সর্বশেষ আপডেট : ১১ মিনিট ৫২ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

‘আল্লামা’ লকবের প্রয়োগ-অপপ্রয়োগ

a-f-m-saidআ. ফ. ম. সাঈদ ::
বাংলাদেশে বর্তমান ‘মাওলানা’রা কমে যাচ্ছেন। অনেকের কাছে ‘মাওলানা’ অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়ছে। তবে ‘আল্লামা’ বৃদ্ধি পাচ্ছেন! ‘আলিমদের’ পরিচিতি হিসেবে ইদানীং ‘আল্লামা’ ব্যবহার করা হয়। ‘মাওলানা’ ব্যবহারের প্রতি অনীহা থেকে মনে হয়, আগামীতে এই শব্দটি শুধু অভিধানেই থাকবে। বাস্তবে এর প্রয়োগ হয়তো উঠে যাবে। যেভাবে ‘মোল্লা’, ‘মুনশি’ ও ‘মৌলভি’ লকবের প্রয়োগ প্রায় লোপ পেয়েছে। অথচ পঞ্চাশ-ষাট বছর পূর্বে এই তিনটি উপাধির বেশ প্রচলন ছিল। ‘মাওলানা’ কদাচিৎ ব্যবহার করা হতো। ইদানীং ‘মাওলানা’ লকব হারিয়ে যাচ্ছে আর নির্বিচারে ‘আল্লামা’ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

আরবি, ফারসি ও ইসলামি শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের এককালে ‘মোল্লা’ বা ‘মৌলভি’ বলা হতো। তাদের তুলনায় যাদের জ্ঞান কিছু কম ছিল, তাদের লকব ছিল ‘মুনশি’। কেরানি এবং লেখকরা ‘মুনশি’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ‘মুনশি’ লকব শুধু মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যারা ফারসি ও উর্দু জানতেন অথবা কেরানির কাজ করতেন, তাঁদেরও ‘মুনশি’ বলার রেওয়াজ ছিল। সে যুগে ‘মাওলানা’-এর সংখ্যা ছিল খুব কম। কোনো মাদ্রাসা থেকে ‘দাওরায়ে হাদিস’ বা টাইটেল পাস করলে তাকে ‘মাওলানা’ বলা হতো। ইসলামি বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চস্তরের জ্ঞানীরা ‘মাওলানা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কালক্রমে মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, সেই সাথে বাড়তে থাকে ‘মাওলানা’-এর সংখ্যা। এর ফলে ‘মোল্লা’, ‘মুনশি’ ও ‘মৌলভি’রা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েন। যারা কিছুদিন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন এবং সামান্য ইসলামি জ্ঞান আছে, বর্তমানে শুধু তাদেরকে ‘মোল্লা’, ‘মুনশি’ বা ‘মৌলভি’ বলা হয়।

‘মাওলানা’ লকবটিও বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে। এর পরিবর্তে বাড়ছে ‘আল্লামা’-এর ব্যবহার। ইদানীং সংবাদপত্র, লিফলেট ও পোস্টারে বিভিন্ন আলিমের নামের পূর্বে ‘আল্লামা’ লেখা হয়। সংশ্লিষ্ট আলিমদের খোশ করতে তথা তোষামুদি হিসেবে, নাকি ওই আলিমদের সম্মতিতে যথেচ্ছা ‘আল্লামা’ লকব প্রয়োগ করা হয়, তা বুঝে উঠা কঠিন। ‘আল্লামা’ উপাধি ব্যবহারের মাধ্যমে এই ধারণা দেয়া হয় যে, মাওলানাদের চেয়ে তিনি অনেক জ্ঞানী। এই ধারণার কারণে ‘মাওলানা’রা ‘আল্লামা’ হয়ে যাচ্ছেন। তাই কয়েক বছর পর ‘মাওলানা’ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

আরবি ‘ইল্ম’ শব্দ থেকে ‘আলিম’, ‘আল্লাম’ ও ‘আল্লামা’ শব্দ তিনটি উ™ভূত। ‘ইল্ম’ অর্থ-বিদ্যা; জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য। ‘আলিম’ অর্থ- বিদ্বান; জ্ঞানী ও পণ্ডিত। ‘আল্লাম’ ও ‘আল্লামা’ শব্দ দু’টি আরবিতে ‘মুবালাগা’ তথা আধিক্যসূচক। এর অর্থ-মহাজ্ঞানী; মহাবিদ্বান এবং মানুষের বংশলতিকা ও বংশপরিচয় সম্পর্কে অত্যন্ত জ্ঞানবান।

আরবিতে আরেকটি শব্দ হচ্ছে ‘ইল্মিয়্যু।’ এই শব্দের অর্থ-তাত্ত্বিক; তত্ত্বজ্ঞানী; বিজ্ঞানী; তত্ত্ববিষয়ক, বিজ্ঞান-সম্পর্কিত ও জ্ঞানবিষয়ক। অনেক মুহাক্কিক আলিমের মতে ‘ইল্মিয়্যু’ থেকে ‘আল্লামা’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। তাই বিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিক এবং বিজ্ঞান ও তত্ত্বজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞানীকে ‘আল্লামা’ বা ‘আল্লাম’ ভূষিত করা সংগত।
আরবি ব্যাকরণ শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘শরহে জামি’-এর টীকায় বলা হয়েছে, আল্লামা সেই ব্যক্তি-যিনি বুদ্ধিবৃত্তি ও পুঁথিগত শাস্ত্রসমূহে বিদ্যাবান।

‘আলিম’ শব্দের অর্থ-জ্ঞানী বা বিদ্বান হলেও ইসলামি পরিভাষায় তাকেই ‘আলিম’ বলা হয়, যার ইসলাম ধর্মবিষয়ক সম্যক জ্ঞান রয়েছে। ইসলামি জ্ঞান নেই, কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে অনেক জ্ঞান থাকলেও তাকে ‘আলিম’ বলা হয় না। আরবি অনেক শব্দ শুধু ইসলামি পরিভাষার জন্য নির্ধারিত হয়ে আছে। যেমন- ‘ইবাদত’ শব্দের অর্থ-উপাসনা; আরাধনা ও প্রার্থনা। কিন্তু এ শব্দটি শুধু আল্লাহর আরাধনার জন্যই নির্ধারিত। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর উপাসনা-আরাধনাকে ‘ইবাদত’ বলা যায় না। ‘তিলাওত’ শব্দটি শুধু কুরআন শরিফ পাঠের জন্য প্রযোজ্য। অন্য কোনো গ্রন্থ পাঠ বা আবৃত্তিকে ‘তিলাওত’ বলা হয় না। অথচ ‘তিলাওত’ শব্দের অর্থ-আবৃত্তি ও পাঠ। ‘মাদ্রাসা’ শব্দের অর্থ-পাঠদান বা শিক্ষাকেন্দ্র। কিন্তু ব্যবহারিক অর্থে শুধু ইসলামি শিক্ষাদান কেন্দ্রকেই মাদ্রাসা বলা হয়। অন্য কোনো শিক্ষাকেন্দ্রকে ‘মাদ্রাসা’ বলা হয় না। এভাবে ‘হাফিজ’ শব্দটিও শুধু কুরআন মজিদ অথবা হাদিস শরিফ মুখস্থকারীর জন্য নির্ধারিত। অন্য কোনো গ্রন্থ বা বিষয় কণ্ঠস্থকারীকে ‘হাফিজ’ বলা যায় না। অথচ এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে-মুখস্থকারী। আরবি ‘হাদিস’ শব্দের আভিধানিক অর্থ-বাণী; কথা; উক্তি ও ভাষণ। কিন্তু প্রায়োগিক অর্থে শুধু মহানবি হজরত মুহাম্মদ সা.-এর বাণী, উক্তি ও ভাষণকে ‘হাদিস’ বলা হয়। অন্য কারো বক্তব্য ও কথাকে ‘হাদিস’ বলা যায় না। এ রকম অনেক আরবি শব্দ রয়েছে, যেগুলো প্রায়োগিক ক্ষেত্রে শুধু ইসলামি বিভিন্ন বিষয়ের জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। ‘আলিম’ শব্দও সেরকম একটি শব্দ। কিন্তু ‘আল্লামা’ শব্দটি প্রয়োগিক ক্ষেত্রে ইসলামি জ্ঞানের জন্য নির্ধারিত নয়। বরং যে-কোনো বিষয়ে মহাজ্ঞানীকে ‘আল্লামা’ বলা যায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘আলিম’ তথা ইসলাম সম্পর্কে বিদ্বজ্জনরা নানা উপাধিতে পরিচিত। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশে আলিমদের বলা হয় ‘মাওলানা’, তুরস্কে বলা হয় ‘মোল্লা’ ও ‘মেভলানা’, ইরানে ‘মোল্লা’, ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ ও ‘আয়াতুল্লাহ’, আরবের দেশগুলো ও পূর্ব আফ্রিকায় ‘শায়খ’ ও ‘ইমাম’, দক্ষিণ এশিয়ায় ‘শায়খ’ ও ‘মোল্লা’, আফগানিস্তান; আজারবাইজান; বসনিয়া ও সোমালিয়ায় ‘মোল্লা’ ও ‘শায়খ’, ইরাকে ‘শায়খ’, ‘আয়াতুল্লাহ’ ও ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে ‘মাওলানা’ ও ‘ইমাম’ বলা হয়।

এককালে মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল খুব কম। তাই সেকালে প্রসিদ্ধ আলিমদের কাছে উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা গ্রহণের রেওয়াজ ছিল। ওইরকম আলিমরা ছাত্রদেরকে ‘দাওরায়ে হাদিস’ সম্পন্ন করার সনদ প্রদান করতেন। মাদ্রাসা থেকেও ‘টাইটেল’ পাস করা যেত। এভাবে ‘মাওলানা’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করা হতো। বর্তমানে শুধু মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে ‘দাওরায়ে হাদিস’ অথবা ‘কামিল’ তথা টাইটেল পাস করলে ‘আলিম’ বা ‘মাওলানা’ হওয়া যায়।

নিজ চেষ্টা ও অধ্যবসায় ইসলামের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। এভাবে কেউ ইসলামি জ্ঞানের পণ্ডিত হলেও তাকে ‘আলিম’ বা ‘মাওলানা’ বলা যায় না। খ্রিষ্টান, ইয়াহুদি ও সনাতন (হিন্দু) ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এমন অনেক আছেন, যাদের কুরআন, হাদিস ও ইসলাম সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান রয়েছে। কিন্তু তাদেরকে ‘আলিম’ ও মাওলানা’ বলা হয় না। কুরআন শরিফ সর্বপ্রথম বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন হিন্দু গিরিশচন্দ্র সেন (১৮৩৫-১৯১০ খ্রিষ্টাব্দ)। সে সময় কেউ কেউ তাঁকে ‘মাওলানা’ উপাধি দেন। কিন্তু তা টেকেনি। বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি ও আরবি বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগে যারা শিক্ষাদান বা অধ্যাপনা করেন এবং যারা এসব বিভাগ থেকে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন, তাদেরকে ‘মাওলানা বা ‘আলিম’ বলা হয় না। মেডিকেল কলেজে অধ্যয়ন ও পাস করলে ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহার করা যায়। তা না করে চিকিৎসা শাস্ত্রে সম্যক জ্ঞান থাকলেও ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহার করা আইনসংগত নয়। ভালো আইনজ্ঞ হলেও আইন পেশায় নিয়োজিত হওয়া যায় না। আইন বিষয়ে লেখাপড়া করে ‘আইনজীবী’ হিসেবে সনদ নিতে হয়। তেমনিভাবে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে সনদ না পেলে স্বীকৃত ‘আলিম’ বা ‘মাওলানা’ হওয়া যায় না।

হাজারো বছরের অধিক পূর্ব থেকে আরব, মধ্য এশিয়া, তুরস্ক, ভারতীয় উপমহাদেশ ও আফ্রিকা তথা মুসলিম জাহানে বিখ্যাত বরণীয় ও সর্বকালজয়ী অনেক আলিমের জন্ম হয়েছে। এসব মুসলিম মনীষী ও বিশ্ববরেণ্য আলিমের ‘আল্লামা’ লকব নেই। তাঁরা তাদের জীবৎকাল থেকে এ পর্যন্ত ইমাম, মাওলানা, মোল্লা বা শায়খ উপাধিতেই ভাস্বর হয়ে আছেন।

মহানবি (সা.)-এর হাসিদ-সংকলকরা সবাই ‘ইমাম’ উপাধিতে পরিচিত। যথা-বুখারি শরিফ প্রণেতা ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল বুখারি (১৯৪-২৫৬ হিজরি), মুসলিম শরিফ প্রণেতা ইমাম মুসলিম ইবনে আলহাজ্জাজ (২০৬-২৬১ হি.), তিরমিজি শরিফ প্রণেতা ইমাম আবু ইসা তিরমিজি (২০৯-২৯৭ হি.), ইবনে মাজাহ্ শরিফ প্রণেতা ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজাহ্ (২০৯-২৭৩ হি.), আবু দাউদ শরিফ প্রণেতা ইমাম আবু দাউদ সুলাইমান সিজিস্তানি (২০২-২৭৫ হি.) এবং নাসায়ি শরিফ প্রণেতা ইমাম আহমদ ইবনে শুয়াইব ইবনে নাসায়ি (২১৪-৩০৩ হি.) রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম। হাদিসের সুপ্রসিদ্ধ এই ছয়টি গ্রন্থ ‘সিহাহ্ সিত্তা’ বলে পরিচিত।

এছাড়াও হাদিসের বিখ্যাত কিতাব মিশকাতুল মাসাবিহ্ (মিশকাত শরিফ) প্রণেতা ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ খতিব তাবরিজি (ওফাত ৭৪১ হি.), সুনানে তাবরানি প্রণেতা ইমাম সুলাইমান ইবনে আহমদ ইবনে আইয়ুব আবুল কাসিম তাবরানি (১২৩৩-১২৭৭ খ্রি.), সুনানে কুবরা প্রণেতা ইমাম আবু বাকার আহমদ ইবনে হুসাইন বায়হাকি (৩৮৪-৪৫৮ হি.), সুনানে দারকুৎনি প্রণেতা ইমাম আবুল হাসান বাগদাদি দারকুৎনি (৩০৬-৩৮৫ হি.), মুসান্নাফে আবি শায়বা প্রণেতা আবু বাকার আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবি শায়বা (১৫৯-২৩৫ হি.), মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক প্রণেতা ইমাম হাম্মাম ইবনে নাফি আস্সানানি (১২৬-২১১ হি.), সহিহ ইবনে হিব্বান প্রণেতা ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হিব্বান আত্তামিমি আলবাস্তি (ওফাত ৯৬৫ খ্রি.), সুনানে দারমি প্রণেতা ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান দারমি (১৮১-২৫৫ হি.), রিয়াজুস সালিহিন প্রণেতা ইমাম আবু জাকারিয়া মুহিউদ্দিন ইয়াহিয়া নওভি (১২৩৪-১২৭৭ খ্রি.), তাহাবি শরিফ প্রণেতা ইমাম হাফিজ আবু জাফর আহমদ ইবনে মুহাম্মদ তাহাবি (২৩৯-৩২১ হি.), মুসনাদে আবু ইয়ালা প্রণেতা ইমাম হাফিজ আবু ইয়ালা আহমদ ইবনে আলি আলমাউসিসি (ওফাত ৩০৭ হি.), মুসনাদে ইবনে বাজ্জার প্রণেতা ইমাম আহমদ ইবনে আমর আলবাজ্জার এবং সুনানে ইবনে খুজাইমা প্রণেতা ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক খুজাইমা রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম।

কুরআন শরিফের বিশ্ববিখ্যাত তাফসির গ্রন্থসমূহের লেখক তথা মুফাস্সিরদের কারো ‘আল্লামা’ লকব ছিল না। যেমন- তাফসিরে ইবনে সিরিন প্রণেতা ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (৩৩-১১০ হিজরি), তাফসিরে কবির প্রণেতা ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি (৫৪৪-৬০৬ হি.), তাফসিরে তাবারি প্রণেতা ইমাম আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির তাবারি (২২৪-৩১০ হি.), তাফসিরে জালালাইন প্রণেতা ইমাম জালাল উদ্দিন মহল্লি (ওফাত ৮৬৪ হি.) ও ইমাম জালাল উদ্দিন সাইয়ুতি (৮৪৯-৯১১ হি.), তাফসিরে কাশ্শাফ প্রণেতা ইমাম আবুল কাসিম মাহমুদ ইবনে উমর জমখ্শরি (১০৭৫-১১৪৪ খ্রি.), তাফসিরে মাজহারি প্রণেতা কাজি সানাউল্লাহ পানিপথি (ওফাত ১২২৫ হি.), তাফসিরে কুরতুবি প্রণেতা ইমাম আবু আবদুল্লাহ আলকুরতুবি (১২১৪-১২৭৩ খ্রি.), তাফসিরে ইবনে কাসির প্রণেতা ইমাম হাফিজ ইসমাইল ইবনে কাসির (১৩০১-১৩৭৩ খ্রি.), তাফসিরে রুহুল বয়ান প্রণেতা ইমাম ইসমাইল হক্কি কুরসেভি (ওফাত ১৭২৫ খ্রি.), তাফসিরে রুহুল মায়ানি প্রণেতা ইমাম আবু সানা শিহাব উদ্দিন সাইয়িদ মাহমুদ আন্দালুসি (১৮০২-১৮৪৫ খ্রি.), তাফসিরে ফাত্হুল কাদির প্রণেতা ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ শাওকানি (১৭৫৯-১৮৩৪ খ্রি.), তাফসিরে খাজিন প্রণেতা ইমাম আলাউদ্দিন আলি ইবনে মুহাম্মদ আলখাজিন, তাফসিরে বায়জাবি প্রণেতা ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে উমর বায়জাবি, তাফসিরে ‘মুআলিমুত্ তানজিল’ প্রণেতা ইমাম আবু মুহাম্মদ হাসান ইবনে মাসউদ বাগভি (৪৪৩-৫১৬ হি.), তাফসিরে তাস্তারি প্রণেতা ইমাম আবু মুহাম্মদ সহল ইবনে আবদুল্লাহ তাসতারি (২০৩-২৮৩ হি.), তাফসিরে মাওয়ার্দি প্রণেতা ইমাম আবুল হাসান আলি ইবনে মুহাম্মদ ইবনে হাবিব মাওয়ার্দি বসরি (৯৭২-১০৫৮ খ্রি.), ‘আত্তাহ্সিল লি উলুমিত্তানজিল’ তাফসির গ্রন্থ প্রণেতা ইমাম মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে জুজিয়্যান কালবি (১৩২১-১৩৫৭ খ্রি.) এবং তাফসিরে মুরাদিয়া প্রণেতা মাওলানা শাহ মুরাদ উল্লাহ আনসারি (ওফাত ১৭৭০ খ্রি.) রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম।

প্রচলিত চারটি ‘মাজহাব’ তথা ইসলামি ফিকাহ্র ধারার প্রবর্তকরা ‘ইমাম’ লকবে পরিচিত। যেমনÑ ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আজম বলে পরিখ্যাত নুমান ইবনে সাবিত (৮০-১৪৮ হি.), ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইদ্রিস শাফেয়ি (১৫০-২০৪ হি.), প্রসিদ্ধ হাসিদ গ্রন্থ ‘মুসনাদে আহমদ’ প্রণেতা ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (১৬৪-২৪১ হি.) এবং হাদিস গ্রন্থ ‘মুয়াত্তা’ প্রণেতা ইমাম মালিক ইবনে আনাস (৯৩-১৭৯ হি.) রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম।

বিগত চৌদ্দ শতাব্দী যাবৎ মুসলিম জাহানে বরেণ্য যত আলিম তথা ইসলামি বিদ্বজ্জন তাঁদের জ্ঞান ও চিন্তাধারা দিয়ে আলোকচ্ছটা ছড়িয়েছেন, যাদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে এবং শরিয়ত; তারিকত; হাকিকত ও মারিফাতের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে, তাঁরা সবাই ইমাম, শায়খ, মাওলানা বা মোল্লা উপাধিতে পরিখ্যাত ছিলেন ও আছেন। যেমনÑহাদিস বিশারদ ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (১১৮ হিজরি-৭২৬ খ্রি.), মহানবি (সা.)-এর বিশ্ববিশ্রুত জীবনীকার আবু মুহাম্মদ আব্দুল মালিক ইবনে হিশাম (ওফাত ২১৮ হিজরি), ইমাম আবু বাকার জাসাস রাজি (ওফাত ৩৭০ হি.), ইমাম ইবনে কাসিম কাশ্আরি (ওফাত ৪৬৫ হি.), তাফসির বিশারদ ইমাম রাগিব ইস্পাহানি (ওফাত ২০২ হি.), ইমাম মুহাম্মদ ইবনে রশিদ কুরতুবি (ওফাত ৫৯৫ হি.), ইমাম আবুল ফর্জ ইবনে জাওজি (৫০৮-৫৯৭ হি.), ইমাম হাফিজ মুনজিরি (৫৮১-৬৫৬ হি.), বাংলাদেশ অঞ্চলে হাদিসে রাসুল সা. শিক্ষাদানের পথিকৃৎ শায়খ শারফুদ্দিন আবু তাওয়ামা বুখারি (ওফাত ৭০০ হি.), তাঁর ছাত্র শায়খ শারফুদ্দিন মাখদুম ইয়াহিয়া মানিরি (৬৬১-৭৮২ হি.) ও শায়খ বদরুদ্দিন জাহেদ, ইমাম আবু ইউসুফ (ওফাত ৭২৯ হি.), ইমাম মুহাম্মদ (৭৪৯-৮০৫ খ্রি.), ইমাম হাফিজ মুহাম্মদ ইবনে আবু বাকার ইবনে কাইয়িম আলজাওজি (৬৯১-৭৫১ হি.), ইমাম শামসুদ্দিন আবদুর রহমান ইবনে কুদামা (ওফাত ৬৮২ হি.), বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে হাদিসে রাসুল সা. শিক্ষার আরেক অগ্রদূত মাওলানা আতাউল হক পাণ্ডুবি (ওফাত ৮১০ হিজরি), ইমাম জুর্জানি নামে খ্যাত আবু বাকার আবদুল কাহির ইবনে আবদুর রাহমান ইবনে মুহাম্মদ জুর্জানি (৪০০-৪৭১ হি.), ইমাম ইবনে হাজার আস্কালানি (৭৭৩-৮৫২ হি.), ইমামুত্তারিকাত গাউসুল আজম শায়খ আবদুল কাদির জিলানি (১০৭৭-১১৬৬ খ্রি.), ফিকাহ্র বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফাতাওয়া কাজিখান’ প্রণেতা ইমাম হাসান ইবনে মনসুর ফারগানি (ওফাত ৫৯২ হি.), ফিকাহ্ শাস্ত্রের আরেকটি বিখ্যাত কিতাব ‘র্শহে বিকায়া’ প্রণেতা ইমাম উবায়দুল্লাহ ইবনে মাসউদ হানাফি, শায়খ আহমদ কবির রেফায়ি (১১০৭-১১৮৩ খ্রি.), মোল্লা আলি কারি নামে খ্যাত আলি ইবনে সুলতানুল কারি (ওফাত ১৬০৫ খ্রি.), ইবনে খালদুন নামে খ্যাত সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আবু জায়েদ আবদুর রাহমান ইবনে খালদুন হাজ্রামি (১৩৩২-১৪০৬ খ্রি.), ‘মসনবি’ গ্রন্থের লেখক মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (১২০৭-১২৭৩ খ্রি.), ইমাম আব্দুর রহমান আওজায়ি (৭০৭-৭৭৪ খ্রি.), ইমাম আবু ইসহাক আশ্শাতিবি (ওফাত ১৩৮৮ খ্রি.), দু’আ-দুরুদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হিস্নে হাসিন’ প্রণেতা ইমাম মুহাম্মদ আলজাজিরি, হাদিস বিশারদ ইমাম ইবনে হাতিম মুহাম্মদ ইবনে ইদ্রিস আররাজি (৮১১-৮৯০ খ্রি.), তাফসিরে মাদারিকুত্ তানজিল ও ফিকাহ্ শাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কান্জুদ্দাকায়িক’ প্রণেতা ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ নাসাফি (ওফাত ৭১০ হি.), ফিকাহ্র আরেকটি বিখ্যাত কিতাব ‘হিদায়া’ প্রণেতা ইমাম বুরহানুদ্দিন আলি ইবনে আবু বাকার মার্গিনানি, ইমাম আবু মুহাম্মদ আলি ইবনে আহমদ সেবিলি আন্দালুসি (৯৯৪-১০৬৪ খ্রি.), ইমাম হাফিজ ইবনে আব্দুল বার (৯৭৮-১০৭১ খ্রি.), ইবনে আরবি নামে পরিচিত ইমাম মহিউদ্দিন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আলি ইবনুল আরবি (১১৬৫-১২৪০ খ্রি.), ইবনুল মাদিনি নামে খ্যাত ইমাম আবুল হাসান আলি ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাফর আলমাদিনি (১৬১-২৩৪ হি.), শায়খ ইবনে হাজার আলহায়তামি আলমক্কি (৯০৯-৯৭৪ হি.), শায়খ আহমদ ইবনে আবদুর রাহমান ইবনে মুহাম্মদ আলবান্না আস্সায়াতি (১৮৮৪-১৯৫৭ খ্রি.), ইমাম আবুল আব্বাস শিহাবুদ্দিন কুস্তলানি (ওফাত ৯২৩ হি.), ইমাম শামসুদ্দিন আবু আবদুল্লাহ কিরমানি (ওফাত ৭৮৬ হি.), ইমাম আবু মুহাম্মদ ইবনে কুদামাহ্ (ওফাত ৬৮২ হি.), কাজি আবু বাকার ইবনুল আরাবি আন্দালুসি (৪৬৮-৫৪৩ হি.), ইমাম আলআলুসি নামে খ্যাত আবু সানা শাহাবুদ্দিন সাঈদ মাহমুদ আলহুসাইনি আলুসি বাগদাদি (১২১৭-১২৭০ হি.), উসুলে ফিকাহর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘নুরুল আনওয়ার’-এর প্রণেতা মোল্লা জিউন ইবনে আবু সাঈদ নামে খ্যাত শায়খ হাফিজ আহমদ এমিটয়ি (ওফাত ১১১৩ হি.), ইমাম ইবনে হাজম নামে খ্যাত আবু মুহাম্মদ আলি ইবনে আহমদ ইবনে সাঈদ ইবনে হাজম (৯৯৪-১০৬৪ খ্রি.), ইমাম জিয়াউদ্দিন আবদুল মালিক ইবনে ইউসুফ জুয়াইনি (১০২৮-১০৮৫ খ্রি.), ইমাম সাদ উদ্দিন মাসউদ ইবনে উমর তাফতাজানি (১৩২২-১৩৯০ খ্রি.), ইমাম বদরুদ্দিন আইনি (৭২৬-৮৫৫ হি.), ইমাম হাফিজ ইবনুল হুম্মাম (৭৯০-৮৬১ হি.), বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ইমাম হাফিজ আবুল কাসিম আলি আসাকির (৪৯৯-৫৭১ হি.), ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে উসমান জাহাবি (১২৭৪-১৩৪৮ খ্রি.), প্যালেস্টাইনের প্রখ্যাত আলিম কাজি শায়খ ইউসুফ ইবনে ইসমাইল নাবহানি (১৮৪৯-১৯৩২ খ্রি.), তুরস্কের মুজাহিদ আলিম ইমাম শায়খ শামিল (১৭৯৭-১৮৭১ খ্রি.), ইমাম গাজ্জালি নামে পরিচিত হুজ্জাতুল ইসলাম আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ গাজ্জালি (১০৫৮-১১১১ খ্রি.), ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ নামে পরিচিত তাকিউদ্দিন আবুল আব্বাস আহমদ ইবনে আবদুল হালিম ইবনে আবদুস সালাম শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (৬৬১-৭২৮ হি.), ফিকাহ্র বিখ্যাত গ্রন্থ দুররুল মুখতার প্রণেতা ইমাম আলাউদ্দিন হাস্সাফি (ওফাত ১০৮৮ হি.), ইমামুল হুদা ফকিহ্ আবুল লেইস সমরকন্দি (ওফাত ৩৭৩ হিজরি), মাওলানা আবদুল হাই লাকনৌভি (১২২৬-১৩০৪ হি.), মোল্লা নুরুদ্দিন আবদুর রহমান জামি খুরাসানি (১৪১৪-১৪৯২ খ্রি.), মুজাদ্দিদে আলফে সানি নামে খ্যাত শায়খ সাইয়িদ আহমদ সিরহিন্দি (১৫৬৪-১৬২৪ খ্রি.), মাওলানা শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (১৭০৩-১৭৬২ খ্রি.), মাওলানা শাহ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভি (১৫৫১-১৬৪২ খ্রি.), শহিদে বালাকোট মাওলানা সাইয়িদ আহমদ বেরেলভি (১৭৮৬-১৮৩১ খ্রি.), উর্দু ভাষার প্রখ্যাত কবি মাওলানা আলতাফ হুসেন হালি (১৮৩৭-১৯১৪ খ্রি.), মাওলানা শাহ আবদুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভি (১৭৪৫-১৮২৩ খ্রি.), মাওলানা শাহ আবদুল কাদির মুহাদ্দিসে দেহলভি (ওফাত ১২৩০ হিজরি), ইমাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল বাকি আলআজহারি আলজুরকানি আলমালিকি (১৬৪৫-১৭১০ খ্রি.), ইমাম আবুল ইখলাস হাসান ইবনে আম্মার শুরুম্বুলালি আলওফায়ি (৯৬৪-১০৬৯ খ্রি.), শহিদে বালাকোট মাওলানা ইসমাইল (১৭৭৯-১৮৩১ খ্রি.), মাদ্রাসায় দরসে নিজামির প্রবর্তক মোল্লা নিজামুদ্দিন সাহলভি (১৬৭৭-১৭৪৭ খ্রি.), মাওলানা মাখদুম মুহাম্মদ সিন্ধি (১১০৪-১১৭৪ হি.), মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরি (১২১৫-১২৯০ হি.), মোল্লা হাসান (ওফাত ১৭৮৪ খ্রি.), মাওলানা ফজলে রহমান গঞ্জে মুরাদাবাদি (১২১৩-১৩০৮ হি.), দুররুল মুখ্তারের ব্যাখ্যামূলক বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহ্তার বা ‘ফাতাওয়ায়ে শামি’ প্রণেতা ইমাম মুহাম্মদ আমিন ইবনে আবেদিন (১১৯৮-১২৫২ হি.), বাহ্রুল উলুম মাওলানা আহমদ আলী (ওফাত ১৮১০ খ্রি.), মাওলানা আবদুল হালিম (ওফাত ১৮৮৬ খ্রি.), মাওলানা ফজলে হক খয়রাবাদি (১৭৯৭-১৮৬১ খ্রি.), দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা শিবলি নুমানি (১৮৫৭-১৯১৪ খ্রি.), ইমামুল ইনকিলাব মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি (১৮৭২-১৯৪৪ খ্রি.), শায়খুল আদব মাওলানা হাবিবুর রহমান উসমানি (১৯০৭-১৯২৯ খ্রি.), তাবলিগ জামায়াতের প্রবর্তক মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.), মাওলানা ইমদাদ উল্লাহ মুহাজিরে মক্কি (১৮১৭-১৮৯৯ খ্রি.), হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা কাসিম নানুতুবি (১৮৩৩-১৮৮০ খ্রি.), ফাকিহুন্নাফ্স মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (১৮২৯-১৯০৫ খ্রি.), ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামী মাওলানা মুহাম্মদ আলি জওহর (১৮৭৮-১৯৩১ খ্রি.) ও তাঁর সহোদর মাওলানা শওকত আলী (১৮৭৩-১৯৩৯ খ্রি.), শায়খুল হিন্দ্ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (১৮৫১-১৯২০), তুরস্কের মুজাহিদ মাওলানা বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি (১৮৭৭-১৯৬০ খ্রি.), মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরি (১৮৫২-১৯২৭ খ্রি.), ইমামুল আছর মাওলানা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরি (১৮৭৫-১৯৩৩ খ্রি.), হেকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভি (১৮৬৩-১৯৪৩ খ্রি.), মাওলানা সাইয়িদ সুলাইমান নদভি (১৮৮৪-১৯৫৩ খ্রি.), মাওলানা মুফতি কেফায়াতুল্লাহ (১৮৭৫-১৯৫২ খ্রি.), শায়খুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি (১৮৭৯-১৯৫৭ খ্রি.), মাওলানা হাসরাত মুহানি (১৮৭৫-১৯৫১ খ্রি.), মাওলানা জাফর আলী খান (১৮৭৩-১৯৫৬ খ্রি.), মাওলানা আজাদ সুবহানি (১৮৯৭-১৯৬৪ খ্রি.), মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ কান্দলভি (১৯১৭-১৯৬৫ খ্রি.), মাওলানা আবদুল বারি ফিরিঙ্গিমহলি (১৮৭৮-১৯২৬ খ্রি.), তুরস্কের প্রখ্যাত আলিম শায়খুল ইসলাম ইবরাহিম আফিন্দি ও মোল্লা ফাতহুল্লাহ আফিন্দি, কথিত ওয়াহাবি মতবাদের প্রবর্তক সৌদি আরবের শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব নজদি (১৭১৩-১৭৯২ খ্রি.) শায়খুল আদব মাওলানা ইজাজ আলি (১৯০২-১৯৫৫ খ্রি.), মাওলানা শাহ আতাউল্লাহ বুখারি (১৮৯২-১৯৬১ খ্রি.), প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদি (১৮৯২-১৯৭৪ খ্রি.), দেওবন্দ মাদ্রাসার সাবেক মুহতামিম হেকিমুল ইসলাম মাওলানা কারি মুহাম্মদ তাইয়্যিব (১৮৯৭-১৯৮৩ খ্রি.), ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামী ও ভারতের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮-১৯৫৮ খ্রি.), মাওলানা শিব্বির আহমদ উসমানি (১৮৮৬-১৯৪৯ খ্রি.), জেরুজালেমের সাবেক গ্রান্ড মুফতি শায়খ আমিন আল হুসাইনি (১৮৯৭-১৯৭৪, শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া সাহারানপুরি (১৮৯৮-১৯৮২ খ্রি.), দেওবন্দের সাবেক মুহতামিম মাওলানা ওহিদুজ্জামান কাসিমি কিরানভি (১৯৩০-১৯৯৫ খ্রি.), দেওবন্দের সাবেক মুফতিয়ে আজম মাওলানা সাইয়িদ মেহদি হাসান (১৩০১-১৩৯৬ হিজরি), ফেদায়ে মিল্লাত মাওলানা আসআদ মাদানি (১৯২৮-২০০৬ খ্রি.), মাওলানা আবুল হাসান আলি নদভি (১৯১৩-১৯৯১ খ্রি.), মাওলানা মনজুর নুমানি নদভি (ওফাত ১৯৯৭ খ্রি.), মাওলানা আমিন আহ্সান ইসলাহি (১৯০৪-১৯৯৭ খ্রি.), মাওলানা আবু ইউসুফ শাহ মুহাম্মদ ইয়াকুব বদরপুরি, ভারতের আসাম রাজ্যের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী, সিলেটের সন্তান (তুড়–কখলা, রেঙ্গা) খলিফায়ে মাদানি মাওলানা আবদুল জলিল চৌধুরী বদরপুরি (১৯২৫-১৯৮৯ খ্রি.), দিল্লি শাহি মসজিদের সাবেক ইমাম মাওলানা সাইয়িদ আবদুল্লাহ বুখারি (১৯২০-২০০৯ খ্রি.), মুহাদ্দিসে কাবির মাওলানা সাইয়িদ ইউসুফ বানুরি (১৯০৮-১৯৭৭ খ্রি.), মাওলানা আশিক এলাহি বুলন্দ্শহরি, শায়খ মুহাম্মদ ইবনে জাফর কাত্তানি (১৮৫৮-১৯২৭ খ্রি.), মিসরের বিখ্যাত আলিম শায়খ মুহাম্মদ আবু জাহরা (১৮৯৮-১৯৭৪ খ্রি.), শায়খ আমিন শানকিতি নামে খ্যাত মৌরিতানিয়ার প্রখ্যাত আলিম শায়খ মুহাম্মদ আলআমিন শানকিতি (১৯০৭-১৯৭৩ খ্রি.), শায়খুল হাদিস মাওলানা আবদুল হক হক্কানি পেশোয়ারি (১৯১৪-১৯৮৮ খ্রি.), মুফতিয়ে আজম মাওলানা মুহাম্মদ শফি (১৮৯৭-১৯৭৬ খ্রি.), মাওলানা মুফতি মাহমুদ (১৯১৯-১৯৮০ খ্রি.), মাওলানা গোলাম গউস হাজারভি, হাফিজুল হাদিস মাওলানা আবদুল্লাহ দরখাস্তি (১৯০৬-১৯৯৪ খ্রি.), শায়খুত্ তাফসির মাওলানা আহমদ আলী লাহোরি (১৩০৪-১৩৮২ হি.), মাওলানা জাফর আহমদ উসমানি (১৩১১-১৩৯৪ হি.), মাওলানা ছহুল আহমদ উসমানি (১৮৭৯-১৯৪৮ খ্রি.), মাওলানা ইহ্তিশামুল হক থানভি (১৯১৫-১৯৮০ খ্রি.), শহিদ মাওলানা ইউসুফ লুধিয়ানভি (১৯৩২-২০০০ খ্রি.), দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা ফারুক চিড়িয়াকুটি, সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলিম শায়খ ইমাম নাসির উদ্দিন আলবানি (১৯১৪-১৯৯৯ খ্রি.), দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক মুহতামিম মাওলানা মারগুবুর রহমান (১৯১৪-২০১০ খ্রি.), প্রখ্যাত মুফাস্সির ও মুহাদ্দিস মাওলানা তাহের (কলকাতা), দারুল উলুম মুয়িনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসার চারজন প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা শাহ সুফি আজিজুর রহমান, মাওলানা আবদুল হামিদ, মাওলানা আবদুল ওয়াহিদ ও মাওলানা হাবিবুল্লাহ, শায়খুল হাদিস মাওলানা মুশাহিদ আলী বাইয়মপুরি (সিলেট), মাওলানা আব্বাস আলী কৌড়িয়া (সিলেট), মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমি (ঢাকা), মাওলানা আবদুল ওয়াহ্হাব পিরজি হুজুর (ঢাকা), মুফতিয়ে আজম মাওলানা ফয়জুল্লাহ (হাটহাজারী), মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরি, চট্টগ্রামের পাটিয়া জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মুফতি আজিজুল হক, ফখরে বাঙাল মাওলানা তাজুল ইসলাম (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), মাওলানা আতহার আলী (কিশোরগঞ্জ), মাওলানা ফয়জুর রহমান (ময়মনসিংহ), মাওলানা আবদুল হক চৌধুরী মুক্তারপুরি (সিলেট), চখ্রিয়ার হুজুর নামে খ্যাত শায়খুল হাদিস মাওলানা রিয়াসত আলী (সিলেট), মাওলানা তাহির আলী মুহাদ্দিসে তইপুরি (সিলেট), মাওলানা বশির উদ্দিন শায়খে গৌড়করণি (মৌলভীবাজার), চট্টগ্রামের জিরি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আহমদ হাসান, মাওলানা আবদুল কাদির সিংকাপনি (মৌলভীবাজার), খতিবে আজম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ (চট্টগ্রাম), বায়তুল মোকাররম মসজিদের সাবেক তিনজন খতিব-মাওলানা মুফতি আমিমুল ইহ্সান, মাওলানা মুফতি আবদুল মুয়িজ ও মাওলানা উবায়দুল হক, মাওলানা বশির আহমদ শায়খে বাঘা (সিলেট), শেরে সিলেট মাওলানা শামসুল ইসলাম শেরপুরি, চট্টগ্রামের পটিয়া মাদ্রাসার সাবেক মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস, কুৎবে জামান মাওলানা লুৎফুর রহমান শায়খে বর্ণভি (মৌলভীবাজার), মাওলানা বদরুল আলম শায়খে রেঙ্গা (সিলেট), মিরেরচরি হুজুর নামে খ্যাত মাওলানা আবদুল গনি (সিলেট), কায়িদুল উলামা মাওলানা আবদুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (সিলেট), বাংলাদেশে তাবলিগ জামায়াতের সাবেক আমির মাওলানা হরমুজ উল্লাহ (সিলেট), মাওলানা শফিকুল হক আকুনি (সিলেট), আরিফ বিল্লাহ হাফিজ মাওলানা আকবর আলী (সিলেট), মাওলানা মুহাম্মদ হারুন বাবুনগরি (চট্টগ্রাম), মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ ইবরাহিম (চট্টগ্রাম), মুফাস্সিরে কুরআন মাওলানা আব্দুল গাফফার (ঢাকা), মাওলানা শামসুদ্দিন কাসিমি (ঢাকা), শায়খুল হাদিস মাওলানা উবায়দুল হক উজিরপুরি (সিলেট), মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল্লাহ শায়খে হরিপুরি (সিলেট), মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক আলগাজি (চট্টগ্রাম), মাওলানা মুফতি দ্বীন মোহাম্মদ (ঢাকা), ব্রাহ্মণবাড়িয়া জামেয়া ইউনূসিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মোহাম্মদ ইউনূস (উত্তর প্রদেশ, ভারত), মাওলানা হাবিবুর রহমান শায়খে রায়পুরি (মৌলভীবাজার), মাওলানা আবদুল মতিন চৌধুরী শায়খে ফুলবাড়ি (সিলেট), মাওলানা আবদুন নূর শায়খে ইন্দেশ্বরি (মৌলভীবাজার), মাওলানা মোহাম্মদ সালেহ (রংপুর), মাওলানা মুফতি আবদুল হান্নান (সিলেট), মাওলানা মোহাম্মদ সোহাইল (বগুড়া), মাওলানা আবুল কাসিম (কুমিল্লা), মাওলানা মঞ্জুরুল হক (নেত্রকোনা), মাওলানা শায়খ মমতাজুর রহমান (বগুড়া), মাওলানা শফিক আহমদ (সিলেট), মাওলানা কাজি ইবরাহিম আলী (সিলেট), মাওলানা আরিফ রব্বানি (ময়মনসিংহ), মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর (ঢাকা), মাওলানা আবদুল হক শায়খে গাজিনগরি (সুনামগঞ্জ), শায়খুল হাদিস মাওলানা ওয়ারিস উদ্দিন হাজিপুরি (সিলেট), শায়খুল হাদিস মাওলানা আবদুল ওয়াদুদ (চট্টগ্রাম), মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিসবাহ (নোয়াখালী), মাওলানা ফখরুদ্দিন আহমদ গলমুকাপনি (সিলেট), মাওলানা আমিন উদ্দিন শায়খে কাতিয়া (সুনামগঞ্জ), মাওলানা মুহাম্মদ হারুন ইসলামাবাদি (চট্টগ্রাম), মাওলানা নুর উদ্দিন মুহাদ্দিসে গহরপুরি (সিলেট), মাওলানা আবদুল গাফফার শায়খে মামরখানি (সিলেট), শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (ঢাকা), মাওলানা ফয়জুল বারী (সিলেট), মাওলানা আবদুল আজিজ দয়ামিরি (সিলেট), মাওলানা বুরহান উদ্দিন (ময়মনসিংহ), মাওলানা আবুল হাসান যশোরি, মাওলানা আবুল হাসান (চট্টগ্রাম), মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাইল (চট্টগ্রাম), মাওলানা মুহাম্মদ আইয়ুব (চট্টগ্রাম), মাওলানা আলী আহমদ বোয়ালবি (চট্টগ্রাম), মাওলানা মুহাম্মদ ইবরাহিম চতুলি (সিলেট), মাওলানা আবদুল হালিম (নোয়াখালী), মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ আলী (চট্টগ্রাম), মাওলানা আবদুল আজিজ (চট্টগ্রাম), শায়খুল হাদিস মাওলানা সিরাজুল ইসলাম (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), মাওলানা শারফুদ্দিন মুহাদ্দিসে ভেড়াখালি (হবিগঞ্জ), মাওলানা নুরুল হক শায়খে ধরমণ্ডলি (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ও মাওলানা আশরাফ আলী বিশ্বনাথি রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপরি-উক্ত প্রাজ্ঞ আলিমদের সবাই দেশ-ভেদে ইমাম, মোল্লা, শায়খ ও মাওলানা লকবে খ্যাত ছিলেন। যুগ যুগ ধরে তাঁরা সবাই সেই উপাধিতেই সুপরিচিত। উল্লিখিত আলিমদের দু’একজনকে ভক্তির আতিশয্যে ‘আল্লামা’ লিখে থাকেন। কিন্তু বর্ণিত আলিমরা জীবিতকালে ও তৎপরবর্তীকালে ‘আল্লামা’ উপাধিতে পরিচিত ছিলেন না। তাঁদের জীবনী গ্রন্থে এবং বিভিন্ন বর্ণনায়ও ‘আল্লামা’ অভিহিত করা হয়নি।

উপরি-উক্ত আলিমরা ইসলামি জ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে (যথাÑতাফসির, হাদিস, ফিকাহ্, তাওহিদ ও আকাইদ, উসুলে তাফসির, উসুলে হাদিস, উসুলে ফিকাহ্, আস্মাউর রিজাল, তাসাওউফ, তাজ্বিদ, তাওয়ারিখ, লিসানুল আরবি, আদবুল আরবি, মায়াশিয়াত, ইক্তিসাদিয়াত, নহ্, সরফ্, ফারাইজ, মন্তিক, বালাগত, সিয়াসত) অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। জাগতিক বিভিন্ন বিষয়েও তাঁদের অনেকে ছিলেন সুপণ্ডিত। কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও তাঁদেরকে ‘আল্লামা’ লকব দেয়া হয়নি। তাঁরা কী এই উপাধির যোগ্য ছিলেন না? অবশ্যই ছিলেন। তবুও তাঁদেরকে ‘আল্লামা’ ভূষণে ভূষিত না করার সূক্ষ্ম কারণ রয়েছে।

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করে অথবা প্রখ্যাত ও স্বীকৃত আলিমদের কাছ থেকে ইসলামি জ্ঞানার্জনকারী সনদপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেই আলিম বলা হয়। অন্য কোনো ধর্ম বা বিষয়ে এবং মাদ্রাসা ব্যতীত ভিন্ন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অথবা অন্য কোনো পন্থায় ইসলামি ইল্ম অর্জন করলে তাকে ‘আলিম’ ও ‘মাওলানা’ বলা যায় না। অর্থাৎ স্বীকৃত পন্থায় ইসলামি ইল্ম অর্জনের সঙ্গে ‘আলিম’ ও ‘মাওলানা’ শব্দটি ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু ‘আল্লামা’ শব্দের সঙ্গে স্বীকৃত পন্থায় ইসলামি জ্ঞানার্জনের সম্পর্ক নেই। কেউ নিজ অধ্যবসায় অথবা অন্য কোনো উপায়ে ইসলামের নানা বিষয়ে প্রচুর জ্ঞানার্জন করতে পারেন। এ রকম ব্যক্তি ইসলামি চিন্তাবিদ, ইসলামি লেখক ও ভালো ওয়াইজ (বক্তা) হওয়াও বিচিত্র নয়।
এসব কারণেই আইম্মায়ে কিরাম (ইমামগণ), উলামায়ে সাবিকিন ও মুতাআখ্খিরিন (প্রাচীনকাল ও তৎপরবর্তীকালের আলিমগণ) এবং মাশায়িখে ইজামকে ‘আল্লামা’ লকব দেয়া হয়নি বলে প্রতীতি হয়।
যে-কোনো ধর্ম, বিষয়-তত্ত্বে অত্যন্ত জ্ঞানবান, বৈজ্ঞানিক এবং মানুষের বংশপরিচয় ও বংশলতিকা সম্পর্কে বিজ্ঞজনকে ‘আল্লামা’ অভিধায় ভূষিত করা হয়। অতীতে তা-ই করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্রুত কয়েকজন আল্লামার কথা উল্লেখনীয়।

মিসরের আবু উমর উসমান ইবনে উমর ইবনে হাজিব (৫৭০-৬৬৬ হি.) ছিলেন র্সফ, নহ্, বালাগত ও ফাসাহত (আরবি শব্দতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও অলংকারশাস্ত্র)-এর যশস্বী পণ্ডিত। আরবি ব্যাকরণ সম্পর্কে তাঁর প্রণীত ‘কাফিয়া’ কিতাব এখনো মাদ্রাসা সমূহে পড়ানো হয়। পরবর্তীকালে মোল্লা নুরুদ্দিন আবদুর রহমান জামি খুরাসানি (রহ.) ‘কাফিয়া’ গ্রন্থের ব্যাখ্যামূলক একটি কিতাব লিখেন। এই গ্রন্থের নাম ‘শারহে জামি’ এবং এটিও মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যতালিকাভুক্ত। মোল্লা জামি তাঁর গ্রন্থের প্রারম্ভে ‘কাফিয়া’ কিতাবের প্রণেতা আবু উমর উসমান ইবনে হাজিব (রহ.)-কে ‘আল্লামা’ অভিহিত করেছেন। মোল্লা জামিও ছিলেন প্রখ্যাত আলিম ও আরবি ব্যাকরণবিদ।
মোঘল সম্রাট আকবরের (১৫৪২-১৬০ খ্রি.) শাসনকালে একজন জাঁদরেল তাত্ত্বিক ‘আল্লামা’ উপাধি পেয়েছিলেন। তবে তাঁর পরিণতি হয়েছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। তাঁর নাম আবুল ফজল (১৫৫১-১৬০২ খ্রি.)। তিনি ছিলেন সম্রাট আকবরের নবরত্মের একজন। নানা বিষয়ে তিনি উচ্চস্তরের জ্ঞানী ছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট আকবর তাঁকে ‘আল্লামা’ খেতাব দিয়েছিলেন। আবুল ফজলের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আবুল ফয়েজ ফয়জি ছিলেন বিখ্যাত ফারসি কবি। তিনিও সম্রাট আকবরের সভাসদ ছিলেন। মিষ্টভাষী আবুল ফয়েজ ফয়জিকে সম্রাট আকবর ‘মালিকুশ শুয়ারা’ অর্থাৎ ‘কবি সম্রাট’ খেতাব প্রদান করেন। ‘মন্তিক’ অর্থাৎ যুক্তিবিদ্যায় আবুল ফজল ও আবুল ফয়েজের অসাধারণ দক্ষতা ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে এই দুই সহোদরের প্ররোচণায় সম্রাট আকবর তথাকথিত ‘দিনে এলাহি’ প্রবর্তন করেছিলেন। আবুল ফয়েজ ও আবুল ফজল ‘দিনে এলাহি’ সম্পর্কিত বিষয়ে তৎকালীন হক্কানি আলিমদেরকে যুক্তির মাধ্যমে পরাস্ত করতেন। তবে তাঁদের পিতা শায়খ মুবারক (রহ., ৯১১-১০২২ হি.) ছিলেন বিখ্যাত আলিম। সম্রাট আকবর তনয় যুবরাজ সেলিমের বাহিনী ১৬০২ সালে আবুল ফজলকে অতর্কিতে হত্যা করে। পরে যুবরাজ সেলিমের নির্দেশে আল্লামা আবুল ফজলের কর্তিত মস্তক বিশ্বের নিকৃষ্টতম স্থান-শৌচাগারে নিক্ষেপ করা হয়। উল্লেখ্য, যুবরাজ সেলিম পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীর নাম ধারণ করে চতুর্থ মোঘল সম্রাট হন।
প্রায় শতাব্দীকাল পূর্বে এই উপমহাদেশে আরেকজন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আল্লামা’ উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি উর্দু ভাষার বিখ্যাত কবি ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮ খ্রি.)। ‘আল্লামা’ হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। তাঁর মাধ্যমেই এই লকবটি উপমহাদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। আলিমদেরকে ‘মাওলানা’-এর পরিবর্তে ‘আল্লামা’ বলা শুরু হয়। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে ইকবালের অগাধ জ্ঞান থাকলেও তিনি ‘মাওলানা’ ছিলেন না এবং আজীবন তাঁর বেশভূষাও সুন্নাতি বা আলিমদের মতো ছিল না। পাকিস্তানের শিয়ালকোটে জন্মগ্রহণকারী ইকবাল ছিলেন ইসলামি জাগরণের কবি, দার্শনিক এবং ব্যারিস্টার। জার্মানির মিউনিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানজনক ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি প্রদান করেছিল। লাহোর ইকবাল অ্যাকাডেমির সহকারী পরিচালক ড. ওয়াহিদ ইশরাত এক অনুষ্ঠানে কবি ইকবালকে ‘আল্লামা’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তখন থেকে তাঁকে ‘আল্লামা ইকবাল’ বলা শুরু হয়। এই ‘আল্লামা’ কাফির ফতোয়ার শিকার হয়েছিলেন। তাঁর ‘শিক্ওয়াহ’ কবিতা প্রকাশের পর কতিপয় আলিম তাঁকে ‘মুরতাদ’ তথা কাফির ফতোয়া দেন। কিন্তু আল্লামা ইকবাল পরবর্তীকালে ‘জওয়াবে শিক্ওয়াহ’ কবিতা রচনার পর ওই আলিমরা লাজবাব ও লজ্জিত হন।

এরকম আরো অনেক আছেন। যারা স্বীকৃত আলিম ছিলেন না, তবে ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক ও লেখক এবং বিভিন্ন তত্ত্ববিদ ছিলেন। একারণে তাঁরা ‘আল্লামা’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।
উচ্চস্তরের আলিমদের জ্ঞান-প্রজ্ঞার বিশালত্ব প্রকাশ ও সম্মাননা হিসেবে অনেকে তাদেরকে ‘আল্লামা’ বলে ভূষিত করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে ছোট-বড়, খ্যাত-অখ্যাত সকল আলিমের নামের পূর্বে ‘আল্লামা’ লকব প্রয়োগ যেন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। মসজিদের ইমাম ও খতিব, সাধারণ মাদ্রাসার মুহতামিম বা অধ্যক্ষ এবং ভালো ওয়ায়িজ বা বক্তা থেকে শুরু করে বিশিষ্ট আলিমদের গণহারে ‘আল্লামা’ আখ্যা দেওয়া হিড়িক পড়েছে। ‘আল্লামা’-এর এহেন অপপ্রয়োগের ফলে পূর্ববর্তী আকাবিরিন, সাল্ফে সালিহিন, বুজুর্গান, মাশায়িখ ও উলামায়ে কিরামের রীতি ভঙ্গের পাশাপাশি তাদের হেয়ও করা হচ্ছে। তাঁদের জ্ঞান মেধা ও প্রজ্ঞা বর্তমান যুগের আলিমদের তুলনায় কম থাকায় তাঁরা ‘আল্লামা’ ছিলেন না বলে ধারণা হওয়া নিতান্ত স্বাভাবিক।
পাদটীকা: বর্তমানে এমন অনেককে ‘আল্লামা’ ও ‘হজরতুল আল্লাম’ বলা হয়, যারা প্রকৃত মাওলানা বা আলিম নন। হয়তো কিছুদিন মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছেন। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে তাদের খণ্ডিত ও আংশিক জ্ঞান রয়েছে। এসব হাইব্রিড আল্লামাকে ‘উল্লামা’ অথবা ‘ইল্মানিয়ু’ লকব দেয়া সংগত।

তথ্য-সহায়তা: দেওবন্দ দারুল উলুম মাদ্রাসার সাবেক মুহতামিম মাওলানা ওহিদুজ্জামান কাসিমি কিরানভি (রহ.) প্রণীত আরবি-উর্দু অভিধান ‘আলকামুসুল ওহিদ’ (২) কাজি জয়নুল আরেফিন সাজ্জাদ মিরাটি প্রণীত আরবি-উর্দু অভিধান ‘বায়ানুল্লিসান’ (৩) বাংলা একাডেমী আরবি-বাংলা অভিধান (৪) ইসলামিক ফাউন্ডেশন আরবি-বাংলা অভিধান (৫) মাওলানা মুহিউদ্দিন খান প্রণীত আরবি-বাংলা অভিধান ‘আলকাওছার’ (৬) ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কর্তৃক প্রকাশিত ফার্সী-বাংলা-ইংরেজি অভিধান (৭) ড. আবু সাঈদ নূর উদ্দিন প্রণীত ‘মহাকবি ইকবাল’, প্রকাশক আল্লামা ইকবাল সংসদ ঢাকা, প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ (৮) মাওলানা আবুল ফাতেহ্ আজিজি প্রণীত আরবি-উর্দু অভিধান ‘মিফতাহুল্লুগাত’ (৯) উইকিপিডিয়া (১০) কবি ইকবালের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ১৯৮৩-এর নভেম্বরে ইসলামিক ফাউন্ডেশন-প্রকাশিত স্মরণিকা ‘আল্লামা ইকবাল’ (১১) ‘আকবরের নবরতœ’-আখতার ফারূক (১২) ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রকাশিত ‘ইসলামী বিশ্বকোষ’।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: