সর্বশেষ আপডেট : ৩৪ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড আগে
রবিবার, ২০ অগাস্ট, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৫ ভাদ্র ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

হীরক জয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণে

1477549762তারিক রহমান সৌরভ:: আগামীকাল শুক্রবার শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরে ঢাকার চলচ্চিত্রের ৬০তম (১৯৫৬-২০১৬) বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এক স্মরণাঞ্জলির আয়োজন করা হয়েছে বাঙালিসমগ্র জাদুঘরের উদ্যোগে। অনেকেই আমাদের প্রশ্ন করেছেন—আপনারা কেন? এই উদ্যোগ তো এফডিসি কিংবা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের নেওয়ার কথা। আমরা মনে করি, ভাষা, সাহিত্য, নাটক, সংগীত, শিল্পকলা, বিজ্ঞান ও ক্রীড়ার মতো ‘চলচ্চিত্র’ও আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা পূরণ ও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট পরিচালক আব্দুল জব্বার খান পরিচালিত ‘মুখ ও মুখোশ’, এই অঞ্চলের মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় বিপুল উত্সাহ পরিলক্ষিত হয়। সেই ধারায় আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের সূচনা হয় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে। যা পরবর্তীতে এ অঞ্চলের মানুষের বিনোদনের চাহিদা পূরণ করে। একটু পিছনে ফিরে যাই। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের যাত্রারম্ভ হয়। আর ভারতে চলচ্চিত্র তো ১৯১৩ সাল থেকেই দর্শকদের মনোরঞ্জন করে আসছে। ভারত ও পাকিস্তানের ছবির একচ্ছত্র বাজার হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা ছিল, ভারত ও পাকিস্তানের চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীদের কাছে একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত বাজার। ঢাকায় তখন চলচ্চিত্র নির্মাণে স্টুডিও ও প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় প্রতিবেশী দেশের আমদানিকৃত ছবির উপরেই ঢাকার চলচ্চিত্র দর্শক ও সিনেমা হলসমূহ নির্ভরশীল ছিল। ১৯৫০-এর গোড়ার দিকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ মিলে প্রায় ১০টির মতো সিনেমা হলে পাক-ভারতের ছবির রমরমা ব্যবসা ছিল। ১৯৫৩ সালে ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মঞ্চ নাটকের অন্যতম প্রাণপুরুষ আব্দুল জব্বার খান তার বন্ধুবান্ধবদের সহযোগিতায় ‘মুখ ও মুখোশ’ নামে একটি চলচ্চিত্র তৈরির উদ্যোগ নেন। কলকাতা থেকে একটি আইমো ক্যামেরা এনে চিত্রগ্রহণ পর্ব শুরু হয়। ঢাকায় কেবল ‘মুখ ও মুখোশ’-এর শুটিং ও গান রেকর্ডিং করা সম্ভব হয়েছিল। ল্যাবের যাবতীয় কাজ লাহোরের শাহনূর স্টুডিওতে সম্পন্ন করা হয়। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় এক লক্ষ দশ হাজার টাকায় নির্মিত ‘মুখ ও মুখোশ’ ছবির প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা ফজলুল হক, ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি পরিচালকের হাতে প্রথম সবাক বাংলা চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়, অতঃপর। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের দুটি হল ছাড়াও ‘মুখ ও মুখোশ’ ছবিটি চট্টগ্রামের নিরালা ও খুলনার উল্লাসিনী হলে প্রায় চার সপ্তাহ প্রদর্শিত হয়। এটা তো খুবই সত্যি কথা, মাত্র একমাসের প্রস্তুতিতে বিগত ৬০ বছরের চলচ্চিত্রের অর্জনকে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টার জন্য তুলে ধরা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। প্রস্তুতির বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমাদের মূলত যে সমস্যাটি হয়েছে, তাহলো—চলচ্চিত্র সংক্রান্ত রেকর্ডের অপ্রতুলতা, ৬০ ও ’৭০ দশকে নির্মিত উল্লেখযোগ্য ছবিসমূহের নিম্নমানের প্রিন্ট, ছবির ফটোসেট ও পোস্টারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাবনীয় অনুপস্থিতি আমাদের কর্মতত্পরতাকে ব্যাহত করেছে নিঃসন্দেহে। আমরা চেষ্টা করছি, বিগত ছয় দশকে ঢাকায় নির্মিত উল্লেখযোগ্য ছবিসমূহের নির্বাচিত অংশ নিয়ে একটি ‘কোলাজ’ নির্মাণের। যা কি না অনুষ্ঠানস্থলে আগত দর্শকদের বিগত ছয় দশকে আমাদের তৈরি চলচ্চিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা প্রদানে সক্ষম হবে। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট প্রায় ত্রিশটি দুর্লভ স্মারক, যেমন—মুভি ক্যামেরা, ছবির ওয়ার্কিং ও সাধারণ স্টিল, চিত্রনাট্যের অংশ বিশেষ, গুরুত্বপূর্ণ চিঠিসহ বিভিন্ন স্মারক নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন। কিছু অসমাপ্ত প্রায় দুর্লভ ছবির শুটিংকৃত কিছু অংশ ও রাশপ্রিন্ট আগত দর্শকদের দেখানো হবে।

আব্দুল জব্বার খানের ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে শুরু হওয়া ঢাকার ছবির যাত্রাপথ ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আসিয়া’, পর্যায়ক্রমে গোটা ষাট দশকে ‘কাচের দেয়াল’, ‘কখনো আসিনি’, ‘সূর্য স্নান’, ‘রূপবান’, ‘সুতরাং’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘বেহুলা’, ‘ময়নামতি’, ‘দর্পচূর্ণ’ হয়ে ১৯৭০ সালে ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবির মাধ্যমে পরিপুষ্ট ও বেগবান হয়। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সাল থেকে ‘ওরা ১১ জন’, ‘অবুঝ মন’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘আলোর মিছিল’, ‘মাসুদ রানা’, ‘লাঠিয়াল’, ‘সূর্য কন্যা’, ‘সুপ্রভাত’, সূর্য গ্রহণ’, ‘বসুন্ধরা’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সারেং বউ’, ‘নোলক’, ‘ডুমুরের ফুল’ ও ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ ঢাকার চলচ্চিত্রকে শৈল্পিক ও সামাজিক দুই ধারায় শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দেয়। আশির দশক পরবর্তী সময়ে ‘ফোক’ ও ‘ফ্যান্টাসি’ ছবি নির্মাণের পাশাপাশি বলিষ্ঠ বক্তব্যমূলক কিছু সাহিত্যাশ্রয়ী ছবি ঢাকার নির্মাতারা অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে নির্মাণ করেছিলেন। মধ্য নব্বই থেকে ঢাকার চলচ্চিত্রে ‘নতুন’ শিল্পী, কলাকুশলীদের আগমনে আমাদের চলচ্চিত্রের ট্রিটমেন্ট ও বিষয়বস্তু দুই ক্ষেত্রেই ব্যাপক পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে।

পূর্ণিমা সেন গুপ্ত, জহরত আরা, বিলকিস বারী, সুমিতা দেবী, ফতেহ লোহানী, কাজী খালেক, শবনম, কবরী, রাজ্জাক, সোহেল রানা, শাবানা, সুজাতা হয়ে ববিতা, ফারুক, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চন, সালমান শাহ, মৌসুমী, শাবনূর থেকে বর্তমানের মাহিয়া মাহী ও পরিমণি—ছয় দশকের সুবিস্তৃত চলচ্চিত্র শিল্প আমাদের। শত সহস্র জ্ঞানী, গুণী নির্মাতা, চিত্রগ্রাহক, চিত্রনাট্যকার, চিত্র সম্পাদক, রূপসজ্জাকর, শিল্পনির্দেশক, গীতিকার, সুরকার, অভিনয়শিল্পী ও প্রযোজক আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে ছয় দশক ধরে কাজ করেছেন। তাদের সকলের সম্মিলিত মেধা, শ্রম ও নিষ্ঠায় আজ শক্ত অবস্থানে আমাদের চলচ্চিত্র।

সময়ের অভাবে অথবা পরিচয়ের অভাবে—যেভাবেই হোক না কেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অনেককেই ব্যক্তিগতভাবে নিমন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এই অপারগতার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে আগামীকাল ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাতীয় জাদুঘরে চলচ্চিত্রের হীরক জয়ন্তীর এই অনুষ্ঠানে আপনাদের স্বপ্রাণ উপস্থিতি কামনা করছি।

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, বাঙালিসমগ্র জাদুঘর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: