন করেন,১৯০৫ সালে ৩৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান । কিন্তু ইতিহাস ও তথ্য বিকৃতিতে আচ্ছন্ন হয়ে তিন বছরের শিশুকে বিরাট ঘড়িঘর বানানোর কৃতিত্ব দেয়া হয়েছে ,যা সম্পূর্ণ ভুল ।’

এ ব্যাপারে আলী আমজদের বংশধর আলী আব্বাস খান ডেইলি সিলেটকে বলেন ‘ আমরা তো ছোট বেলা থেকেই জানি ঘড়ি টির নির্মাতা আলী আহমদ খান ,কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ-ই তা জানে না । কারণ হিসেবে বলা যায়, আ্লী আমজদের ঘড়ির নামের কারণেই সম্ভবত মানুষের ধারনা হয়েছে এর নির্মাতা আলী আমজদ খান । আসলে এটি নির্মাণ করেছিলেন তার বাবা আলী আহমদ খান ।’

সিলেট সিটি কর্পোরেশন ৩ নং ওয়ার্ডের সচিব ওমর মনিহার এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আমারতো ধারনা ছিল ঘড়িটি যেহেতু আলী আমজদের নামে সেহেতু এর নির্মাতাও তিনি, কিন্তু এখন জানলাম এর নির্মাতা তার বাবা আলী আহমদ খান । এমন কি প্রথম আলোতেও দেখেছিলাম এর নির্মাতা আলী আমজদ খান । আসলে ভুল তথ্য দিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে । সবারই সঠিক ইতিহাস জানা দরকার ।’

ঊল্লেখ্য আড়াই ফুট লম্বা ডায়ামিটার ও দুই ফুট লম্বা কাটার এই ঘড়িটি সে সময় চাবি দিয়ে চালানো হতো। প্রতিদিন ঘড়ির চাবি দেয়ার জন্য তৎকালীণ পৌরসভায় একজন কর্মচারী নিযুক্ত ছিলেন। বিরাট আকারের ডায়াল ও কাটা সংযুক্ত সুবিশাল ঘড়িটির ঘণ্টাধ্বনি শহরের বাইরে অনেকদূর থেকেও শোনা যেত। নির্মাণের পর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদার বাহিনীর গোলার আঘাতে এই প্রাচীন ঘড়িঘর বিধ্বস্ত হয়। স্বাধীনতার পর পৌরসভা মেরামতের মাধ্যমে ঘড়িটি সচল করলেও কিছুদিনের মধ্যে ঘড়ির কাটা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান আ ফ ম কামালের প্রচেষ্টায় নবাব আলী আমজাদের ঘড়ি মেরামত করে আবার চালু করা হয়। এ সময় ঘড়িটি চালু করার জন্য ঢাকার একটি কোম্পানির কারিগররা ঘড়িটি চালু রাখার জন্য রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে ঘড়িটি সচল রাখার ব্যবস্থা নেয়। পৌর চেয়ারম্যানের অফিস কক্ষ থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে ঘড়ির কাটা ঘুরত। কিন্তু দু’চার বছর যেতে না যেতেই ঘড়ির কাটা আবার বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর ঘড়িটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পরে থেকে পরগাছা ও কবুতরের বাসায় পরিণত হয়। সে সময় সিলেটের ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষায় নবাব আলী আমজাদের ঘড়ি চালু করতে জেলা পরিষদ এগিয়ে আসে। এবার জাপানি সিজান কোম্পানি ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে ঘড়িটি আবার চালু করে। চারপাশে বেষ্টনীর ওপর তিন ফুট উঁচু গ্রিল তৈরি করে ঘড়িটিকে সুরক্ষিত করা হয়। কিন্তু বছর না ঘুরতেই ঘড়িটির কাটা আবারও বন্ধ হয়ে যায়।

সর্বশেষ চলতি ২০১৬ সালের জুন মাসে প্রায় দুই বছর অচল থাকার পর সচল হয় সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ‘আলী আমজদের ঘড়ি’। প্রায় ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সিটি কর্পোরেশন ঘড়িটি মেরামত করেছিল। এখন প্রতি ঘন্টায় বাজে ঘন্টা ধ্বনি। যা প্রায় আধা কিলোমিটার দূর থেকে শোনা যায়। ঘড়িটির মেরামত কাজ করেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ঐশি ইলেকট্রনিক্স। ঐতিহাসিক নবাব আলী আমজাদের ঘড়ি পর্যটকদের জন্য এক অন্যতম আকর্ষণ। নগরীর সৌন্দর্য্য বর্ধনে
এই ঘড়ির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সিলেট বেড়াতে এসে ঘড়িঘর দেখতে কেউ ভুল করেন না। সুরমা নদীর তীরবর্তী ঘড়িঘর ও এর লাগোয়া ঐতিহাসিক ক্বিন ব্রিজ ও চাঁদনীঘাট এলাকাটি সিলেট মহানগরের একটি আকর্ষণীয় স্থান।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: