সর্বশেষ আপডেট : ৬ মিনিট ১০ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৩ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

একজন আলী বানাত: মরণব্যাধী ক্যান্সার যার জন্য গিফট

ali-banatতাইসির মাহমুদ:
আলী বানাত। মাত্র পঁচিশ বছরের এক টগবগে হাস্যোজ্জল যুবক। চোখে মুখে যার এখনও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন। এই বয়সেই যিনি অঢেল সম্পদ আর অর্থ-প্রাচুর্যের মালিক। যিনি ৬শ হাজার ডলারের ফেরারী স্পাইডার গাড়ি হাঁকেন। যার একটি ব্রেইসলেটের দাম ৬০ হাজার ডলার। একজোড়া জুতার দাম ১৩শ ডলার আর একজোড়া সেন্ডেলের দাম ৭শ ডলার।
একসময় এসব ছিলো তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিষ। জীবন বলতে তাঁর কাছে ছিলো বিলাসিতা। কিন্তু এখন তাঁর কাছে জীবন মানে সবকিছু উজাড় করে মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেয়া। কে সেই আলী বানাত। কী-বা তার পরিচয়। কীভাবে বদলে গেলো তাঁর জীবন। গল্পের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু গল্প নয়, বাস্তব।
ইউটিউব কিংবা গুগলে ক্লিক করলেই ভেসে আসেন আলী বানাত। তাঁর মুখেই শোনা যায় জীবনের গল্প- জীবনের স্বর্ণালী সময়ে ক্যান্সার নামক মরণব্যাধী কীভাবে আপাদমস্ত পালটে দেয় তাঁকে। জীবন কী বুঝতে পারেন তিনি। মর্মে মর্মে উপলব্দি করতে পারেন সৃষ্টিকর্তাকে।

ফিলিস্তিনী বংশোদ্ভুত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক আলী বানাত সম্প্রতি এসেছিলেন লন্ডনে। তাঁকে নিয়ে যুক্তরাজ্যের তিনটি শহরে ‘ল্যাগেসি অব আলী বানাত ও ইমাম কাসেম’ শিরোনামে অনুষ্ঠান করে চ্যারিটি সংস্থা আল-খায়ের ফাউন্ডেশন। বলটন ও বার্মিংহাম শহরে দুটি অনুষ্ঠান শেষে সর্বশেষ অনুষ্ঠান হয় ২৩ অক্টোবর রোববার অভিজাত এক্সেল এরিনায়। দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দীর্ঘ ৭ ঘণ্টাই অনুষ্ঠান মঞ্চে ছিলেন আলী বানাত। তাঁকে একনজর দেখতে ছুটে এসেছিলেন হাজার হাজার যুবক-তরুণ বৃদ্ধ। সকলেই তাঁর সাথে প্রাণখুলে কথা বলেছেন, হ্যান্ডশেক করেছেন।

রাত নয়টায় অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে নেমে এলে সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় মিলিত হন এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে সহাস্যে বললেন, ভালো আছি। বললেন, ক্যান্সার তাঁর জন্য একটি বিশেষ গিফট। ক্যান্সারে আক্রান্ত না হলে তিনি জীবন সম্পর্কে বুঝতেন না। উপলব্ধি করতে পারতেন না সৃষ্টিকর্তাকে। বদলে দিতে পারতেন না তাঁর বিলাসী জীবনকে।

যখন জানতে পারলেন ক্যান্সার শরীরে বাসা বেঁধেছে তখন মানসিক অবস্থা কেমন ছিলো- বললেন, যখন জানতে পারলাম আমি আর বাঁচবোনা, তখন প্রথমত আমি আমার ৬০০ হাজার ডলারের গাড়ি, বেইসলেট, ঘড়িসহ যাবতীয় জিনিসপত্র, কাপড় চোপড় বিক্রি করে বিদেশে গরীব মানুষের মধ্যে বিলি করে দিই। আমার হৃদয়ে এখন দুনিয়ার জন্য কোনো জায়গা নেই।

দীর্ঘ ৭ ঘণ্টাই অনুষ্ঠান মঞ্চে আলী বানাত তাঁর জীবনের বদলে যাওয়ার গল্প বলেন। তিনি বলেন, “শরীরে প্রচন্ড ব্যাথার জন্য আমার এক বন্ধু আমাকে বিশেষ ধরনের ড্রাগ নিতে বলেছিলেন। একবার ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে বেশি মাত্রায় ড্রাগ গ্রহণ করি। এরপর অবচেতন হয়ে পড়ি। চলে যাই সম্পুর্ণ এক ভিন্ন জগতে। তখন এমন এক জগত দেখলাম যা এর আগে কখনো দেখিনি। আমার পরিবারের সদস্যরা তখন আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিলেন। আমি উপরের দিকে হাত তুলে বলছিলাম অহ আল্লাহ, টেইক মি। ওহ আল্লাহ আমাকে নিয়ে যাও। এতো সুন্দর একটি জগত দেখলাম। সেখানে চলে যেতে আমার মন ছটফট করছিলো। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে জেগে মন খারাপ হয়ে যায়। আল্লাহ আমাকে সেই অনিন্দ সুন্দর ভুবনে নিয়ে যাননি।

আলি বানাতের শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর ডাক্তাররা তাঁর জীবনের মেয়াদ বেঁধে দিয়েছিলেন ৭ মাস। কিন্তু অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে আছেন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। কতদিন বাঁচবেন-এ নিয়ে তাঁর কোনো চিন্তা নেই। জীবন নিয়ে তাঁর কোনো আফসোস নেই। পরিবারে বাবা মা আছেন। ভাই-বোন আছেন। স্ত্রী সন্তান আছে। জীবনে শিক্ষাক্ষেত্রে তেমন সফল হতে না পারলেও সফল হয়েছিলেন ব্যবসায়। সীমাহীন প্রাচুর্যের মালিক হয়েছিলেন অল্প বয়সেই।
আলী বানাত তাঁর বদলে যাওয়ার গল্প বলতেই থাকেন। তিনি বলেন, “আমার এক ক্যান্সার আক্রান্ত বন্ধুর মৃত্যুর পর তাঁকে দাফনের জন্য কবরস্থানে গেলাম। বন্ধুকে দাফনের পর আমি নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করি। বন্ধুটি চলে গেলো। কিন্ত তার সঙ্গে তো কিছুই গেলোনা। আমার মৃত্যুর পরও তো কোনো কিছুই সঙ্গে যাবেনা। অর্থ-সম্পদ, মা-বাবা, ভাই-বোন কিছুই না, কেউ না। যা সঙ্গে যাবে তা হচ্ছে ভালো কাজ, চ্যারিটি। এই একটি কাজই পরবর্তী জীবনে আমাকে সাহায্য করতে পারে।

এরপর আমি আফ্রিকা চলে যাই। ফিরে এসে মুসলিম অ্যারাউন্ড দ্যা ওয়ালর্ড প্রজেক্ট নামে চ্যারিটি প্রতিষ্ঠা করি। আমার সকল অর্থসম্পদ দান করি এই চ্যারিটি সংস্থায়। এখন ফান্ডরেইজিং করছি এই চ্যারিটির জন্য। আমার অবর্তমানে এই চ্যারিটি যেনো আমার জন্য সাদকায়ে জারিয়া হতে পারে।
আপনার শেষ দিনগুলো কেমন কাটছে- জবাবে আলী বানাত বলেন, সৃষ্টিকর্তার সাথে সাক্ষাতের প্রস্তুতি নিচ্ছি। কারণ নবী করিম (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করতে চায়, আল্লাহ তায়ালা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ভালোবাসেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সাক্ষাৎ চায়না, আল্লাহ তায়ালাও তার সাথে সাক্ষাত করতে চান।

 

14508546_10154154555719753_1402242462_nলেখক: সম্পাদক, ‘সাপ্তাহিক দেশ’

লন্ডন।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: