সর্বশেষ আপডেট : ১২ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড আগে
বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

ইতিহাসের পনেরোটা বছর

1478573680খেলাধুলা ডেস্ক:: ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডের পরের ঘটনা। বাংলাদেশ তখন বিজয়ের উৎসব করতে ব্যস্ত। দলের তরুণরা ইচ্ছেমতো ছোটাছুটি করছেন। সিনিয়ররা সবার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। এর মধ্যে চোখে পড়লো খুব ছটফট করে ছুটে বেড়াচ্ছেন দীর্ঘকায় এক লিকলিকে তরুণ। ফ্লাড লাইটের আলোয় প্রেসবক্স থেকে চেহারাটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিলো না।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাবেক জাতীয় দল অধিনায়ক হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘মনে হয়, এখন দলে সবচেয়ে কম বয়স ওর। বিশ্বাসই হয় না, মাশরাফি পনেরো বছর পার করে ফেলতে যাচ্ছে।’

হ্যাঁ, সব দিক থেকেই বিশ্বাস করা খুব কঠিন।

মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যেতে বসেছিলো মাশরাফি বিন মুর্তজার ক্যারিয়ারে। এই পনেরো বছরে অন্তত এগারো বার মনে হয়েছে, আর পারবেন না। মাশরাফি হারিয়ে যেতে বসেছিলেন। প্রতিবার উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনি। প্রতিবার উঠে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছেন, ফিরে ফিরে এসেছেন। আর বজ্রকণ্ঠে যেনো ঘোষণা করেছেন, তিনি হারিয়ে যাওয়ার জন্য আসেননি।

দেখতে দেখতে এই উত্থান-পতনকে সাক্ষী করে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা মাশরাফি আজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পূর্ণ করছেন পনেরো বছর।

২০০১ সালের ৮ নভেম্বর জিম্বাবুয়ের সাথে টেস্টের ভেতর দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। পরের বছরই নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম এবং ভয়াবহতম ইনজুরিতে পড়েন। এরপর দফায় দফায় সাতবার শুধু দুই হাঁটুতে অপারেশন হয়েছে, অধিনায়কত্ব পেয়েও দুই দিনের বেশি সেটা করতে পারেননি। দেশকে জিতিয়েছেন অনেক অনেক ম্যাচ। এক সময় ছিলেন দেশের সবচেয়ে বেশি ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতা খেলোয়াড়।

সেখান থেকে সরে গিয়ে হারিয়ে যেতে বসেছিলেন। ২০১১ বিশ্বকাপে ঘরের মাটির আসরে দলেই ঠাঁই হয়নি। সেই মাশরাফি আবার ফিরে এসেছেন। জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব পেয়েছেন। আর জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি। টানা ছয়টা ওয়ানডে সিরিজ জিতিয়েছেন বাংলাদেশকে, তুলেছেন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে।

গতকাল বলছিলেন, এই পনেরো বছর ধরে খেলে যাওয়ার কোনো অর্জন তাকে আপ্লুত করে না। তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের লাল-সবুজ জার্সিটা পরতে পারা, ‘এই মুহূর্তে খুব ভালো লাগছে। আমি কি করতে পেরেছি, সেই কারণে নয়। বাংলাদেশ দলের একজন সদস্য হিসেবে ১৫ বছর পার করলাম, এটাই আমার কাছে অনেক বড়।’

এই লম্বা পথ পাড়ি দিতে গিয়ে কয়েক প্রজন্মকে সতীর্থ হিসেবে পেয়েছেন, তাদের স্মরণ করে খুব উপভোগ করছেন সময়টা, ‘সত্যি বলতে, খুব ভালো লাগছে। বেশ কয়েক প্রজন্মের সঙ্গে খেলেছি। রকিবুল ভাই বা লিপু ভাইদের তো পাইনি। যাদের সঙ্গে শুরু করেছিলাম, আকরাম ভাই, সুজন ভাই, আজকে তারা বোর্ডের ভালো ভালো জায়গায় আছে। বুলবুল ভাই, পাইলট ভাই, রফিক ভাই, মনি ভাই, মঞ্জু ভাই, শান্ত ভাই—সবার কথাই মনে পড়ছে। পরের প্রজন্ম ধরলে আমাদের ব্যাচ, আশরাফুল, শরীফ, তাপশ বৈশ্য, তালহা জুবায়ের, পরে নাফিস ইকবাল, রাজিন ভাইরা এলেন। আরো পরে মুশফিক-সাকিব-তামিমরা এলো। এখন মুস্তাফিজ, মিরাজ—প্রতিটি প্রজন্মের সঙ্গে খেলাই উপভোগ করেছি। যতো দিন খেলবো, চেষ্টা করবো উপভোগ করতে।’

মাশরাফির মতো ইনজুরিপ্রবণ খেলোয়াড়ের জন্য পনেরো বছর খেলে যাওয়াটা শুধু বিস্ময় নয়, মহাবিস্ময়ের ব্যাপার। তিনি নিজে বলছেন, এই পারার প্রধান কারণ, উপভোগ করতে পারা, ‘ক্রিকেট খেলে যদি উপভোগ না করতাম, আনন্দ না পেতাম, তাহলে খেলতে পারতাম না। বিশেষ করে আমার যত সমস্যা ছিল।’

একটু আক্ষেপ আছে যে, ইনজুরি না থাকলে এই পনেরো বছরে তার অর্জনটাও হয়তো আরেকটু সমৃদ্ধ হতো। তবে আক্ষেপের চেয়ে ভালো লাগাই বেশি, ‘ইনজুরি না থাকলে হয়ত আরো ভালো কিছু হতে পারতো। পরিসংখ্যান আরো সমৃদ্ধ হতে পারতো। তবে সেই আক্ষেপের চেয়েও ভালো লাগাটা বেশি যখন ভাবি, যে এতো সমস্যার ভেতরও আমি খেলতে পেরেছি। সবার দোয়া ছিল।’

এক নজরে মাশরাফি

২০০১: জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ঢাকা টেস্টের ভেতর দিয়ে ৮ নভেম্বর শুরু জাতীয় দলের হয়ে খেলা; ১৯ নম্বর টেস্ট ক্রিকেটার। একই মাসে একই প্রতিপক্ষের সাথে ওয়ানডে অভিষেক

২০০২: ইনজুরিতে বসে রইলেন সারাটা বছর। নিউজিল্যান্ড সফরে চোট লেগেছিলো। বাড়িতে রিহ্যাব করার সময় লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়।

২০০৩: দক্ষিণ আফ্রিকায় বিস্মরণযোগ্য বিশ্বকাপ দিয়ে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরলেন। পুরো বিশ্বকাপ শেষ করতে পারেননি। গোড়ালি মচকে ফিরে এসেছিলেন। বছরের শেষদিকে ইংল্যান্ডকে কাঁপিয়ে দেওয়া বোলিংয়ের পর আবারও ইনজুরিতে পড়েন।

২০০৪: অলরাউন্ড পারফরম্যান্স দিয়ে প্রথমবারের মতো হারালেন ভারতকে। ডেভ হোয়াটমোরের সাথে জুটি শুরু হলো।

২০০৫: বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের অংশীদার। তিন বছর পর প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেললেন ঘরোয়া ক্রিকেটে।

২০০৬: অস্ট্রেলিয়াকে কার্ডিফে হারানোর অন্যতম নায়ক হয়ে উঠলেন। কেনিয়ার বিপক্ষে ২৬ রানে ৬ উইকেট এবং পরপর দুই ম্যাচে ম্যাচসেরা। বিয়ে করলেন এই বছর। ভারতের বিপক্ষে টেস্টে অসামান্য ব্যাটিংয়ের কারণে আলোচনায় ছিলো মাশরাফির ব্যাটিং।

২০০৭: ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপে ভারতকে হারানোর পথে অবিস্মরণীয় বোলিং। বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ডকে হারানোর পথে অলরাউন্ড পারফরম্যান্স।

২০০৮: প্রথম দল থেকে বাদ পড়েছিলেন ইনজুরি থেকে ফেরার পর। আইসিএলে যাওয়ার প্রস্তাব ফেরালেন। জাতীয় দলের সহ-অধিনায়ক হলেন; অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল।

২০০৯: আইপিএলে ডাক পেলেন। ৪ কোটি টাকায় কলকাতা নাইট রাইডার্স কিনে নিলো তাকে দুই বছরের জন্য। মোহাম্মদ আশরাফুলকে সরিয়ে পূর্ণাঙ্গ অধিনায়ক করা হলো। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম দায়িত্বে গিয়ে টেস্টের দ্বিতীয় দিনেই ইনজুরিতে পড়ে সে অধ্যায় শেষ।

২০১০: জাতীয় দলের সাথে সামান্য টানাপোড়েন হলো। ইনজুরি থেকে ফিরে এসে ছন্দ পাচ্ছিলেন। দলে জায়গা হারালেন। তবে একই বছর আবার ইংল্যান্ডে ও আয়ারল্যান্ডে সীমিত ওভারের দলে অধিনায়কত্ব করলেন।

২০১১: পরপর দুই দফা ইনজুরি। সেরে উঠছিলেন বিশ্বকাপকে মাথায় রেখে। এই অবস্থায় আবাহনীর হয়ে খেলতে গিয়ে আবার ইনজুরিতে পড়ায় অনিশ্চিত হলো বিশ্বকাপ। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে বিতর্কিতভাবে রাখা হলো না দলে। সে নিয়ে অনেক তোলপাড়, চোখের পানি। প্রথম বাবা হলেন এই বছর। মাঠের বাইরে থাকলেন প্রায় সারা বছর।

২০১২: প্রথম বিপিএলে প্রায় অপাংক্তেয় ছিলেন। ঘটনাচক্রে ঢাকার অধিনায়ক হলেন এবং শিরোপা জিতলেন।

২০১৩: আবারও বিপিএল শিরোপা। ফিটনেস ইস্যুতে খুব ভুগছিলেন। অপারেশন করিয়ে দারুণ ফিটনেস কাজ করলেন বছর জুড়ে।

২০১৪: পূর্ণ ছন্দে ফিরে এলেন বল হাতে বছরের মাঝামাঝি মুশফিকের ইনজুরিতে টি-টোয়েন্টি অধিনায়কত্ব করলেন। আর বছরের শেষে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সীমিত ওভারের অধিনায়ক করা হলো তাকে। টানা ছয়টা ওয়ানডে সিরিজ জিতে উদযাপন করেছেন।

২০১৫: কিংবদন্তী হয়ে ওঠার বছর। ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ে, ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জয়। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়া। আবারও বিপিএল শিরোপা জয়।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: