সর্বশেষ আপডেট : ৪ মিনিট ৯ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

যেভাবে পতন স্বঘোষিত দানবীর রাগীব আলীর… !

dailysylhet_ragib_aliহাসান মো. শামীম:: সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করা রাগীব আলী পরিচিত ছিলেন দানবীর হিসেবে। জন্ম বিশ্বনাথে হলেও পড়াশুনা করেছেন সিলেট রাজা জি সি স্কুলে হাই স্কুলে। পরবর্তিতে তার উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি ।  নিজে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন না করলেও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখার ব্যাপারে তার চেষ্টা ছিল ব্যাপক। শিক্ষাকে পুজি করে রাগীব আলি নেমেছিলেন ব্যবসায় । তিনি সিলেটের প্রথম বেসরকারী মালিকানার মেডিক্যাল কলেজ  জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটি  প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তিনি ছিলেন  বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ এর একজন উদ্যোক্তা এবং ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য, সাউথ ইষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়- অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। মুখে তার প্রতিষ্ঠান গুলোতে গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের নানা সুযোগ সুবিধা দিয়ে পড়ার সুযোগ দেওয়ার কথা থাকলেও  বাস্তবে তা ছিল ভিন্ন । বরঞ্চ তার মালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলো ভর্তি ফি থেকে শুরু করে পড়াশুনা বাবদ ব্যয় ছিল সমসাময়িক অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক বেশি । নিজেকে তিনি দানবীর হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলেও সাধারন মানুষের কাছে তিনি একজন প্রচার মুখী ‘অবৈধ সম্পদের দানবীর রাগিব আলী’ হিসেবে ই পরিচিত ছিলেন, তবে তা মনে মনে।  সর্বক্ষেত্রে ধনকুবের রাগীব আলির ব্যাপক প্রভাবের কারণে প্রকাশ্যে কখনো কেউ তার সম্পর্কে সত্য বলার সাহস দেখাতে পারেন নি । এ কথিত ‘দানবীর’ শিল্পপতির অর্থের উৎস নিয়ে জনমনে ছিল  শত জল্পনা-কল্পনা। সিলেটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তার সম্পত্তির পরিমাণ নিয়েও ছিল নানা হিসাব-নিকাশ। জালিয়াতি করে হাজার কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি দখল নিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলাও ছিল। তবু রহস্যজনক কারণে রাগিব আলী ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এছাড়া  রাগীব আলী সম্পর্কে বিভিন্ন সময় বেশ কিছু অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে; যার মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশে থেকে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করা, যুদ্ধাপরাধীদের সহায়তা করা ইত্যাদি । দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত রাগিব আলী বিগত ওয়ান ইলেভেনের সময় পালিয়ে লন্ডনে আত্মগোপন করেছিলেন। তত্তাবধায়ক আমল শেষ হওয়ার পর তিনি দেশে আসেন,কাল
ক্রমে চাপা পড়ে যায় সকল অভিযোগ । তবে কথায় আছে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে , সত্য কখনো চাপা থাকেনা ।
১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ছেলে আবদুল হাইয়ের নামে তারাপুর চা বাগানটি ইজারা নেন তিনি। প্রায় হাজার কোটি টাকার দেবোত্তোর সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রেখেছিলেন তিনি।  ২৬ বছর ৪ মাস পর এ বছরের মে মাসে  তারাপুর চা বাগানের দখল সেবায়েত পংকজ কুমার গুপ্তের নিকট ফিরিয়ে দেয়া হয়।  চা বাগান দখলের ঘটনায় গঠিত সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন ও প্রতারণা মামলার এজাহারে তারাপুর চা বাগান নিয়ে রাগিব আলীর নানা জালিয়াতির চিত্র প্রকাশ পায়। দেবোত্তর সম্পত্তি তারাপুর চা বাগান প্রতারণার মাধ্যমে লিজ নেন রাগিব আলী। লিজের শর্ত ভঙ্গ করে চা বাগান ধ্বংস করে গড়ে তুলেন হাউজিং প্রকল্প ও নানা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। বাগানটিতে নিজ নামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও গড়ে তুলেছেন তিনি।
মামলায় বলা হয়েছে, ৮০০ কোটি টাকার দেবোত্তর সম্পত্তি দখল করে নিয়েছেন রাগিব আলী। তবে ২০০৫ সালে মামলা করার সময় ৮০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে ওই জমির বাজার মূল্য ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
প্রসংগত বলা যায়,প্রতারণার মাধ্যমে ভূ-সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাগিব আলীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তৎকালীন সিলেট সদর ভূমি কমিশনার এসএম আবদুল কাদের কোতোয়ালি থানায় মামলাটি করেন। নং-১১৭/০৫।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, রাগিব আলী নিজ স্বার্থে পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের নামে জাল আমমোক্তারনামা তৈরি করেছেন। তিনি তারাপুর চা বাগান আত্মসাৎ করার জন্য জাল অনুমতিপত্র এবং সন্দেহজনক আমমোক্তারনামার বলে নিজের লোক দিয়ে আবদুল হাইয়ের নামে বিক্রি রেজিস্ট্রেশন করে নিয়েছেন। দেওয়ান মোস্তাক মজিদ ৪ জনকে দিয়ে একটি আমমোক্তারনামা তৈরি করেন। তারাপুর চা বাগান আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যেই নিজের লোকদের দিয়েই আমমোক্তারনামার বলে আবদুল হাই বিক্রি রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নেন।
মামলায় রাগিব আলী ছাড়াও তার স্ত্রী রাবেয়া খাতুন চৌধুরী, পুত্র আবদুল হাই, কন্যা রেজিনা কাদির, জামাতা আবদুল কাদির, ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দেওয়ান আবদুল মজিদ ও সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে আসামি করা হয়।
প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার এই দেবোত্তোর সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে রাগীব আলীর দখলে ছিল। সম্প্রতি উচ্চ আদালতের এক রায়ে বলা হয়, রাগীব আলী প্রতারণার মাধ্যমে তারাপুর চা বাগান দখল করেছেন। আদালত ছয় মাসের মধ্যে চা বাগানটি দখলমুক্ত করতে সিলেটের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ প্রদান করেন। একইসাথে চা বাগান ধ্বংস করে গড়ে ওঠা সকল স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার নির্দেশনাও দেন আদালত।
শিল্পপতি রাগীব আলীর ছেলে আবদুল হাইয়ের দায়েরকৃত এক রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের চার বিচারক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ১৯ জানুয়ারি রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায়ে তারাপুর চা বাগানে গড়ে তোলা আবাসিক প্রকল্প, এ সম্পত্তির ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে অবৈধ, এ বাগানকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়াসহ ১৭টি নির্দেশ দেয়া হয়। রায়ে বাগানের সকল অবকাঠামো ছয় মাসের মধ্যে সরিয়ে সেখানে চা বাগান করার নির্দেশনাও দেয়া হয়।
জানা যায়  ১৯১৫ সালের ২ জুলাই বৈকুণ্ঠ চন্দ্র গুপ্ত তারাপুর চা বাগানসহ তার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ জিউর দেবতার নামে রেজিস্ট্রি দানপত্র করে দলিল করেন। তখন থেকে এ সম্পত্তিটি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। তারও আগে এ বাগানটি তৎকালীন আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত জনসন কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। বৈকুণ্ঠ চন্দ্র গুপ্তের মৃত্যুর পর রাজেন্দ্র লাল গুপ্ত এ দেবোত্তর সম্পত্তিটির সেবায়েত নিযুক্ত হন। রাজেন্দ্র গুপ্ত প্রাণ হারালে তার পুত্র পঙ্কজ কুমার গুপ্ত বাগানটির সেবায়েতের দায়িত্ব পান।
পঙ্কজ কুমার গুপ্ত ভারত চলে গেলে কথিত পাওয়ার অব এটর্নি মূলে দেবোত্তর সম্পত্তিটির সেবায়েত বনে যান রাগিব আলীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় দেওয়ান মোস্তাক মজিদ। একজন মুসলমান ব্যক্তিকে দেবোত্তর সম্পত্তির সেবায়েত করা হয় ‘পাওয়ার অব এটর্নি’ জালিয়াতির মাধ্যমে। এরপর এ মোস্তাক মজিদই রাগিব আলীর পুত্র আবদুল হাইকে ৯৯ বছরের লিজ প্রদান করেন বাগানটি।
শুধু পাওয়ার অব এটর্নি জালিয়াতি নয়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মির্জা ফজলুল করিমের স্বাক্ষর জাল করে ৯৯ বছরের জন্য লিজ প্রদান করা হয় তারাপুর চা বাগান ।
এর পর   সিলেট মুখ্য মহানগর হাকিম সাইফুজ্জামান হিরো দুটি মামলায় রাগীব আলী, তার পুত্র-কন্যাসহ পরিবারের ৫জন এবং তারাপুর বাগানের সেবায়েত পংকজ কুমার গুপ্তসহ মোট ৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন। গত ১০ জুলাই আদালতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সারোয়ার জাহান ওই দুই মামলার অভিযোগপত্র দেন। গত বুধবার ছিল মামলার শুনানির দিন। ওইদিন রাগীব আলী অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সময় চেয়ে আবেদন করেন, কিন্তু আদালত আবেদন নাকচ করে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেয়।

অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও ভূমি আত্মসাতের দুটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে শিল্পপতি রাগীব আলী সপরিবারে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান । শুরু হয় তার পতন । একের পর এক অভিযোগে উঠে আসে রাগীব আলীর নাম ,বহু দিন মুখ বন্ধ করে রাখা মানুষরা হয়ে উঠেন প্রতিবাদে সোচ্চার । সর্বশেষ তার মালিকানাধীণ মালনী ছড়া চা বাগানে খোজ মেলে ভূয়া ডাক্তারের । অবশেষে ভারতে পালানোর সাড়ে  তিন মাস পর পুলিশের জালে আবারো বন্দি হোন  রাগীব আলী। নিজের  পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়াতে গিয়ে ধরা খেয়ে যান এই কথিত দানবীর ।
এর আগে গত ১২ নভেম্বর এই সীমান্ত দিয়েই দেশে ফেরার পথে রাগীব আলীর ছেলে আব্দুল হাইকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: