সর্বশেষ আপডেট : ৮ মিনিট ৪ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

লিবিয়া থেকে ইতালি…সমুদ্রে বিপন্ন হাজারো প্রান !

1-daily-sylhet-0-7হাসান মো. শামীম:: ইদানিং সিলেট শহরের বেকার যুবক দের মাঝে বেড়ে গেছে বিদেশ যাওয়ার প্রবনতা । দলে দলে অনেকেই পাড়ি জম্মাচ্ছেন প্রবাসের পথে ! তবে লক্ষ্য ভিন্ন, স্বপ্নের দেশ ইংল্যান্ড নয়,ইউরোপের দেশ ইতালি ! কোণ মতে পৌছাতে পারলেই যেখানে নিশ্চিত উন্নত জীবনের হাতছানি, স্থায়ী হওয়ার সুযোগ, এবং ভাল ভাবে খেয়ে পড়ে বেচে থাকার নিশ্চয়তা । তবে স্বপ্ন পুরনের সে যাত্রা মোটেও মসৃন নয় । পাড়ি দিতে হয় বিপদ সংকুল আটলান্টিক মহাসাগর! অবৈধ পথে ইতালি যাত্রার সে রুটে প্রথমে যেতে হয় যুদ্ধ বিধধস্থ লিবিয়া ।সেখান থেকে ধাপে ধাপে ইতালি ,প্রতি সেকেন্ডেই থাকে মৃত্যুর পরোয়ানা ! সবাই পালাতে চায় দেশ থেকে।। আর এ পালানোর পথটি সহজ না হওয়াতে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে পাড়ি জমানো ইউরোপ আমেরিকাতে। সফল হচ্ছেন কেউ কেউ কালে-ভদ্রে, আবার কেউ বেঘোরে মারা গিয়ে লাশ হয়ে বিলীন হয়ে হারিয়ে যাচ্ছেন কোন অজানা অচেনা অথৈ সমুদ্রে। কারো খোঁজ মেলে কখনো বেঁচে যাওয়া সহযাত্রীর মুখে, কেউবা নিখোঁজ থাকে বছরের পর বছর। স্বজনরা অন্ধকারে হাতরাতে থাকে প্রিয়জনের মুখ দিনের পর দিন!

এরূপই এক গ্রামীণ বাঙালি তরুণের সমুদ্র পথে ইতালী পৌঁছানোর ভয়াবহ ও চমকপ্রদ সত্য কাহিনী…

বর্ণিত বাংলাদেশী তরুণের অনুরোধে তার প্রকৃত নামটি প্রকাশ না করে আমরা ধরে নিলাম তার নাম ‘তুহীন’। তুহীনের গ্রামের বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজারে। তার গ্রামের তথা বাড়ির আশে-পাশের অনেকই বসবাস করে যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালীসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, নিদেনপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে। তাই উচ্চ মাধ্যমিক পড়া শেষ করেই তুহীন খুঁজতে থাকে ইতালী গমনের নানা বৈধ/অবৈধ পথ, এ এক সংক্রামক রোগ! এক সময় খোঁজ মেলে কাংখিত দালালের, যারা সাড়ে সাত লাখ টাকার বিনিময়ে লিবিয়া হয়ে সমুদ্র পথে পৌঁছে দেবে ইতালীর সিসিলি দ্বীপে। প্রথমে দিতে হবে দেড় লাখ টাকা বাংলাদেশে, বাকি টাকা পর্যায়ক্রমে লিবিয়া ও সিসিলি পৌঁছার পর। প্রথমে দেড় লাখ টাকা নগদ পরিশোধ করে বাকি টাকার ডলার সাথে নিয়ে ১৫-জনের গ্রুপের সঙ্গে লিবিয়া পৌঁছে তুহীন দালালের মাধ্যমে। পৌঁছে লিবিয়ার প্রত্যন্ত শহর ‘আল-জাউফ’-এ।

প্রায় ৩-মাস সেখানে কাটানোর পর নতুন লিবীয়-বাঙালি দালালের মাধ্যমে ত্রিপলী সমুদ্র বন্দরের কাছাকাছি ‘ইতালী-গমনের ট্রানজিট’ সমুদ্র পয়েন্টে গোপন পথে পৌঁছে দেয়ার চুক্তি করে তুহীনদের গ্রুপ প্রতিজন ২০০০ লিবীয় দিনারের বিনিময়ে, যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় দেড় -লাখ টাকার সমান। চোরাই পথে মানুষ পরিবহণের বিশেষ ধরণের কাভার্ড ভ্যানে তোলা হয় তুহীনদের ৫০-জনের গ্রুপকে। ভ্যানে বসার জন্যে তৈরী করা থাকে বিশেষ ধরণের আসন (বাংলাদেশী বসার মোড়ার মত) এবং শ্বাস-প্রশ্বাস করার বিশেষ কৃত্রিম নল। বিশেষ টয়লেটও থাকে ঐ ভ্যানে। টয়লেটে গমনের প্রয়োজনে নল মুখে দিয়ে যেতে হয়। প্রায় ৪ দিন ঐ মোড়ার আসনে বসে থাকতে হয় অন্ধকার কুঠরিতে। মাঝে ২-বার গোপন পাহাড়ের গুহায় প্রবেশ করে ভ্যান। সেখানে সবাই নেমে ১-ঘন্টা হাটাচলার সুযোগ পায়। আবার দিনরাত চলে অন্ধকার ভ্যান। অবশেষে শেষ রাতে বিশেষ পয়েন্ট ‘আজদাফিয়ায়’ নামিয়ে দিয়ে ভ্যান চলে যায় তার নিজ গন্তব্যে নতুন যাত্রীর খোঁজে।

আজদাফিয়া সমুদ্র বন্দরের কাছাকাছি ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ জড়ো হয় তুহীনদের গ্রুপ। সেখানে কয়েক হাজার মানুষ দেখতে পায় তারা। আফ্রিকা ছাড়াও বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের প্রচুর লোকের দেখা মেলে সেখানে। কেউ অপেক্ষা করছে ১-মাস, কেউবা ২-৪দিন আগে এসেছে বিভিন্ন পথে। সবার উদ্দেশ্য সমুদ্র পথে ইউরোপ গমন, বিশেষ করে ইতালী। নগদ ৫০০০ দিনারে জনপ্রতি চুক্তি করে তুহীনরা। তাদেরকে পৌঁছে দেয়া হবে সিসিলি দ্বীপে কিংবা ইতালীর যে কোন স্থলভাগের কাছাকাছি ডুবিয়ে দেয়া হবে বোট, সাঁতরে উঠতে হবে তীরে। সিন্ধান্ত মত ২৫০ জনের গ্রুপ রাত দুটোয় বাংলাদেশী সমুদ্রগামী দেশী ফিশিং বোটের মত ইঞ্জিন চালিত নৌকায় উঠে বসে তুহীনরা। যার মধ্যে বাঙালির সংখ্যা ৫০।

নির্দেশ মত প্রত্যেকে কেবল নিজ পড়নের হালকা জামা-কাপড় ও পানি নিরোধক পলিথিনে করে যার যার সঙ্গের ডলার ছাড়া খালি হাতে বোটে ওঠে তারা। ওঠার সময় প্রত্যেক যাত্রীকে পথে বিপদ, সাঁতার কাটা, ঝড়ে পড়লে করণীয় ইত্যাদি বুঝিয়ে কেবল একটি সাঁতার কাটার লাইফ জ্যাকেট ধরিয়ে দেয়া হয় হাতে। ১০০ মানুষের ধারণ ক্ষমতার বোটে ২৫০ অভিবাসী উঠানোর কারণে প্রত্যেকে প্রত্যেকের গায়ে গায়ে লেগে বোটের পাটাতনে অপেক্ষা করতে থাকে অনন্ত সময়ের। ২-ইঞ্জিন চালিত খোলা বোট সারারাত ভূমধ্যসাগরে নীল জলরাশি কেটে কেটে ভোরের মধ্যেই তিউনিসিয়ার ‘সাইটেক্স উপকুল’ পাড়ি দিয়ে এগুতে থাকে মাল্টার দিকে। অদূরে চলাচলরত ধাবমান ও ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে গভীর সমুদ্রে ভাসমান বোটের দেখা মেলে বেশ ক’টি। কিন্তু কারো চিৎকারে কেউ এগিয়ে না গিয়ে সব কিছু তুচ্ছ করে ‘ইয়া নাফছি’মত নিজেদের বোট নিয়ে এগুতে থাকে মাল্টা উপকুলের দিকে।

হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে থাকতে প্রায় সবার পায়ে ঝিঝি লাগে। বোটের ৫-লিবীয় নাবিক কঠোর আরবী ভাষায় সবাইকে নড়াচড়া না করার নির্দেশ দেয়। জুনের শান্ত সমুদ্রেও ৪-৫ ফুট উঁচু ঢেউ ফেড়ে ফেড়ে বোট সামনে এগুতে থাকে গ্রীক মহাকাব্যিক নাবিকেদর মত। সন্ধ্যার কাছাকাছি বোট মাল্টাকে ডানে রেখে সোজা চলতে থাকে উত্তর বরাবর। কম্পাস ও দূরবীণ নিয়ে স্থানীয় অভিজ্ঞ লিবীয় নাবিকগণ নিদের্শনামত শেষরাতেই পৌছে যান সিসিলি দ্বীপের কাছকাছি। স্থলভাগে পৌঁছতে আরো ৪০-৫০ কিলোমিটার থাকতেই ইতালীয় নৌ-সেনার রাডারে ধরা পড়ে অবৈধ বোট। তুহীনদের চলমান বোটের দিকে জ্বলন্ত সার্চলাইট ফেলে এগুতে থাকে ইতালীয় দ্রুত গতির বিমানবাহী নৌসেনার যুদ্ধ জাহাজ।

লিবীয় বোট মাঝিরা সবাইকে গভীর সমুদ্রে ঝাপ দেয়ার নির্দেশ দেয়। ভোরের আধো অন্ধকার থাকতেই একে একে ঝাপিয়ে পড়তে থাকে আফ্রিকা-এশিয়ার নবাগত অভিবাসীরা। যারা ভয়ে ঝাপ দিয়ে চায়না, তাদের মাথায় কাঠ দিয়ে আঘাত করে লিবীয়রা। কয়েকজনকে পিস্তলের গুলি করে। ২৫০ জনের সবাইকে ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় সমুদ্রে ফেলে দিয়ে বোটের বিশেষ ‘হোলকে’ খুলে দিয়ে ইতালীয় নৌজাহাজ পৌছার আগেই বোটকে ডুবিয়ে দেয় গভীর সমুদ্রে। নিজেরাও সমুদ্রে ঝাপিয়ে পড়ে অন্যদের মত। অপেক্ষা করতে থাকে উদ্ধারকারী নৌজাহাজের, ভাসতে থাকে সমুদ্রের নীল জলরাশিতে।

নৌসেনারা কাছাকাছি এলে পূর্বে শেখানো নির্দেশ মত সবাই দু’হাত উঁচু করে ইতালীয় ভাষায় ‘‘হেল্প হেল্প’’ বলে চিৎকার করতে থাকে। জাহাজ থেকে ১০-১২টি ছোট বোটে নৌসেনারা এসে একে একে বিপন্ন যাত্রীদের তুলতে থাকে নিজস্ব বোটে। এর মধ্যে ৭-জন হারিয়ে যায় সমুদ্রের মাঝে ঢেউ কিংবা ভয়ে। ২৪৩-জনকে উদ্ধার করে ইতালীয় নৌসেনারা। বিশেষ সিঁড়ি ফেলে তুলে নেয় মূল জাহাজে। প্রথমে সবাইকে গোছল করায় নর্মাল পানি দিয়ে, পরীক্ষা করায় ডাক্তার দিয়ে। চেক করে সমস্ত শরীর। ডলার পেয়েও যার যার ডলার ফিরিয়ে দেয় তাদের। পড়তে দেয় ‘অন টাইম ইউজের কাগুজে জামা-কাপড়’, খেতে দেয় হালকা খাবার।

২-৩ ঘন্টার মধ্যে জাহাজ নোঙর করে সিসিলি বন্দরে। সবাইকে বিশেষ পাহারায় ভর্তি করে বন্দর সন্নিকটের হাসপাতালে। প্রায় ১-মাস হাসপাতালে রেখে নানাবিধ পরীক্ষা শেষে বিশেষ হেলিকন্টারে সবাইকে নেয়া হয় রোমের সেন্ট্রাল জেলে।
রোম সেন্ট্রাল জেলে ট্রাউজার, তোয়ালে, হাফ হাতার নুতন জামা কাপড় ইত্যাদি দেয়া হয় সবাইকে। এর মধ্যে প্রায় প্রত্যেকের আত্মীয় স্বজনই জেলে হাজির হয় পূর্ব প্লান মোতাবেক ‘উকিল’ নিয়ে। বাংলাদেশী ৫০-জনের প্রায় সবাই একই কথা বলে ‘রাজনৈতিক কারণে দেশে তাদের জীবন বিপন্ন’। দূতাবাস থেকে ডাকা হয় বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের, কথা বলে তুহীনদের সঙ্গে। তুহীনরা প্রমাণ করতে পারেনা ‘কিভাবে তাদের জীবন বিপন্ন দেশে ফিরে গেলে’। প্রায় ১০-মাস চলে মামলা। এই ১০ মাস তুহীনদের মত প্রায় দেড় হাজার বাঙালিকে দেখতে পায় রোম সেন্ট্রাল জেলে।

যারা কোন না কোন ভাবে ইতালী প্রবেশ করার সময় ধরা পড়েছিল ইতালীয় গার্ডদের হাতে। জেলে তাদের প্রচুর খাবার, ফল ইত্যাদি দেয়া হয় প্রত্যহ। এ ছাড়াও রেডক্রিসেন্টের মাধ্যমে দেশে ফোন করা, ইমেইল পাঠানো ইত্যাদির সুবিধা পায় তারা। ইতালী প্রবাসী আত্মীয়রা নিয়মিত দেখা করার সুযোগ পায় তুহীনদের সাথে। নিজেদের কাছে রক্ষিত ডলার দিয়ে পুলিশের মাধ্যমে নানাবিধ মালপত্র কিনতে পারে তারা বৈধ মতে। কিন্তু কেসের রায় চলে যায় তুহীনদের বিপক্ষে। যেহেতু বাংলাদেশ দূতাবাস অবস্থান নেয় সঙ্গত কারণেই তুহীনদের বিপক্ষে। কিন্তু তারপরও তুহীনরা আপীল করে উচ্চ আদালতে। কিন্তু ৩-দিনের মাথায় আপীল খারিজ হয় যৌক্তিক কারণ না দেখতে পেয়ে। রায় হয় তাদের সরকারি খরচে ‘ডিপোর্টেশন’ তথা দেশে ফেরত পাঠানোর।জীবন ফিরে পেলেও ইতালি তে থাকার সুযোগ হয়না আর,তবে অনেকেই থাকার অনুমতি পান,পান কাজ করার অনুমতি ও। এভাবেই সমাপ্ত হয় জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে জয় পরাজয়ের গল্প!

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: