সর্বশেষ আপডেট : ৮ মিনিট ৪১ সেকেন্ড আগে
মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ছাতকের হেলাল উদ্দিনের সাফল্যে দেশেই বায়ো ডিজেল

samakal_rahmaniমুকিত রহমানী ::
কম্পিউটার হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সৌদি আরবের আরামকো কোম্পানিতে কাজ করতে গিয়েছিলেন সিলেটের এক তরুণ। ছাতক উপজেলার বানিকান্দি গ্রামের ডা. ছমির উদ্দিনের ছেলে এই তরুণের নাম হেলাল উদ্দিন। কোম্পানির কাজে কয়েকবার চীনে যেতে হয় তাকে। সেখানে দেখেন তিনি পুরনো টায়ার আর প্লাস্টিক রিসাইকেল করে তেল উৎপাদন করছেন চীনারা। এ আবার কেমন ব্যাপার? কৌতূহলী হয়ে ওঠেন হেলাল। জানতে পারেন, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পরিত্যক্ত এসব টায়ার আর প্লাস্টিক দিয়ে বায়ো ডিজেল বানাচ্ছেন তারা। জ্বালানি সংকট আছে, আছে পরিত্যক্ত ক্ষতিকর জিনিসপত্র জমে পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা চীনারা তাই রিসাইক্লিংয়ের পথে হাঁটছে। শুধু চীন নয়, পৃথিবীর অনেক দেশই এভাবে বায়ো ডিজেল উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে।

সেই থেকে নতুন এক স্বপ্নের শুরু হেলাল উদ্দিনের। নতুন সময়ের এ জ্বালানি উৎপাদনের তেমন কোনো উদ্যোগ আছে কি তার দেশে? ঘোর জ্বালানি সংকটের এ দেশে নিজস্ব পদ্ধতিতে স্থানীয় উদ্যোগে বায়ো ডিজেলের উৎপাদন যে কত গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে দেরি হয় না তার। এ নিয়ে খোঁজখবর নিতে থাকেন তিনি, করতে থাকেন তথ্য সংগ্রহ। চীন ও সৌদি আরব থেকে বায়ো ডিজেল প্রযুক্তির নানা দিক ও ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা অর্জন করেন তিনি। দীর্ঘদিনের অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে খুঁজে পান বায়ো ডিজেল উৎপাদনের পথ। কয়েক বছর আগে দেশে ফিরে আসার পর তিনি মন দেন বায়ো ডিজেল উৎপাদনে। এক নাগাড়ে দেড় বছর প্রচেষ্টা চালিয়ে ২০১৪ সালে তিনি দুই টন ক্যাপাসিটির একটা পাইরোলাইসিস মেশিন তৈরি করেন। এই মেশিন দিয়ে পুরনো টায়ার ও প্লাস্টিক কাজে লাগিয়ে পিউরিফাই করে বায়ো ডিজেল উৎপাদন করেন তিনি। সিলেটে নতুন সময়ের জ্বালানি বায়ো ডিজেল উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করার মধ্য দিয়ে সারাদেশের সামনেই আশার আলো জ্বেলেছেন হেলাল উদ্দিন। মেধা আর কঠোর পরিশ্রমে এমন একটি উদ্ভাবন এ দেশে এটিই প্রথম। কিন্তু একটি পর্ব অতিক্রম করতে না করতেই আরেক পর্বের জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে। এখন তার চিন্তা কী করে পরিবেশ রক্ষা করে এর উৎপাদন নিশ্চিত করে বাজারজাত করা যাবে। সরকারের সহযোগিতা পেলে এই প্রচেষ্টা আলোর মুখ দেখবে বলে মনে করছেন তিনি।

বর্তমানে শহরতলির কুমারগাঁও এলাকায় বসবাস করছেন হেলাল উদ্দিন। পাশের চাতল এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন তার এ প্রকল্প। নিজের তৈরি পাইরোলাইসিস মেশিন থেকে হেলাল উদ্দিন প্রথম দিকে প্রতিদিন ৪৫ শতাংশ হারে প্রায় ৯০০ লিটার অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করতে থাকেন। কিন্তু এ তেল অপরিষ্কার ও দুর্গন্ধযুক্ত হওয়ায় বাজারজাত করতে বেশ সমস্যায় পড়েন তিনি। তবে হাল না ছেড়ে তেল পিউরিফাই করার উদ্যোগ নেন তিনি। এক বছর প্রচেষ্টা চালিয়ে চলতি ২০১৬ সালের শুরুতে তিনি উদ্ভাবন করেন ছোট আকারের একটি পাইরোলাইসিস অয়েল রিফাইনার মেশিন। এর পর আবারও নতুন উদ্যোগে বায়ো ডিজেল উৎপাদনে বার বার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গত এপ্রিল মাসে পুরোপুরি সফল হয়েছেন তিনি। ওই সময় থেকে (এপ্রিল) তিনি নিজের মোটরসাইকেল ও ডিজেল ইঞ্জিন জেনারেটরে এই পিউরিফায়েড পাইরোলাইসিস অয়েল বা বায়ো ফুয়েল ব্যবহার করছেন।

হেলাল উদ্দিনের বায়ো ডিজেল মেশিনটি বর্তমানে প্রতিদিন ৫০০ লিটার তেল উৎপাদনে সক্ষম। এটিকে আরও কার্যকর করে তুলতে তিনি গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা অব্যাহত রেখেছেন। তবে দেশে বায়ো ডিজেল বাজারজাত করার ক্ষেত্রে কোনো আইন নেই। এজন্য তিনি কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছেন না। তবে সিলেটের জেলা প্রশাসকের কাছে তিনি এসব ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করেছেন। হেলাল মনে করেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ’ ও ‘বায়ো-গ্যাস’ ব্যবহারে দেশে যেমন ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, সেভাবে তার বায়ো ফুয়েল বা বায়ো ডিজেল প্রযুক্তিও বিকল্প জ্বালানির প্রচলন ঘটিয়ে ব্যাপক সমৃদ্ধি ঘটাবে।

হেলাল উদ্দিনের বায়ো ডিজেল কোম্পানি সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, পাইরোলাইসিস অয়েল থেকে রিফাইন করে বায়ো ডিজেল তৈরির কাজে ব্যস্ত কয়েকজন কর্মচারী। দুর্গন্ধ বের হওয়ায় সেখানে থাকা দুঃসাধ্য। এ কারণে পাইরোলোসিস তেল তৈরি করতে পারছেন না তারা। বায়ো ডিজেল মেশিনও আপাতত বন্ধ করে রাখা হয়েছে।

হেলাল জানান, তার এই উদ্যোগ একটা রিসাইক্লিং প্রকল্প। বর্তমানে এক লিটার ডিজেল ৬৫ টাকায় বাজার থেকে কিনতে হয়। এর আমদানি খরচই পড়ে প্রায় ৫০ টাকা। কিন্তু তার গবেষণালব্ধ পদ্ধতিতে আবিষ্কৃত মেশিন দিয়ে ফেলে দেওয়া পুরনো টায়ার বা প্লাস্টিক থেকে পাইরোলাইসিস তেল উৎপাদন করতে গিয়ে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ডিজেল, তিন শতাংশ আলকাতরা, চার শতাংশ মাটিয়া তেল এবং তিন শতাংশ গ্যাস পাওয়া সম্ভব। সম্ভব বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা। তিনি জানান, টায়ার রাবার গাছের রস ও বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে তৈরি হয়। রাবার জৈব পদার্থ, যা কৃষক বা রাবার খামারিরা বাগানে উৎপাদন করে থাকেন। ওই রাবার বা পরিত্যক্ত টায়ার থেকে যে তেল উৎপাদন হয় তাকে গ্রিন অয়েল বা পাইরোলাইসিস অয়েল বলা হয়। তিনি তার উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে পাইরোলাইসিস অয়েল বা গ্রিন অয়েলকে পরিশুদ্ধ করে বায়ো ফুয়েল বা বায়ো ডিজেল উৎপাদন করছেন, যা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাজারজাত করা সম্ভব।

হেলাল উদ্দিনই জানালেন, বর্তমানে দেশে ৩৬টি পাইরোলাইসিস প্ল্যান্ট আছে। এগুলো থেকে উৎপাদিত গ্রিন অয়েল থেকেও তার আবিষ্কৃত পদ্ধতিতে বায়ো ফুয়েল উৎপাদন করা যায়। তিনি বলেন, ‘ওই প্ল্যান্টগুলোকে বর্তমান সরকার গ্রিন অয়েল প্ল্যান্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রতিটি প্ল্যান্ট থেকে প্রতিদিন উৎপাদিত হয় ৪৫০০ লিটার গ্রিন অয়েল। সে হিসাবে এই ৩৬টি পাইরোলাইসিস প্ল্যান্ট থেকে প্রতিদিন উৎপাদন হয় মোট ১,৬২,০০০ লিটার গ্রিন অয়েল। এই পরিমাণ গ্রিন অয়েল থেকে প্রতিদিন তার আবিষ্কৃত কম খরচের ফরমুলা ও মেশিন দিয়ে ৯০ শতাংশ বায়ো ডিজেল বা এক লাখ ৪৫ হাজার ৮০০ লিটার বা প্রায় ১৪৬ টন বায়ো ফুয়েল বা বায়ো ডিজেল উৎপাদন করা সম্ভব। এর ফলে প্রতি লিটার ৬৫ টাকা হিসাবে মোট ৯৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকার বৈদেশিক মুদ্রা প্রতিদিন সাশ্রয় করা সম্ভব। অর্থাৎ, বছরে ৩৪৫ কোটি ৯১ লাখ ৫৫০০ টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। দেশে শিক্ষিত বেকার যুবসমাজকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। হেলাল উদ্দিন বলেন, বিকল্প জ্বালানি প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিতে আমি বর্তমান জনবান্ধব সরকার ও সচেতন জনগণের সহযোগিতা কামনা করি। এ প্রসঙ্গে সিলেটের জেলা প্রশাসক জয়নাল আবদীন জানান, তার আবেদন পাওয়া গেছে। সহযোগিতার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখবেন।

-সমকাল থেকে নেয়া…

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: