সর্বশেষ আপডেট : ১৩ মিনিট ২৬ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অফুরন্ত মনের জোরেই এগিয়ে যায় মেহেদিরা

full_528375057_1480159198নিউজ ডেস্ক:: বাবা একটি কলেজে অফিস সহকারী হিসেবে চাকুরি করতেন। আর মা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিংয়ে অনার্স করছিলেন। মোটামুটি চলে যাচ্ছিলো তাদের সংসার। তাদের একমাত্র ছেলে অঞ্জন মেহেদি বড় হচ্ছিল নানা নানির কাছে।

মা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার কারণে মায়ের সাহচর্য খুব কম পেয়েছে ঝিনাইদহ জেলার কোট চাঁদপুরে নানা বাড়িতে বড় হওয়া মেহেদি। তবে কিছুটা বিষন্নতা কাজ করলেও খুব ভালোভাবে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিলো মেহেদি।

এরপর তার মা পড়ালেখা শেষ করে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়। এরপর সেখান থেকে একটি এনজিওতে জয়েন করে মেহেদির মা।

খুব বেশী ভালো না হলেও বেশ চলছিলো তাদের পরিবার। কিন্তু ১৯৯৯ সালে হঠাৎ করে তার বাবা মারা যায়। এ অবস্থায় বেশ দিশেহারা হয়ে পড়ে মেহেদির মা ও মেহেদি। মেহেদি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে।

এর বছর দুয়েক পর সামাজিক ভাবে বিভিন্ন সমস্যার কারণে আবারো বিয়ে করেন মেহেদির মা। তারপর তিনি আবারো মেহেদি থেকে দূরে চলে যান। তবে তার সমস্ত দেখাশুনা বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন করতে লাগলেন মেহেদির নানা-নানি।

কিন্তু বাবা হারা এবং মায়ের দূরে চলে যাওয়ার পর মানষিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে মেহেদি। তবুও পড়ালেখা চালিয়ে যেতে লাগলো তবে তা আগের মত আর ভালো ভাবে হচ্ছিলাে না। এভাবে মানষিক সমস্যার কারণে পড়ালেখায় মন বসাতে না পেরে এসএসসিতে ফেল করে মেহেদি। পরেরবার আবারো ফেল করে সে।

এরপর সেই ২০০৫ সাল থেকে পড়ালেখা থেকে দূরে চলে যায় সে। তবে কখনো খারাপ পথে যায়নি সে। এ সময়টা একাডেমিক পড়ালেখা না করলেও বিভিন্ন বিষয়ের বই পড়ে আর লেখালেখি করে পার হয়ে যেত তার সময়। ওদিকে মায়ের পাঠানো খরচ এবং নানা-নানির কাছ থেকে পাওয়া হাতখরচ জমিয়ে প্রতি বছর বইমেলায় ঢাকায় এসে বই কিনে নিয়ে যেত সে।

এর মাঝে মামার ব্যবাসায় সাহায্য করা এমনকি ঢাকায় এসে শিশুদের পাঠ্য উপকরণ মাথায় করেও বিক্রি করেছে সে। কিন্তু এরপর সে বুঝতে পারে তার পড়ালেখা করা প্রয়োজন।

তারপর উন্মুক্ত থেকে সে ২০১২ সালে এসএসসি পাশ করে এবং কোট চাঁদপুর পৌর ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১৬ সালে এইচএসসি পাশ করে। তারপর সে প্রস্তুতি নিতে থাকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য।

কিন্তু এসময় একটি খবরে তার পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়। তা হলো এসএসসি উন্মুক্ত হওয়ার কারণে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না সে। এরপর ঢাকায় এসে রেজাল্ট সমমান করার পর সে জানতে পারে শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারবে সে।

এরপর মনের জোরকে সঙ্গী করে পুরোদমে প্রস্তুতি নেয় মেহেদি। আর গত ২৩ অক্টোবর ঢাবি’র ‘খ’ ইউনিটে পরীক্ষা দিয়ে ৬১২ তম স্থান অধিকার করে সে। এবছর ভর্তি হয়েছে ইতিহাস বিভাগে।

পেছনের এত স্মৃতি বলার সময়েও বেশ বিষন্ন হয়ে পড়েছিলেন মেহেদি। তার কথায়, আমি যেভাবে মানষিক সমস্যা এবং সংকীর্নতার মধ্যে বড় হয়েছি তা এখনো মনে করলে আমি আর ঠিক থাকতে পারি না।

মেহেদি বলে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি কারো সহযোগীতায় নয়, নিজের পরিশ্রম আর যোগ্যতা দিয়ে। আমি এখান থেকেই এগিয়ে যেতে চাই। তাছাড়া কারো সহযোগীতা নিয়ে সে আর সামনে এগোতে চায়না বলেও দৃড় কণ্ঠে জানায়।

ছোটবেলায় বাবাকে হারানো এবং মায়ের থেকে দূরে থাকা মেহেদি নানা-নানির স্নেহে বড় হলেও পড়ালেখা নিয়ে কথা বলবার মত কেউ ছিলো না তার। তাকে আদর দিয়ে বড় করার জন্য নানা-নানি এবং আর্থিক সাপোর্ট দেয়ার কারণে মায়ের কাছে চির কৃতজ্ঞ মেহেদি। তার নানা-নানি কয়েক বছর আগে মারা গিয়েছেন।

মেহেদি জানায়, অনেক বছর পর পড়ালেখা শুরু করার পর অনেকে বিভিন্ন ভাবে অপমান করতো কিন্তু আমি কিছু মনে করিনি। শুধু আমার সফলতা দিয়ে তাদের উচিত জবাব দিতে চেয়েছি।

মেহেদির কথায়, যারা পড়ালেখা থেকে দূরে চলে গিয়েছে কিন্তু এখনো ফিরে আসার সময় আছে। তারা যেন আবার পড়ালেখা শুরু করে। ইচ্ছাশক্তি আর মনের জোর থাকলে হারিয়ে যাওয়া কয়েকটি বছর ছাড়া সবকিছু ফিরে পেতে পারে সে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর মেহেদির খুব কাছের ছোট ভাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র লিজন লেখে-

”একজন অঞ্জন মেহেদীর স্বপ্ন ছোয়ার গল্প-
সময়টা ২০১০ কি ২০১১ মানুষটার সাথে আমার আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক। খুবই আকস্মিকভাবে সে আমাকে বলল ভাই আমি আবার শুরু করব, কথাগুলি হচ্ছিল খুবই ক্যাজুয়ালি, বাট আমি বেশ সিরিয়াসলি নিলাম, এবং উৎসাহ দিলাম। প্রায় ৭-৮ বছর পর সে বিদ্যালয়ের গন্ডিতে পা রাখল। সবকিছু বেশ ঢিমেতালে এগোচ্ছিল। ও বরাবরই খুব শঙ্কায় থাকত আর আমাকে প্রশ্ন করত ভাইরে আমি পারব তো? বরাবরই তার পিঠ চাপড়ে বলেছি মিয়া ভাই তুমি পারবা। অতপর সে পারল এস, এস সি তে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় সে ঝিনাইদাহ জেলায় সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট করল। কিন্তু বিধি বাম উন্মুক্ত থেকে পাশ করার কারণে সরকারী কোন কলেজে ভর্তি হতে পারল না, অগত্যা ঠিকানা হল কোটচাদপুর পৌর কলেজ, তবুও সে দমে যায়নি, অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানসিক দহন পীড়ন সহ্য করে সে এগিয়ে যেতে লাগলো। ফলাফলও হাতে নাতে ১৬ সালের এইস, এস, সি পরীক্ষায় জিপিএ ৫.০০। চলতে লাগল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জল্পনা কল্পনা আর প্রস্তুতি। শেষ মুহূর্তে আবারও নিয়তির খেলা, একের পর এক সংবাদ আস্তে লাগল এস, এস, সি উন্মুক্ত হবার কারণে ছেলেটি ভর্তি পরিক্ষাই দিতে পারবে না। সত্যই তখন মনে মনে বহুবার বলেছি ঈশ্বর থাকেন ঐ ভদ্র পল্লীতে। অবশেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে আর্থিক দন্ড দিয়ে, সশরীরে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে রেজাল্ট সমমান করার পর একমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার অনুমতি দিল। সামনে শুধুমাত্র একটাই সুযোগ। সেও হেরে যাবার পাত্র নয়। অবশেষে এল কাঙ্ক্ষিত ২৩ অক্টোবর। সে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করল, আর আমি যথারীতি বাহিরে অপেক্ষমাণ, অবশেষে বেরিয়ে এল হাসিমুখে। আমার মুখটা শুকনো আর চিন্তিত দেখে ও ঊল্টো আমাকে শান্তনা দিতে দিতে বলল মিয়া ভাই টেনশন নিস না হয়ে যাবে, আমার কাজ আমি করছি বাকিটা আ, স, ম আরেফিন স্যারের টেনশন। সত্যি বলছি ২ টা দিন খুব টেনশন হচ্ছিল আর শঙ্কা জাগছিল, তবে কি আমরা হেরে যাব?? কাল (রেজাল্টের আগের) রাতেও ওর সাথে প্রায় ১৫ মিনিট কথা হয়েছে, একজন আরেকজনকে খালি শান্তনা দিছি।। অবশেষে আজ সন্ধ্যা ৬ টা।। না আমরা হারিনি। অঞ্জন মেহেদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষায় ৬১২ তম।

মিয়া ভাই গল্পটা তোমার একার কিন্তু শেষ হাসিটা আমাদের দুজনেরই।।
আর কিছু মানুষের জন্য আজ মোক্ষম জবাব একটাই—
‘Don’T Judge a Book by Its Cover’
‘যদি লক্ষ্য থাকে অটুট বিশ্বাস হৃদয়ে,
হবেই হবেই দেখা,
দেখা হবে বিজয়ে।।”

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: