সর্বশেষ আপডেট : ৩ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড আগে
শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬, খ্রীষ্টাব্দ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সিন্ডিকেটের দখলে সীমান্ত হাট

1477709391নিউজ ডেস্ক:: দুই দেশের মানুষকে কাছে আনলেও জীবনমান বাড়ায়নি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত হাট। অথচ পণ্য কেনাবেচার মাধ্যমে সীমান্তের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব, আচরণ ও জনগণের দৈনন্দিন জীবনমান উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়েই ৪টি হাটের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

সীমান্ত পাড়ের বাসিন্দারা বলেছেন, সপ্তাহে মাত্র একদিন হাট বসে। চুক্তি অনুযায়ী সীমান্তের পাঁচ কিলোমিটার অভ্যন্তরের বাসিন্দারাই পরিচয়পত্র দেখিয়ে হাটে কেনাবেচার সুযোগ পান। সীমিত পণ্যের পাশাপাশি এক দেশের তালিকাভুক্ত মাত্র ২৫ ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রি করতে পারেন। আর একজন ক্রেতা ১০০ ডলারের বেশি পণ্য কিনতে পারেন না। এসব নানাবিধ বিধিনিষেধের ফলেই জমে ওঠেনি সীমান্ত হাট। এছাড়া রয়েছে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, নতুন করে সার্ভে করে পণ্য তালিকা তৈরি, বিক্রেতার পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ বাড়ানো, জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে উভয় দেশের নাগরিকের হাটে প্রবেশের সুযোগসহ কয়েকটি পদক্ষেপ নিলে জমে উঠবে দু’দেশের মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা আলোচিত সীমান্ত হাট।

২০১০ সালের ২৩ জুলাই এক জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার বালিয়ামারী সীমান্তে প্রথম সীমান্ত হাটের উদ্বোধন করা হয়। রাজিবপুর উপজেলা শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে বালিয়ামারী সীমান্তে দু-দেশের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম গারোহিল জেলার কালাইয়েরচর নামক স্থানে এ হাট শুরু হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে তত্কালীন বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান, ভারতের পক্ষে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী শ্রী আনান্দ শর্মা, মেঘালয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডঃ মুকুল এম সাংমা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এরপর আরো ৩টি সীমান্ত হাটের উদ্বোধন করা হয়। এরমধ্যে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার তারাপুর ও পশ্চিম ত্রিপুরার কমলাসাগর, ফেনীর ছয়ঘরিয়ার মধ্যবর্তী স্থান ও দক্ষিণ ত্রিপুরার শ্রীনগরের পূর্ব মধুগ্রাম ও সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সায়দাবাদ ও মেঘালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম খাসি পাহাড়সংলগ্ন নালিকাটা সীমান্ত হাট।

সরেজমিনে কুড়িগ্রামের সীমান্ত হাট

অধিকাংশ সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উপজাতীয়দের বিভিন্ন ধর্মীয় উত্সবের অজুহাতে বন্ধ থাকে এ হাটটি। এ ছাড়াও রয়েছে বিএসএফ ও বিজিবি’র নানা খবরদারী ও হয়রানি। ফলে ভেস্তে যেতে বসেছে এই সীমান্ত হাটের উদ্দেশ্য।

হাটের প্রবেশ মুখে ১ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক। একটি বাশের সাঁকোর অবস্থাও করুণ। নদী পথে পণ্য আনা-নেয়া করতে হয় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের। ফলে অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন হাট থেকে। এছাড়া হাটে পণ্যসামগ্রী কেনাবেচা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। হাটে ভারত থেকে যেসব পণ্য সামগ্রী উঠে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা সবগুলো কিনে নেয়। একই ভাবে বাংলাদেশের যেসব বিক্রেতা রয়েছে তাদের পণ্যসামগ্রী ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভারতের কাছে বিক্রি করা হয়। সরেজমিনে সীমান্ত হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে ওই তথ্য পাওয়া গেছে।

হাটের ভারতীয় বিক্রেতা রবীন্দ্র কোচ বলেন, ‘হাটে কোন কোন পণ্য বিক্রি হবে তা আগেই বাংলাদেশিরা মোবাইল ফোনে জানিয়ে দেয়। আমরা সে অনুপাতে পণ্য হাটে আনি। তবে এই সময়ে সবেচেয়ে বেশি বিক্রি হয় জিরার প্যাকেট ও মজা সুপারি। বাংলাদেশি বিক্রেতা সোনা মিয়া বলেন, বাংলাদেশ থেকে হাটে বিক্রি হয় প্লাস্টিক ও মেলামাইন সামগ্রী ও গার্মেন্টস এ তৈরি পোশাক।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক ক্রেতা বলেন, ‘হাটে বাংলাদেশের পক্ষে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। সিন্ডিকেটের সদস্যরাই ক্রেতা আবার বিক্রেতাও। তাদের অনুমতি ছাড়া হাটে কোনো কিছু কেনার শক্তি নেই কারো। এরা হাটের সব পণ্য কিনে নিয়ে তা দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করে থাকে। ভারতীয় মসলা জাতীয় দ্রব্যাদির ব্যাপক চাহিদা থাকায় সিন্ডিকেটের ঐসব ব্যবসায়ী সীমান্ত হাট থেকে কিনে তা কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের সব জেলায় সরবরাহ করে।

এ প্রসঙ্গে সীমান্ত হাটে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী বালিয়ামারী বিজিবি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার নায়েক সুবেদার মোরশেদ জানান, হাটে কেনাবেচা সিন্ডিকেটের বিষয়টি সত্যি নয়। এক সঙ্গে অনেক পণ্য সামগ্রী দেখলেই আমরা আটকে দেই। তখন তারা অনেকগুলো ক্রেতার কার্ড একসঙ্গে এনে বলে এগুলো সবারই। পরিবহনে সুবিধার্থে এক সঙ্গে নেয়া হচ্ছে।’

হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষে রাজিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন মাহমুদ জানান, ‘হাটে সিন্ডিকেট করে কেনাবেচা হচ্ছে এমন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সীমান্ত হাটের ক্রেতা আতাউর রহমান জানান, পণ্য তালিকায় দু’দেশের ৬৯টি পণ্য হাটে বেচা-কেনার অনুমতি থাকলেও ভারত থেকে আসে জিরা, সুপারী, কলা ও আদা। আর বাংলাদেশের পণ্যের মধ্যে প্লাস্টিক, ক্রোকারিজ সামগ্রী, তৈরি পোশাক, আলু ও শাক-সবজি। ফলে চাহিদা মোতাবেক পণ্য না থাকায় হতাশ সীমান্ত হাটের ক্রেতারা।

সীমান্ত হাটের ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক জানান, ভারতীয় ব্যবসায়ীদের হাটে মুদ্রা বিনিময়ের ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সে সুযোগ না থাকায় পড়তে হচ্ছে নানা ভোগান্তিতে। পাশাপাশি হাটে প্রবেশের জন্য সেতু না থাকায় নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে হাটে যাচ্ছেন ক্রেতারা। এছাড়াও বিজিবি ও বিএসএফ’র নানা হয়রানির কথাও জানান ব্যবসায়ীরা। অন্য সীমান্ত হাটগুলোর প্রায় একই অবস্থা।

বাড়াতে হবে পণ্যের সংখ্যা

চুক্তি অনুযায়ী একেবারেই সাধারণ কিছু পণ্য বেচাকেনা চলে সীমান্ত হাটগুলোতে। এছাড়া উভয় দেশেই এসব পণ্য অনেকটা হাতের নাগালে। বর্তমানে সীমান্ত হাটে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা চানাচুর, চিপস, আলু, তৈরি পোশাক, মাছ, শুঁটকি, মুরগি, ডিম, সাবান, শিম, সবজি, গামছা ও তোয়ালে, কাঠের টেবিল-চেয়ার, গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহূত লোহার তৈরি পণ্য বিক্রি করতে পারেন। আর ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ফল, সবজি, মসলা, মরিচ, হুলুদ, পান, সুপারি, আলু, মধু, বাঁশ ইত্যাদি বিক্রির সুযোগ পান। নিয়ম অনুযায়ী, একজন ক্রেতা স্ব স্ব দেশের মুদ্রায় সর্বোচ্চ একশ’ ডলার মূল্য সমপরিমাণের কেনাকাটা করতে পারবেন। হাটের ঠিক মাঝে একটি ভবনে দু’দেশের একটি সমন্বয় অফিস রয়েছে। সেখানে টাকা ও রুপি বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে।

আগামি ৫ বছরের জন্য নবায়ন হচ্ছে সীমান্ত হাট চুক্তি

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হাট চুক্তি নবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া আরো নতুন নয়টি বর্ডার হাট চালু এবং তা কার্যকর করতে কর্মকৌশল গ্রহণ করা হবে। আগামী ১৬ ও ১৭ নভেম্বরে দিল্লীতে দু’দিনব্যাপী বাংলাদেশ-ভারত সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ওই বৈঠক সামনে রেখে এজেন্ডা চূড়ান্ত করেছে সরকার। তারমধ্যে এটিও রয়েছে। জানা গেছে, সীমান্ত হাট চুক্তি নবায়ন করার পাশাপাশি আরো নয়টি হাট চালু এবং চালু থাকা চারটি হাট আরো কার্যকর করার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা করা হবে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, সচিব পর্যায়ের এবারের বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে ভারত। বাণিজ্য বৈষম্য দূর করে উভয় দেশ কিভাবে লাভবান হতে পারে সেসব বিষয়ে এবারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তিনি বলেন, বর্ডার হাট চুক্তি নবায়নসহ বাণিজ্য বৃদ্ধিতে যেসব বাধা রয়েছে তা দূর করতে উভয় দেশ আলোচনা করবে।

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, প্রধান সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: