সর্বশেষ আপডেট : ১৩ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড আগে
বুধবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭, খ্রীষ্টাব্দ | ৩ কার্তিক ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |

DAILYSYLHET

সুনামগঞ্জে কমিউনিটি ক্লিনিকের হালচাল : বাড়ছে সেবাগ্রহীতার হার

4547সুনামগঞ্জ সংবাদদাতা:: পিছিয়ে থাকা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মানসম্মত প্রাথমিক চিকিৎসার লক্ষ্যে সরকার সারাদেশের ন্যায় সুনামগঞ্জেও দুই শতাধিক কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। চারদলীয় জোট সরকার ২০০১ সালে নির্বাচিত হয়ে এই ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় আ.লীগ সরকার পরবর্তীতে এসে তা চালু করলেও শুরুতে সেবা নিয়ে সন্দেহে ছিল গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। তাই ক্লিনিকগুলোতে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা আশানুরূপ ছিল না।

স্থানীয় লোকজনের মতে এমনও সময় গেছে সেবাগ্রহীতা না আসায় কমিউনিটি ক্লিনিকের বরাদ্দকৃত ওষুধ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর ফেলে দেওয়া হতো! এখন সেই ওষুধে ১ মাসও যায় না! তাই বিনা ওষুধেই ফিরে যেতে হয় অনেক রোগীকে। এখন সেবাগ্রহীতাদের দাবি ওষুধ সরবরাহ বাড়ানোর।
জানা গেছে, ক্লিনিক ব্যবস্থাপনায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সাংগঠনিকভাবে সম্পৃক্ত করার কথা থাকলেও তাদেরকে সক্রিয় করা হয়নি। ফলে অসচেতন গ্রামীণ লোকজন সেবা নিত না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র বিরাজ করছে। ক্লিনিক পরিচালনায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করায় সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে। নিয়মিত শত শত গ্রামীণ রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের ‘কলায়া কমিউনিটি ক্লিনিক’ পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয় সুবিধাভোগী লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা গেল। তারা জানান, এখন আর কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রতি সেবাগ্রহীতাদের বিরূপ ধারণা নেই। তবে ক্লিনিকে যাওয়ার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, বিদ্যুতায়ন ও ওষুধ সরবরাহ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন তারা। এলাকাবাসী আরো জানান, বাড়ির দোরগোড়ায় হওয়ায় ক্লিনিকে এসে সবচেয়ে বেশি সেবা নিচ্ছেন নারী ও শিশুরা। গর্ভবতী মা, প্রসূতি মা ও শিশুরা এখানে এসে জরুরি সেবা নিতে পারছেন। গর্ভধারণের পর ক্লিনিকে এসে সন্তান জন্ম দানের আগে-পরে নিয়মিত চেকআপ ও সেবা নেওয়ায় মা ও শিশু মৃত্যুর হারও কমেছে। কমেছে জন্মনিয়ন্ত্রণের হারও। তাছাড়া গ্রামীণ নানা বয়সী লোকদের মধ্যেও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিতেও তারা আগ্রহী হয়েছেন।

সুনামগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি নিষ্ক্রিয় ‘কমিউনিটি গ্রুপ’ ও ‘কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ’কে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলার দিরাই ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ৪২টি কমিউনিটি ক্লিনিকের নিষ্ক্রিয় কমিউনিটি গ্রুপ ও কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপকে সক্রিয় করতে দাতা সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশ ‘নিউট্রিশন দি সেন্টার’ নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৩ সনের অক্টোবর থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই দাতা সংস্থা কমিউনিটি গ্রুপ ও সাপোর্ট গ্রুপের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করায় তারা এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৮৮টি ইউনিয়নে ২২০টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। ক্লিনিক পরিচালনার নিয়মানুযায়ী প্রতিটি ক্লিনিকের বিপরিতে একটি কমিউনিটি গ্রুপ (ব্যবস্থাপনা কমিটি) ও তিনটি কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ (সহায়ক কমিটি) রয়েছে। প্রতিটি কমিটিতেই রয়েছেন এক তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধি। জেলায় মোট ৮৮০টি কমিটি রয়েছে যারা এলাকার নানা পেশার গণ্যমান্য। ক্লিনিক পরিচালনায় নিয়োজিত কমিটিগুলো এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি ক্লিনিকে এসে সেবা নিতে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করছে।

এলাকাবাসী জানিয়েছেন শুধু সহায়ক কার্যক্রম পরিচালনাই নয় বিভিন্ন এলাকার সক্রিয় কমিটির লোকজন নিজেরা মাসিক চাঁদা দিয়ে নির্দিষ্ট তহবিলও গঠন করেছেন। নিজেদের অর্থায়নে তারা বিদ্যুৎহীন কমিউনিটি ক্লিনিকে বিদ্যুৎসংযোগও দিচ্ছেন। সাপোর্ট গ্রুপ পরিচালনার লক্ষ্যানুযায়ী স্থানীয় সম্পদ আহরণের মাধ্যমে কমিউনিটি গ্রুপ তহবিল তৈরি করে ক্লিনিকের রক্ষণাবেক্ষণসহ এই এলাকার অবহেলিত ও দরিদ্র জনগণকে জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তিতে সহায়তা করতেও দেখা যাচ্ছে। কমিটির লোকজন এই কাজের পাশাপাশি অপুষ্টি চক্রে মানুষের দুর্ভোগ, পরিবার পরিকল্পনার সুফল, দারিদ্র্যবিমোচনে পরামর্শ, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ এবং যৌতুকের বিরুদ্ধেও গ্রামীণ লোকদের সচেতন করছেন। কাজ করতে গিয়ে এলাকার হতদরিদ্রদের পরিসংখ্যানও স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সামনে তোলে ধরছেন কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনা কমিটি ও সাপোর্ট কমিটির লোকজন।

সুনামগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সন থেকে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম চলছে। ২০১৪ সনের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সনের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নারী, শিশু পুরুষসহ ১৭ লক্ষ ২৭ হাজার ১৪১জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ওই সময়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে সন্তান প্রসব করেছেন ১০৯ জন মা।

কলায়া কমিউনিটি ক্লিনিকের সাপোর্ট গ্রুপের আহ্বায়ক ও এলাকার প্রবীণ শিক্ষক সত্যব্রত দাস বলেন, আমাদের ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আগে কোন ধারণা ছিল না। এখন জেনেছি আমাদের ক্লিনিক আমাদেরকেই পরিচালনা করতে হবে। গ্রামীণ লোকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে তাদেরকে ক্লিনিকে সেবা নিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সেই লক্ষ্যে আমাদের চারটি কমিটি সক্রিয় ভাবে কাজ করছি। এতে মানুষ সচেতন হচ্ছে, সেবাও নিচ্ছে। দিনদিন সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের ক্লিনিক রক্ষণাবেক্ষণে আমরা নিজেরাই মাসিক চাঁদা দিয়ে নির্দিষ্ট তহবিলও সংগ্রহ করেছি। এলাকা থেকে চাঁদা তোলে বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্যোগ নিয়েছি।
কলায়া কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপের সদস্য শিখা রাণী দাস বলেন, আমাদেরকে কমিটিতে সক্রিয় ও সচেতন করায় আমরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে গর্ভবতী মহিলাদের ক্লিনিক থেকে সেবা নিতে উদ্বুদ্ধ করছি। তারা যাতে পরিকল্পিত পরিবার গড়ে সেই প্রচারণাও চালাই। প্রথমে এই সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পর নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হলেও এখন সেই সংকট কেটে গেছে। নারী ও শিশুরা ক্লিনিকে সেবা নিতে ঝুঁকছে। এতে মা ও শিশুর মৃত্যুহার ও জন্মনিয়ন্ত্রণের হার কমেছে এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে। আমরা প্রতি দু’মাস পরপর সভা করে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করে কাজ করছি।
কলায়া কমিউনিটি ক্লিনিক সাপোর্ট গ্রুপের যুগ্ম আহ্বায়ক স্থানীয় কাজী আব্দুল হক শাহ বলেন, মানুষের মধ্যে সেবা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বাড়ায় ওষুধের চাহিদা বেড়েছে। অথচ এক সময় নির্ধারিত মাসের বরাদ্দকৃত ওষুধই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে নষ্ট হয়ে যেতো। এখন যে ওষুধ সরবরাহ করা হয় তা এক মাসেই শেষ হয়ে যায়। তিনি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহ বৃদ্ধির দাবি জানান।

কেয়ার বাংলাদেশের প্রকল্প পরিচালক (পুষ্টি) মো. হাফিজুল ইসলাম বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্লিনিকের প্রদেয় সেবাসমূহ এবং স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে “কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ (সিএসজি) কমিউনিটি গ্রুপ (সিজি) সহায়ক হিসেবে মাঠ পর্যায়ে কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। যার ফলে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়ে মানুষের দোদুল্যমানতা কমেছে। আমরা সবগুলো কমিটিকে সক্রিয় করার চেষ্টা করছি। যাতে আরো মানুষ ক্লিনিকে এসে সেবা নিতে পারে।

সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল হাকিম বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক হচ্ছে জনগণ পরিচালিত ক্লিনিক। কিন্তু আমাদের জনগণ সেই বিষয়ে আগে তেমন সচেতন ছিল না। এখন তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ায় মানুষ সেবার প্রতি আগ্রহী হয়েছে। ঘরে বসেই সাধারণ মানুষ বিনামূল্যে সেবা পাচ্ছে। তিনি কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনা কমিটি ও সাপোর্ট কমিটিকে আরো সক্রিয় করতে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানান।

এ বিভাগের অন্যান্য খবর

নোটিশ : ডেইলি সিলেটে প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি -সম্পাদক

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

২০১১-২০১৬

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি : মকিস মনসুর আহমদ, সম্পাদক : লিয়াকত শাহ ফরিদী
প্রকাশক : কে এ রহিম, নির্বাহী সম্পাদক: মারুফ হাসান
কার্যালয়: ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি, ৯ম তলা, জিন্দাবাজার, সিলেট-৩১০০
ফোন : ০৮২১-৭২৬ ৫২৭, ০১৭১৭ ৬৮ ১২ ১৪ (নিউজ), ০১৭১২ ৮৮ ৬৫ ০৩ (সম্পাদক)
ই-মেইল: dailysylhet@gmail.com

Developed by: